চাঁদপুর। শনিবার ১৫ জুলাই ২০১৭। ৩১ আষাঢ় ১৪২৪। ২০ শাওয়াল ১৪৩৮

বিজ্ঞাপন দিন

বিজ্ঞাপন দিন

সর্বশেষ খবর :

  • ---------
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

২৮-সূরা কাসাস 


৮৮ আয়াত, ৯ রুকু, ‘মক্কী’


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


৮৪। যে কেহ সৎকর্ম লইয়া উপস্থিত হয় তাহার জন্য রহিয়াছে উহা অপেক্ষা উত্তম ফল, আর যে মন্দকর্ম লইয়া উপস্থিত হয় তবে যাহারা মন্দকর্ম করে তাহাদিগকে তাহারা যাহা করিয়াছে উহারই শাস্তি দেওয়া হইবে।     


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


 


হতাশা এবং অবিশ্বাস উভয়েই ভীতি দূর করে।


                 -উইলিয়াম আলেকজান্ডার।

মায়ের পদতলে সন্তানদের বেহেশত। 


ফটো গ্যালারি
ঘুম নগরীতে ঘুম
সাইফুল ইসলাম জুয়েল
১৫ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+
‘তুলতুলে, আদুরে, ঘুম কাতুরেদের জন্য ঘোরাঘুরি নয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জার্নির ওপরে থাকা লাগতে পারে, টানা কয়েক রাতও নির্ঘুম কাটতে পারে! তাই না ঘুমানোর প্রস্তুতি নিয়েই যেতে হবে।’

আমার এ কথা শুনে বন্ধু হাসান যেন খানিকটা নয় পুরোপুরিই হতাশ হলো। বলল, ‘না ঘুমিয়ে কি ঘোরা যায়? ঘুম, তথা বিশ্রাম তো কাজ অর্থাৎ ঘোরাঘুরিরই অংশ। তাহলে, না ঘুমালে চলবে কেমনে?’

আমি আর কিছু না বলে ভ্রমণের পরিকল্পনা নিয়ে ঘাটাঘাটি করছিলাম। যাচ্ছি দার্জিলিং। প্রথমে ঢাকার ক্যন্টনমেন্ট থেকে মৈত্রি এক্সপ্রেসে (ট্রেনে) যাব কলকাতা স্টেশন। তারপর বাসে শিলিগুঁড়ি হয়ে জিপে দার্জিলিং যাব।

দার্জিলিয়ের দর্শনীয় স্থানগুলো দেখতে গিয়ে তালিকার প্রথমেই যেটি চোখে পড়ল, তা হলো-ঘুম!

আমি স্তম্ভিত। বন্ধু হাসানকেও দেখলাম, মুচকি মুচকি হাসছে। আমিও কিছুক্ষণ কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেললাম। তবে কেন জানি মনের মধ্যে খুঁত খুঁত করতে লাগল। শেষমেষ তো ও বলেই বসল, ‘তুই না বললেও, দেখছিস তো, ঘুমই হলো দার্জিলিং গিয়ে ভ্রমণার্থীদের প্রধান কর্ম। নিশ্চয়ই ওখানে গিয়ে ঘুমানোর মধ্যে আলাদা ফিলিংস আছে!’

এতক্ষণে আমার আসল বিষয়টা মনে পড়ল, ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ৭৪০৭ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত ঘুম হলো এক সময়কার পৃথিবীর সবচেয়ে উচ্চতর রেলওয়ে স্টেশন। এখন অবশ্য তালিকায় ১৪ তম স্থানে নেমে গেছে। কিন্তু ভারতের সর্বোচ্চ রেলওয়ে স্টেশন এটিই। বন্ধু হাসানের মুখে তাই চুনকালি পড়তে বেশিক্ষণ লাগলো না। তবে, আমি কিন্তু মনে মনে ঘুমে গিয়ে একবেলা ঘুমানোর পরিকল্পনা সাজিয়ে ফেলেছি!

২. 

শুভ্র বরফে ঢাকা পাহাড়ের সঙ্গে মেঘ যেখানে প্রতিক্ষণেই মিতালি করে, যেখানে নীলচে পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে সূর্যের স্বর্ণালি আভার বিকিরণ হয় প্রতিটি ভোরেই-এমন এক স্থানে একটি ভোর হবে, যে ভোরে আড়মোড়া দিতে দিতে জাগবো, আর হা করে তাকিয়ে থাকবো-এমন আকাক্সক্ষা ছিলো বহুদিনের। অনেক আগ থেকেই কাঞ্চনজঙ্ঘাও যেন আমাকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো হাতছানি দিয়ে ডাকছিলো। কিন্তু দার্জিলিংয়ের প্রথম সকালটা কাটলো কুয়াশাময়! তবুও দিনভর হেঁটে হেঁটে উপভোগ করলাম পাহাড় নগরীর সৌন্দর্য। হিমালয়ের সর্পিল রাস্তা দিয়ে ছুটে চলে কু ঝিক ঝিক রেল গাড়ি। এখানে দু ধরনের ট্রেন চলে-বাষ্পীয় ইঞ্জিনের আর ডিজেল ইঞ্জিনের। মূলত, বাষ্পীয় ইঞ্জিনের শত বছরের পুরোনো স্বাদ পেতেই মানুষ এখনকার টয় ট্রেন সওয়ারী হয়। আর কাঞ্চনজঙ্ঘার অজানা মায়া থেকে মুক্তির কোনো উপায় নেই সৌন্দর্যপিপাসু মানুষের!

সিদ্ধান্ত নিলাম আজ না হলেও, পরদিন ভোরে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে যাব। সে জন্য জিপে করে টাইগার হিলে যেতে হবে। আগের রাতেই গাড়ি ঠিক করে রাখলাম। ভোর চারটায় উঠতে হবে। কিন্তু ঘুম ভেঙে গেল তিনটায়। এক অদ্ভুত সুরলহরী যেন রাতের দার্জিলিং শহরকে আচ্ছন্ন করে রাখছিলো তখন। ভূপৃষ্ঠের ৭০০০ হাজার ফুট উচ্চতায় ৬ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় কম্বলের নিচের আরামদায়ক শীতনিদ্রা থেকে ওঠা নিঃসন্দেহে কঠিন কাজ। ঘোরের মধ্যেই কম্বলের তলা থেকে বের হলাম। বাইরে তখন বৃষ্টি হচ্ছে, ঝুম বৃষ্টি। হঠাৎ হঠাৎ বিদ্যুৎ ঝিলিক দিয়ে উঠছে আকাশে। হোটেলের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখে নিলাম মনভরে। শঙ্কাও ছিলো মনে-বৃষ্টিতে তো কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা মিলবে না! তবুও বৃষ্টি আর ভীষণ ঠা-ার মধ্যে শরীরে কয়েক প্রস্থ গরম কাপড় আর বর্ষাতি চাপিয়ে বের হলাম। হিন্দি মুভির দৃশ্যের মতোই ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে জিপে চড়ে পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ অনুভব করছিলাম মনে। যখন টাইগার হিলে পৌছলাম, তখন বৃষ্টি থেমে গেছে। চারপাশে মেঘের সমুদ্র। এখানে নতুন অবজারভেটরী বিল্ডিং বানানো হচ্ছে। আকাশে লালিমা শুরু। পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠছে, রক্ত লাল। কিন্তু আমরা অপেক্ষা করছি সেই মোহনীয় দৃশ্যের। একটু পরে সেই দৃশ্য দৃশ্যত হলো-সোনালী কাঞ্চনজঙ্ঘা! আহ, এই দৃশ্য দেখার জন্য কারো কারো এক মাসও অপেক্ষা করতে হয়, তবুও দেখা মেলে না! আমরা ভাগ্যবান। মনে হলো-আমার চোখের আজ শান্তি মিলল! একটু পরেই অবশ্য সূর্য আবার মেঘের আড়ালে চলে গেল। আবার যখন উঠল, তখন আর সেই রূপ নেই, এখন সে সোনালি নয়, রূপালি সৌন্দর্যের রাণি।

৩.

ফেরার পথে গাড়ি থামল ঘুম মনাস্টারি বা ইগা চোলিং বৌদ্ধমঠের সামনে। দার্জিলিং এর আনাচে কানাচে অসংখ্য বুদ্ধ মনাস্টারি রয়েছে। তবে ১৮৫০ সালে তৈরি এই মঠটিই দার্জিলিংয়ে সবচেয়ে পুরানো মঠ। দেয়ালে চমৎকার সব শিল্পকর্ম, বেশির ভাগ দেখলেই মনে হয়- ছোটবেলায় যে চিনা রূপকথা পড়তাম, তার চরিত্র। মূল মন্দিরে যাওয়ার আগে আরেকটি বিল্ডিং পড়ে, এখানে দেয়ালে তিব্বতি বা চিনা ভাষায় অনেক মন্ত্র লেখা। মূল মন্দিরের মাঝে বিশাল এক বৌদ্ধ মূর্তি। বাতাসে মিষ্টি ফুলের গন্ধ, ভিক্ষুরা পবিত্র জল ছিটাচ্ছে আর জপযন্ত্র ঘুরাচ্ছে। বাহিরে বাচ্চা ভিক্ষুরা ছোটাছুটি করছে। সব মিলিয়ে কেমন যেন একটা পরিবেশ, গেলে আপনা থেকেই মন শান্ত হয়ে যায়।

এরপর গেলাম ঘুম মনাস্টারি থেকে প্রায় ৩ কিমি দূরে বাতাসিয়া লুপ। একে লুপ বলে কারণ বিখ্যাত টয় ট্রেন দার্জিলিং থেকে শিলিগুঁড়ী যাওয়ার পথে এটা প্রদক্ষিণ করে একটা লুপ তৈরি করে। লুপের মাঝে গোরখা মেমোরিয়াল সৌধ। সৌধের গায়ে মাতৃভূমিকে বাঁচাতে গিয়ে শহীদ হওয়া সকল গোরখা যোদ্ধাদের নাম লিখা। সৌধের জন্য এত চমৎকার জায়গা বুঝি আর হয় না। প্রতিদিন টয় ট্রেন একবার চক্কর দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়, আর হিমালয় তার বিশাল ভালোবাসা নিয়ে ঘিরে রেখেছে। এককথায়, হিমালয় দিয়ে ঘেরা স্মৃতিসৌধ। সৌধের পাশে একটি ছোট বোটানিকাল গার্ডেন আছে, শুধু ওষধি বৃক্ষের। এখানে দার্জিলিংয়ের জাতীয় পোশাক ৫০-১০০ রুপীতে ভাড়া পাওয়া যায়। সেই পোশাক পরে ছবি তোলার ব্যবস্থাও আছে। তাছাড়া, ৩০ রুপীর বিনিময়ে টেলিস্কোপ দিয়ে হিমালয়ের পর্বতমালা দেখার ব্যবস্থাও রয়েছে। টেলিস্কোপ বললেও জিনিসটা আসলে- দূরবিনের সামনে টিন পেঁচিয়ে বানানো হয়েছে! এখান থেকে দার্জিলিং শহরটা দারুণ দেখায়। আবহাওয়া পরিষ্কার থাকলে কাঞ্চনজঙ্ঘাও দেখা দেয়। আর ভাগ্য ভাল থাকলে মাউন্ট এভারেস্টের দেখাও মেলে।

হঠাৎ মনে পড়ল-আরে, আসল জিনিটাই তো দেখা হলো না! আরামের ঘুম বাদ দিয়ে যে জিনিসটা দেখতে এলাম, সেই ‘ঘুম’ কই? ড্রাইভার বলল, ‘সেটা পেছনে ফেলে এসেছি। দেখার মতো কিছু নাই। ¯্রফে আর দশটা স্টেশনের মতোই!’

উহু বললেই হলো! এতদূর এসে ঘুম না দেখে কি ফেরা যায়? ঘুম আর অন্য দশটা স্টেশন কি এক হলো নাকি? গাড়ি ঘুরিয়ে আবারও ঘুম স্টেশনের পানে ছুটলাম। ঘুম স্টেশনে পৌছার পর অদ্ভূত এক অনুভূতি জাগল মনে। এই সেই ঘুম স্টেশন। ঘুমে আমরা বিখ্যাত বৌদ্ধ মন্দির দেখেছি, বাতাসিয়া লুপ দেখেছি, টাইগার হিলের সূর্যোদয় দেখেছি। কিন্তু আমাকে সবথেকে বেশি আপ্লুত করেছে ঘুম রেল স্টেশন। যতোটা না সৌন্দর্যের জন্য, তার থেকেও বেশি এই স্টেশনের ঐতিহাসিক গুরুত্বের জন্য। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো দার্জিলিং হিমালয়ান রেলকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করে। ব্রিটিশরা তাদের অবকাশযাপনের জন্য শহর দার্জিলিংয়ের পত্তন ঘটিয়েছিল। দার্জিলিং মিউনিসিপ্যালিটির একটি ওয়ার্ড ‘ঘুম’। শান্ত দার্জিলিংয়ে ছোট্ট পাহাড়ি অঞ্চল ‘ঘুম’ 

যেন আরেক বিস্ময়। মূল শহর থেকে ঘুমের সৌন্দর্যরাজ্যের দূরত্ব ছয় কিলোমিটার। শিলিগুঁড়ী থেকে হিল কার্ট রোড ধরে দার্জিলিং যাওয়ার পথেই ফেলে যেতে হবে ঘুম রেলওয়ে স্টেশনকে। ১৮৮১ সালে এই স্টেশন স্থাপন করা হয়। দার্জিলিংয়ের টয় ট্রেনগুলো এই ঘুম স্টেশন থেকেই দার্জিলিংয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। আর ঘুমের সুনসান নীরবতা ভাঙে ট্রেনের ঝিক ঝিক শব্দে। রেলপথ বাদে অন্যান্য যানে ঘুম থেকে দার্জিলিং যেতে ২০-২৫ মিনিট সময় লাগে। আসলে ঘুম হচ্ছে অনেকগুলো রাস্তার জংশন পয়েন্ট, যেখান থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে পাড়ি দেয়া যায়। ঘুম থেকে একটি রাস্তা চলে গেছে ক্যালিম্পংয়ের দিকে। ৪৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এ স্থানটিতেই নীলচে কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা মিলবে। এখান থেকেই একটি রাস্তা দ্বিখ-িত হয়ে চলে গেছে গ্যাংটকের দিকে। ঘুম থেকে অন্য একটি রাস্তা ধরে এগোলে মিরিকের মায়াবী লেক আর চা বাগানের সবুজ স্বর্গরাজ্যে মুখ ডুবিয়ে প্রকৃতির স্বাদ আস্বাদন করা যাবে। মোদ্দাকথা হলো- দার্জিলিংয়ে যাওয়ার পথে ঘুমে এক পা ফেলতেই হবে ভ্রমণকারীদের। এখানকার পরিবেশটা বেশ চমৎকার। খুবই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। একরত্তি ময়লা নেই কোথাও। আনমনে হাঁটছিলাম ঘুমের রেললাইন ধরে। এই রেলপথে বর্তমানে স্বল্প পরিসরে ট্রেন চলাচল চালু আছে। তখন এই স্টেশনে বসে এককাপ কফি পানের খুব ইচ্ছে জাগছিলো মনে! কিন্তু আশপাশে কোথাও কফিওয়ালার টিকিটিরও দেখা পেলাম না। ঘুম রেলস্টেশনের বিপরীতে ঘুম জাদুঘরের অবস্থান। খুব ইচ্ছে ছিল জাদুঘরটা ঘুরে দেখব, কিন্তু সকাল ১০টার আগে খুলে না বিধায় ভেতরটা দেখা হয় নি। বাইরের বাগানে রাখা ছিল ইধনু ঝওাড়শ. এটা হচ্ছে প্রথম ইঞ্জিন যা কিনা ১৮৮১ সালে টয় ট্রেন উদ্বোধনের সময় ব্যবহার করা হয়েছিল।

হঠাৎ বন্ধু হাসানের কথা মনে পড়ল। আনমনে হাঁটতে গিয়ে ওকে কোথায় ফেলে এসেছি কে জানে! পিছনে এসে দেখি- বেচারা স্টেশনের পাশের এক বেঞ্চিতে চুপটি মেরে বসে আছে! কাছে গিয়ে বুঝলাম-এ কী বসে থাকা! এ হলো ঘুমে বসে মজার ঘুম!

দার্জিলিং থেকে আসার পথে ট্রেনে অবশ্য হাসানকে নির্ঘুম এক রাতই কাটাতে হয়েছিল। থাক, সে গল্প নাহয় আরেকদিন করব!

আজকের পাঠকসংখ্যা
৬০৮০৯৭
পুরোন সংখ্যা