চাঁদপুর। রোববার ১৩ আগস্ট ২০১৭। ২৯ শ্রাবণ ১৪২৪। ১৯ জিলকদ ১৪৩৮

বিজ্ঞাপন দিন

বিজ্ঞাপন দিন

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

২৯-সূরা আনকাবূত

৬৯ আয়াত, ৭ রুকু, ‘মক্কী’

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

২৮। স্মরণ কর লুতের কথা, সে তাহার সম্প্রদায়কে বলিয়াছিল, ‘তোমরা তো এমন অশ্লীল কর্ম করিতেছ, যাহা তোমাদের পূর্বে বিশ্বে কেহ করে নাই।   

দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন




একটি সুন্দর মন থাকা একটি সুন্দর রাজ্যে বসবাস করার আনন্দের মতো।                     

 -জনওয়েলস।


রাসূল (সাঃ) বলেছেন, নামাজ আমার নয়নের মণি।


শকুনের বয়স
শাহনেওয়াজ বিপ্লব
১৩ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+

মান্নান মিয়ার কথাই বলছি। বয়স প্রায় পঁচাত্তর। শরতের ছেঁড়াকাটা মেঘের মতো মাথার টাকের মাঝে মাঝে সাদা সাদা চুল। দিন দশেক হল বহু অনুরোধের পর নাপিত এসে গোঁফ-দাড়ি কামিয়ে দিয়ে গেছে। আবার কতবার কত অনুরোধের পর কবে আবার আসবে কে জানে ! সরু সরু হাত-পায়ের শিরাগুলো শুকনো আলুর ছালের মতো আলগা চামড়ার বাধা মানতে চায় না। বুকটাকে দেখলে আর নরকংকালের ছবি দেখার দরকার হয় না।

বিপরীতভাবে মোড়ানো দু'হাঁটুকে দু'হাতের বেষ্টনীতে আবদ্ধ করে হাঁটুর ফাঁকে ঘাড় গুঁজে বারান্দায় একটি পুরনো কাঁথার উপর বসেছিলেন মান্নান মিয়া। এইভাবেই বসে থাকেন। পরিধেয় কাপড়টা হাঁটু থেকে নিচে নেমে গিয়ে জাঙিয়ার মতো শুধু লজ্জা নিবারণ করছিল। মাঝে মাঝে নুয়ে যাওয়া মাথাটা ঈষৎ তুলে, বসে যাওয়া চোখ দু'টি যথাসম্ভব ধারালো করে সামনে, এপাশে-ওপাশে তাকাচ্ছিলেন বৃদ্ধ। বৌমা সুমনার দিকে তাকালেন একবার। বিরক্ত হল নিশ্চয়ই সুমনা, এসব বৃদ্ধের জানা হয়ে গেছে কিনা !

-ভাত হতে আজ দেরি হবে মনে হয় বৌমা? বৃদ্ধের সাধারণ প্রশ্ন।

শান্ত স্বর সুমনার, আজ একটু দেরি হবে।

কখন ডাকবে সুমনা-এই চিন্তা মান্নান মিয়ার । কেবল ভাবেন-এই বুঝি বলবে, 'রান্না হয়ে গেছে বাবা। আসুন, খেতে আসুন'। নিরুপায় হয়ে চুপ করে বসে রইলেন বৃদ্ধ। আজ যে দেরি হওয়ারই কথা। একপ্রস্থ রান্না হয়ে গেছে। তাই খেয়ে পুত্র জামাল গেছে অফিস, নাতি গেছে ইস্কুলে। বৃদ্ধ কী করবেন খুঁজে পাচ্ছিলেন না। অন্যদিন কথাটা বলে খোঁচা খেয়েছেন, 'বুড়ো শুকুন' শুনতে হয়েছে, চোখ ফেটে পানি ঝরেছে, তবু থাকতে না পেরে তিনি আবার আজ বললেন, তরকারির ছালে সবই নোংরা হয়ে আছে, মশলা বেটে শিলটাও তুললে না। পানি পড়ে কী হয়েছে চারিদিক। একটু চুপ করে থেকে আবার প্রশ্ন করলেন, সক্কাল বেলাতেই রহিমা বুড়ি, কি জন্যে এসেছিল? বেটা খেতে দেয় না তো, আমরা কি করব? একটু থেমে আবার ফদ্ ফদ্ করে উঠলেন, আদার কুচিটা পড়ে রয়েছে বৌমা, ফেলে দিয়েছ ? আলুটা কি পচে গেছে! সবই তো পয়সা দিয়ে কেনা-

বৃদ্ধ মান্নান মিয়া অপচয় সহ্য করতে পারেন না। দেখতে পারেন না চারিদিক নোংরা থাকা। দেরিও সয়না। মনে হয় এখনই সব ঠিকঠাক হয়ে গেলে ভালো হয়। সারাদিন এইসব দেখেন বসে বসে। ছেলে-বৌ-নাতির ছড়িয়ে যাওয়া স্বভাব, আর ব্যস্ত হয়ে ওঠা স্বভাব বৃদ্ধের। প্রতিবাদ করেন, যুক্তি মানেন না, অপমান খান, কাঁদেন। আবার যখন শোনেন, 'বাবা খেতে আসুন,' তখনই আনন্দে হেসে ওঠেন।

_বাবা, আপনার চারিদিকে এত নজর কেন? কতবার না বলেছি । নিজের চোখেই তো দেখলেন, দু'জনকে কত তাড়াতাড়ির মধ্যে রেঁধে খাইয়ে পাঠালাম। সময়টা তো পেতে হবে! সাধে কী আপনার নাতি বলেছিল_থেমে গেল সুমনা। মান্নান মিয়ার সামনে দাড়িয়ে নাতিই তাকে 'বুড়ো শকুন' বলেছিল। ছেলে বা ছেলেবউ প্রতিবাদ কেউ করেনি এটাই দুঃখ তাঁর। অথচ তিনি বুড়ো শকুন হতে চাননি। চেয়েছিলেন স্ত্রী জীবিত থাকতে থাকতে চলে যেতে। কিন্তু মৃত্যু তো তাঁর হাতে নয়। মান্নান মিয়ার নিজের জীবনের একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। তখন তার যৌবনের ডুব-সাঁতার কাটার বয়স । বাস থেকে নেমে একটা বাঙ্ ঘাড়ে করে সস্ত্রীক বাড়ি ফিরছিলেন চাকরির জায়গা থেকে। স্ত্রী অস্বস্তি বোধ করায় বলেছিলেন, তুমি ব্যস্ত হয়োনা, এখন তো গাধার বয়স, ঠিক পারবো। এমনকি বারো বছরের ছেলে নিতে চাইলেও দেননি তাকে। বলেছিলেন পরে তোমাকেও এসব করতে হবে, এখন থেকে কেন! তুমি বরং মায়ের ব্যাগটা ঘাড়ে নিয়ে ছাতাটা ওনার মাথায় ধরো। একটু পরে মান্নান আবার মুখ খুলেছিলেন, এ বয়সটা তাও ভালো, ভয় করি শকুনের বয়সটাকে।

কিন্তু নিজে যেতে পারেননি। তার আগেই চিরতরে চলে গেছেন স্ত্রী। এইসব ভাবতে ভাবতে মান্নান মিয়ার চোখ দুটি ঝাপসা হয়ে এল। হঠাৎ চিন্তার প্রসঙ্গ পাল্টাতে ময়লা লুঙ্গিটা কোমরে জড়াতে জড়াতে বললেন, খিদে পেয়েছে, খেতে দাও বৌ মা।

কড়াইতে কী যেন নাড়তে নাড়তে সুমনা বিরক্ত স্বরে বলল, কেন আজ একটু দেরি হবে বললাম না! আপনার ছেলে আসুক, ইলিশ খাবেন না?

খাবো না আবার! মনে আছে আমার।

গতকাল ছেলে মাংস খাইয়েছে বাবার ইচ্ছানুসারে। সেইজন্যে পেটের অবস্থাও অনুকূলে নয়। কিন্তু ক'দিনই বা আর খাবেন। পৃথিবীর সব ভালো ভালো খাবারকে একটু করে চেখে দেখার ইচ্ছে করছে তার। তাতে প্রয়োজনে দিনে অনেকবার করে বাথরুমে যেতে হলেও আপত্তি নেই মান্নান মিয়ার। আজ কিন্তু ইলিশের ঝাল খেতে চেয়েছেন মান্নান মিয়া। বৌমা খুশি না হলেও ছেলে জামাল বলেছে, অফিস থেকে কোন একটা ফাঁকে ইলিশ কিনে নিয়ে আসবে। বারোটার মধ্যে ফিরবে। সে কথা সকাল থেকেই ভেবে চলেছেন বৃদ্ধ। সরষে বাটা দিয়ে ইলিশের ঝাল-বৌমা রাঁধে ভালোই, সবই মনে আছে, কেবল দেখলেন সুমনার মনে আছে কী না। তাই ভাতের জন্যে তাড়াতাড়ি করা। উত্তরে বললেন, খেলেই হল। বেশি চাই না। পেটটাও তেমন ভালো নয়।

----দেখুন আবার! আপনার যা বয়স তাতে এত খাই খাই না করাই ভালো বাবা। একটু চুপ করে থেকে মান্নান পেটটায় দু-একবার খোঁচা মেরে বললেন, ভয় ততো নেই। দেরি যখন আছে তখন সব ঠিক হয়ে যাবে। বলে পেটটা আঙ্গুল দিয়ে আবার খুঁচে নিলেন, একবার বলতে গেলেন, নাতির জন্যে কিছুটা ইলিশ তুলে রেখে একটু বেশি করে ঝাল দিও তো বৌমা। কিন্তু তা বলতে না পেরে বললেন, ঝালটা একটু কম দিও। আর সরষে দিয়ো ভালো করে... তুমি তো ভালোই রাঁধো, ইলিশের কী খুব কাঁটা হবে বৌমা!

ইলিশের আবার কাঁটা আছে নাকি? বলে তীর্যক দৃষ্টিতে শ্বশুরের দিকে চেয়ে গজগজ করতে লাগল সুমনা। ফোকলা দাঁতে হেসে ফেললেন বৃদ্ধ, মা আমার রাগ করছে দেখছি। দোষ তো নেই। তোমার কী তুলনা আছে! আচ্ছা শোন-একটা পেটি দেখে.... নাকি ইলিশের পেটি হয় না? কড়াইটা নামিয়ে বিরক্ত হয়ে শ্বশুরকে গামছা দিল সুমনা, গোসলটা সেরে ফেলুন, বাথরুমে পানি দিচ্ছি।

-কটা বাজে বৌমা? আর একটু না হয় দেখি। বলে প্রায় আধঘণ্টা বসলেন বৃদ্ধ। তারপর পুত্রের আশায় দরজার দিকে একবার চেয়ে বললেন, চাঁদপুরে যখন থাকতাম, প্রতিদিন কেবল ইলিশই খেয়েছি।

তারপর খেতে বসার সময়ও মান্নান মিয়া বার দুই, দরজার দিকে না তাকিয়ে পারলেন না। শ্বশুরের মনের অবস্থা বুঝতে পেরে সুমনা বলল আপনি খেতে বসুন তো, ইলিশ মাছ নিয়ে এলে আপনাকে আমি সাথে সাথে ভেজে দেব। নিশ্চয়ই সে অফিস থেকে ছাড়া পায়নি। না হলে বারোটা-দশ বেজে গেল, আসে না কেন এখনো!

মান্নান নীরবে খেতে বসলেন। কতটুকুই বা খেতে পারেন, তবু নিজের অপরিসীম লোভের কথা ভেবে লজ্জিত হলেন। যদিও তিনি বিশ্বাস করেন লোভ-মোহমুক্ত মানুষ মানেই মৃত-মানুষ। তার আর পৃথিবীর কোন প্রয়োজন নেই। ভালোবাসতে না পারুক, তাকে দেখে কেউ বিরক্ত পর্যন্ত হবে না, কেবল উপেক্ষা করেই চলে যাবে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি আজ লজ্জা পেলেন। ভাত দিয়ে সুমনা শ্বশুরের থুথু ফেলার পাত্রটা বাঁ হাতে করে ধরে নাকে কাপড় দিয়ে চলে গেল বাথরুমে গোসলের উদ্দেশ্যে। মান্নান মিয়া খেতে খেতে তাকিয়ে দেখলেন। নিজের প্রতি ঘৃণা হল তাঁর।

মিনিট পঁচিশেক পরে সুমনা গোসল সেরে এসে যা দেখলো তাতে একেবারে থ'। ভাত আধ-খাওয়া। মান্নান মিয়া পরনের কাপড়টা যথাসম্ভব উপরের দিকে তুলে দাঁড়িয়ে আছেন, আর দুর্গন্ধযুক্ত প্রায় পানির মতো তরল অপদ্রব্যে চারদিক একাকার।

-একী করলেন! বলে কাঁদতে বাকি সুমনা।

- তুমি বাথরুমে ছিলে তাই,-আর বলতে পারলেন না। মান্নান মিয়ার একমাত্র পুত্র। হাতের ব্যাগে ইলিশ। ঢুকেই বলল, ইলিশের আমদানি আজ এত কম যে, কী হল, তুমি বমি করছ কেন সুমনা?

সুমনা আঙুল দিয়ে ঘরটা দেখিয়ে দিল। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে জামালও অবাক। অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে মান্নান মিয়া। এদিকে সুমনার বাক্যবাণ তখন, পুরনো হলেও, জামালের কানে নতুন সুরে প্রবেশ করতে লেগেছে। বাবাকে আজ মাংস, কাল ইলিশ, পরশু ডিম-আরে বাবাকে কে না ভালোবাসে, কিন্তু বয়সটাকে তো দেখতে হবে! আর ওনারও এই বয়সে বিশ্বগ্রাসী ক্ষিদে।

মুহুর্তে মাত্র অপেক্ষা করে জামাল ব্যাগটা রেখে খুলে ফেলল নিজের জামাটা। তারপর কম্পমান বাবাকে পাঁজাকোলা করে তুলে একবারে বাথরুমে নিয়ে চলে গেল। স্ত্রীকে বলে গেল পাশের ঘরে বিছানাটা ঠিক করতে।

মান্নান মিয়া যা ভয় করতেন তাই আজ আরম্ভ হল। প্রথমত, পরনির্ভরশীল হতে তিনি চাননি। তারপর এই কাজ করে যদি পরের উপর ভরসা করতে হয় তাহলে সবারই ঘৃণাও তাঁকে কুড়াতে হবে। কিন্তু কী করা যায়।

বাবাকে একপ্রকার গোসল করিয়ে ঘরের ভিতর কাপড় পরাতে পরাতে জামাল বলল, দৃষ্টিটা নিজের সামর্থ্যের দিকে ফেরাও, বুঝলে! পাশের ঘরে পুত্র-পুত্রবধূর মধ্যে মৃদু বচসা চলছে আর এ-ঘরে বিছানায় শুয়ে শুয়ে নিজেকে সমস্ত অশান্তির কেন্দ্রবিন্দু বলে ভাবতে লাগবেন মান্নান মিয়া। সঙ্গে সঙ্গে তিনি এও ভাবলেন যে তিনি নিতান্ত অবাঞ্ছিত, অপাঙতেয়। আর কোন প্রয়োজন তাঁর দ্বারা সাধিত হবে না। এমনকী মৃত্যুবরণ ইচ্ছাটাও চরিতার্থ করার যোগ্যতা তাঁর নেই। একবার অভিমান হল স্ত্রী উপর। চুপচাপ শুয়ে থাকতে থাকতে ছেলের কথাটা একবার ভাবলেন-'দৃষ্টিটা নিজের সামর্থ্যের দিকে ফেরাও'। ভাবতে ভাবতে মান্নান মিয়া নিজের দৃষ্টিটাতে, অতীতের সত্য বলে জানা, চটে যাওয়ার রঙটার উপর, বর্তমানের নতুন রঙ লাগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে লাগলেন। ভাবলেন যা হয়ে এসেছে তাইই এখনো হবে-এমন কোন কথা নেই। নিজের হাত দুটি মুঠো করে ভাবতে লাগলেন, কতটা আর ধরবে এতে!

আজকের পাঠকসংখ্যা
১৫৭০৭৭
পুরোন সংখ্যা