চাঁদপুর। রোববার ১৩ আগস্ট ২০১৭। ২৯ শ্রাবণ ১৪২৪। ১৯ জিলকদ ১৪৩৮

বিজ্ঞাপন দিন

বিজ্ঞাপন দিন

সর্বশেষ খবর :

  • --
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

২৯-সূরা আনকাবূত

৬৯ আয়াত, ৭ রুকু, ‘মক্কী’

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

২৮। স্মরণ কর লুতের কথা, সে তাহার সম্প্রদায়কে বলিয়াছিল, ‘তোমরা তো এমন অশ্লীল কর্ম করিতেছ, যাহা তোমাদের পূর্বে বিশ্বে কেহ করে নাই।   

দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন




একটি সুন্দর মন থাকা একটি সুন্দর রাজ্যে বসবাস করার আনন্দের মতো।                     

 -জনওয়েলস।


রাসূল (সাঃ) বলেছেন, নামাজ আমার নয়নের মণি।


রহস্যে ঘেরা লাইব্রেরি
হালিমাতুন মুনিয়া মুন
১৩ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


সবে সূর্যটা উঠি উঠি করছে। সূর্যের হালকা আভায় পরিবেশটা কেমন হলদেটা হয়ে গেছে। আকাশের নীল আভাটা আজকে আরো গাঢ় আকার ধারন করেছে। এরই মধ্যে রফিকুল ইসলাম তার দুপুরের খাবার নিয়ে প্রতি দিনের রুটিন অনুযায়ী লাইব্রেরিতে হাজির হলো। আজ একটু দেরি হওয়াতে তাড়াতাড়ি পা বাড়িয়ে হাঁটছেন তিনি। মাত্র পনেরো দিন হলো এ জেলায় এসছেন রফিক সাহেব। পাঁচ দিন হলো এ লাইব্রেরিতে লাইব্রেরিয়ান হিসেবে যোগদান করেছেন। বিশাল এক দোতলা লাইব্রেরি। এতে অন্তত হাজার খানেক বই দেখতে একদম রাজপ্রাসাদ। কিন্তু এই লাইব্রেরিতে কোন লাইব্রেরিয়ান কয়েকদিনের উপরে থাকতে পেরেছে এমন ঘটনা বিরল। যারা এসেছে তারাই বলেছে রাতে এ লাইব্রেরিতে নাকী পিচাশরা বই পড়তে আসে। লাইব্রেরি থেকে নানা রকম হাসির শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। মাঝে মাঝে আবার বিকট কান্নার আওয়াজও শুনতে পাওয়া যায়। এর আগের লাইব্রেরিয়ান বলেছে পিচাশগুলো বিভিন্ন মজার মজার বই পড়ে হিহিহি করে হাসে। আর হিটলার ধরণের ইতিহাস পড়ে বইগুলো এদিকে সেদিকে ছুড়ে মারে আর বিকট আওয়াজে কান্না করে। সকালে উঠে দেখতে পাওয়া যায় রাতের গুছানো বইগুলো এদিকে সেদিকে এলোমেলো হয়ে ছড়ানো ছিটানো। কেন এমন হয়। কী করে এমন হয় এর সন্ধান আজও পর্যন্ত কেউ বের করতে পারেনি। অনেকেই এর সন্ধান খুঁজতে এসে কয়েকদিন পর পিচাশদের ভয়ে পালিয়েছে। তারা পিচাশদের সম্পর্কে নানা রকম উদ্ভট উদ্ভট কথাও বলে গেছে। কিন্তু কোনটা আসলে সত্য তা আজ পর্যন্ত জানা গেলনা। আগের লাইব্রেরিয়ান গেল প্রায় পাঁচ মাস হয়ে যাওয়ার পরেও এত বড় লাইব্রেরিটার জন্যে একটা লাইব্রেরিয়ান পাওয়া গেলনা। অনেক খোঁজা খুঁজির পর যখন সবাই নিশ্চিত হলো এ লাইব্রেরির জন্য আর কোন লাইব্রেরিয়ান পাওয়া যাবেনা। ঠিক তখনই হলো বিনা মেঘে বজ্রপাত কোথা থেকে যেন একটা লোক এসে লাইব্রেরিয়ানের দায়িত্বটা গ্রহন করলো। সবাই যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো। সবাই ভাবলো নতুন লোক হয়তো এই ভূতড়ে লাইব্রেরি সম্পর্কে কিছু জানেনা। তাই নিজ ইচ্ছায় ভূতের ডিনার হতে এসেছে। এ কারণে লাইব্রেরির পুরানো ইতিহাস সম্পর্কে সবকিছু বলে নতুন লাইব্রেরিয়ান রফিক সাহেবকে সাবধান করে দিলো। সবাই ভেবেছিলো ভূতড়ে লাইব্রেরি সম্পর্কে এসব ভয়ঙ্কর কথাশুনে রফিক সাহেব লেজ গুটিয়ে পালাবে। কিন্তু সে রকম কিছুই হলোনা। বরং সবার মুখের উপর বললো। ভূত হোক আর যাই হোক আমি এ লাইব্রেরি ছেড়ে যাবনা। এতবড় একটা লাইব্রেরি অথচ কোন লাইব্রেরিয়ান ছাড়া একা পড়ে থাকবে সে আমি কখনোই হতে দেবনা। এ কথা বলার পর লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষের আর কোন কথা থাকে না। সবাই রফিক সাহেবকে লাইব্রেরিয়ান হিসাবে নিযুক্ত করেছে। মাত্র পাঁচদিন হলো রফিক সাহেব লাইব্রেরিতে জয়েন করেছে। দিনের বেলায় লাইব্রেরিতেই থাকেন লাইব্রেরির দোতলায় রফিক সাহেবের জন্যে একটা ঘর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অনেকদিন কেউ এখানে না থাকায় ময়লার স্তুপ জমে রয়েছে। রফিক সাহেব লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষের নিকট বিনীত আবেদন করেছে যাতে তার ঘরটা মানুষের থাকার উপযোগী করে দেন। তাই যতদিন পর্যন্ত না তার আবেদন কার্যকর না হচ্ছে ততদিন রফিক সাহেব শহরের পশ্চিম দিকে এক বাড়িতে নিজের থাকার ব্যবস্থা করে নিল। প্রতি দিন সকালে নাস্তা সেরে দুপুরের খাবার নিয়ে রফিক সাহেব লাইব্রেরির দিকে রওয়ানা হয়। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। সকালের ফুরফুরে বাতাসের মধ্য দিয়ে হেঁটে রফিক সাহেবের মনটাও যেন সতেজ হয়ে গেল। তিনি কিছুক্ষণের জন্যে ভুলে গেলেন তিনি একটা ভূতড়ে লাইব্রেরিতে যাচ্ছে সারাদিনের জন্য যেখানে কয়েকটা চেয়ার টেবিল এবং কয়েকহাজার বই ছাড়া নিঃস্বজ্ঞতা কাটাবার অন্য কোন বিকল্প পথ নেই। রফিক সাহেব লাইব্রেরির প্রায় যেন ফটকের সামনে এসে দাঁড়াতেই রেজাউল করিমের সাথে দেখা হলো। ভদ্রলোক লম্বা প্রায় ৬ ফুটের কাছাকাছি হবে। দেখে মনে হবে গায়ে আলকাতরা ঢেলে এসেছে বাঙালি তো মনে হবে পাউডারের দাম আলকাতরা থেকে অনেক বেশি তাই পাউডারের পরিবর্তে আলকাতরা গায়ে মেখেছে। মাথাটা মনে হচ্ছে সাহারা মরুভূমি। সারা মাথায় চুলের কোন চিহ্নই নেই। দেহের কাঠামো আস্ত একটা জলহস্তী। ভূরিটা দেখতে একটা কুমড়োর মতো। নিজের হাতে তার নাভীটা ছুতে পারে কিনা সন্দেহ। ভদ্রলোক কী নিয়ে যেন খুব রেগেছে। রাগে ফোস ফোস করছে। লাইব্রেরির ভেতরে থাকা কাউকে উদ্দেশ্যে করে যেন বকাবকি করছে। রফিক সাহেব ভাবছে। এ ভোরবেলায় লাইব্রেরিতে কে আসলো। কাকে উনি এমন বকাঝকা করছে। লাইব্রেরিতে থাকা পিচাশগুলোকে নাতো। এ সকালবেলা লাইব্রেরিতে পিচাশগুলো কী করছে। ওদের কী কোন কান্ডজ্ঞান নেই। মানুষের গতিবিধি সম্পর্কে মনে হয় ওদের কোন ধারনাই নাই। নানা ধরনের সন্দেহের মধ্যে দিয়ে রফিক সাহেব লাইব্রেরির সামনের ফাকা জায়গাটাতে এসে দাঁড়ালেন । যেখানে রেজাউল করিম গলা ছেড়ে তার নিজের রচিত বিদ্রোহী কবিতা আবৃত্তি করেছেন। লোকটার অহেতুক চিৎকার মুনে রফিক সাহেব বলল আপনার জন্য কী কিছু করতে পারি। কী সমস্যা যদি বলতেন তাহলে বড় উপকৃত হতাম। লোকটা তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে রফিক সাহেবকে পর্যাবেক্ষণ করতে লাগলেন। মুখটা পেচার মতো করে বলল, কে আপনি ভোরবেলা এই ভূতড়ে লাইব্রেরির সামনে কী করছেন। আজ্ঞে আমি এ লাইব্রেরির নতুন লাইব্রেরিয়ান মাত্র পাঁচদিন হলো জয়েন করেছি।



ও আপনিই হলেন সেই বীরপুরুষ যে কিনা সব ঐরংঃড়ৎু শুনার পরও এই ভূতড়ে লাইব্রেরিতে পড়ে আছেন। সময় থাকতে লেজ গুটিয়ে পালান এখনও সময় আছে। জান বাঁচান। ফরজ কাজ করেন।



আমার জন্যে আপনাকে ভাবতে হবেনা। আমি কী ভাবতে চাই মিয়া। আপনাগো মতো এমন অনেক বীরপুরুস এ লাইব্রেরিতে রহস্য বের করতে এসেছে।



তারপর কী হলো



তারপর আবার কী। সবাই কয়দিন থেকেই পালালো। যতসব ঝামেলা আমার উপর কেন? আপনার আবার কী ঝামেলা। আরে মিয়া কয় কী। এই লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ানরা পালানোর পরে নতুন লাইব্রেরিয়ান আসতে অনেক সময় কেটে যায়। এতে করে লাইব্রেরিয়ানদের জন্যে যে ঘরটা রয়েছে সেটাতে মানুস থাকার পরিবর্তে পিচাশ থাকার উপযোগী হয়। ময়লার আস্তরণে রুমটা ডাস্টবিন হয়ে যায়। দেয়ালে নানা ধরনের আগাছা জন্মাতে থাকে।



তো এখানে আপনার সমস্যাটা কী?



আমার সমস্যা মানে



নতুন লাইব্রেরিয়ানদের রুমটা আমাকেই পরিষ্কার করতে হয়। এই ঝাড়ু দাও রে। আগাছা কাটরে, পানি দিয়ে ধৌত কররে। বিরক্তির একশেষ। এত কষ্টের পরেও যদি কেউ এই রুমটায় একমাস থাকতো তাহলেও আমার কষ্টটা সার্থক হতো। একমাস যেতে না যেতেই শালারা লেজ গুটিয়ে দেয় চম্পট। আবার নতুন লাইব্রেরিয়ান আসে। তারপর সেই পুরানো প্যাচাল। আপনিই কন এটা একটা বাজে কাজ না।



তা বটে।



দেখেন ভাই। এত কষ্ট করে আপনার রুমটা পরিষ্কার করলাম। যদি এক মাসের আগে বিদায় হয়েছেন তাহলে আবার নতুন লাইব্রেরিয়ান আসলে আপনাকে খুঁজে বের করে এ রুম পরিষ্কার করাবো। এ আমি বলে রাখলাম।



আপনাকে এত কষ্ট করে আমাকে খুঁজতে হবে না। কারণ আমি ছয় মাসের আগে এ লাইব্রেরি ছেড়ে যাচ্ছি না।



আপনার মতো এমন বক্তৃতা অনেকেই দিয়েছে।



রেজাউল করিম রাগে কিটমিটি করছে। ভদ্র লোকের চামড়া নিশ্চয়ই অনেক ভারী। যেভাবে রেগেছেন চামড়া নরম হলে এতো ক্ষণে ফেটে রাগগুলো বের হয়ে যেত। এখন ঘরটা পরিষ্কার ঝকঝকে তকতকে। এ ঘরটা দেখে কেউ বুঝতেই পারবে না যে মাত্র কয়েকদিন আগে এ ঘরটা একটা পোড়া বাড়ির মতো ছিলো।



রেজাউল করিম অনেকক্ষণ হলো চলে গেছে। লাইব্রেরিটা নীরবতায় খান খান করছে। রফিক সাহেব লাইব্রেরি ঝাড়ু দিয়ে জানালা দরজা সব খুলে তার নিজস্ব টেবিলে এসে বসলো। রফিক সাহেব ভাবলো কী আশ্চর্য আজ পাঁচদিন হলো লাইব্রেরিতে এসেছি। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোন পাঠকেরই দেখা পেলামনা। তবে কী এ লাইব্রেরির পাঠক শুধু ভূতেরাই। আচ্ছা ভূতেরাও কী বই পড়ে। তারা কোন ধরনের বই পড়ে। তাদের কোন বইটা বেশী প্রিয়। এসব কথা ভাবতে ভাবতে রফিক সাহেবের চোখটা লেগে আসলো। আসবেই তো এ রকম নির্জন একটা জায়গায় ঘুম না আসলে আসবে কোথায়। কিসের যেন একটা শব্দে রফিক সাহেব হতচকিত হয়ে জেগে উঠে ধরমর করে উঠে বসলো। এদিক ওদিক চোখ বুলাতেই একটা রফিক সাহেবের চোখে পড়লো বিড়ালটা গ্লাসটা টেবিলের উপর থেকে ফেলে দিয়েছে। সম্ভবত সেটারই এমন বিকট শব্দ হয়েছে।



রফিক সাহেব এ লাইব্রেরিতে জয়েন করার পর রেজাউল করিম ব্যতীত এই বিড়ালটাই সবপ্রথম লাইব্রেরিতে আগমন করলো। একজন লাইব্রেরিয়ান হিসাবে কোন মানুষ লাইব্রেরিতে আসলে লাইব্রেরিয়ান তাকে সাদর সম্ভাষণ জানান। কিন্তু বিড়ালের ক্ষেত্রে কী নিয়ম। বিড়ালকে স্বাগত জানাবে নাকি তাকে লাঠি নিয়ে তাড়া করবে। তা রফিক সাহেবের জানা নেই। তাই তিনি অপলক দৃষ্টিতে বিড়ালটির দিকে তাকিয়ে আছেন। বিড়ালটি হয়তো মনে মনে ভাবছে। আরে লোকটা কী প্রতিবন্ধী। আমি গ্লাসটা ফেলে দিলাম অথচ উনি আমাকে তাড়া না করে বসে রয়েছে। তাই বিড়ালটাও অবাক বিস্ময়ে রফিক সাহেবের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। রফিক সাহেবের হঠাৎ করে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপধ্যায়ের বিড়াল প্রবন্ধের কথা মনে পড়ে গেলে । রফিক সাহেব কল্পনার জগতে বিড়াল প্রবন্ধের কথক হয়ে গেল। আর টেবিলের উপরে বসে থাকা বিড়ালটা যেন সেই মার্জার সুন্দরী।



বিড়ালটি বলল। কী গো তোমার কোন ভয় নেই। এই ভূতের গুহায় একা একা বসে কী করছো।



একা কোথায় তুমিও তো আছো। আমি তো এইমাত্র এলাম। এখন আবার চলেও যাব।



তাহলে কেন এসেছ



আমি কী আর সাধে এসেছি বাহিরে একটা কুকুরের তাড়া খেয়ে লাইব্রেরিতে ঢুকেছি।



আমিও তোমার মতো তাড়া খেয়েই এখানে এসেছি।



কে তোমাকে তাড়া করেছে।



জীবনের তাড়ায় এখানে এসেছি। না হলে কী এই ভূতের কারখানায় আমি মরতে আসতাম।



বাহিরে রেজাউল করিমের রুক্ষ কণ্ঠটা শুনে রফিক সাহেব ভাবনার জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে আসলো। রফিক সাহেব ভাবলো কল্পনা হলেও এ বিড়ালটা কিছুক্ষণের জন্য কিছুটা হলেও আমার নিঃসজ্ঞতা দূর করেছে।



টেবিলের উপরে থাকা চশমাটা নিয়ে রফিক সাহেব চেয়ার থেকে উঠে রেজাউল করিমের কণ্ঠ ধরে এগোচ্ছে। লোকটার কী খেয়ে ধেয়ে আর কোন কাজ নেই চিৎকার না করলে কী ওনার ঘুম হয় না। কী আজব লোক এসব কথা ভাবতে ভাবতে রফিক সাহেব রেজাউল করিমের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। রেজাউল করিম শহরের যে বাড়িতে রফিক সাহেব থাকতো সে বাড়ি থেকে তার সমস্ত জিনিস এনে দরজায় সামনে স্তুপ করে রাখলো।



রফিক সাহেবকে দেখতেই রেজাউল করিম মুখে কিছুটা হাসির রেশ টেনে বলল, এই লন আপনার জিনিস আমার কাজ শেষ। এবার আপনার কাজ শুরু। এগুলো এখানে রেখে গেলাম আপনি আপনার রুমে নিয়ে সবকিছু গুচগাছ করে নেন। রফিক সাহেব কিছু বলার আগেই রেজাউল করিম হনহন করে চলে গেলেন। রফিক সাহেব অনেকক্ষণ তার চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে থেকে নিজের মতো করে তার রুমটা গুছিয়ে নিলেন। কেরোসিনের চুলাটা ঠিকঠাক করে তিনি বাজারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। উদ্দেশ্যে কিছু হাড়ি, পাতিল, চাল, ডাল এবং কাচা বাজার করবেন। বাজার করা শেষ করতে সন্ধ্যা প্রায় ঘনিয়ে গেল। রফিক সাহেব ভারী দুটি ব্যাগ নিয়ে লাইব্রেরির দিকে আসছে। ভারী ব্যাগ দুটি তার পথচলার ক্ষেত্রে বেঘাত ঘটাচ্ছে। রফিক সাহেব আরেকটু এগোতেই বুঝতে পারলো লাইব্রেরির মেইন ফটকে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। এখানের ল্যাম্পপোষ্টগুলো সব বন্ধ থাকায় চাঁদের আলোয় লোকটার ছায়াটাকে আস্ত একটা দৌত্তের মতো মনে হলো কে লোকটা। এ অসময়ে এখানে কী করছে। কেন এসেছেন উনি। এমন হাজারো প্রশ্ন উকি দিতে লাগলো রফিক সাহেবের মনে। রফিক সাহেব কিছুটা ঘেমে গেছে। কপালে গামের চিকন রেশগুলো তার প্রমান অত্যাধিক ভয়ের কারনে নাকী ভারী দুটি ব্যাগ এতটা রাস্তা বহন করেছে বলে রফিক সাহেব ঘেমেছে। তা বুঝা বড় ভার। রফিক সাহেব কিছুক্ষণের মধ্যে বুঝতে পারলো এখানে একজন লোকনা। মনে হয় দু'জন দূর থেকেই লোকগুলো রফিক সাহেবকে দেখতে পেয়ে তার দিকে আসতে লাগলো। দুটি অচেনা লোক এদের কাউকেই রফিক সাহেব চেনেন না। অচেনা লোক দুটির মধ্যে থেকে একজন বলল আপনিই কী মিস্টার রফিক।



জী। কিন্তু আপনাকে তো চিনতে পারলাম না। চিনার কথাও না। আমি স্থানীয় সমাজ সেবক রবিউল আহমেদ।



ও আচ্ছা আর উনি।



দ্বিতীয় লোকটি এতক্ষন কোন কথাই বলেননি, কিন্তু এখন তার পরিচয় জানতে চাওয়াতে সে কিছুটা উৎফুল্ল হয়ে বলল, আজ্ঞে আমি মতিউর রহমান। সবাই আমাকে মতি বলে ডাকে, আর একটু ভদ্রলোক টাইপের মানুষরা ডাকে রহমান বলে। আপনি যেহেতু ভদ্রলোক তাই আপনিও আমাকে রহমান বলে ডাকতে পারেন।



তবে



রহমান নামের বয়ষ্ক লোকটির অসমাপ্ত কথা রবিউল আহমেদের চোখের ইশারায় সমাপ্ত হয়ে গেল।



মুখে কিছুটা হাঁসি টেনের রবিউল আহমেদ বলল, আচ্ছা আমরা তাহলে আসি।



কোন প্রয়োজন ছিল কী?



না তেমন কিছু না। এদিক দিয়েই যাচ্ছিলাম তাই ভাবলাম আপনার সাথে পরিচিত হয়েই যাই এই আর কী।



ও আচ্ছা তো ভেতরে আসেন চা খেয়ে যান, না এখন তাড়া আছে অন্য একদিন আসবো। চাঁদের আলোয় রফিক সাহেব দেখতে পেল লোক দুটি বড় বড় পা ফেলে হনহন করে হেটে চলে গেল। দেখে মনে হচ্ছে কেউ বুঝি ওদেরকে ধরতে আসছে। আর তাদেরকে ধরে লকারে ঢুকিয়ে দেবে আজীবনের জন্য। এ কারণে তারা দৌড়িয়ে দৌড়িয়ে হাঁটছে। এতক্ষণ পরে রফিক সাহেব টের পেল লাইব্রেরির সামনের সবগুলো ল্যাম্পপোস্ট বন্ধ। এগুলো বন্ধ নাকী নষ্ট। রফিক সাহেব তো বুঝতে পারলো না। আশেপাশের সব রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টগুলো কী সুন্দর জলছে। কিন্তু এখানের ল্যামপোস্ট গুলো বন্ধ কেন। তবে কী এটা ভূতদের কারসাজি না এর পেছনে অন্য কারো ভূমিকা রয়েছে। কী যে ভাবছি আবোল-তাবোল এই লোকগুলোর সংস্পর্শে এসে আমিও অন্ধ বিশ্বাসে বিশ্বাসী হয়ে যাচ্ছি। নিজেকে ভৎসনা দিতে দিতে রফিক সাহেব তার কামরার পেছনে ছোট একটা রুমে এসে তার বাজার থেকে আনা জিনিসপত্রগুলো গোজগাছ করছে। এটাই এখন থেকে রফিক সাহেবের রান্নাঘর । কেরোসিনের চুলায় কোন রকমে কয়েকটা চাল ফুটিয়ে ডাল রান্না করে গরম গরম ডাল ভাত খেয়ে শুয়ে পড়ল। আজইএই ভূতের লাইব্রেরিতে রফিক সাহেবের প্রথম রাত। এখনও রফিক সাহেব অস্বভাবিক কিছুই দেখেননি। সব কিছুই তো ঠিকঠাক চলছে। কেন যে এত সুন্দর একটা লাইব্রেরি নিয়ে লোকে এমন উদ্ভট কথা বলে, কে জানে, উল্টা-পাল্টা নান কথা ভাবতে ভাবতে রফিক সাহেবের চোখে নিদ্রাদেবী এসে ভর করল, সারাদিনের পরিশ্রমের কারণে সহজেই রফিক সাহেব গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। আজ পূর্ণিমার রাত।



কিছুক্ষণ পর একখ- মেঘ এসে, চাঁদটাকে আড়াল করে দেয়। আবার চাঁদটাকে মুক্ত করে দিয়ে চলেও যায়। ঝিরিঝিরি বাতাস বইছে। সারা আকাশের তারারা তাথিং তাথিং করে নাচানাচি করছে। রাত প্রায় তিনটা। হঠাৎ কিছু একটা পড়ার শব্দে রফিক সাহেব ঘুম থেকে লাপ দিয়ে উঠে লাইট অন করলো। অত্যাধিক ভয়ের কারণে রফিক সাহেব কিছুটা ভটকে গেল। নিজেকে কিছুটা সামলিয়ে শব্দটা কোথা থেকে এলো তা জানার জন্য রফিক সাহেব টর্চলাইট নিয়ে বের হলেন। তিনি রুম থেকে বের হয়ে আসতেই সব নীরব হয়ে গেল। কোথাও একটা সুচ পড়লেও বুঝি এটোম বোমার মতো শব্দ হবে। এমন অবস্থা রফিক সাহেব তার হাতের টর্চলাইট বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছেন তার রুমের দরজার সামনে একটু পর আবার শব্দ হলো। মনে হলো কে যেন লাফ দিয়ে দৌড়াচ্ছে। কিছুক্ষণ দৌড়ায় আবার থামে। তারপর আবার দৌড়ায়। শব্দটা সম্ভবত নিচের তলা থেকে আসছে। কী হতে পারে। কে নিচে এভাবে দৌড়াচ্ছে ভূত নাতো।



রফিক সাহেব এক পা দু'পা করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে। তার হাত পাগুলো একটু একটু করে কাঁপছে। টর্চলাইট যেন হাত থেকে পড়ে যাচ্ছে। সামান্য একটা লাইট বহন করার শক্তি যেন ফুরিয়ে যাচ্ছে রফিক সাহেবের। লাইটটা অনেক ভারী মনে হচ্ছে তার কাছে। রফিক সাহেব শেষ সিঁড়িটায় এসে দাঁড়ালো। আবারো নিরবতা নেমে আসলো পুরো ঘরটায়। অজানা জিনিসটা মনে হয় রফিক সাহেবের উপস্থিতি টের পেয়েছে। (চলবে)



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৭৬২৯১
পুরোন সংখ্যা