চাঁদপুর। রোববার ১৩ আগস্ট ২০১৭। ২৯ শ্রাবণ ১৪২৪। ১৯ জিলকদ ১৪৩৮

বিজ্ঞাপন দিন

বিজ্ঞাপন দিন

সর্বশেষ খবর :

  • --
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

২৯-সূরা আনকাবূত

৬৯ আয়াত, ৭ রুকু, ‘মক্কী’

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

২৮। স্মরণ কর লুতের কথা, সে তাহার সম্প্রদায়কে বলিয়াছিল, ‘তোমরা তো এমন অশ্লীল কর্ম করিতেছ, যাহা তোমাদের পূর্বে বিশ্বে কেহ করে নাই।   

দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন




একটি সুন্দর মন থাকা একটি সুন্দর রাজ্যে বসবাস করার আনন্দের মতো।                     

 -জনওয়েলস।


রাসূল (সাঃ) বলেছেন, নামাজ আমার নয়নের মণি।


জব্বার আল নাঈম ও কবিতা গ্রন্থের কথা
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
১৩ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+

সমকালীন তরুণ কবিদের মধ্যে প্রতিশ্রুতিশীল কবি জব্বার আল নাঈমের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ 'এসেছি মিথ্যা বলতে' পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে প্রকাশিত হয়েছে।

তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'তাড়া খাওয়া মাছের জীবন' পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হয়। একজন কবির কবিতা যখন পাঠক সানন্দ্যে গ্রহণ করে তখন কবির দায়বোধ আরো বেড়ে যায়। সেই দায়বদ্ধতা থেকে তাকে ভাবতে হয় প্রচুর। করতে হয় নিরীক্ষা। বলতে পারি, সেই ভাবনা বা নিরীক্ষাই এবার তিনি তুলে দিয়েছেন পাঠকের হাতে। গ্রন্থের নামকরণেও সে লক্ষণ আমরা দেখতে পাই। মানুষ মাত্রই মিথ্যা বলে। তা স্বেচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায়। কিন্তু মিথ্যাকে কখনোই মিথ্যা বলে স্বীকার করতে চান না কেউ। এমনকি স্বীকার করেনও না। কবিরা কি সবসময় সত্যদ্রষ্টা হন? হয়তো হ্যাঁ নয়তো না।

গ্রন্থের শিরোনামেই কবি জব্বার আল নাঈম অকপটে স্বীকার করেছেন 'এসেছি মিথ্যা বলতে'। গ্রন্থ পাঠে আমরা জানতে পারি তিনি কেমন মিথ্যা বলেছেন, কেন বলেছেন এবং কীভাবে বলেছেন। প্রথমেই গ্রন্থটিকে তিনি তিনটি পর্বে ভাগ করে নিয়েছেন। প্রথম পর্ব 'ট্রাফিক_বৃষ্টিতে ভিজে', দ্বিতীয় পর্ব 'রক্তমাখা ইটের গল্প', তৃতীয় পর্ব 'গুলবদন ও অন্যান্য কবিতা'। প্রত্যেক পর্ব আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য ও বক্তব্যে উপস্থাপিত হয়েছে।

কাব্যগ্রন্থের প্রথম পর্ব 'ট্রাফিক_বৃষ্টিতে ভিজে'র প্রথম কবিতায় কবি বলেছেন, 'অথচ আগের পাঁচ হাজার বছর আর পরের দশ হাজার বছরের জাঁতাকলে আটকে আছি এখনও। নতুন করে শূন্যতার সমান কিছু ভাবছি...'। (মুহূর্তের কথা)

মাঝখানে বসে কবি নিজেকে মধ্যযুগ দাবি করেন। তিনি নতুন করে কিছু ভাবেন। সেই ভাবনাগুলোই কবিতা হয়ে পাঠকের সামনে হাজির হয়।

জব্বার আল নাঈম তার কবিতায় সময়কে নিয়ে খেলেছেন। কখনো পাঁচ হাজার বছর আগের অতীত; কখনো দশ হাজার বছর পরের ভবিষ্যৎ। তবে কবিতার দৃশ্যকল্পে উঠে এসেছে নিখাদ বর্তমান। যেখানে হতাশা, ব্যর্থতা, গ্লানি প্রতিমুহূর্তে কবিকে হাহাকারের দিকে নিয়ে যায়। 'আসলে ধ্বংসের রাস্তায় কেউ কারো কথা শোনে না। এরা বিবর্ণ। শরীরে পোশাক নেই। পকেট নেই। পকেট বানাতে না পারার অভিমান; আত্মহত্যার মঞ্চে লাফাচ্ছে সদ্য ভার্সিটি পাশ বর্তমান।' (বেকারনামা ও পরবর্তী পদক্ষেপ)।

তার কবিতায় সমকালীন অরাজকতা, বিবেকবর্জিত বাস্তবতা নিখুতভাবে তুলে ধরেছেন। গদ্যাকারে রচিত পদ্যমালায় ছন্দ বা তালের ব্যত্যয় ঘটেনি। অলংকারে কোথাও কোনো অসঙ্গতি নেই। নিরেট গল্পের ছলে বলে যাচ্ছেন পঙক্তির পর পঙক্তি। এ যেন আমাদের সবার কথা। আমরা বলতে চেয়েও হয়তো পারিনি। যে কথাগুলো মিথ্যা নয়; আবার সত্য হিসেবেও কখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি বা হবেও না।

আমাদের চোখের সামনে খুন হচ্ছে মানুষ। অথচ আমরা মুখ ফুটে বলতে পারি না। খুনিকে আমরা চিনি; অথচ ধরিয়ে দিতে পারি না। বা তার দিকে আঙুল তুলে বলতে পারি না, 'তুমি খুনি'। আত্মহত্যার পরের ঘটনা চোখ রাখলে দেখা যায়, 'চোখের সামনে যে খুন হচ্ছে তাকে চিনি। অনেকগুলো নৈঃশব্দ্য একত্র করে এগিয়ে যাই খুনির দিকে। হাত-পা কাঁপতে শুরু করল। তবুও মনে আনন্দের শিরশির-প্রবাহ; বৈশাখী চাপা উল্লাস।'

একটি মানিব্যাগ হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে জাত-পাতের বৈষম্য-বিদ্বেষকে তুলনা করেছেন কবি। তিনি বলেন, 'এভাবেই আলাদা হতে থাকল জাতপাত, ধর্ম ও বর্ণ! বাড়তে থাকল মানুষে মানুষে বিদ্বেষ!' (বৈষম্য)

উপমার আড়ালে গভীর ব্যঞ্জনা লক্ষ্য করা যায় তার কবিতায়। কবিতার ভাষায়-

'এখানে প্রতিবাদ প্রতিরোধ নেই

পৃথিবীর মানুষ বারবার লাশের সামনে নিক্ষেপ করে

সেই থেকে আমিও লাশ। লাশের সঙ্গে সংসার!'

(আদিনিবাস)

জীবিত একজন মানুষ কখন নিজেকে মৃতের সঙ্গে তুলনা করেন। যখন সে জীবন্মৃত। কবির উপলব্ধি পরাবাস্তবতায় গিয়ে লীন হয়ে যায়।

কবি সত্য-মিথ্যার পার্থক্য খোঁজেন। সত্যকে আরাধ্য জানলেও মিথ্যাকে কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না। কবি তাই তো বলেন, 'মিথ্যে বললে পেছনে কাঁটাতার। সত্যের সামনে অন্ধকার। ডানে-বামে প্রবল প্রতিপক্ষ! উধর্ে্ব চড়ার হিম্মত কই আর?' (পাথর)

এসেছি মিথ্যা বলতে গ্রন্থে কবিতায় দেশাত্মবোধ ফুটে উঠেছে ভিন্ন মহিমায়। সংগ্রামে-সংক্ষুব্ধতায় এ এক অন্য দেশের কথা বলেন তিনি। কবির ভাষায়,

'আঙুলের ঠিক সামনেই বিশাল শূন্য মাঠ

পেছনে ষোল কোটি পৃষ্ঠার বেঁচে থাকার সংগ্রাম' (মানচিত্র)

কবিতায় স্বদেশের পাশাপাশি এসেছে প্রকৃতির অপরূপ মহিমা। বাঙালির প্রিয় অনুষঙ্গ বৃষ্টি এসেছে ব্যতিক্রম ব্যঞ্জনা নিয়ে বলেন,

'বানের বৃষ্টিতে ছিপ ফেলে বসে আছে যে কালপুরুষ

নিরন্তর খোঁজ করে

শিকার ও সঙ্গম

দরজার দুইপাশে অচেনা সুন্দর ফুল' (ফুল ও অন্যান্য উপকথা) তার কবিতায় প্রকৃতির অপার বিস্ময়, মানুষের পূজনীয় প্রিয় ফুল ধরা দেয় ভিন্ন উপমায়-

'সুদৃশ্য যোনিফুলের ভাস্কর্য দেখে

মানুষ আবিষ্কার করতে শেখে

টগর, বেলি, জুঁই, হাসনাহেনা ও অন্যান্য ফুল।' (ফুল ও অন্যান্য উপকথা)

কবি শহীদ কাদরীর অন্তিম যাত্রা কবিকে ব্যাপক মর্মাহত করে। কবি শহীদ কাদরীকে তিনি সমগ্র বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা করেছেন। প্রবীণ কবির প্রতি একজন তরুণ কবির অগাধ শ্রদ্ধা এবং সীমাহীন ভালোবাসা ফুটে ওঠে তার কবিতায়। কবি বলেন,

'শেষতক টুপি না-পেয়ে

আমরা কফিনবন্দি বাংলাদেশ মাথায় নিয়ে হাঁটতে থাকলাম

মিরপুর শহিদ বুদ্ধিজীবী গোরস্থানের দিকে'

(কফিনে মোড়ানো বাংলাদেশ)

কোনো কোনো কবিতায় দার্শনিক চিন্তা প্রকট হয়ে ওঠে। অবচেতন মনের নিবিড় আলাপ প্রোথিত হয় কবিতার শরীরে। কবিতায় পূর্ববর্তী পৃথিবী আর পরবর্তী পৃথিবী ধরা পড়ে নিখুত চোখে। বর্তমানকে উৎরে গিয়ে কবি ভবিষ্যদ্বাণী করতে চেয়েছেন। আবার কখনো জাতিস্মর হয়ে অতীতের কথাগুলোও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। কবি বিবর্তনের বেদনায় জড়ানো সময়-পায়ের তলায় পিষ্ট করতে হেঁটেছেন।

?'রক্তমাখা ইটের গল্প' পর্বে আবর্জনায় ভরা যন্ত্রণাক্লিষ্ট শহর কবিকে হতাশ করে। তিনি বৃক্ষের ছায়া খোঁজেন। হয়ে ওঠেন পরিবেশবাদী। তার কবিতায় প্রস্ফুটিত হয় বৈশ্বিক চিন্তা। উঠে আসে বর্ণবাদ, আমেরিকা, আফগানিস্তান, ভারত, চিন, রাশিয়া, রোহিঙ্গা ও আরাকান। কবি বলেন,

'কালো কালি শ্বেতখাতায় লেখে ইতিহাস

মানুষে মানুষে সর্বনাশ!' (বর্ণবাদ)

রাজনীতি সচেতন কবির কবিতায় উঠে আসে সমকালীন প্রসঙ্গ। যে ইস্যুকে কেন্দ্র করে ফায়দা লুটতে চায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। আর এতে ক্ষমতাসীনরা অনড়। তার কবিতায় ফারাক্কা, টিপাইমুখ, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ নানাবিধ প্রসঙ্গ বিবৃত হয়েছে। যাবতীয় স্বার্থপরতার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদে ফুসে ওঠেন কবি। রাজনীতির নামে মিথ্যার বেসাতিকে ঘৃণা করেন তিনি। তিনি অকপটে বলে যান,

'কথা ফেলার ডাস্টবিন নেই কোথাও। যেখানে থুতু ফেলি সেখানেই মক্কা-মদিনা। পির-মাশায়েখ; মানুষ-অথচ পর্দা খোলার পর দেখি কেবলামুখী শয়তান। আমি শয়তানের আড়তে কাঁচামাল

... ... ... ...

বিশুদ্ধ সমাজে প্রতিদিন বিক্রি হই কম দামে, বাতুল সময়ে...' (অন্ধকার)

ধর্মের নামে অধর্মকে যারা লালন করেন; তাদের ঘৃণা করেন কবি। তার অন্তর বেদনায় হু-হু করে ওঠে। কবির ভাষায়,

'সভ্য শিকারিও ওত পাতে

ধর্মের পোশাকে; নগরীতে

বিভ্রান্ত আশেকান। আক্রান্ত গরমিল

হায়! জ্বলে দেবালয়-ধর্মে অবক্ষয়

ধর্মভ- দেখুক মানব পরাজয়!' (শিকারি)

'এসেছি মিথ্যা বলতে' কবির একটি দীর্ঘ কবিতা। মিথ্যা বলার কারণগুলো তিনি তুলে ধরেছেন। কবি মুক্তি চান। মুক্তবুদ্ধির চর্চার কথা বলেন। মুক্ত মানবতার কথা বলেন। তার কাছে আজকের পৃথিবীটাকে নির্যাতিত মানুষের সস্নোগান মনে হয়। এখানে গ্রাম-শহর-বিশ্ব, সমাজ-জাতি-রাষ্ট্র, মানুষ-মনুষ্যত্ব-বিবেক উঠে আসে কৌশলে।

তৃতীয় বা শেষ পর্ব 'গুলবদন ও অন্যান্য কবিতা'য় কবি নিজেকে কুকুরের সঙ্গে তুলনা করতেও পিছপা হননি। কুকুর পালন করতে আগ্রহী বিত্তশালীকে তিনি নিজের অবস্থানের কথা জানিয়ে সতর্ক করে দিতে চান। এখানে বেকারত্বের নির্মম কষাঘাত ফুটে ওঠে। যেখানে দিন দিন বেকারের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে; সেখানে প্রতিপত্তিশালীদের ইচ্ছা হয় কুকুর পালবার। যে দেশ একজন মানুষকেই ঠিকমতো ভরণ-পোষণ দিতে পারে না; সে দেশের নাগরিক একটি কুকুর পালবার জন্য প্রতিমাসে অজস্র টাকা ব্যয় করতে পারেন। তাই কবির ক্ষোভ গিয়ে আছড়ে পড়ে নিজের ওপর। সমাজব্যবস্থার ওপর।

ঘুমহীন চোখে কবি কত কিছুর কল্পনা করে যান। দৃশ্যকল্পের পর দৃশ্যকল্পে তা তুলে ধরেন পাঠকের সামনে। না ঘুমানো মানুষের ছটফট-হাহাকার মুহূর্তেই ভেসে ওঠে চোখের সামনে। কারো মৃত্যুসংবাদও দুদ- শান্তি দেয় না মানুষকে। সবকিছুই কেমন তাড়িয়ে নিয়ে যায় অসীমের সন্ধানে।

'দিশেহারা হয়ে শার্ট-প্যান্টের পকেটে ঘুম খুঁজি

ওয়্যারড্রোব, টিভি, ফ্রিজ, ডাইনিং টেবিলের উপর খুঁজি

কাগজ-কলম ছুড়ে ফেলে কয়েক ঢোক পানি ঢকঢক গিলি

তবুও ঘুমহীন চোখ!' (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্নাইলাইহি রাজিউন)

এছাড়াও কবির কাছে অনেক প্রশ্নের উত্তর জানা নেই। তিনি উত্তর খোঁজেন। কবি জানতে চান কে তোমার আত্মীয়? আমাদের সবকিছুর দূরত্ব কতদূর? আরো অনেক জিজ্ঞাসা। এই যে বৃষ্টিতে ভেজা, মদ খাওয়া, নারীতে সুখ খোঁজা-কতকিছুই না করে মানুষ। আসলে সেকি জানে তাঁর গন্তব্য কতদূর? অথচ কবির ইচ্ছারাও কত ব্যতিক্রম। ভালোবাসার মানুষকে সে পায়ে পায়ে দাঁড়াতে শেখাতে চান। নিজের মানুষটিকেও তিনি কারো প্রতি নির্ভরশীল হতে দিতে চান না। সবকিছুকে অতিক্রম করে কবি তার প্রিয়তমাকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করতে চান মানুষের সামনে। সেখানে দেখা যায় সোচ্চার উচ্চারণ, 'তোমাকে চাই দাঁড় করাতে পায়ে পায়ে।'

কবি তার চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্র বিস্তৃত করতে চান। বৈশ্বিক চিন্তা তার অন্তর্গত রক্তের ভেতরে খেলা করে। টালমাটাল বিশ্ব কবিকে ভাবিয়ে তোলে। সমকালীন বিশ্ব রাজনীতি তাকে অনেক পাঠের আয়োজন করতে বাধ্য করে। নিজের অভিজ্ঞতার চোখে দেখা বিশ্বকে ঠিক নিজের মনের মতো দেখতে পান না। তাই জ্বলে ওঠে ক্ষোভের আগুন। কবি বলেন,

'এশিয়া-মেরিকায় যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা

পুড়ে গেছে জাপান ধ্বংস বোমে

ফিলিস্তিন উদ্ধাস্তু শিবির

বিশ্বাসের খরায়

বিপথে আফ্রিকা

মুমূর্ষু আদিবাসী অস্ট্রেলিয়া

ভেঙে পড়ে মানুষের শির' (গুলবদন)

তবে 'এসেছি মিথ্যা বলতে' গ্রন্থের তৃতীয় পর্বের কবিতাগুলো 'গুলবদন'কে উদ্দেশ্য করে বলা কবিমনের অনেক কথা। কবিতাগুলোয় ঘুরেফিরে গুলবদন এসে হাজির হয়েছেন। বা কবি নিজেই গুলবদনকে বারবার টেনে এনেছেন। হতে পারে গুলবদন তার মানসসঙ্গীনি। হতে পারে অনুপ্রেরণা, আস্থা, ভরসা, ভালোবাসা, নির্ভরতার প্রতীক। এই গুলবদন পাঠে আমাদের মনের ভেতর কল্পনার জগতে একেকজন গুলবদনের জন্ম হয়। যে গুলবদন সংসারে, বাস্তবতায়, আঘাতে, অহংকারে, মমতায় সর্বক্ষণ আমাদের পাশে থাকেন। এমনকি ভবিষ্যতেও পাশে থাকবেন। অথচ কবি এও স্বীকার করেন যে, 'গুলবদন, জানো? কষ্টের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার ইতিহাস জানা নেই ফায়ার সার্ভিস কর্মীদেরও।'

কবি জব্বার আল নাঈমের গদ্যনির্ভর কবিতা আমাদের মুগ্ধ করে। তার কবিতায় সুনীল-জীবনানন্দের প্রভাব হয়তো লক্ষ্য করা যায়। বৈশ্বিক নিসর্গ বা মানুষের আরাধনা তুলে আনেন কবি। উদারমনা কবি শুধু কবিতার কথাই ভাবেননি। তিনি ভেবেছেন তার প্রেরণা জোগানো মানুষগুলোর কথা। তাই তিনি বেশকিছু কবিতা বেশকয়েকজনকে উৎসর্গ করেছেন। আর পুরো গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন কবি ও অধ্যাপক খালেদ হোসাইনকে।

কবি তার কবিতায় বিষয় নির্বাচনে নতুনত্বের আবহ তৈরির চেষ্টা করেছেন। উপমা প্রয়োগে নতুনতর ব্যঞ্জনার সৃষ্টি করেছেন। মুক্তক ছন্দে রচিত হয়েছে অধিকাংশ কবিতা। তবে তাতে ছন্দের ব্যত্যয় তেমন ঘটেনি। কোনো কোনো কবিতায় পর্ব বিন্যাসে বা মাত্রার ক্ষেত্রে সমতা রক্ষা করে উঠতে পারেননি। তবে ব্যাকরণগত সীমাবদ্ধতার পরেও কবিতা পাঠে কিন্তু জড়তা বা দুর্বোধ্যতা পরিলক্ষিত হয় না। কবি যা বলতে চান; পাঠক তা সহজেই বুঝতে পারেন। কবিতার এই সহজবোধ্যতাই তার সহজাত বৈশিষ্ট্য হয়ে চির জাগরুক থাকবে। কবির সার্থকতা এখানেই। যেমন- 'গুলবদন' কবিতাটি পাঁচটি অংশে উপস্থাপন করেছেন। 'তামাশা ও অন্যান্য কবিতা'টি তিনটি অংশে বিন্যাস করা হয়েছে। 'কাঁটাতার' কবিতাটি দুটি অংশে বিভক্ত। এর বাইরেও তিনি বিভিন্ন প্যাটার্ন বা ফর্ম তৈরির চেষ্টা করেছেন। সুতরাং অবশেষে বলাই যায়, কবি মিথ্যা বলতে এলেও আমাদের এক পৃথিবী সত্যকে উদ্ভাসিত করে দিয়েছেন। আমরা কবির মিথ্যাকেই সত্য জ্ঞান করে মানবজনম সার্থক করতে পারি। আমি গ্রন্থটির বহুল পাঠ এবং গভীর আলোচনা কামনা করছি।

এসেছি মিথ্যা বলতে/জব্বার আল নাঈম/প্রকাশকাল : ঈদুল ফিতর ২০১৭/প্রকাশক: চৈতন্য/প্রচ্ছদ : সারাজাত সৌম

টাকা : ১২০ টাকা।

আজকের পাঠকসংখ্যা
৭৫৬০৬
পুরোন সংখ্যা