চাঁদপুর। শনিবার ১১ নভেম্বর ২০১৭। ২৭ কার্তিক ১৪২৪। ২১ সফর ১৪৩৯

বিজ্ঞাপন দিন

বিজ্ঞাপন দিন

সর্বশেষ খবর :

  • ---------
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৩১-সূরা লোকমান


৩৪ আয়াত, ৪ রুকু, ‘মক্কী’


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


৩০। এটাই প্রমাণ যে, আল্লাহ্-ই সত্যি এবং আল্লাহ্ ব্যতীত তারা যাদের  পূজা সব মিথ্যা। আল্লাহ্ সর্বোচ্চ, মহান।


৩১। তুমি কি দেখ না যে, আল্লাহর অনুগ্রহে জাহাজ সমুদ্রে চলাচল করে, যাতে তিনি তোমাদেরকে তাঁর নির্দেশনাবলী প্রদর্শন করেন? নিশ্চয়ই এতে প্রত্যেক সহনশীল, কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্যে নির্দেশন রয়েছে।


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


 


চোখ পেটের চেয়ে বড়।


                               -স্কট।

দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞান চর্চায় নিজেকে উৎসর্গ করো।


নাইওর
জাহাঙ্গীর হোসেন বাদশাহ
১১ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+

মায়ের সম্পূর্ণ কথা না শুনেই খেয়াঘাটে এলাম। বাবা নৌকা নিয়ে গেছে ওপারে। রোদ উঠেছে ভীষণ। বাবার কাছে কোনো ছাতা নেই, যা দিয়ে রোদ তাড়াবে। মাথায় বেঁধেছে ছেঁড়া গামছা। বাবার পুরো দেহটা আঁকড়ে ধরেছে পোড়া রোদ। ক'জনকে নিয়ে বাবা আবার ফিরছে এপারে।

আমার বাবা এই খেয়াঘাটের মাঝি। আমি তার অতি আদরের ছেলে। মাত্রই এসএসসি শেষ করেছি। গঞ্জের এক কলেজে মানবিক শাখায় ভর্তি হয়েছি। বাবা একা ক্লান্তিবোধ করে ভীষণ, তাই কলেজ শেষ করে বাবার ক্লান্তি দূর করতেই মাঝে মাঝে খেয়াঘাটের মাঝি হয়ে যাই।

এই পৃথিবীর সব মানুষই তো স্বার্থবাজ, স্বপ্নবাজ। আমারও স্বপ্ন আছে, স্বার্থ আছে যা সবার কাছে অর্থহীন হতে পারে; আমার কাছে নয়। একটুও নয়।

এই তো বাবা ঘাটে পৌঁছাল। একে একে নেমে যাচ্ছে সবাই।

বাবাকে বললাম, বাবা তুমি বাড়ি যাও। খানাপিনা করে আসোগে। আমি নৌকা বাইবোনি।

বাবা বলল, আচ্ছা ঠিক আছে। তুই থাক। আমি বাড়ি যাই।

সুখীপুর থেকে নিতাইপুর। মাঝখানে ছোট একটা নদী। এই নদীতেই খেয়া পারাপার। বাবার নৌকাটা দুই গ্রামের মাঝে কী দারুণ একটা বন্ধন তৈরি করে দিয়েছে। ভাবতে ভালোই লাগে।

বিকেল গড়িয়ে এলো। সুখীপুরের হাইস্কুল ছুটি হবে। কর্মমুখী মানুষ আসবে। নিতাইপুরের সব ছাত্রছাত্রীও আসবে। অনেককেই চিনি। আবার অনেকেই আছে যাদের একটুও চিনি না। কিন্তু এই চেনা-অচেনার মাঝে একজন আছে চিরচেনা। পরী। পরী, আমার চেনা মানুষ। যুগ যুগের চেনা বলব না। বলব না, পরীকে আগে কখনও চাতক পাখির মতো করে চিনেছি। শতাব্দী থেকে শতাব্দী ধরে চেনা, সেটাও না। এই তো কিছুদিন হলো চিনি। আমি জানি, কাউকে এক মুহূর্তেই চেনা যায় আবার কাউকে হাজার বছর দেখেও চেনা যায় না। পরীকে খুব অল্প সময়েই চিনেছি। মৌন মুগ্ধতায় অজান্তে ভীষণ রকমের ভালোওবেসে ফেলেছি পরীকে।

পরী আমাকে চেনে না। একটুও জানে না। তবে আমি যে মাঝির ছেলে সেটা জানে। আমার নামটাও জানে। সবুজ। এবার তো সবাই অবাক হবে; তাহলে অচেনা-অজানা হয় কী করে? আমি পরীর চোখের কাছে অচেনা, মনের কাছে অজানা।

ফজল জোয়ার্দারের মেয়ে। যেমন রৃপবতী, সুন্দরী তেমনি গুণবতী, মায়াবতী। অনেক হাসি-খুশি মাখা একটা চঞ্চলা মেয়ে। অনেক দিন ধরেই দেখি। শুধু চোখ দিয়ে দেখি না, মনের চোখ দিয়েও দেখি। খুব আলাদা স্বভাবের মেয়ে। বান্ধবীদের সঙ্গে নৌকায় উঠেছে। ওপারে যাবে। নিতাইপুর গ্রামে বাড়ি। বৈঠা বাইছি আর ক্ষণে ক্ষণে চোখ মেলছি পরীর দিকে। পরী আমার দিকে তাকায় না। একটুও তাকায় না। আর তাকাবেই বা কেন? তাকানোর মতো কেউ হলে তো আমি! তাকাবে... আমি হলাম কালো-কুৎসিত, বিশ্রী-বেঁটে একটা ছেলে। অগোছালো ভাবনাগুলো ভাবতে ভাবতে নিতাইপুরের ঘাট পেয়ে গেলাম। একে একে সবাই নেমে যাচ্ছে। সেও নেমে যাচ্ছে। খালি হয়ে গেল নৌকাটা। কেন যেন মনে হলো আমার মনটাও খালি হয়ে গেছে। সবাই বাড়ি ফিরছে। দূর দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছি, সেও বাড়ি ফিরছে।

খালি নৌকা নিয়ে জলের এলোমেলো ঢেউ কেটে কেটে এলোমেলো মনটা নিয়ে ভেসে ভেসে আসি এপারে।

এভাবে পরীকে প্রতিদিনই দেখা হয়। চেনা হয়। জানা হয়। বোঝা হয়। শুধু পরীর কাছে নিজেকে চেনাতে পারি না। জানাতে পারি না। বোঝাতে পারি না। পাগল মনটার কাছে জটিল প্রশ্ন রাখি- এত অপ্রকাশিত কেন রে আমি?

বেশ কয়েকদিন পরের বিকেল বেলা। ক'জন নিয়ে নিতাইপুরের ঘাটের উদ্দেশে নৌকা ছাড়ি। আমার সামনে বসা লোকটি আরেকজনকে বলে উঠল, আজ নাকি ফজল জোয়ার্দারের মেয়ে পরীর বিয়ে? প্রত্যুত্তরে আরেকজন বলল, হ, শুনলাম তো বিয়ে। সকালে দেখলাম জোয়ার্দারের বাড়িজুড়ে বেশ ধুমধাম।

বাতাসের গতিবেগ বেড়ে ওঠে। জলের অসমতল ঢেউগুলো উন্মাদের মতো ছুটছে কিনারে আর নিজের ভেতর একটা কিছুর অভাব অনুভব করলাম। একটা কিছু হারিয়ে যাওয়ার কষ্ট অনুধাবন করলাম।

নৌকা ঘাটে ঠেকল। সবাই নেমে যাচ্ছে। একদম ফাঁকা হয়ে গেল নৌকাটা। শুধু আমিই একা। ও, আমি তো মাঝি। দুঃখী মাঝি। নৌকা থেকে নেমে শুকনো বালির ওপর দাঁড়াই। মন পরীর কাছে যেতে চাইছে। স্থির থাকতে পারলাম না। এক নিঃশ্বাসে দৌড়ে এলাম। জোয়ার্দার বাড়িজুড়ে কত মানুষের আনাগোনা। কাউকে চিনি না। আমাকেও চেনে না কেউ। চেনা মানুষটাকে খুব করে খুঁজছি, কিন্তু পাচ্ছি না।

বারান্দার এক কোণে পরী বসে আছে বউয়ের সাজে। কী দারুণ লাগছে পরীকে। এত সুন্দর লাগছে অথচ বড্ড অচেনা ঠেকছে। এত চেনা মানুষটাকে আজ সবচেয়ে বেশি অচেনা মনে হচ্ছে। চোখটা মুছে সান্ত্বনা দিলাম অপ্রকাশিত মনটাকে। যাকে পরান খুলে ভালোবাসলাম, সম্পূর্ণ করে ভালোবাসলাম, তার জন্য বিকিয়ে দিলাম মনের আকাশ। বাড়ি ছেড়ে এলাম অনেক দূরে। সূর্যটা বিকেলের আকাশকে রক্তিম করে দিয়ে অস্তিম হয়ে যাচ্ছে। পরীও কেমন আমার আকাশ ঢেকে দিল মেঘে।

গান গাইতে গাইতে আসছে চার বেহারার পালকি। দূরে দাঁড়িয়ে দেখছি, ঘোমটা ছেড়ে পরী লজ্জাবনত মুখে বসে আছে বরের মুখোমুখি। শেষ বিকেলের নিঃসঙ্গ বকপাখির মতো তাকিয়ে থাকি। পাগল মন ভেতর থেকে অকস্মাৎ বলে ওঠে- হায় রে ভালোবাসা...।

আজকের পাঠকসংখ্যা
৪৮৮৩৩
পুরোন সংখ্যা