চাঁদপুর। শনিবার ২০ জানুয়ারি ২০১৮। ৭ মাঘ ১৪২৪। ২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৯
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • চাঁদপুরের সুধীজন ও সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের সাথে মতবিনিময়কালে নবাগত পুলিশ সুপার জিহাদুল কবির পিপিএম বলেন, যে কোনো মূল্যে চাঁদপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখা হবে। এছাড়া তিনি সড়কে ট্রাক চলাচল বন্ধ রাখার সবপ্রকার চেষ্টা অব্যাহত রাখবেন
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৩৪-সূরা সাবা

৫৪ আয়াত, ৬ রুকু, মাক্কী

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

১৬। অতঃপর তারা অবাধ্যতা করল, ফলে আমি তাদের উপর প্রেরণ করলাম প্রবল বন্যা! আর তাদের উদ্যানদ্বয়কে পরিবর্তন করে দিলাম এমন দুই উদ্যানে, যাতে উদগত হয় বিস্বাদ ফলমূল, ঝাউ গাছ এবং সামান্য কুলবৃক্ষ।

১৭। এটা ছিল কুফরের কারণে তাদের প্রতি আমার শাস্তি। আমি অকৃতজ্ঞ ব্যতীত কাউকে শাস্তি দেই না।

দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


অভিজ্ঞতা হচ্ছে সুন্দর ও মজবুত দালান তৈরির উপকরণের মতো।

-ম্যানিলিয়াস।


নামাজে তোমাদের কাতার সোজা কর, নচেৎ আল্লাহ তোমাদের অন্তরে মতভেদ ঢালিয়া দিবেন।


ফটো গ্যালারি
আমাদের ইলিশ
তৃপ্তি সাহা
২০ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


শীত এলেই ইলিশের গন্ধটা খুব নাকে লাগে। রাতে লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছি, হঠাৎ করেই ইলিশের গন্ধ। আশেপাশে কেউ ইলিশ ভাজছে। ব্যাস, যেই ভাবনা অমনি জিভে জল চলে এলো। চোখের সামনে ভেসে উঠলো ইলিশ মাছ_তেলে কড়া করে ভাজা, ধোঁয়া ওঠা ভাত তার সাথে ইলিশ ভাজির একটু গরম তেল। গরম ভাতে মেখে কালো কাঁচা মরিচ টিপে খেতে কী যে মজা! আহা! কী রসনা বিলাস! বাঙালি বলতেই ইলিশ প্রিয়। শুধু কী ইলিশ! তা তো নয়, তার বারো মাসে তের পার্বণ। সবই ঘটা করে খাওয়া দাওয়ার ব্যাপার। ওটাই মুখ্য, অন্য সব গৌণ। যেমন ধরুন বিয়ে অথবা ঈদ বা পূজো? ভোজন রসিক বাঙালি বলে কথা!



আর এখন তো ইলিশ নিয়ে কত রকম মাতামাতি। ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর, ইলিশ উৎসব, ইলিশ চত্বর, ইলিশ ছড়া, ঘটা করে ইলিশের নানা পদের রেসিপি, রান্নার প্রতিযোগিতা। সবই ভালো তবে এসব করে আমাদের মত সহজ-সরল চাকরিজীবীদের সমস্যা। সুবিধাভুগি অসৎ ব্যবসায়ীরা ইলিশ মাছ মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে নিয়ে গেলো। ভাগ্যিস্ সরকার বাঙালির বাংলা বৎসরের প্রথম দিনের হাস্যকর ইলিশ পান্তা খাওয়ার উৎসব উচ্ছেদ করতে পেরেছে। ফলে দাম বেশি হলেও ইলিশ প্রচুর পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু পদ্মার ইলিশ বা চাঁদপুরের রূপালি ইলিশ দেশ-বিদেশে সর্বদা সমাদৃত, সব দেশের সমস্ত বাঙালির রসনা নিবৃত করেছে এই ইলিশ। চাঁদপুরে কিন্তু দু-রকমের ইলিশ পাওয়া যায়। লম্বাটে চন্দনা ইলিশ, আর চকচকে চ্যাপটা রূপালি ইলিশ। স্বাদে গন্ধে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ এই চ্যাপ্টা রুপালি ইলিশ। তাই দেখে-শুনে দাম দিয়ে সঠিক ইলিশ কিনাটা কঠিন কাজ। সর্ষে ইলিশ আজও যেমন কদর আগেও তেমনি কদর ছিল। উৎসবে অনুষ্ঠানে অন্য মাছের ভিন্নতা থাকতো, কিন্তু ইলিশ না হলে আয়োজনের বিশেষত্ব হারাতো। বিয়ে বাড়িতে সর্ষে নারকেল ইলিশ খুব প্রচলিত। মাকে দেখেছি দই সর্ষে ইলিশ প্রায়শ রান্না করতো। সবার মা ভালো রান্না করেন কিন্তু আমার মা রান্নাতে স্পেশালিস্ট। বাদাম ইলিশ_চিনে বাদাম সামান্য ভেজে খোঁসা ছাড়িয়ে মিহি বেঁটে ইলিশ দিয়ে রান্না_খুব সুস্বাদু এবং পুষ্টিগুণে ভরপুর। ভাঁপা ইলিশ আর ভাতে ইলিশ_প্রায় একই রকম হলেও, স্বাদে! ভাতে ইলিশ অতুলনীয়। পেঁয়াজ ইলিশ, পাতুরি ইলিশ_ বিশেষ বিশেষ দিনে রান্না হতো। আসলে সে সময় পরিবারগুলো এতো ছোট ছিল না। বাঙালিদের মধ্যে বিশেষ করে আমরা যারা বাংলাদেশে বাস করি তাদের মধ্যে ব্যস্ততা, হুড়োহুড়ি, ছল-চাতুরি এতোটা ছিল না। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা নিয়েও মায়েরা এত ছোটাছুটি করেনি। পরিবারগুলি ভেঙে যায়নি এই সেদিনও, যৌথ পরিবার ছিল। আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না ভাগাভাগি করে নিতো। পরিবারগুলোতে অনুষ্ঠান লেগেই থাকতো। কারো জন্মদিন গেলে অন্য জনের বিবাহবার্ষিকী বা মৃত্যুদিবস। আত্মীয়-স্বজন পরিবেষ্টিত থাকতো। ফলে নানা ধরনের রান্না হতো বাড়িতে। পাতুরি ইলিশ_কলা পাতা অথবা লাউ পাতা দিয়েও করা যায়। তফাৎটা হলো কলা পাতা ফেলে দেয় আর লাউ পাতাসহ মাছটা খায়। খাবারের স্বাদ তো আলাদা হবেই। এছাড়াও কচি চালতা দিয়ে ইলিশের পাতলা ঝোল, কচি কুমড়ো দিয়ে ইলিশ, বেগুন ইলিশ, কালি জিরা দিয়ে ইলিশ নিত্য দিনের রান্না। স্পেশাল দিনে কুমোড়ের বিচি দিয়ে ইলিশ পাতুড়ি, ইলিশ পোলাও_ আহা! কী গন্ধ কী স্্বাদ! যেন অমৃত। যদিও ইলিশ মাছের ত্রিশ কাঁটা বলে বদনাম আছে।



এছাড়াও লবণ ইলিশ আরও একটি প্রিয় খাবার, বিশেষ করে মেয়েদের কাছে। বিদেশ বিভুইয়ে আগে তো মাটির পাতিলে করে ইলিশ যেতো। আবার বাজারেও লবণ ইলিশ বিক্রি হয়। লবণ ইলিশের কথা যখন এলো তখন একটি ঘটনা আপনাদের সবার সাথে শেয়ার করতে চাই_আসলে বাংলাদেশের একটি সম্পদ নিয়ে কথা বলবো আর মুক্তিযুদ্ধের কথা আসবে না তা কি হয়? বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশ পয়সার এপিঠ আর ওপিঠ। যুদ্ধের সময় আমরা এ-গ্রাম থেকে ও-গ্রামে, ও গ্রাম থেকে অন্য কোথায়ও। ঐটুকুন বয়সে নিঃশব্দে মাইলের পর মাইল হেঁটে বিভিন্ন গ্রামে আশ্রয় নিয়েছি, সময়ে বাবার কোলে চড়ে। কিন্তু কোথায়ও নিরাপদে থাকতে পারিনি। গ্রামের পর গ্রাম আক্রমণ করেছে পাকসেনারা। জ্বালিয়ে দিয়েছে গ্রামকে গ্রাম। অবশেষে একদিন আর টিকতে না পেরে বর্ষার শেষ দিকে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলো ভারতে চলে যাওয়ার। মা মাটির পাতিলে করে লবণ ইলিশ নিয়ে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা করেছে, নৌকাপথে, বর্ষা শেষের দিকে বা শেষ হয়ে গেছে। পথিমধ্যে রাজাকারদের হাতে ধরা পড়লাম, আমাদের বাঁচালো চৌমুহনী কলেজের ভিপি ছাত্র ইউনিয়নের ইফসুফ মিয়া, পরবর্তীতে উনি চেয়ারম্যান হন, সে অনেক কথা। শান্তিবাহিনীর লোক কাছ থেকে দেখেছি। আশ্রয় নিয়েছিলাম ভিপির বাড়িতে। কৃতজ্ঞতা তাঁর প্রতি। সে যাত্রায় বেঁচে গেলাম, যাওয়া হলো না ভারত। তারও ১৫/২০ দিন পরে আবারও লবন ইলিশ যাত্রা। এবার ডিমাতলী বর্ডার পার হয়ে ভারতের রাধানগর একটি পল্লী গ্রামের নাম, আমরা সেখানে দু-এক রাত ছিলাম দশ টাকা ভাড়াতে, লাড়কির দামসহ। বর্ডারের কাছাকাছি। গরু বা ছাগল থাকার ঘরে আশ্রয় নেই, সেখানে মা এই লবণ ইলিশ রান্না করে, কাঁচা কলা দিয়ে। সেই স্বাদ এখন আর মনে নেই। সেখানে অনেকেই আশ্রয় নিয়েছিলো। অনেক ক্যাম্প অনেক মানুষ দেখেছি এর মধ্যে আমাদের আত্মীয়-স্বজন, পরিচিত লোকও ছিলো।



কিন্তু আমি স্বাধীন বাংলাদেশে আমার ছোটবেলার মায়ের হাতের ইলিশ খাওয়ার কথা ভুলবো না। তখন ফ্রিজ ছিল না। আমরা দুটো পরিবার আমাদের ছয় জনের এক পরিবার আর ছয়জনের পিসির পরিবার। আদালত পাড়ার খান মঞ্জিলের একই বাসায় থাকতাম। একই রান্নাঘর। রান্নাঘরটি দৈর্ঘ্য প্রস্থে প্রশস্ত। দুটো মিটসেফ দুদিকে মুখ করা। এখন যে ইলিশটি এক হাজার টাকায় পাওয়া যায় তখন সে ইলিশটি (যখন ঝাঁকে ঝাঁকে ধরা পড়তো) দশ টাকায় বিক্রি হতো। একশ' টাকায় দশটা ইলিশ কতদিন না এনেছে। তখনতো ইলিশ নিয়ে উৎসব ছিলো না। মানুষ কোনো কাজ এতটা ঢাকঢোল পিটিয়ে (বিয়ে, ঈদ আর পূজো ব্যতীত) করতে অভ্যস্ত ছিলো না। ঘরে ঘরে প্রতিদিনই উৎসব থাকতো। ইলিশের দাম ছিলো সাধারণ মানুষের ক্রয়-ক্ষমতার মধ্যে। তবে মজুদ রাখার সুবিধাও কম ছিলো। সাতলিয়ে রাখা অথবা লবণ দিয়ে রাখা। এখনতো একেক জনের ফ্রিজে বিশ-ত্রিশ কেজি ইলিশ মজুদ থাকে। যাই হোক সেই সময় আমাদের বাড়িতে বেশ ইলিশ আসতো। আমি খুব ইলিশ পছন্দ করতাম। লাকড়ির চুলো, নেট দেয়া আলমারি যাকে মিটসেফ বলতো। তার মধ্যে থাকতো ভাত, মাছ, তরি-তরকারি। আমাদের বাসায় কখনো পিঠের মাছ, কোলের মাছ আলাদা না করে মাছ রান্না হতো না। কিন্তু এখন তো সেই বড় সাইজের মাছ নেই। থাকলেও বিরল। ঘাটে পাওয়া গেলেও সচরাচর নয়। কখনো থাকলেও তার দাম স্বাভাবিক মানুষের নাগালের বাইরে। এখন বাজারে যা দেখি তা কখনই পিঠের মাছ আর কোলের মাছ আলাদা করে কেটে খাওয়ার যোগ্য নয়। ছোটদের জন্য কোলের মাছ বরাদ্দ। কম কাঁটার জন্যে। তো যে কথায় ছিলাম_শীতের সবজি বেগুন আর ইলিশের পাতলা ঝোল। দুই বেলাতে খেতাম আবার সকালে দুই তিন পিছ সর-পরা অর্থাৎ ঠা-ায় জমে থাকা ইলিশ নিয়ে রোদেলা ছাদে চলে যেতাম। আমাদের ছাদে সব সময় ফুল থাকতো। জমিয়ে ইলিশ খাওয়া চলতো।



আমার ্এই ইলিশ প্রীতি দেখে বসার সবাই ঠিক করলো, আমাকে গোটা ইলিশ রান্না করে খাওয়াবে। মা রান্না করে যথারীতি আমার পাতে দিল আর আমিও প্রাণভরে মাছের রাজা ইলিশ খেতে বসলাম। দাদা-দিদি সবাই চোখ ঠ্যারাঠুরি করছে, বলছে কিরে জামাইরাজার পাতে গোটা মুরগি, মাছ দিলে থালার চারপাশে পাঁচ-ছয়জন থাকে, তুই তো একা। ধ্যাৎ, আমার কী এত কথা শোনার সময় আছে, আমি তো খাচ্ছি গোগ্রাসে। আমার কাঁটাতেও সমস্যা ছিলো না। কাঁটা বেছে সুন্দর খেতে পারতাম, মাথা লেজা সব। এখনও লেজা কাটতেই বড় করে কাটি, কারণ ওটা আমি খাবো। আমাদের ছেলেমেয়েরা তো কাঁটার ভয়ে মাছ খাওয়া ছেড়েছে। আমি মহানন্দে মাছের রাজা ইলিশের স্বাদ, গন্ধ সবই নিলাম।



সাড়ে সাত কোটি মানুষের জায়গা দখল করেছে প্রায় সতের কোটি মানুষ। কিন্তু মাছের অভাব নেই, যদিও দাম বেশি, সাইজ ছোট। বর্তমান সরকার এবং প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে ইলিশ মাছ সুরক্ষায় বিভিন্ন ফলপ্রসূ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ফলও পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের সুস্বাদু রুপালি ইলিশ বিদেশে প্রচুর পরিমাণে রপ্তানি করেও আমাদের বিশাল জনগোষ্ঠীর রসনার জোগান দিয়ে যাচ্ছে ভালো মতো। ডিম ছাড়ার সময়টাতে মা ইলিশ সুরক্ষা এবং জাটকা ধরা রোধ করার উদ্দেশ্যে বছরে দু'বার জেলেদের মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকে। মহতি এই উদ্যোগ সফল করার ক্ষেত্রে প্রশাসনকে প্রচুর নজরদারি করতে হয়। এক্ষেত্রে শতভাগ সফলতা অর্জনের দাবিদার তারা। কিন্তু পাশাপাশি আরও একটু নজরদারি করা উচিত এই জেলেদের ব্যাপারে। তারা যেন এ সময়টাতে স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকে বঞ্চিত না হয়। তার চাহিদা অতি সামান্য, দুবেলা দু মুঠো ভাত। চাঁদপুরের পাঁচ নম্বর ঘাটের বাংলার ঐতিহ্য নৌকার মাঝিদেরকে দেখলে আমার কান্না পায়। একদিন তাদের কত ব্যস্ততা ছিল হাসিখুশি ছিলো তাদের মুখ। তাদের কথা রাষ্ট্রকেই ভাবতে হবে, বিকল্প জীবন ব্যবস্থা তাদের দিতে হবে। প্রত্যেকটি জীবনকে মূল্যায়ন করতে হবে। এরাই একদিন আমাদের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে_নদীমাতৃক এই বাংলাদেশে। ভালো থাকুক ইলিশ, ভলো থাকুক জেলেকূল, ভালো থাকুক মাঝিকূল, ভালো থাকুক নদ-নদীকূল। ভালো থাকুক বাঙালি, ভালো থাকুক বাংলাদেশ। বাঙালি থাকুক ইলিশ ভাতে।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৮৬৬৬৩৫
পুরোন সংখ্যা