চাঁদপুর । শনিবার ৭ জুলাই ২০১৮ । ২৩ আষাঢ় ১৪২৫ । ২২ শাওয়াল ১৪৩৯
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • কচুয়ায় স্ত্রী হত্যার দায়ে স্বামীকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছে জেলা দায়রা জজ আদালত
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৩৯-সূরা আয্-যুমার


৭৫ আয়াত, ৮ রুকু, মক্কী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


২৯। আল্লাহ এক দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন: একটি লোকের উপর পরস্পর বিরোধী কয়জন মালিক রয়েছে, আরেক ব্যক্তির প্রভু মাত্র একজন তাদের উভয়ের অবস্থা কি সমান? সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানে না।


৩০। নিশ্চয় তোমারও মৃত্যু হবে এবং তাদেরও মৃত্যু হবে।


৩১। অতঃপর কেয়ামতের দিন তোমরা সবাই তোমাদের পালনকর্তার সামনে কথা কাটাকাটি করবে।


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


 


সৎ এবং চরিত্রবান নাগরিক দেশের গর্ব।


-ড্রাইডেন


 


 


 


 


 


 


 


নামাজ বেহেশতের চাবি এবং অজু নামাজের চাবি।


 


 


ফটো গ্যালারি
অন্তহীন পথে
কাদের পলাশ
০৭ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


খুব যত্ন করে খোঁড়া হচ্ছে কবর। পাশে অনেকেই শুয়ে আছেন অন্তহীন নিদ্রায়। কবর করনেওলা খুব আদবের সাথে মাটি আলগা করছেন। কোদালের আওয়াজ জেনো বড় না হয় সে নির্দেশ দিচ্ছেন বাবা। তিনি কবরের পাশে হাতে কাফনের কাপড় নিয়ে বসে আছেন। পূর্বেও এভাবে কাফন নিয়ে বসে ছিলেন তিনি। পছন্দের কাফনে শেষ বিদায় দিয়েছেন স্ত্রী সন্তানকে। আজ আবার প্রস্তুত সন্তানের মৃতদেহ সাদা পোশাকে সাজিয়ে দিতে। একবার বুকে আগলে ধরছেন তো আবার মুখের কাছে তুলে আলতো করে চুমু খাচ্ছেন। প্রতিটি চুমুতে সীমাহীন তৃপ্তি অনুভব করছেন তিনি। চোখে জল নেই। তবে বুক ভরা কষ্ট বের হচ্ছে প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসে। এর আগে স্ত্রী সন্তান মারা যাওয়ার পর বাবাকে কখনো এতো আপ্লুত হতে দেখিনি। এবার যেন মৃত্যু শোক পাথর বানিয়েছে তাকে। বাবার পাশে বসে আছে ছয় বছরের শিশু। দাঁড়িয়ে কবর খোঁড়া দেখছে। এখনো পৃথিবীর ধূম্রজাল বুঝে ওঠেনি ও।



 



তার মা বার বার মূর্ছা যাচ্ছে। জ্ঞান ফিরলেই বলে উঠছে, 'আমি কী নিয়ে বাঁচবো? কথাতো এমন ছিলো না।' স্মৃতিগুলো মনে পড়তেই রুদ্ধ হয় বাক। বন্ধ হয় প্রলাপ। এভাবেই চলছে সকাল থেকে দুপুর অব্দি। পাড়া প্রতিবেশীরা আসছেন দলে দলে। অনেকে গোপনে দু ফোঁটা জল ফেলছেন। কেউ কেউ বিলাপ করছেন 'বড় বালা মানুষ আছিলো' বলে।



অনেকেই লাশ একনজর দেখে নীরবে উল্টো পথে হাটছেন। বড় দুই বোন চিৎকার দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে বাড়িতে এসেছেন। এখন আর কাঁদতে পারছেন না। শুধু বিলাপ করছেন। গ্রামে মানুষ মরলে সুর সুরে কাঁদেন। সে সুর এখন অনেক গানে বাজে। তাই কিছু গান আছে শুনলে হৃদয় হুহু করে কেঁদে ওঠে। স্বজনহারা মানুষগুলো কবিয়ালের মতো ছন্দে ছন্দে কাঁদেন। শেষ সাক্ষাৎ এর সময়টাকে গল্পের মতো বলে আহাজারি করেন। বাড়ির উঠোন থাবড়িয়ে থাবড়িয়ে উজাগাড় করে তোলেন। উপস্থিত অন্যরাও সমব্যথি হন। অন্যরা কান্নার জন্যে কাঁদেন। বোনেরা কাঁদেন ভাই বিয়োগের শোকে। ভাই কাঁদেন গোপনে গোপনে। আপন যাকে কাছে পান তাকেই জড়িয়ে ধরে ভাইয়ের শরীরের ওম খুঁজেন। কারো শরীরের সাথে ভাইয়ের শরীরের ওম মিলে না। শুধু শূন্যতার বিষাদে বুক ভারি হয়। গুমড়ে কাঁদে পরাণ।



আমি সব দেখছি। এর আগেও অনেক মরা বাড়িতে আমার উপস্থিতি ছিল। মরা বাড়ির দৃশ্য এমনই হয়। তবে মৃতকে মাটি চাপা দেয়ার পর খুব নিরবতা খাঁ-খাঁ করে। চারদিকে যেন একটা টু শব্দ হয় না। গাছের পাতারাও শোকে কাতর হয়ে নিরবে ঝরে। শব্দ করে না। পশু পাখিগুলো শোকে কাতর হয়। কাতর হয় প্রকৃতি। আকাশটা মাতাল হয়ে মাথা ঝুলিয়ে দেয় পূর্ব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণ কিংবা পৃথিবীর চৌকোণে। সব কোলাহল পাশের গ্রামে অভিগমন করে দলবেঁধে। একসময় এ শোক হানা দেয় অন্য কোথাও। শোকের বিশ্রাম নেই। আজ এখনোতো কাল ওখানে। পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে ঘুরে বেড়ায় শোকের দল। তাদের স্থায়ী কোনো আবাসন নেই।



কবরের ভেতর দুইজন আল্লাহ রাসূলের নাম নিতে নিতে মাটি কাটছেন। বাবা বলছেন, এপাশটা একটু সমান করো। ওপাশও। তারপর কিছু সময় নিরবতা আগলে ধরে তাকে। বুকে জড়িয়ে রাখা সাদা কাফনের কাপড় হজ্ব করতে গিয়ে মক্কা শরীফ থেকে এনেছিলেন। নিজেই প্রতিদিন রোদে শুকাতেন। মাঝে মাঝে আতর ছিটাতেন। এ কাপড়ে তিনি বর সাজবেন বলে গর্ব করে বলতেন, আমার নতুন পোশাক আমিই পছন্দ করে কিনেছি। এ পোশাকে বর সাজবো আমি। একবার সেজেছি রঙিন পোশাকে। শেষ বার সাজবো সাদা পোশাকে। সবাই সাদা পোশাকেই সাজে। কারণ পবিত্রতার রং সাদা, সত্য ও সুন্দরের প্রতীক সাদা। হয়তো আল্লাহর পছন্দের রংও সাদা। তাই মানুষের শেষ বিদায়ের পোশাকও হয় সাদা।



আমাকে আর্কিটেকচার বানানোর বড় সখ ছিলো বাবার। পারেন নি। বলা নেই কওয়া নেই একদিন বাবাকে বললাম, আমি সাংবাদিক হতে চাই। সাংবাদিকতা করলে অনেক সম্মান। ইচ্ছে করলে ডিসি এসপি ওসি এমনকি প্রতিটা ডিপার্টমেন্টের প্রধানদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে উঠে। কথা বলা যায়, একজন খেটে খাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে রক্ত চোষা মানুষগুলোর সাথেও। বাবা আমায় না করলেন। বললেন, রক্তচোষা মানুষগুলো হিংস্র, মায়া ও দয়াহীন হয়। ওরা তোর রক্ত খেতেও দ্বিধা করবে না। বাবা তোর সাংবাদিক হওয়ার দরকার নেই । বরং তুই একটা ছোটখাটো চাকুরী নে। অনেক চেষ্টা করেও একটা চাকুরী জোগাড় করতে পারলাম না। স্নাতকোত্তর ডিগ্রি শেষ হয়েছে গত বছর। বাবা শখ করে বিয়ে দিলেন ছাত্রবয়সেই। দুইবছর বাবার ঘাড়ে স্ত্রী সন্তান নিয়ে চলছি। উচ্চ শিক্ষিত হয়ে চাকুরি না পাওয়ার অভিশপ্ত জীবন কেউ কখনোই গ্রহণ করতে চায় না।



বাবাও চায় না আমি বেকার থাকি। বড় ভাই প্রতিষ্ঠিত। ব্যবসা করেছেন। দুই বোন ও দুলাভাইদ্বয় সময়ের সাথে খুব ভালোই চলছেন। শুধু আমাকে নিয়ে বাবার যত টেনশন। অবশ্য টেনশনের চেয়ে অপেক্ষা খুব কষ্ট দেয় বাবাকে। কবে মায়ের কাছে যাবেন এ অপেক্ষা। মাকে ডাক্তার দেখাবার সময় বাবা সাথে যেতেনই। মাঝে মাঝে ডাক্তারের কাছে নিজেই নিয়ে আসতেন। আর ঘুরে ফিরে ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করতেন স্যার ও ভালো হবে তো? একদিনের ভিজিটে ডাক্তার এ কমন প্রশ্নের সম্মুখে কয়েকবার পড়বেন। এটা তিনি নিশ্চিত থাকতেন। তাই ডাক্তার হ্যাঁসূচক মাথা নাড়তেন। চেম্বার থেকে বের হওয়ার সময় দরজায় দাঁড়িয়ে ফের একই প্রশ্ন করতেন বাবা। ডাক্তার একটা মুচকি হাসি দিতেন। বাবা বুঝে নিতেন মা ভালো হয়ে যাবে। অথচ বাবা নিজেও জানেন মারের মরণ ব্যাধি বস্নাড ক্যান্সার হয়েছে। একদিন মা চলে গেলেন।



বন্ধু ফরাস উদ্দিন একবার হজ্বে যাবার সময় বাবার জন্যে কী আনবে জিজ্ঞেস করেছিলেন। বাবা শুধু একটা কাফন আনতে বললেন। বন্ধু হজ্ব থেকে দুইটা কাফন এনে ছিলেন। একটা দিয়েছিলেন মাকে। আরেকটা নিজের জন্যে খুব যত্ন করে রেখেছেন। অবশ্য মাস দুয়ের মধ্যে ওটাও পড়াতে হয়েছে বড় ছেলে সাকিব উদ্দিনকে।



মাকে হারিয়ে বাবা একা হয়ে গেলেন। সন্তান হারিয়ে হলেন পাথর। একবার কবরের কাছে তো আবার বাড়ির উঠোনে। এভাবে চলছে দিন। এমন অস্থিরতা দেখে বাবাকে হজ্বে পাঠানো হয়েছিল মা ও ভাইয়ের মৃত্যুর কিছুদিন পর। হজ্ব থেকে ফেরার পর তিনি আরো উদগ্রীব হয়ে উঠেন। সাথে নিয়ে আসেন নিজের জন্যে কাফন। মৃত্যুর ডাকে সাড়া দিতে তিনি সব সময় প্রস্তুত হয়ে থাকেন। সবসময় কাফনটা সিঁথানের কাছে রেখে দেন। যাতে মৃত্যুর পর খুঁজতে কষ্ট না হয়।



চাকুরি খোঁজার ফাঁকে ফাঁকে কবে যে, সৌখিন সাংবাদিকতা থেকে পেশাদার সাংবাদিক হয়ে উঠেছি বুঝতেই পারিনি। সাংবাদিকতা খুব ভালো একটা জগৎ। এখানে কোনো বিধি নিষেধ নেই। বয়স কিংবা সার্টিফিকেটের ধরা বাঁধা নিয়ম নেই। আত্মীয় হলেতো কথাই নেই। সাংবাদিকতার স শেখার আগে কার্ড পেয়ে যাবেন। অপর কোনো এক আত্মীয়ের কাছ থেকে একটা ক্যামরা চেয়ে নিলেই হলো। যদিও এখন কম দামি মোবাইলেও ভালো ছবি হয়। সেদিন আমার ব্যাচলর বন্ধুর বাসার বুয়া এসে বললো, আঙ্গ কুদ্দুচে সামবাদিক অইচে। হেইগ্গায় এতোদিন লঞ্চঘাড বনরুডি বেচতো। অন সামবাদিক অই গ্যাচে।



বন্ধু, আমার মুখের দিয়ে তাকায় একবার, আবার বুয়ার দিকে। আমি বিব্রত হইনি। কারণ সাংবাদিক হওয়া দোষের কিছু নয়। স্বরবর্ণ ব্যাঞ্জনবর্ণ জেনে সাংবাদিক হতে পারলেতো আরো ভালো। অবশ্য এখন চোর থেকে সাংবাদিক হওয়া যায়, অটো চালক থেকে সাংবাদিক হওয়া যায়, ড্রাইভার কাম স্টাফ রিপোর্টার হওয়া যায়, কার্পেন্টার পেশা থেকে সাংবাদিক হওয়া যায়। শর্ত, স্বরবর্ণ আর ব্যাঞ্জন বর্ণ পারলেই হলো। আর কোনো পেশায় ঠাঁই না মিললেও গণমাধ্যমে একটা অবারিত সুযোগ রেখেছেন কিছু মালিকপক্ষ। এক্ষেত্রে তেল বা স্নেহ দেয়ার দক্ষতা থাকলেতো কোনো কথাই নেই। তেলবাজের কদর বেড়ে যায বহুগুণে। প্যাচার কাছে ঘুঘুর চেয়ে বাদুরের কদর বেশি হবে এটাই স্বাভাবিক। কারণ পেঁচা প্রশংসা পেতে খুব পছন্দ করে আর বাদুর অতিরিক্ত প্রশংসা করতে ওস্তাদ। আর ঘুঘু প্রাপ্য প্রশংসার বেশি তথা মিথ্যা প্রশংসা করতে পারে না।



বাবা খুব অসুস্থ। আমাকে বাড়ি যেতে বারবার ফোন করা হচ্ছে। এদিকে দেশে হঠাৎ শুরু হলো রাজনৈতিক সহিংসতা। প্রতিদিনই পুড়ছে মানুষ। মরছে মানুষ। শত শত মানুষ আহত হয়ে হাসপাতালের বেডে কাতরাচ্ছে। চারিদিকে মানুষের মাংস পোড়া গন্ধ। আন্দোলনে নতুন আবিষ্কার পেট্রোল বোমা। একমাসের মধ্যে মারা গেছে শতাধিক তাজা প্রাণ। তিনমাস ধরে চলছিলো ক্ষমতা বঞ্চিত ও ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতায় টিকে থাকা ও দখলের লড়াই। এমন রাজনৈতিক উত্তাল সময়ে মোটারসাইকেলে চড়ে রাতের বেলায় বাড়ি ফিরছি। হঠাৎ কি হলো আমি বুঝতে পারিনি। মৃত্যুস্বাদ এতো রুক্ষ হয় আগে এর কিঞ্চিত বুঝিনি। একদিকে দেহ পুড়ছে অপরদিকে বাঁচতে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছি। কত কিছুকে ঝাপটে ধরে বাঁচার চেষ্টা করেছি। সব চেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছিল। বারবার মা, বাবা, ভাই বোন, স্ত্রী সন্তানের মুখ চোখের সামনে ভেসে উঠছে। শত চেষ্টা করে শরীরটাকে তুলতে পারিনি। যখন তুলেছি ততোক্ষণে আমি হালকা হয়ে গেছি। ডানা ছাড়া উড়তে পারি। একবার বাবার কাছে আসি, একবার বোনের কাছে কখনো বা ভাই বন্ধুর কাছে। আমায় কেউ দেখে না। আগেই শুনেছি মৃতের আত্মা দেহ দাপন না হওয়া পর্যন্ত উপরে ওঠে না। বিদায় নামাজ শেষ। বাবার পছন্দের সাদা কাপড়ে জড়ানো আমার দেহ। আমাকে পাঠানো হচ্ছে অন্তহীন আখেরি গন্তব্যে...! আমি জড়িয়ে ধরি আমার পৃথিবী। বুক ধড়পড় করছে। গলা শুকিয়ে আসছে। আমার চিৎকার কারো কানে পেঁৗছায় না।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৪২১৫৭৭
পুরোন সংখ্যা