চাঁদপুর । শনিবার ৭ জুলাই ২০১৮ । ২৩ আষাঢ় ১৪২৫ । ২২ শাওয়াল ১৪৩৯
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • কচুয়ায় স্ত্রী হত্যার দায়ে স্বামীকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছে জেলা দায়রা জজ আদালত
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৩৯-সূরা আয্-যুমার


৭৫ আয়াত, ৮ রুকু, মক্কী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


২৯। আল্লাহ এক দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন: একটি লোকের উপর পরস্পর বিরোধী কয়জন মালিক রয়েছে, আরেক ব্যক্তির প্রভু মাত্র একজন তাদের উভয়ের অবস্থা কি সমান? সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানে না।


৩০। নিশ্চয় তোমারও মৃত্যু হবে এবং তাদেরও মৃত্যু হবে।


৩১। অতঃপর কেয়ামতের দিন তোমরা সবাই তোমাদের পালনকর্তার সামনে কথা কাটাকাটি করবে।


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


 


সৎ এবং চরিত্রবান নাগরিক দেশের গর্ব।


-ড্রাইডেন


 


 


 


 


 


 


 


নামাজ বেহেশতের চাবি এবং অজু নামাজের চাবি।


 


 


ফটো গ্যালারি
মায়ের আশীর্বাদ
কবির হোসেন মিজি
০৭ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


অফিসের মুভিং চেয়ারে বসে এখনো কাজে ব্যস্ত রয়েছে নাজির সাহেব। কখন যে বেলা চারটা বেজে গেছে টেরই পাননি। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ব্যস্ততা থেকে কিছুটা স্বস্তি ফিরে পেলো। হাত বাড়িয়ে দক্ষিণের জানালা খুলতেই শেষ বিকেলের সোনালি আলো ভেতরে প্রবেশ করলো। টেবিলে রাখা পত্রিকার পাতায় চোখ বোলাতেই চমকে ওঠেন। আজ মা দিবস! কাজের ব্যস্ততায় এ কথা একেবারেই ভুলে গিয়েছেন তিনি। মায়ের কথা মনে হতেই ভাবনার অতলে ডুবে যান। জীবনের ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে এতগুলো বছর কেটে গেলো। আজও মায়ের চাঁদ বদনখানি দেখা হয়নি। কতদিন হলো মায়ের গলায় জড়িয়ে ধরে পরম মমতায় বলা হয়নি, মাগো তুমি শুধু আমাকে আশীর্বাদ করো। আমি যেনো মানুষের মতো মানুষ হয়ে বাঁচতে পারি। তোমার ভালোবাসা নিয়ে আমি যেনো জীবন যুদ্ধে জয়ী হতে পারি...



পিয়নের ডাকে সম্বিৎ ফিরে পায়।



স্যার আমাকে ডেকেছেন ?



না তো।



নাজির সাহেবের হতাশামাখা মুখ দেখে পিয়ন আর কোনো প্রশ্ন করলো না। তবুও স্যারের মায়া ভরা মুখটি দেখে ভয়ে ভয়ে নিচু গলায় বললো, স্যার এককাপ চা দিবো?



হ্যাঁ চাচা। তবে আদা এবং লেবুর রস দিয়ে একটা লাল চা।



জি্ব স্যার তাই হবে।



পিয়ন পা বাড়াতেই ডেকে বললো, রহিম চাচা, শরীফ সাহেবকে বলবেন একটু একশ দুই নম্বর বেডের রোগীটাকে দেখার জন্য। রহিম চাচা চলে হেঁটে চললো শরীফ সাহেবের উদ্দেশ্যে। শরীফ সাহেবকে খবরটা দিয়েই আদা এবং লেবুর রস দিয়ে রং চা বানাতে চলে যান। কিছুক্ষণ পর নাজির সাহেবের উদ্দেশ্যে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো, স্যার আপনার চা। মনে হয় কিছু একটা বলবেন রহিম চাচা। নাজির সাহেব তার কুচিমুচি দেখেই বুঝতে পারলো রহিম চাচা কিছু একটা বলতে চাইছেন। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন করলো, চাচা কিছু বলবেন?



জি্ব স্যার। কিন্তু বুকে সাহস পাইতেছি না।



আপনি নির্ভয়ে বলুন চাচা।



রহিম মিয়া আমতা আমতা করে বললো, স্যার বেয়াদবি মাফ করবেন। আমি বেশ কয়েক বছর ধরে দেখছি আপনি মাঝে মাঝে কেমন যেনো বদলে যান। বিশেষ করে এই মাসটি এলেই আপনাকে খুব চিন্তিত মনে হয়। আপনি যেনো কি এমন গভীর চিন্তা করেন।



রহিম চাচার কথা শুনে, দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো, চাচা আপনার মা বেঁচে আছে?



না স্যার। গত আট বছর হলো আমার মা মারা গেছেন। আর বাবা এখনো বেঁচে আছেন। বয়স দাঁড়িয়েছে নব্বইয়ের কোঠায়।



জীবন হচ্ছে একটি ঝরাপাতার মতো তাই না চাচা? দেখুন আপনার এত বয়স হয়েছে অথচ আপনার বাবা এখনো বেঁচে আছেন। আমি দোয়া করি বিধাতা আপনার বাবাকে আরো হায়াত দান করুক। আর আমিতো সেই ছোটবেলাতেই বাবাকে হারিয়েছি। আর মা জীবত থেকেও আমার কাছে মৃত।



কী বলছেন স্যার?



হ্যাঁ চাচা, আমার দুঃখের কাহিনী শুনলে আপনিও যে স্পর্শকাতর হবেন। একটা সাজানো সংসার ছিলো আমাদের। বাবা চাকরি করতেন একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে। আমি তখনো পৃথিবীর আলো দেখিনি। মায়ের মুখে শুনেছি বাবার বেতনের টাকা দিয়ে দু বেলা দু মুঠো খেয়ে-পরে হাসি-আনন্দে ভালোই চলতো আমাদের সুখের সংসার। হঠাৎ একদিন বাবা রাগ করে চাকরি থেকে অব্যাহতি নেন। সংসারের দুঃসময়ে আমি পৃথিবীর আলো দেখি। ছোট্ট সংসারের সুখ হারিয়ে যায় নিয়তির দরজা দিয়ে, ভাগ্যের দরজায় প্রবেশ করে দুঃখ। দিনে দিনে অভাব নামের দানব আমাদের সুখের সংসারটাকে গ্রাস করে। বাবা হয়ে ওঠেন আরো চিন্তামগ্ন। তারপর একদিন...



এতটুকু বলতেই নাজির সাহেবের মুখের ভাষা যেনো বন্ধ হয়ে যায়। হাত-পা যেনো খাটো হয়ে আসছে। সমস্ত শক্তি যেনো তার শরীর থেকে হারিয়ে ফেলছে। চোখের অশ্রুতে ভিজে গেছে সমস্ত মুখ।



কান্নার আবডালে রহিম চাচা প্রশ্ন করলো, স্যার আপনার চোখে পানি!



আপনি ভুল দেখছেন চাচা। ওটা পানি নয় আমার মায়ের আশীর্বাদ।



থাক স্যার আর বলতে হবে না। আমি শুধু শুধু আপনার কষ্টের কথা স্মরণ করিয়েছি।



না না চাচা আমাকে যে বলতেই হবে এর শেষ ঘটনা কী? তা না হলে যে আমার বুকের ভেতর আরো কষ্ট চেপে বসবে। তারপর বাবা একদিন সবার অজান্তে গলায় দড়ি দিয়ে দারিদ্তা থেকে একেবারেই মুক্তি নেন। মা প্রায় কেঁদে কেঁদে বলতেন, তুই কপাল পোড়া। জন্মের পর তোর বাবাকে খেয়েছিস্। এই বলে আমাকে ছুঁড়ে ফেলে দিতো। আমি চিৎকার করে কাঁদতাম। আমার কান্না দেখে মায়ের আর সইতো না। শত রাগ হলেও তবুও তো মায়ের মন। মা আমাকে চুম্বন করে আবার বুকে জড়িয়ে নিতো। কত স্নেহ মমতা দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতো আমাকে। গ্রামের এ-বাড়ি ও-বাড়ি ঘুরে ফিরে কাজ করে মুখে খাবার তুলে দিতো। একজজনের সহযোগিতায় একদিন আমাকে গ্রামের একটি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। আস্তে আস্তে আমি জীবন সম্পর্কে বুঝতে শিখি। তখন মা আমাকে বলতো বাবারে জীবন মানেই যুদ্ধ। এ জগতে বাঁচতে হলে তোকে জীবনের সাথে যুদ্ধ করে বাঁচতে হবে। তোকে নিয়েই এখন আমার অনেক স্বপ্ন, অনেক আশা। আমি তোকে আশীর্বাদ করলাম বাবা। তুই পড়ালেখা করে একদিন অনেক বড় হবি। মানুষের মতো মানুষ হবি। জীবন যুদ্ধে জয়ী হয়ে তোর দুখিনি মায়ের চোখের জল মুছে দিবি। দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো নাজির সাহেব। বললো, চাচা সেদিনের মায়ের মুখের কথাগুলো আজ শুধু আমার জীবনে স্মৃতি হয়েই রয়ে গেল। তারপর হঠাৎ একদিন আমি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ি। আমার অসুস্থতায় মায়ের কান্নাকে কারো শান্ত্বনার বাণী হার মানাতে পারেনি। আমাকে সুস্থ করার জন্য জীবনের শেষ সম্বল মায়ের হাতের দুটো বালা বিক্রি করে চিকিৎসার জন্য আমাকে ঢাকায় নিয়ে যান। মায়ের আশীর্বাদে আমি এক সপ্তাহের মধ্যে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠি। বাড়ি ফেরার পথে সদর ঘাটে কখন যে মা চোখের আড়াল হয়ে যায় বুঝতে পারিনি। যে মায়ের সন্ধান আজো আমি খুঁজে পাইনি। বাকি জীবনেও পাবো কি না জানি না। তাই প্রতি বছরের মা দিবসটি আমি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি চাচা।



আর্তনাদের হাহাকারে ছেয়ে গেছে নাজির সাহেবের মুখ। কান্নাভেজা কণ্ঠে বললো, চাচা আজ আমি জীবন যুদ্ধে একজন বিজয়ী সৈনিক। অর্থ, সম্পদ, যশ-খ্যাতি সবই আছে। কিন্তু আমার বুকের ভেতর যে শূন্যতা রয়েছে তা আমি কিভাবে পূরণ করবো? আমার জীবন থেকে যে অমূল্য সম্পদ হারিয়ে গেছে তাকে কি আমার সমস্ত অর্থের বিনিময়ে ফিরে পাবো? পাবো না চাচা। মাতৃত্বের এতটুকু ভালোবাসা। আমি যে আশা নিয়ে বেঁচে আছি, আমার আত্মবিশ্বাস একদিন ঠিকই আমি আমার সে মাকে ফিরে পাবো। আপনি দোয়া করবেন চাচা, আমি যে মায়ের আশীর্বাদে আজ এতবড় হতে পেরেছি , জীবনের শেষ বেলাতে হলেও যেনো সে মাকে আমি ফিরে পাই।



শুক্রবার সরকারি ছুটির দিনে নাজির সাহেব ভাবলো, ফকির শাহর মাজারে যাবেন। কয়েক প্যাকেট আগরবাতি, মোমবাতি দান করবেন মাজারে। তারপর মাজার জিয়ারত শেষে বাবা-মায়ের জন্য দোয়া চাইবেন আল্লাহর দরবারে। গাড়ি স্টার্ট করতেই অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে দুটো জোড়া শালিক চোখে পড়লো। দুটো শালিক একসাথে দেখে মুগ্ধ হলেন নাজির সাহেব। একসময় মা বলতো জোড়া শালিক দেখলে নাকি জীবনে মঙ্গল বয়ে আনে। আজ মায়ের কথাগুলো স্মরণ করে ডানহাতের তালুতে একটা চুমু খেয়ে শালিক দুটোকে সম্মান জানিয়ে ছুটে চললো ফকির শাহের মাজারের উদ্দেশ্যে।



প্রতি শুক্রবার ফকির শাহের মাজারে দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন আসে। সবাই যার যার মতো করে বাবার কাছে দোয়া চায়। কান্নাকাটি করে বাবার কাছে চাইলে মনের বাসনা পূর্ণ হয়। নাজির সাহেব শত শত মানুষের ভীড় ডিঙিয়ে মাজারের সম্মুখে পেঁৗছলেন। আগরবাতি মোমবাতি মাজারে রেখে জিয়ারত শেষে ফিরে যায় গাড়ির কাছে। গাড়িতে পা প্রবেশ করতেই মুহূর্তেই ষাট-সত্তর বয়সী একজন বৃদ্ধা হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো, বাজান এই ব্যাগটা আমনে ভুলে মাজারে রাইখা আইছেন।



বৃদ্ধার পানে অবাক দৃষ্টিতে তাকায়। বৃদ্ধার মাথার চুলগুলো আধাপাকা, কপালে চামড়ার ভাঁজ পড়েছে। হাত পায়ের চামড়াগুলোও মোড়ানো, মুখে মায়াবী ছাপ। নাজির সাহেব অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বৃদ্ধার পানে। দু চোখে আনন্দের অশ্রু টলমল করে বইছে। খুশিতে আত্মহারা হয়ে কান্নাকে আর ধরে রাখতে পারলেন না। আজ পঁচিশ বছর পরেও জন্মধারিণী মাকে চিনতে এতটুকু কষ্ট হয়নি সন্তানের। মাকে পায়ে ধরে সালাম করে শ্রদ্ধা জানালো। জড়িয়ে ধরে বললো, মাগো তুমি কেমন আছো? আমাকে চিনতে পারছো মা? আমি তোমার নাজির।



সন্তানের মুখের কথা শুনে মায়ের শূন্যতায় ভরা বুকটা সুখের আলোয় ভরে উঠলো। মা কেঁদে কেঁদে সন্তানকে বুকে জড়িয়ে নেয়। পঁচিশ বছর পর মা যেনো আজ পৃথিবীর সমস্ত সুখ খুঁজে পেলো তার শূন্য বুকের মাঝে। অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, বাজান তুই মেলা বড় হইছত।



হ্যাঁ মা, এ সবই তোমার আশীর্বাদ। চলো মা বাসায় গিয়ে বাকি কথা হবে। তারপর মাকে গাড়িতে বসিয়ে গাড়ি ড্রাইভ করে সোজা ছুটে চললো বাসার উদ্দেশ্যে...



 



 



 



 



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
১২৪৬৩৬
পুরোন সংখ্যা