চাঁদপুর। শনিবার ১১ আগস্ট ২০১৮। ২৭ শ্রাবণ ১৪২৫। ২৮ জিলকদ ১৪৩৯
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৪০-সূরা আল মু'মিন


৮৫ আয়াত, ৯ রুকু, মক্কী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


৩৬। ফেরাউন বলল, হে হামান, তুমি আমার জন্যে একটি সুউচ্চ প্রসাদ নির্মাণ কর, হয়তো আমি পেঁৗছে যেত পারব।


৩৭। আকাশের পথে, অতঃপর উঁকি মেরে দেখব সূসার আল্লাহকে। বস্তুতঃ আমি তো তাকে মিথ্যাবাদীই মনে করি। এভাবেই ফেরাউনের কাছে সুশোভিত করা হয়েছিল তার মন্দ কর্মকে এবং সোজা পথ থেকে তাকে বিরত রাখা হয়েছিল। ফেরাউনের চক্রান্ত ব্যর্থ হওয়ারই ছিল।


৩৮। মুমিন লোকটি বলল: হে আমার কওম, তোমরা আমার অনুসরণ কর। আমি তোমাদেরকে সৎপথ প্রদর্শন করব।


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


 


পরামর্শ মানুষের কাজে বলিষ্ঠতা আনয়ন করে।


-ভার্জিল।


 


 


মানবতাই মানুষের শ্রেষ্ঠতম গুণ।


 


 


 


 


 


 


 


 


ত্রিভুজ প্রেমের গল্প
আব্দুর রাজ্জাক
১১ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


শিউলি মাথার এলোমেলো চুল গুছিয়ে বেণী বেঁধে স্কুলে যায়। পরিপাটি মেয়ে। বয়স বার-তেরো। ক্লাস সেভেনের ছাত্রী। সুশ্রী, টগবগে, মুখখানা মায়াবী। ছোট্ট এ কিশোরীর মন পরিচ্ছন্ন, লেশমাত্র দুঃখ নেই। হেসে-খেলে পড়াশোনা করে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ায়। বাঁধন ছাড়া পাখির মতোন জীবন। বাড়ির অদূরে স্কুল। স্কুলে ক্লাস শেষে প্রাইভেট পড়ে। তার সাথে আরো তিনজন। রুজী, কুশী, মিঠু। পড়াশোনোয় নিমগ্ন শিউলি শ্রাবণের বর্ষা মানে না। মানে না চৈত্রের কাঠফাটা রোদ্র। রুজী, কুশী, মিঠু না আসলেও শিউলির সরব উপস্থিতিতে শিক্ষকরা অভিভূত। চারজনের দল। এক পরিচ্ছন্ন বন্ধনে তারা দিনে দিনে আরো বেশি কাছে এসেছে। একটি পরিবার মতো এক সুতায় বেঁধেছে তাদের রঙিন স্বপ্ন। স্বপি্নল জীবনের প্রত্যাশায় জাগ্রত চারটি প্রাণ একে অপরের সারথি। ক্লাস, হোমওয়ার্ক, সংস্কৃতি ও ক্রীড়াঙ্গনে তাদের অংশগ্রহণ প্রতিষ্ঠানের সুনাম কয়েক গুণ বেড়েছে। শিক্ষকদের কাছে শিউলি, কুশী, রুজী, মিঠু আদরের চারটি নাম। স্কুলের কাছে মিঠুর বাড়ি। আর কজনের দূরদূরান্তে। অনেক আগের কথা তখন স্কুলের কাছাকাছি কোনো হাটবাজার ছিলো না। মধ্য বিরতিতে ছাত্রছাত্রী মিঠুদের বাড়ি যেতো। আম, জাম, তেঁতুল খেতো। কুশী, শিউলি ও রুজী তাদের বিরতির সময় মিঠুদের বাড়ি সময় কাটাতো। মিঠু মা-বাবার একমাত্র সন্তান। মিঠুর মা কুশী, শিউলি ও রুজীর সমস্ত আবদার পূরণ করে। তার যেনো চারটি সন্তান। মিঠুর ভালবাসায় তারা তিনজন ভাগীদার। ভালো কিছু রান্না হলে তাদের জন্যে তুলে রাখে। ঈদ এলে তাদের জামাকাপড় দেয়। বাড়ির মানুষ এ নিয়ে বদনাম রটাতে দেরি করেনি। মাতৃহৃদয় এমনই ছেলে না থাকলে ছেলের অভাব। আবার মেয়ে না থাকলে মেয়ের অভাবে হৃদয়ে শূন্যতা তৈরি হয়। যেনো তার কিছু নেই। মা-হারা কুশীর প্রতি তহুরার আলাদা টান। মেয়েটি ওদের চেয়ে একটু অন্যরকম। আনন্দ-হাসি-খুশির মধ্যও তার চোখ তার জীবনের কথা বলে, লুকানো বিষাদের কথা বলে। যা একজন মায়ের কাছে লুকানো যায় না। কুশীর এ পৃথিবীতে কেউ নেই। কুশী অনাথ এক ভালোবাসাহীন পৃথিবীর নাম। মায়ের গর্ভে থাকতে বাবাকে হারায়। জন্মের পরে কিছু বুঝে ওঠার আগেই মা। মা শুধু তার কাছে ছবি।



মিঠুর মা তহুরা কুশীর জীবনের সুখ-দুঃখের ভাগী হয়ে গেলো। সমাজের সকল বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে সে আজ কুশীর দরদী। একান্ত আপন। তহুরা কুশীকে নিয়ে অনেক কিছু ভাবে। কুশীর বাড়ি যায়। অসুখ-বিসুখ হলে সেবা যত্ন করে। কুশীকে অভয় দেয়, পৃথিবীতে কুশীর সব আছে। কুশীদের দলের সবাই বড় হয়েছে। ক্লাস ডিঙ্গিয়ে বড় ক্লাসে। এসএসসি পরীক্ষা দিবে।



শিউলি লকলক করে বড় হয়ে গেছে। প্রকৃতির টান তার যৌবনেও হাওয়া লেগেছে। পরিপাটি শিউলি আজ আরো স্মার্ট, আরো চমকপ্রদ তার জীবন ধারা। মনের কোণায় কোণায় উতাল পাতাল করে। পাখির মতোন বাঁধনছাড়া সেই মেয়েটি কারও ভালোবাসার বন্ধনে ধরা পড়তে চায়। তার এই মনের আকুতি কাকে বলবে! বান্ধবীদের! সে আজ ভেবে ভেবে দিশেহারা। মিঠুকে সে জানে, ছোটবেলা থেকে একসাথে চলে। মিঠুর সকল কাজের সাথী। শিউলি অন্য কিছু অনুভব করে। শিউলি ক্লাসের ফাঁকে বা ছুটি হলেই তহুরার কাছে চলে যায়। চাচি বলে ডাকে মেয়ের মতো আগ বাড়িয়ে কাজ করে দেয়। তহুরার তাতে মন ভরে না। তার হৃদয়ে আসন করেছে এক অনাথ মেয়ে। তাকে সে কিছুতে ভুলতে পারে না। তহুরা কুশীকে নিয়ে স্বপ্নের জাল বোনে। একদিন মিঠু ভালোভাবে পাস করবে, বড় চাকুরি করবে। কুশীকে তার ছেলের বউ করে আপন করে নিবে। সমাজের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিবো। এ পৃথিবীতে কুশী একা নয়। তার মা আছে বাবা আছে।



শিউলি যাকে প্রাণের সাথে বেঁধেছে সে বন্ধুত্বের বাঁধনে শিউলিকে বেঁধেছিল সেই প্রথম দেখাতে। তার মনে নতুন কোনো উদ্যম নেই, ভাবনাও নেই। মিঠু একান্তই আবেগহীন, অপ্রকাশিত মানুষ। শিউলি এতো কাছে এসেছে তবু তার নজরে পড়েনি। একসাথে আড্ডা, কাছাকাছি থাকা তবুও মিঠুর চোখ শিউলিকে কেয়ার করেনি। ভালোবাাসার মানুষ কাছে আসে। অথচ শিউলি কোনোভাবে আজও বলতে পারে না। স্কুল পড়া বারো- তেরো বছরের সেই শিউলি যার মনে কোনো দুঃখ ছিলো না, ছিলো না কোনো বিষাদ। আজ তার হৃদয়ে রক্ত ঝরে, চোখের নোনা জলে স্বপ্ন ভিজে যায়। আরো অনেক বসন্ত আগে অথবা শ্রাবণের কোনো ভেজা ভোরে পেয়েছিলো তাকে আজ তা বলা যায় না, বুক ফাটে তো মুখ ফুটে না। মিঠু কি তাকে কোনো দিন ভালোবাসবে না! এমন আশা আর হতাশায় শিউলি পাগলপারা। সে কি কোনোদিন তাকে বলতে পারবে না মনের কথা! শিউলি তাই পণ করেছে কোনোদিন সে নিজে থেকে বলবে কিছু না। শুধু ভালোবেসে যাবে। শিউলি মিঠুকে পাওয়ার আশায় যুদ্ধে নেমেছে। তহুরার কাছে তার নিত্ত আসা-যাওয়া। মিঠুর জন্যে নিয়মিত স্কুলে যাওয়া।



 



শিউলি হারতে চায় না। জীবনের সব প্রান্তে-অলিগলিতে মিঠুর বসবাস। কখনো-কখনো চলার পথের স্মৃতিগুলো শিউলকে ব্যথিত করে। পড়ায় মনোযোগ নেই। বইয়ের পাতায় পাতায় মিঠুর ছবি ভেসে ওঠে। বই বন্ধ করে মিঠুকে নিয়ে ভাবে। ঘুমের ঘরে স্বপ্নে আসে, আবার চলে যায়। শিউলি স্বপ্ন দ্যাখে, 'একদিন বালুর চরে ঘর বাঁধবে।' সেই ঘরে সুখের সীমা থাকবে না। বাঁধনহীন পাখির মতো মিঠুকে নিয়ে উড়ে বেড়াবে। পরের দিন যখন মিঠু সাথে দেখা হয় তখন সব স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়। শিউলি চিঠি লেখে আবার ছিঁড়ে ফেলে। রুজীর মাধ্যমে ঈদের কার্ড পাঠায়। অথচ বলতে পারে না ভালোবাসি। দিনে দিনে শিউলির পৃথিবী ছোট হয়ে আসছে। তার মার শরীর ভালো নেই। বাবাও অসুস্থ। শিউলির জীবন ভালোবাসাহীন শুকনো মরুভূমি। কোথাও শান্তির শীতল পরশ তার ভাগ্যে জোটে না। মা মারা গেছে। হতচ্ছাড়া শিউলির কান্না আজ চিরদিনের সাথে সাথী। একবার ভাবে সবকিছু খুলে বলে দিবে। আবার নিজের কাছে অভিমান করে ভুলে যায়। মা-হারা শিউলির জন্যে বিয়ের প্রস্তাব আসে। বিয়ের ঘটক রোজ তার বাবাকে জ্বালাতন করে। আইএ পড়ুয়া মেয়ে, আবার দেখতেও সুদর্শনা। বিএ পাস, বিকম পাস ছেলে নিয়ে আসে। শিউলির বাবার তাতে সায় নেই। চাকুরীজীবী ছেলের হাতে মেয়েকে দিয়ে নিজে নিশ্চিন্ত হতে চায়। কিন্তু মেয়ের হৃদয়ের হাহাকার কে বুঝবে! পাত্র প্রায় ঠিক ছেলে ঢাকায় বড় চাকুরে। সব দিক সমান। সম্পদের পাহাড় তাদের। শিউলির সমস্ত হৃদয়ে মোচড় দিয়ে ওঠে_ঘর থেকে বের হয়ে যাবে! নাকি মিঠুর কাছে চলে যাবে? সমাজ বাস্তবতা তাকে কি মুক্তি দিবে না? শিউলির মুক্তির সকল পথ বন্ধ হয়ে গেলো। কুশীর বেশ কয়দিন কোনো খবর নেই। চিন্তিত তহুরা কুশীর বাড়ি হাজির। মেয়ের ভীষণ অসুখ দেখে মায়ের মন কেঁদে ওঠে। শরীর কঙ্কাল হয়ে গেছে। মা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে, 'কুশী তুই আমার সাথে চল। তোকে আমার কাছে নিয়ে যাবো, চিকিৎসা করাবো।' কুশী কিছুতেই রাজি হয় না। কুশী বলে, 'মা তোমার ঘরে বড় ছেলে হয়েছে। মানুষ তোমারে খারাপ বলবে। আমার নামে বদনাম রটাবে। আমি চাই না মা এসব হোক।' কুশীর চোখের জল দরদর করে পড়ছে। কুশীর পৃথিবীতে সে কেবল একাই। আজ ক্ষণকালের জন্যে তার সামনে যাকে মা বলেছে সেও তার আপন নয়। তাই এ কান্না চিরদিনের। তার পৃথিবী অন্ধকারাছন্ন। অনিশ্চিত তার পথ ও গন্তব্য। তাই তার কুড়িয়ে পাওয়া মাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেয়া ছাড়া কোনো উপায় তার কাছে নেই। তহুরার মাতৃহৃদয় আজ চরম ব্যস্তবতার কাছে হেরে গেলো। কুশী এক নিশ্চিত সুখের সন্ধন পেয়েও হাত বাড়ায়নি। ভালোবাসার প্রতিদান দিয়েছে নিজেকে বঞ্চিত করে।



তহুরা দিকভ্রান্ত। ছেলেকে বলবে! ছেলেকে বলেই বা কী হবে। কুশী তো তাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিয়েছে। কুশী, শিউলির পড়াশোনো শেষ। কুশী ক্লাস টেন। শিউলি এইচএসসি। রুজী মিঠুর পড়াশোনা কেবল চলছে। একই ক্লাসে। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রেখেছে। পড়াশোনো, আড্ডায় সবখানে দুজনের উপস্থিতি। তারা ধরতে গেলে বাল্যবন্ধু। ক্যাম্পাসে দুজনে দাপিয়ে বেড়ায়। রুজী-মিঠু জুটি বলে সবাই চিনে। অথচ তারা একটি প্রেমের বাক্যও এখন পর্যন্ত ব্যয় করেনি। একে অপরের বন্ধু_এটাই তারা জানে। বান্ধবীদের টিপ্পনী রুজীকে বেশ আহত করে। 'কয় বছর হলো প্রেমের বয়স। কবে বিয়ে করবি। তোকে কেমন ভালোবাসে?' নানান প্রশ্নবাণে রুজীকে জর্জরিত করা হয়। রুজী মিঠুকে অন্যভাবে দেখা শুরু করলো। ক্লাসের শুরুতে মিঠুর সাথে দেখা। সে আজ আর তুই বলে ডাকলো না। তুমি বলে সম্বোধন করলো। মিঠু একটু রোমান্স অনুভব করলো। বন্ধুবান্ধবের মুখরোচক কি সত্যি হবে! যেখানে কিছু ঘটে সেখানে কিছু রটে_এমন ব্যাপার। সুদীর্ঘ বন্ধুত্ব কি প্রেমে গড়াবে? রুজীর সবকিছুতে পরিবর্তন। সে এখন লুকিয়ে চলে। ডানপিটে, উদার ব্যক্তিত্ব সম্পূর্ণ মেয়েটি যে কিনা ক্যাম্পাসে মিছিল-মিটিং আর হৈ-রৈ করে কাটাতো সে আজ লাজুক। সকল কোলাহলকে এড়িয়ে নিস্তব্ধতার দিকে এগিয়ে যায়। কি জানি কী হয়েছে। রুজীর পৃথিবী ওলোটপালট। মিঠু তার কাছে বেশি আসে না। মাঝে মধ্যে ক্যাম্পাসে দেখা এতোটুকই। বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্ব শেষ। রুজী বাড়ি চলে যাবে। তাই মিঠুর সাথে দেখা করার প্রয়োজন। দেখা হলোও। রোজি বললো, মিঠু তোমাকে আমাকে নিয়ে সবাই কতো কিছু বলে। তোমার কি কিছু তাতে বলার নেই? পড়াশোনা শেষ। ক্যাম্পাসে আমি অনেক জ্বালা সয়েছি। আমার আর ভালো লাগে না। কথা বলতে বলতে রুজী উদাস হয়ে গেল। মিঠু কোনো কথা বললো না। একবার ভাবলো, বেশ ভালোই তো! দুজনে উচ্চ শিক্ষিত। কিছু একটা করতে পারবো। ওকে নিয়ে ঘর বাঁধি। স্বপ্নের ঘোরে নিমগ্ন মিঠুর চোখ খুলে দেখে এতো অবাস্তব। মিঠু কিছু না বলেই চলে গেলো।



শিউলির বাবা মেয়েকে আর ঘরে রাখতে চায় না। গ্রাম্য মানুষ শিউলির বয়স নিয়ে কানাঘুষা করে। মেয়ের বয়স হয়েছে এখনো বিয়ে দেয় না। তার বাবাকে মানুষ নানাভাবে জ্ঞান দেয়। আর কিছু ভাবার সময় নেই। বিয়ের সানাই বাজবে। সবকিছু ঠিক। বরযাত্রী এসেছে। সেই রাতে শিউলি বাড়ি থেকে পালিয়ে মিঠুর বাড়ি এসেছে। মিঠু শিউলিকে দেখে নির্বাক। শিউলি, এতো রাতে তুমি? আমার বিয়ে ঠিক



 



হয়েছে। আমার জন্যে কিছু করো। আমি তোমাকে ছাড়া কাউকে ভালোবাসতে পারবো না। মিঠু আমার সব শেষ। আমার আত্মহত্যা ছাড়া কোনো উপায় নেই। মিঠুর শরীর কাঁপছে। কি করবে দিকভ্রান্ত যুবক! অন্ধকার রাতে এ পৃথিবীর কেউ জেগে নেই। কার কাছে যাবে পরামর্শ চাইতে। তাছাড়া সে তো শিউলিকে কোনোদিন ভালোও বাসেনি। তবে বিয়ের প্রশ্নই বা কেন? সবকিছু আশ্চর্য! এ রাতে শিউলির সাথে কথা বলা এক প্রকার অন্যায়, পাপ। শিউলিকে যদি ফিরিয়ে দিই তবে ওরইবা কী হবে! মিঠুর হাতে খুব অল্পসময়। শিউলির জীবনের লালিত স্বপ্ন আজ অফুটন্ত থেকে যাবে! মিঠু শিউলিকে বললো, শিউলি, এখন অনেক রাত। কেউ দেখে ফেললে তোমার-আমার কলঙ্ক হবে। মানুষ কি বলবে। তারচেয়ে তুমি চলে যাও। ভোর হলে তোমার সাথে কথা হবে। মিঠু শিউলির হাতটি নামিয়ে দিলো। এটিই শিউলির জীবনের পরম ও শেষ পাওয়া। শিউলি চোখের জলে ভাসে। অন্ধকারে হাঁটে। বিয়ে বাড়ি শোরগোল পড়েছে। শিউলিকে পাওয়া যাচ্ছে না। বরযাত্রীরা অধৈর্য হয়ে মেয়ের বাবাকে ডেকে গালমন্দ করে চলে গেলো। ভোরে ওড়নায় ফাঁস দেয়া শিউলির মৃতদেহ দেখে গ্রামবাসী হতবাক। কেউ বলে আত্মহত্যা, আবার কেউ বলে খুন, কেউ করে নানা সমালোচনা।



চাচার আশ্রয় থাকা কুশীকে তহুরা কিছুতেই ভুলতে পারেনি। মিঠু পাঠ চুকিয়েছে। এখন বড় চাকুরি পাবে। মা ছেলেকে বিয়া করাবে। পাত্রী তার ঠিক করা। কুশী তহুরাকে যতোই ফিরিয়ে দিক। সে তার অধিকার নিয়ে আবার কুশীর কাছে যাবে। কুশী যে তার ছেলেকে ভালোবাসে। মা হয়ে একটু হলেও টের পেয়েছে। মিঠু উচ্চ শিক্ষিত। সে কি অল্প শিক্ষিত মা বাবা হারা মেয়েটিকে গ্রহণ করবে? যদিও ওরা বাল্যসখী। তহুরা তাও ভাবে। তহুরা সব ঠিকঠাক করে রেখেছে। এবার। ছেলের কাছে বলবে, 'মিঠু, তুই তো কুশীকে চিনিস। ওকে আমি মেয়ের মতো ভালোবাসি। ওকে তোর বউ করে আরো আপন করে নিতে চাই। কি বলিস্ বাবা? মায়ের কথায় মিঠুর মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ার মতো। শিউলির আত্মহত্যা, রুজীর ভালবাসা আজ তার মনে বিষাদ ছুঁয়ে গেছে। মিঠুর কাছে সবকিছু দুর্বোধ্য। নিয়মের বাহিরে। খালি প্রশ্ন কেন এমন হলো। আমি তো এমনটি চাইনি। তবে কি আমার দোষ! শিউলি, রুজী, কুশী তো আমার ক্লাসমেট, বাল্যসখী। তবে কেন এরকম হয়! তবে কি আমি নিঃশেষ হলে এই যন্ত্রণারর অবসান হবে?



তহুরা ধুমধাম করে বিয়ের আয়োজন করেছে। কুশীকে মাতৃকোড়ে এনে এ পৃথিবীকে বলে দিবে, 'কুশী আমার বন্ধন। কুশী আমার মেয়ে। সে আমার পুত্রবধূ। আমার সমস্ত রাজ্যের শাসনভার তার। এ সংসারের চাবিকাঠি তার, আমি কেবল তার ছায়া। এ আনন্দের ছোঁয়া বাড়ি থেকে গ্রামে ছড়িয়ে গেছে। বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক। চিন্তায় নিমগ্ন মিঠু ভাবে, 'শিউলি কেন আত্মহত্যা করেছিলো? আত্মহত্যা কোনো কোনো মুহূর্তে কি মানুষের জন্যে অনিবার্য হয়ে ওঠে? কুশীকে বিয়ে করা কি আমার পক্ষে সম্ভব? রুজীকে কি জবাব দিবো? শিউলির আত্মহত্যার জন্যে তো আমি দায়ী নই। তবে কেন শিউলির ছবি আমার চোখে ভেসে বেড়ায়!



কুশীর বাড়ি যাওয়ার জন্যে সবাই প্রস্তুতি নিচ্ছে। আজ কারো জীবনের প্রাপ্তি মেটানোর সময়। কারো দুঃখের আগুনে পুড়ে খাঁটি হওয়ার দিন। কুশী একটু সুখ চায়, একটু আশ্রয় চায়। চায় কারো বন্ধনের পাখনাতলে নিজেকে লুকাতে। মুক্তির স্বাদ নিতে তবে নিয়ম বড় নিষ্ঠুর, আশা করতে নেই। মুক্তি তো সবাই চায়। কিন্তু এক একজনের মুক্তি তো এক একজনকে ঘিরে। সব বন্দোবস্ত শেষ। মিঠুকে পাওয়া গেলো না। সবাইকে তৈরি হতে বলে সে নিরুদ্দেশ। তহুরা নির্বাক! অশ্রুসজল চোখে গন্তব্যহীন পথের দিকে চেয়ে আছে...



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৭৯১৯১
পুরোন সংখ্যা