চাঁদপুর। শনিবার ১১ আগস্ট ২০১৮। ২৭ শ্রাবণ ১৪২৫। ২৮ জিলকদ ১৪৩৯
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৪০-সূরা আল মু'মিন


৮৫ আয়াত, ৯ রুকু, মক্কী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


৩৬। ফেরাউন বলল, হে হামান, তুমি আমার জন্যে একটি সুউচ্চ প্রসাদ নির্মাণ কর, হয়তো আমি পেঁৗছে যেত পারব।


৩৭। আকাশের পথে, অতঃপর উঁকি মেরে দেখব সূসার আল্লাহকে। বস্তুতঃ আমি তো তাকে মিথ্যাবাদীই মনে করি। এভাবেই ফেরাউনের কাছে সুশোভিত করা হয়েছিল তার মন্দ কর্মকে এবং সোজা পথ থেকে তাকে বিরত রাখা হয়েছিল। ফেরাউনের চক্রান্ত ব্যর্থ হওয়ারই ছিল।


৩৮। মুমিন লোকটি বলল: হে আমার কওম, তোমরা আমার অনুসরণ কর। আমি তোমাদেরকে সৎপথ প্রদর্শন করব।


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


 


পরামর্শ মানুষের কাজে বলিষ্ঠতা আনয়ন করে।


-ভার্জিল।


 


 


মানবতাই মানুষের শ্রেষ্ঠতম গুণ।


 


 


 


 


 


 


 


 


একটি সাদা চিরকুট
কবির হোসেন মিজি
১১ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+

বিড়ালটা সেই কখন থেকেই ফাঁদ পেতে বসে আছে ইঁদুরটাকে ধরার জন্য। শুনেছি বিড়াল নাকি অাঁধারেও চোখে দেখতে পায়। তাই ঘোর অন্ধকারেও ওর শিকারি চোখ মোটেও ভুল করেনি। এক সময় ঠিকই তার ফাঁদে খপ করে ধরে ফেলে ইঁদুরটাকে। ইঁদুর আর বিড়ালের ধস্তাধস্তিতে হঠাৎ শেফালির ঘুম ভেঙে যায়। অাঁতকে ওঠে শেফালি। তার দেড় বছরের মেয়েটাও ঘুম থেকে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। শেফালি অন্ধকারে হাত বাড়িয়ে ঘরে আলো জ্বালানোর চেষ্টা করছে। অন্ধকারে খুঁজে খুঁজে কোনো রকমে বিদ্যুতের সুইচটা অন করতেই বুঝতে পারলো ঘরে বিদ্যুৎ নেই। মেয়েটার কান্না কোনোভাবেই থামছে না। কান্না থামানোর জন্য কত না আহ্লাদি কথা বেরিয়ে আসছে শেফালির মুখ থেকে।

_ও হো কাঁদে না মা আমার। সোনা যাদু লক্ষ্মী সোনা, কাঁদে না মা। ও চাঁদ আয়রে আমার খুকুর কপালে টিপ দিয়ে যাওরে। ও হো কাঁদে না মা আমার কাঁদে না।

শেফালি যতই ঘুমপাড়ানির গল্প আর ছন্দ কবিতা শোনাচ্ছে, কিন্তু মেয়েটার কান্না কোনোভাবেই থামছে না। কান্নার শব্দ আরো জোরে-শোরে বেড়ে চলেছে। পাশের ঘর থেকে শেফালির শাশুড়ির কণ্ঠে ভেসে আসছে, কি গো বউ, মা কী হয়েছে? জুলি এভাবে চিৎকার করছে কেন?

শেফালি মৃদু কণ্ঠে বললো, না মা কিছুই হয়নি। হঠাৎ ঘুম ভাঙলো তো তাই। এইতো এখনই ঠিক হয়ে যাবে। আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন। শেফালি অনুভব করলো ঘরে বিদ্যুৎ না থাকার কারণে প্রচ- গরমে হয়তো মেয়েটা এমন করছে। হাত বাড়িয়ে দক্ষিণের জানালা খুলতেই সুরসুর করে দক্ষিণা বাতাস ভেতরে প্রবেশ করে শেফালিকে মুগ্ধ করে দিলো। আর পূর্ণিমার ভরা জোছনায় শেফালির ঘুম হারিয়ে গেলো কোনো এক অজানা সুদূরে। ততক্ষণে বিড়ালটাও তার শিকার নিয়ে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে পড়লো।

মেয়েটার কান্না অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। শেফালি ওর বুকে হাত চাপড়ে গুনগুন কণ্ঠে কবিতার সুর ধরলো : আমার যাদু জুলি সোনার গুম যে আসে না, চাঁদ মামা দাওগো তুমি আরো জোছনা।

কবিতার গুনগুন শব্দে একসময় মেয়েটা আপোষেই ঘুমিয়ে পড়লো। কিন্তু শেফালির চোখে এক ফোঁটা ঘুম নেই। যৌবনের দারুণ পিপাসায় কাতর হয়ে স্বামীর পথের পানে চেয়ে চেয়ে অপেক্ষায় কেটে যায় তার প্রতিদিন প্রতিটি রাত।

শেফালির স্বামী আবদুল জলিল মিয়া প্রায় আট বছর ধরে রাজধানীর গুলিস্থানে একটা মুদি দোকান দিয়ে বসেছে। ব্যবসা মোটামুটি ভালোই চলছে। ইদানিং হলো দোকানে একটা ফ্রিজও কিনেছে। দোকান দেয়ার প্রথম অবস্থায় জলিল মিয়া একাই দোকানের ব্যবসা চালাতো।

ধীরে ধীরে যখন ব্যবসার একটু উন্নতি দেখলো তখন সে দোকানে দশ-পনের বছর বয়সী একজন কর্মচারী রাখলো। মাসে পনেরশ' টাকা বেতন। ছেলেটা প্রথম প্রথম কয়েক মাস বেশ ভালোই দোকানের ব্যবসা চালাচ্ছিলো। তার আচার আচরণও খুব ভালো ছিলো। তার ব্যবহারে জলিল মিয়া মুগ্ধ হয়ে বিশ্বাস করে ব্যবসার সমস্ত দায়িত্ব তাকে বুঝিয়ে দিয়ে একদিন গ্রামের বাড়িতে কদিনের জন্য বেড়াতে গেলো।

কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই কর্মচারী ছোলেমান তার বিশ্বাসের অমর্যাদা করে ব্যবসার টাকা-পয়সা এবং দোকানের মালামাল চুরি করে উধাও হয়ে যায়। সেই থেকে জলিল মিয়ার দোকানে আর কোনো কর্মচারী নেয়া হয়নি। তাই একা একা ব্যবসার ব্যস্ততার কারণে জলিল মিয়া যেনো দিন দিন ভুলে যাচ্ছে তার স্ত্রী-সন্তানের কথা। তারপরও মানুষ যতই ব্যস্ত থাকুক না কেনো কেউ কি কখনো নিজের স্ত্রী-সন্তানকে ভুলে থাকতে পারে? তাই জলিল মিয়াও পারেনি তার প্রিয় স্বজনকে ভুলে থাকতে।

সারাদিনের ব্যস্ততা সেরে দোকান বন্ধ করে স্ত্রী শেফালির মোবাইল নম্বরে কল করলো। শেফালি ফোন রিসিভ করেই অভিমানী কণ্ঠে বললো, আমাদের কথা বুঝি মনে পড়লো তোমার।

জলিল মিয়া দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো, মনে তো সারাক্ষণই পড়ে। কিন্তু কি করবো বলো, জীবন মানেই তো যুদ্ধ, বাস্তব বড় কঠিন। আর কঠিন জীবনে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও কিছু করা যায় না। যাই হোক শেফালি আমার জুলি মা কেমন আছে?

_ভালো। তুমি কেমন আছো?

_তুমি যতটা ভালো রেখেছো ঠিক ততটাই ভালো আছি।

_এভাবে কথা বলছো যে?

_এর চেয়ে ভালো কথা আর কীভাবে বলবো?

_আমি জানি তুমি আমার উপর অনেক রেগে আছো। তোমার ব্যথাটা আমি বুঝি। আমারও তো খুব ইচ্ছে করে সারাক্ষণ তুমি আর জুলির পাশে থাকতে কিন্তু...।

_থাক কিন্তু কিন্তু বলে আর মিথ্যে ভালোবাসা দেখানোর কোনো প্রয়োজন নেই। যদি আমার মনের ব্যথাই বুঝে থাকো তাহলে আর এভাবে পাষাণের মতো রাজধানীতে পড়ে থাকতে না। যেদিন দূরে কোথাও হারিয়ে যাবো সেদিন তুমি বুঝবে হারানোর শূন্যতা মানুষকে কতোটা যন্ত্রণা দেয়। তখন তুমি তোমার ব্যবসা নিয়ে থেকো।

_প্লিজ লক্ষ্মী সোনা আমার সাথে এতোটা অভিমান করো না। আমি কথা দিলাম আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই আমি গ্রামে আসবো। তখন হৃদয়ের সমস্ত ভালোবাসা তোমাকে উজাড় করে দেবো। যাতে তুমি আমাকে ভুলে না যাও। আজ তাহলে রাখি সোনা_এই বলে লাইন কাটলো জলিল মিয়া।

আজ সন্ধ্যা থেকেই শেফালির মনটা বড় উৎফুল্ল হয়ে আছে। কেন জানি মনের মধ্যে অনেক আনন্দ অনুভব করছে। ইচ্ছে করছে পাখির মতো দুটি ডানা মেলে মুক্ত বিহঙ্গে নিজেকে ওড়াতে। রাশি রাশি স্বপ্নের বীজ বুনে অচেনা অজানা দূরে কোথাও হারিয়ে যেতে। দরজার সামনে এসে বাইরে তাকায় শেফালি। ঘোর অন্ধকারে মিটমিট করে জোনাকিরা আলো ছড়াচ্ছে। জোনাকির আলো দেখে শেফালিরও এই মুহূর্তে ইচ্ছে করছে রঙিন সাজে নিজেকে সাজাতে। তাই আর অপেক্ষা না করে মেয়েটাকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে আধ ঘণ্টা আয়নার সামনে বসে স্নো, লিপিস্টিক, আইভ্রো, আলতা, পাউডার দিয়ে নিজেকে মনের মতো করে সাজালো। কিন্তু এই মুহূর্তে কে দেখবে শেফালির এই সাজসজ্জা? বেশ কিছুক্ষণ আয়নায় নিজের চেহরার দিকে তাকিয়ে নিজের সৌন্দর্য নিজেই দেখে নিলো। হঠাৎ শেফালির মোবাইলের রিংটোন বেজে উঠলো। মোবাইল স্ক্রীনে চোখ পড়তেই দেখলো ইদানীং ধরে যার সাথে শেফালির পরকীয়া প্রেমের সখ্যতা গড়ে উঠেছে সেই জয়ের নাম্বার। শেফালি দু ঠোঁটে একটা মুচকি হাসি টেনে ফোন রিসিভ করেই বলতে লাগলো, ঠিক সময়ে ফোন দেয়ার জন্য ধন্যবাদ।

_কেনো এ কথা বললে?

_কারণ মনে মনে তোমার কথাই ভাবছিলাম।

_এছাড়াও হয়তো অন্য কোনো কারণ আছে?

_হ্যাঁ আছে।

_কী সেটা? দেখি তুমি অনুভব করতে পার কিনা।

জয় কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো, হয়তো নতুন কোনো পোশাক পরেছো।

_না নতুন কোনো পোশাক পরা হয়নি। তবে নিজেকে মনের মতো করে সাজিয়েছি। আর তাইতো এই মুহূর্তে মনে মনে তোমাকে স্মরণ করছিলাম ঠিক সেই মুহূর্তে তুমি ফোন করলে।

শেফালীর কথা শুনে জয় বললো, তোমার কথা শুনে এই মুহূর্তে তোমাকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে।

_তাহলে চলে এসো।

এভাবেই এখন বিভিন্ন সময় শেফালির সাথে জয়ের গভীর ভালোবাসার কথা হয়। এখন আর শেফালি স্বামী জলিল মিয়া এবং তার ফোনের অপেক্ষায় থাকে না। জলিলের প্রতি শেফালির ভালোবাসা যেনো দিনদিন মরে যেতে বসেছে। এখন শুধু সারাক্ষণ তার পরকীয়া ভালোবাসার মানুষ জয়ের ভালোবাসার অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকে।

এভাবে স্বামী এবং জয়ের ভালোবাসর পরশ নিয়ে শেফালীর জীবন থেকে কেটে গেলো আরো দুটি বছর। স্বামীর সংসারে থেকে শাশুড়ির চোখ ফাঁকি দিয়ে এভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম করতে ভালো লাগে না শেফালির। তাই যতদ্রুত সম্ভব একটা কিছু করার তাগিদ দিলো জয়কে। জয়ও তার সংসারের স্ত্রী সন্তান রেখে শেফালীকে বিয়ে করতে প্রস্তুত।

এদিকে আগামী সপ্তাহে জলিল মিয়া রাজধানী থেকে গ্রামের বাড়িতে আসছে। তাই যা কিছু করার আগামী সপ্তাহের আগেই করতে হবে। এ সিদ্ধান্তই ঠিক করে রাখলো দুজন।

দেখতে দেখতে পার হয়ে গেলো সাতটি দিন। আজ রাতেই জলিল মিয়া ঢাকা থেকে গ্রামে রওনা দেবে। ওইদিকে শেফালি এবং জয়ও সবকিছু ঠিকঠাক করে রেখেছে সময় হলেই তারা দুজন ছুটে চলবে নতুন ভালোবাসার গন্তব্যে।

দিন পেরিয়ে রাত হলো। জলিল মিয়া স্ত্রী সন্তান এবং মায়ের জন্য বিভিন্ন জিনিসপত্র নিয়ে রওনা দিলো গ্রামের বাড়িতে। আজ কতদিন পর আবার নতুন করে একসাথে হবে সবাই। স্ত্রী শেফালীর সমস্ত অভিমান ভেঙে দিয়ে হৃদয়ের ভালোবাসা উজাড় করে দেবে। এইসব ভেবে যেনো আনন্দ মনে ধরছে না জলিলের।

চারদিকে পাখির কলতান। পূর্ব দিগন্তে লাল সূর্য উঁকি দিয়ে উঠেছে। মিষ্টি গায়ের ভোর যেনো মুগ্ধ করে দেয়। ততক্ষণে জলিল বাড়ির আঙ্গিনায় পা রাখলো দূর থেকেই স্ত্রী শেফালিকে ডাকতে শুরু করলো। শেফালি এই শেফালি...

কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে ভাবলো হয়তো অভিমান করেছে। দ্রুত পায়ে হেঁটে ঘরের দরজায় পা রাখতেই দেখতে পেলো মেয়েটা একা বিছানায় শুয়ে আছে। শেফালি ঘরে নেই। বেশ কিছু আসবাবপত্র এলোমেলো অবস্থায় পড়ে আছে। টেবিলের ওপর একটা সাদা চিরকুট। জলিল চিরকুটখানা হাতে নিয়ে পড়ে শেষ করে মেয়েটার নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে নির্বাক হয়ে চাপা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো।

আজকের পাঠকসংখ্যা
৭৯০২১
পুরোন সংখ্যা