চাঁদপুর। শনিবার ১১ আগস্ট ২০১৮। ২৭ শ্রাবণ ১৪২৫। ২৮ জিলকদ ১৪৩৯
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • ফরিদগঞ্জের চান্দ্রার খাড়খাদিয়ায় ট্রাক চাপায় সাইফুল ইসলাম (১২) নামের ৭ম শ্রেনীর শিক্ষার্থী ও সদর উপজেলার দাসাদি এলাকায় পিকআপ ভ্যান চাপায় কৃষক ফেরদৌস খান নিহত,বিল্লাল নামে অপর এক কৃষক আহত হয়েছে।
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৪০-সূরা আল মু'মিন


৮৫ আয়াত, ৯ রুকু, মক্কী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


৩৬। ফেরাউন বলল, হে হামান, তুমি আমার জন্যে একটি সুউচ্চ প্রসাদ নির্মাণ কর, হয়তো আমি পেঁৗছে যেত পারব।


৩৭। আকাশের পথে, অতঃপর উঁকি মেরে দেখব সূসার আল্লাহকে। বস্তুতঃ আমি তো তাকে মিথ্যাবাদীই মনে করি। এভাবেই ফেরাউনের কাছে সুশোভিত করা হয়েছিল তার মন্দ কর্মকে এবং সোজা পথ থেকে তাকে বিরত রাখা হয়েছিল। ফেরাউনের চক্রান্ত ব্যর্থ হওয়ারই ছিল।


৩৮। মুমিন লোকটি বলল: হে আমার কওম, তোমরা আমার অনুসরণ কর। আমি তোমাদেরকে সৎপথ প্রদর্শন করব।


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


 


পরামর্শ মানুষের কাজে বলিষ্ঠতা আনয়ন করে।


-ভার্জিল।


 


 


মানবতাই মানুষের শ্রেষ্ঠতম গুণ।


 


 


 


 


 


 


 


 


ফটো গ্যালারি
নতুন সূর্যের সন্ধানে
হানিফ রাশেদীন
১১ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+

মাঝরাতে বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে পড়ল লালবানু, গভীর রাত্রি এবং ঘুমের নিস্তব্ধতা ভেদ করে কিসের যেন গুঞ্জন। মনে হয়েছিল পুলিশ হবে হয়তো, প্রায়ই ওদের পুলিশের আক্রোশের শিকার হতে হয়। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে ঘুমজড়ানো চেখে দেখতে পেল অসংখ্য সেনাসদস্য এবং পুলিশ ও র‌্যাব ছড়িয়ে আছে রাস্তায়; এবং তাদের একেকটি গাড়ি বিকট শব্দে হুইসল বাজিয়ে আসছে-যাচ্ছে। আর কোনো মানুষজনের দেখা নেই, এক ভয়ানক রাত; অজানা আতঙ্কে মোচড় দিয়ে ওঠে বুকের ভেতরটা।

অবশ্য ক'দিন ধরেই লালবানু লক্ষ্য করছিল প্রতিদিন একটার পর একটা মিছিল-মিটিং লেগেই আছে; লাঠিসোটা নিয়ে দু'পক্ষের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া। মানুষের মৌলিক চাহিদা বা প্রতিদিনকার রুটিন খাওয়া-দাওয়ার মতো এ-ও যেন এক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু আজকে এই যে রাত, এরকম সে আর কোনোদিন দেখেনি; উদ্বিগ্ন চোখে ঘুমিয়ে থাকা ছেলেটির দিকে তাকায়, এই ছেলেটিকে ঘিরেই তার জীবন-যত আশা, যত স্বপ্ন আর ভালোবাসা, এবং ভালোবাসার চিহ্ন।

ফুটপাথের দেয়াল ঘেঁষে ওরা ঘুমোচ্ছিল, এখানে থাকার মতো কোনোরকম একটা ব্যবস্থা করে নিয়েছে লালবানু। একসময় কল্যাণপুর বস্তিতে থাকত, ক'বছর হলো সরকার উচ্ছেদ করে দিয়েছে; তারপর থেকে এই অস্থায়ী এবং অনিশ্চিত নিবাস-আজ এখান থেকে কেউ উঠিয়ে দেয় তো কাল ওখান থেকে। ওরা যে কোথায় যাবে কেউ-ই বুঝতে চায় না; পুলিশও উঠিয়ে দেয়, অনেক কাকুতি-মিনতি করার পর কারও একটু দয়া কিংবা করুণা হলো, তো আবার পরের দিন অন্য পুলিশ এসে তাড়িয়ে দেয়।

হঠাৎ প্রচ- শব্দে লালবানুর সারা শরীর কেঁপে উঠে; সাবধানতার সঙ্গে, ছেলেটি যাতে আবার উঠে না পড়ে, ধীরে ধীরে কাঁথা-বালিশ দেয়ালের আরো কাছে গুটিয়ে নেয় এবং দেয়লে পিঠ ঠেকিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে, অনেকটা 'দ' এর মতো হয়ে; যতটা সম্ভব ছোট হওয়া যায়, কেউ যাতে দেখতে না পায়।

না জানি কী হয়! ভীতু ও চোরাচোখে চারদিকে তীক্ষ্ন নজর রাখে লালবানু, চোখের দৃষ্টি যতদূর যায়। একটু দূরেই ডাস্টবিনের পাশে একটি কুকুর ঘুরঘুর করছে।

লালবানুর আতঙ্কগ্রস্ত চোখেমুখে রাজ্যের বিস্ময়; কপালে দুশ্চিন্তার রেখা ফুটে ওঠে-কুকুরটার চেয়েও কেমন অসহায়, কী দুর্গতি... আল্লার উপর বড় রাগ হয় লালবানুর, যা খুশি সে তা-ই করছে ওদের নিয়ে... তার তো খাওয়া-দাওয়ার চিন্তা করতে হয় না, মাথা গোঁজার একটু ঠাঁই পেতে পুলিশের ডা-ার বাড়ি খেতে হয় না... এইসব ভাবতে ভাবতে বুকের গভীরতম তলদেশ থেকে একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।

ওদের সামনে পুলিশের একটি গাড়ি এসে থামে এবং কয়েকজন পুলিশ নামে, নেমে ওদের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। লালবানু কী করবে কিছু বুঝতে পারে না, আল্লাকে স্মরণ করে, সবকিছু ছেড়ে দেয় সে মহান আল্লাতালার ওপর। আসন্ন এ-বিপদ থেকে বাঁচতে নানাভাবে সে আল্লাকে খুশি করতে থাকে; পরিবাগ মাজারে দুই টাকা মানত করে এবং মনে মনে আরও ঠিক করে যে, কোনোদিন আর নামাজ ফাঁকি দেবে না, ঠিকঠাক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বে।

দুই টাকার বিষয়টা তাকে ঠিক সায় দিচ্ছে না, মনের মধ্যে কেমন একটা উসখুস ভাব, দুই টাকা আবার কম হয়ে গেল নাকি! আবার মনে হয়, না, আল্লার কাছে দুই টাকা যা, একশো টাকাও তা। আসল কথা হলো অন্তর থেকে বলা, সে কি অন্তর থেকে বলেছে? না ভয়ে? অন্তর থেকেই বলেছে, তা-ই মনে হয় লালবানুর।

ভয়ানক চটে গেল পুলিশ অফিসার, তিক্তস্বরে বলল, 'ওদেরকে কেন ধরে নিয়ে আসছো? সবকিছু বলে দিতে হয়! এটা তো কমন সেন্সের ব্যাপার, নাকি?'

হতভম্ব হয়ে গেল ওদের ধরে নিয়ে যাওয়া পুলিশের দল, তারা কিছুই বুঝতে পারল না; দ্বিধাগ্রস্ত চোখেমুখে নির্বোধের মতো হ্যাঁ-সূচক মাথা ঝাঁকালো সামনে থাকা একজন, মুখ থেকে কোনো কথা বেরুলো না।

দু চোখে যতদূর সম্ভব করুণ-ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে লালবানু; পুলিশ অফিসারের যদি একটু দয়া কিংবা করুণা হয়!

'ওদেরকে গলির ভেতরে নিরাপদ একটা জায়গায় রেখে আসো,' গায়ে না-লাগানো ভঙ্গিতে বলে, লালবানুর দিকে বিরক্তভাবে তাকালো পুলিশ অফিসার, 'তোমাদের যেখানে রেখে আসবে ঠিক সেখানেই থাকবে, উঠবে না, বুঝেছ? যাও। '

মাথা হেলিয়ে সায় দিল লালবানু।

পুলিশটির পেছনে পেছনে, বাচ্চা ছেলেটিকে কোলে নিয়ে গাড়িতে উঠল সে; চোখেমুখে ছড়িয়ে পড়ল প্রশান্তি আর ভরসার ছাপ এবং পুলিশ অফিসারের জন্য মমতায়, তার মঙ্গল কামনায় বুক ভরে ওঠে; কী মহানুভবতা! কৃতজ্ঞতায় লালবানুর চোখে পানি চলে এলো।

সাধারণ পুলিশ সদস্যদের কেউই বুঝতে পারছে না, কেমন আবছা হয়ে আসছে সবকিছু, কিছুতেই তারা হিসেব মেলাতে পারছে না; মনে হচ্ছে যে, তাদেরকে তো এরকমই অর্ডার দেওয়া হয়েছিল : রাত ১১টা থেকে অনির্দিষ্ট কালের জন্য কারফিউ, কেউ বাইরে থাকতে পারবে না। তো! এছাড়া তারা আর কী করতে পারতো? এটাই কি তাদের করণীয় ছিল না! নিয়মমাফিক তারা তো কেবল অর্ডারটি পালন করেছে। অর্ডারটি মনে করতে থাকে তারা... হ্যাঁ, সব ঠিকই তো আছে, তাহলে? তাহলে ভুলটা কোথায়! দ্বিধাদ্বন্দ্বের গোলোকধাঁধায় ঘুরপাক খেতে থাকে তাদের মনোজগৎ... তাহলে কি ওরা মানুষ না! দেখতে তো অবিকল মানুষের মতোই। তবে চোখের দেখাই সবকিছু নয় ঠিক, এছাড়া আর কীভাবেই-বা বলা যায় যে, ওরা মানুষ কিনা! মানুষ হতে হলে কী কী যোগ্যতা ও গুণ থাকা উচিৎ এবং কী কী থাকতে নেই? মানুষের সংজ্ঞা কী? তারা কি মানুষের সংজ্ঞা জানে? যেমন জানে, পাঠ্যবইয়ে পড়েছে প্রাণীর সংজ্ঞা-প্রাণ থাকলেই প্রাণী; সে-হিসেবে ওরা প্রাণী। কিন্তু মানুষ কিনা তা কীভাবে বলা যেতে পারে! কে জানে ওরা মানুষ কিনা! হয়তো মানুষ, হয়তো মানুষ নয়; না, নিশ্চয়ই ওরা মানুষের পর্যায়ে পড়ে না। স্যার ঠিকই জেনে থাকবে, ওরা যদি স্যারের মতো অফিসার হতো তাহলে ওরাও হয়তো বুঝতো মানুষ আর অমানুষের পার্থক্য।

পুলিশ অফিসারের দেয়া আশ্বাসে পুরোপুরি স্থির হতে পারছে না লালবানু; আকাশ-পাতাল ভাবনাচিন্তায় উতলা হয়ে উঠছে সমস্ত মন-এই পুলিশরাই-বা তাকে ঠিক কোথায় নিয়ে যাচ্ছে! পুলিশ অফিসারের প্রতিও সন্দেহের একটু আভাস উঁকি দিচ্ছে মাথায়; সে আবার হঠাৎ এত দরদ দেখাল কেন? ওরা যে কী! ওদেরকে তো হাড়ে-হাড়ে জানা আছে। কোনো মতলব নেই তো আবার! কোনো কুমতলব? ওরা ধরেই-বা নিয়ে গেল কেন? আবার ছেড়েই-বা দিচ্ছে কেন? কিছুই বোঝা যাচ্ছে না! আজ রাতের এমন অবস্থাই-বা কেন? ছেলেটি হঠাৎ নড়ে উঠলে, কিছুটা ঘাবড়ে যায় লালবানু, ঘুম ভেঙে গেলে আবার কান্নাকাটি শুরু না করলে হয়!

না, শেষমেশ ভালোয় ভালোয় সবকিছু শেষ হলো। এবং নতুন করে আবার পায়ের তলায় মাটি খুঁজে পেলেও (ওরা যেখানে ছিল, সেখান থেকে ওদের কাঁথা-বালিশ আর দু-চারটা হাঁড়ি-পাতিল যা ছিল, পুলিশ সব গাড়িতে করে ওদেরকে ভেতরের দিকে একটি গলির ভেতরে রেখে গেছে) স্থির হতে পারছে না লালবানু, কবে যে পুনর্বাসন হবে! ওদের যে পুনর্বাসনের কথা ছিল তার আর নামগন্ধও নেই! মনে পড়ে ছেলেটির বাবার কথা, নদী ভাঙ্গনে সব হরানোর কথা... রাজ্যের ভাবনাচিন্তায় এই নতুন জায়গায় নতুন করে লালবানুর আর ঘুম আসছে না, কতকিছু যে ভনভন করে মাথার ভেতর!

এখন রাত-বা আর কতটুকু বাকি কে জানে! একসময় লালবানুর অসহায় দু'চোখ বারবার ঘুমে ঢুলে পড়ে এবং যাপিত-জীবনের সমস্ত অন্ধকার ছাপিয়ে ঘুমে জড়িয়ে আসা চোখে দেখতে পায় একটি ফলবতি গাছ। ফলের ভারে গাছটি মনে হচ্ছে যে এখনই ভেঙে পড়ে যাচ্ছে, কিন্তু পড়ছে পড়ছে করেও শেষমেশ পড়ছে না; অবাক হয় লালবানু। পরক্ষণে আবার মনে হয়, কেন পড়বে? এ-তো যেনতেন গাছ নয়, বেহেস্তের গাছ বলে কথা; এক উজ্জ্বল আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠে সে। বুকের ভেতর একটু একটু করে জমাট বাঁধা এতদিনের চাপা কষ্টগুলো মিলিয়ে যেতে থাকে সেই আলোয়। হঠাৎ প্রচ- এক ঝাপটায় গাছটি পড়ে যায় ছেলেটির গায়ের উপর, কেঁদে ওঠে ছেলেটি। হাউমাউ করে উঠে বসে লালবানু।

ছেলেটি কাঁদছে, হাত-পা ছুঁড়ে কাঁদছে ছেলেটি, কাঁদুক। হাউমাউ করে কেঁদে উঠেই কেমন যেন হয়ে যায় লালবানু অথবা কী যেন মনে হয় তার, না যেন অতি শোকে পাথর; ভাবলেশহীন চোখে মূর্তির মতো তাকিয়ে আছে সে আর কেঁদেই চলে ছেলেটি। কাঁদুক। লালবানু এবার তাকায় বিপরিত দিকের দেয়ালে, একটি পোস্টার দেখা যায়। পোস্টারটির উপর দিকে এক কোনায় একটি সূর্য অাঁকা আর নিচে দেখতে ঝাপসা এমন অসংখ্য মানুষ, উপরে মুষ্ঠিবদ্ধ হাত তুলে সূর্যের দিকে এগিয়ে চলছে, একেবারে নিচে লেখা 'নতুন সূর্যের সন্ধানে'। এবার লালবানু ফিরে তাকায় ছেলেটির দিকে, তাকিয়ে থাকে, দেখে, আর কোনোদিন বুঝি দেখেনি সে তার ছেলেটিকে। কখন যেন ওর তাবিজটি ছিঁড়ে পড়ে আছে, একদিন কিসে যেন ভয় পাওয়ায়, পরিবাগ মাজার থেকে একটি তাবিজ এনে ওর গলায় পরাণ হয়। লালবানু সেটি তাগা থেকে খুলে ছুঁড়ে ফেলে দেয় আর তাগাটুকু রেখে দেয় বালিশের নিচে-কত সময় কত বাঁধাছাঁদার কাজে লাগে।

আজকের পাঠকসংখ্যা
৮২৬৪৩১
পুরোন সংখ্যা