চাঁদপুর। শনিবার ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮। ৩১ ভাদ্র ১৪২৫। ৪ মহররম ১৪৪০
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • --
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৪১-সূরা হা-মীম আস্সাজদাহ,

৫৪ আয়াত, ৬ রুকু, মক্কী

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

২৯। কাফিররা বলবে : হে আমার প্রতিপালক! যেসব জি¦ন ও মানব আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল তাদের উভয়কে দেখিয়ে দিন, যাতে তারা নি¤œ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হয়।

৩০। নিশ্চয়ই যারা বলে : আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, অতঃপর অবিচলিত থাকে, তাদের নিকট অবতীর্ণ হয় ফেরেশ্তা এবং বলে : তোমরা ভীত হয়ো না, চিন্তিত হয়ো না এবং তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তার সুসংবাদ পেয়ে আনন্দিত হও।

দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন



 


বন্ধু অপেক্ষা শত্রুকে পাহারা দেওয়া সহজ।

-আলকমেয়ন।




যে ধনী বিখ্যাত হবার জন্য দান করে, সে প্রথমে দোজখে প্রবেশ করবে।



 


ফটো গ্যালারি
জলের সংসার
সোহেল নওরোজ
১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+

আজ আনিতার বিয়ে। ধুমধাম করেই বিয়েটা হচ্ছে। এ উপলক্ষে বাড়িতে আয়োজনের কমতি নেই। বিয়ে নিয়ে আনিতাকে বড় ধরনের সুখস্মৃতি উপহার দিতেই এতো এন্তেজাম। ওর ছেলেমেয়ের কাছে আজকের দিনের গল্প করে যদি কখনও আনন্দ পায়, তাতেই আমার সুখ। অথচ মাসখানেক আগেও পরিস্থিতি এমন সহজ এবং এতটা অনুকূলে ছিলো না। আরেকটু হলেই এলোমেলো হয়ে যেতো সব। আনিতার চোখে-মুখে ভয়, সঙ্কোচ আর সংশয় দেখে কিছুটা অাঁচ করেছিলাম। ভাগ্যিস্, বরাবরের মতো আমার ওপর বিশ্বাস রেখে সব খুলে বলেছিলো।

আবীর নামের যে ছেলেটাকে আনিতা ভালোবাসে তাকে তখনও চিনতাম না। তবে ও আশ্বস্ত করেছিলো আবীরকে আমাদের অপছন্দ হবে না। আমিও ওকে নিশ্চয়তা দিয়েছিলাম শুভ পরিণয়ের জন্যে যা কিছু করার দরকার করবো। ওদের প্রেমকে পরিণতি দিতে আমার তাড়নাও কম ছিলো না! অথচ ওদের নাকি ধারণা ছিলো এই পরিবারের কেউ এ বিয়েতে রাজি হবে না। সম্পর্কটাকে পরিণতি দিতে হবে নিজেদেরই! অর্থাৎ পালিয়ে বিয়ে! আমি থাকতে তা হতে দেবো কেনো? এ একমাসে আমাকে অনেককিছুই করতে হয়েছে। দুই পরিবারের অভিভাবকদের ভেতর থেকে 'প্রেম করা ছেলেমেয়ের বিয়ে দেবো না' মনোভাব দূর করাই ছিলো বড় চ্যালেঞ্জ। সে চ্যালেঞ্জে জয়ী হয়েছি বলেই সব বাধা দূর হয়ে আজ ওদের বিয়েটা হচ্ছে।

মানুষের জীবনে এমন কিছু সময় আসে যখন আস্থা করার মতো কাউকে খুব প্রয়োজন হয়। বুকের জমাটবাঁধা কথাগুলো বলতে পারলে একটু স্বস্তি মেলে। যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে একসময় আমাকে যেতে হয়েছে, আমার মেয়েকেও সে কঠিন পরিস্থিতিতে ঠেলে দিতে পারি না। ওর পছন্দে কিছু কমতি থাকলেও তাই দ্বি-মত করতাম না। হয়তো একটু সময় দিতাম। তারপরও দুজনকে মিলিয়ে দেয়ার মূল দায়িত্বটা নিজের কাছেই রাখতাম। এ যে আমার অনেক দিনের দায় মেটানোর উপলক্ষ!

*২.

পঁচিশ বছর আগের শ্রাবণের এক রাতে আমার জীবনের গল্পটাই বদলে যায়। আশা-আশঙ্কায় দুলতে থাকা সে সময়ের দিকে তাকালে এখনও বুকের ভেতরে শোরগোল করে ওঠে, রক্তের স্রোত স্তিমিত হয়ে যায়। শফিক তখন সবে পড়ালেখা শেষ করেছে। টিউশনি করে আর কোচিংয়ে ক্লাস নিয়ে যা পায় তা দিয়ে কোনোমতে নিজের খরচ চালায়। ভালো একটা চাকুরির জন্যে দিন-রাত পরিশ্রম করছে। আমার পড়ালেখাও শেষের পথে। বাড়ির সদস্যদের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে আমার বিয়ে। এমনও দিন গেছে, একাধিক পাত্রের সামনে গিয়ে আমাকে বেণি করা চুল খুলে, দাঁত বের করে হেসে এবং খালি পায়ে হেঁটে দেখাতে হয়েছে। আমার জন্যে অস্বস্তিকর হলেও সামাজিকতার প্রকোষ্ঠে থেকে প্রতিবাদস্বরূপ টুঁ শব্দ করতে পারিনি। অনীহা সত্ত্বেও নীরবে মেনে নিয়েছি যাবতীয় নিয়ম। কেবল একটাই প্রার্থনা ছিলো, শেষপর্যন্ত শফিকের সঙ্গেই যেনো বিয়েটা হয়।

মনের কথা মুখে বলতে না পারার অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে দিন কাটতে লাগলো। একেকটা পাত্রপক্ষ বিদায় হয় আর মাথার ওপর থেকে একটা করে পাথরখ- নেমে যায়। কিন্তু এভাবে খুব বেশিদিন যাবে না বুঝতে পেরেই শফিককে রাজি করাই বাবা-মায়ের সামনে এসে দাঁড়াতে। মৃদু আশা ছিলো অন্তত কেউ না কেউ আমাদের পাশে দাঁড়াবেন, সম্পর্কটাকে মেনে নেবেন। এখনই না হোক, শফিককে হয়তো আরেকটু সময় দেবেন ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্যে। এর মধ্যেও ঠিকই একটা ব্যবস্থা করে ফেলবে।

সময় আমাদের পক্ষে ছিলো না। ভাগ্যও প্রবঞ্চনার খেলা খেল্ছিলো। তা না হলে শফিকের মুখের সামনে আমার পরিজনেরা সরাসরি ওভাবে 'না' বলে দিতো না। প্রেমের বিয়েতেই তাদের যতো আপত্তি। এটা হলে নাকি তাদের সম্মানের কিছু আর অবশিষ্ট থাকবে না! বহু কষ্টে কান্না সামলেও যখন আমাদের বাড়ি ছেড়ে যাচ্ছিলো, খুব ইচ্ছে করছিলো দৗড়ে গিয়ে আমি ওর হাত চেপে ধরি। দু'জন একসঙ্গে এ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। নিজেদের মতো করে সংসার সাজাই। তখন পারিনি। তবে এসব অযাচিত নিয়ম আর মানবসৃষ্ট সামাজিক বলয়ের বিরুদ্ধে মনের ভেতরেই ক্ষোভ তৈরি হয়েছিলো। প্রকাশের উপায় ছিলো না।

নিজের সঙ্গে যুদ্ধ বেশিদূর চালিয়ে নেয়া যায় না। আমিও পারলাম না। শ্রাবণের সেই ঝুম বৃষ্টির রাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম। একটা ছাতা আর সামান্য ক'টা টাকা ছাড়া সঙ্গে আর কিছু ছিলো না। বাইরে কোনো গাড়ি না পেয়ে হাঁটতে লাগলাম। সেই প্রথম নিজের ভেতর অজানা এক পেলব অনুভব করেছিলাম। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটাগুলোকেও মুক্তোদানার মতো লাগছিলো। পায়ের তলায় বয়ে যাওয়া পানির স্রোত যেনো নতুন কোনো কবিতা লিখে চলেছে! রাতের অন্ধকারকে মনে হচ্ছিলো বড্ড আপন। শফিক যেখানে থাকতো সেখানে পেঁৗছাতে আধা ঘণ্টার মতো লাগে। বৃষ্টি সত্ত্বেও তার আগেই সেদিন সেখানে পেঁৗছে গিয়েছিলাম। আমাকে দেখে শফিক কতটুকু চমকে যাবে আর কতটা খুশি হবে তার হিসেব করতেই পথটুকু ফুরিয়ে যায়।

ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে শফিকের রুমের সামনে যাই। কিন্তু আমাকে এমনভাবে হতাশ হতে হবে তা কল্পনাতেও ছিলো না। ওর রুম তালাবদ্ধ। তখন মুঠোফোনের সময় নয়। যোগাযোগের সহজ কোনো মাধ্যম ছিলো না। এ অবস্থায় অন্য কোথায় যাওয়ারও উপায় ছিলো না। রাতটুকু দরজার বাইরে কাটিয়ে দেবো বলে ভাবছি এমন সময় শিহাব এসে হাজির হয়। ও আমাদের সঙ্গে পড়তো। থাকতো শফিকের পাশের রুমে। ঘটনার কিছুটা হয়তো শফিকের মুখ থেকে শুনেছিলো, আমার কাছ থেকে পুরোটা শুনে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। ভালোবাসার তীব্রতা বুঝতে ওর সময় লাগে। তবু নিজেকে সামলে ওর রুমেই আমার থাকার ব্যবস্থা করে। ও বাইরে কোথাও কাটায় সারাটা রাত।

পরদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই শফিকের কাছে নিয়ে যায় শিহাব। আমাকে এভাবে দেখে শফিকের বিস্ময়ের সীমা থাকে না। আমার সাহস ওর কাছে হঠকারিতা বলে মনে হয়। এমন কিছু করবো তা ওর কল্পনাতেও ছিলো না। অথচ আমরা দু'জনে একসময় পালিয়ে বিয়ে করার কথাও ভেবেছিলাম! ও কি সেসব ভুলে গেছে? আনন্দের বদলে ওর চোখে বিরক্তি প্রতিভাত হয়। শফিকের এ বদলে যাওয়ার কারণ কি আমার পরিবারের সেদিনের আচরণ, নাকি অন্য কিছু? আমি আর ভাবতে পারি না। উপেক্ষার দৃষ্টি সহ্য করে প্রিয় মানুষের সামনে বসে থাকা যায় না। আমিও অজানার উদ্দেশ্যে পা বাড়াই। শফিক বাধা দেয় না। নিজের ভেতরে পাহাড় ভাঙার শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাই। আমি চূড়ান্তভাবে অসহায় হয়ে পড়ি। ভাবনাগুলো ক্রমশ জট পাকিয়ে যায়। জীবন আমাকে সবচেয়ে বড় পরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়।

শিহাব পাশে না দাঁড়ালে হয়তো সেখানেই থেমে যেতো জীবন। আজকের এদিন আসতো না। ও তা হতে দেয়নি। আমাকে ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস জুগিয়েছে। নতুন করে জীবন সাজানোর শক্তি ফিরে পেতে কিছুটা সময় লেগেছে। এ সময়টাতে সবরকম সাহায্য করেছে শিহাব। যখন বুঝে গেছি, জীবনের সঙ্গে এখনও অনেক বোঝাপড়া বাকি, তখন আর পেছনে ফিরে তাকাইনি। সর্বোচ্চ চেষ্টা করে গেছি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে। একটা ভালো চাকুরি জুটে গেলে আস্তে আস্তে চারপাশ বদলে যেতে থাকে।

একদিন শফিক এসে ওর সেদিনের আচরণ আর অপারগতার জন্যে ক্ষমা চেয়ে পুরানো সম্পর্কটাকে পরিণতি দেয়ার কথা জানায়। আমি ওকে কোনো সুযোগ দিই না। সরাসরি 'না' বলে দিই। এই 'না' ওর প্রাপ্য ছিলো। শফিক ফিরে যাওয়ার পর বিয়ে নিয়ে চিন্তাটা আবার মাথায় আসে। বাকি জীবনের জন্যে শিহাব ছাড়া অন্য কাউকে ভাবতে পারি না। শিহাবও তাতে অমত করে না। অল্পদিনের মধ্যেই শুরু হয় আমাদের যৌথজীবন।

*৩.

আনিতা চলে যাচ্ছে। ওর হাতে আবীরের হাত। এমন একটা দৃশ্য দেখার বড় সাধ ছিলো। আনিতার মধ্যে নিজেকে দেখতে পাচ্ছি। যাকে নিয়ে স্বপ্ন সাজিয়েছিলো তার সঙ্গে ঘর বাঁধার তৃপ্তি ওর সঙ্গী। এমন জীবন আমারও স্বপ্নে ছিলো, ভাগ্যে ছিলো না। আজও বাইরে মুষল বৃষ্টি। এমন এক রাতেই ঘোর অনিশ্চয়তাকে সঙ্গী করে আমিও ঘর ছেড়েছিলাম। আনিতার মতো একটা সংসারের চাওয়াতেই পা বাড়িয়েছিলাম, উদ্দেশ্য এক হলেও দু'জনের পরিস্থিতিতে কত বৈপরীত্য! প্রকৃতি কার জীবনের গল্প কীভাবে লিখে রেখেছে কেউ জানে না। আচমকা দিনপঞ্জিরদিকে চোখ পড়তেই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে।

আজ ২০ শ্রাবণ! মনে পড়ে যায়, পঁচিশ বছর আগের সে রাতের কথা। সেদিনও ছিলো শ্রাবণ মাসের ২০ তারিখ!

আজকের পাঠকসংখ্যা
৭১৯১১
পুরোন সংখ্যা