চাঁদপুর। শনিবার ৬ অক্টোবর ২০১৮। ২১ আশ্বিন ১৪২৫। ২৫ মহররম ১৪৪০
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৪২-সূরা শূরা

৫৪ আয়াত, ৫ রুকু, মক্কী

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

২১। তাদের কি এমন কতকগুলো শরীকও আছে যারা তাদের জন্যে দ্বীনের এমন বিধান প্রবর্তন করেছে যার অনুমতি আল্লাহ দেননি? ফায়সালার ঘোষণা না থাকলে তাদের বিষয়ে তো সিদ্ধান্ত হয়েই যেতো। নিশ্চয়ই যালিমদের জন্যে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।  

দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন

 


মনে মনে সব মানুষই কবি।      


-ইমারস।


মানুষ মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত হবার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে (যাচাই না করে) তাই বলে বেড়ায়।



 


ফটো গ্যালারি
আজাদের বৃক্ষপ্রেম
কবির কাঞ্চন
০৬ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


 



স্কুল থেকে এইমাত্র বাড়ি ফিরেছে আজাদ। আজ খুব কষ্ট করে ক্লাস করতে হয়েছে তাদের। ক্লাসের পুরো সময়টা তাদের চরম অস্বস্তিতে কেটেছে। ক্লাসে ঢুকতেই কারেন্ট নেই। এই গরমের দিনে কারেন্ট না থাকলে কি চলে! চলে না। ক্লাসরুমের তুলনায় শিক্ষার্থী সংখ্যা বেশি। তাছাড়া আশপাশে কোনো গাছগাছালিও ছিলো না। এ সময় আজাদের বাড়ি আসতে খুব ইচ্ছে করছিলো। তার প্রিয় সেগুন গাছটার নিচে বসে মুক্ত বাতাসে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে ইচ্ছে করছিলো। সেগুন গাছের পাতা মাটিতে বিছিয়ে শীতলপাটি তৈরি করে উচ্ছলআনন্দে হারিয়ে যাবার দৃশ্য মনে পড়ে তার।



আজাদ ভাবতে লাগলো, পাখার বাতাস আর শাখার বাতাসে যোজনযোজন পার্থক্য। পাখার বাতাস তার কাছে মন্দের ভালো। কিন্তু শাখার বাতাস তার কাছে সবচেয়ে ভালো। শাখার বাতাস যখন গায়ে লাগে তখন তার মনে হতে থাকে যেনো মায়ের কোমল পরশ তার দেহমন শীতল করে দিচ্ছে।



বাড়ি এসে স্কুলব্যাগটা পড়ার টেবিলের ওপর রেখে এক দৌড়ে সেগুন গাছটার নিচে চলে আসে আজাদ। তারপর চোখ দুটো বন্ধ করে হাত দুটো দুদিকে প্রসারিত করে বেশ ক'বার দম নেয়। এ সময় তার মন থেকে স্কুলের সব কষ্ট দূর হয়ে যায়। দুনিয়ার বুকে সে যেনো স্বর্গ খুঁজে পায়।



স্কুলে-বাড়িতে কিংবা খেলার মাঠে আজাদের অনেক বন্ধু আছে। আজাদ তাদের সাথে পড়ে, কথা বলে, আনন্দে খেলে। কিন্তু কারো সাথে তার একটু মনের মিল না হলে অমনি প্রিয়বন্ধুও তার সাথে অচেনা মানুষের মতো আচরণ করে বসে। স্বার্থ বুঝে সময়ে কেটে পড়ে। কখনও কখনও শুধু এই বন্ধুদের খপ্পড়ে পড়ে তো কারো কারো জীবনও নষ্ট হয়ে যায়।



আজাদ আবার ভাবে, অথচ এই সেগুন গাছটি আমার-আমাদের কাছে কখনও কিছু চায়নি। সবসময় অকৃত্রিমভাবে দিয়েই গেছে। আজাদের মনে হতে থাকে, ওকে না পেলে সেগুন গাছেরও ভালো লাগে না। ও যখন গাছটির কাছে আসে অমনি গাছের শাখা-প্রশাখা কিংবা পত্রপল্লব অপার সুখে দোলতে শুরু করে। সেই মধুর দোলন দেহমন জুড়িয়ে আরো আপন করে নেয় আজাদকে। একাকী নির্জনতাও আজাদের কাছে মোটেও একা বলে মনে হয় না। আজাদদের গাঁয়ের জমিদার একদিন সে পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। খুব রোদ পড়লে তিনি একটু বিশ্রাম নিতে সেগুন গাছটির নিচে বসলেন। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে তার সমস্ত ক্লান্তি-অবসাদ দূর হয়। ফুরফুরে ভাব আসে তার। এমন সময় ওপর থেকে কিছু একটা জিনিস এসে পড়ে তার মাথায়। তিনি বামহাত দিয়ে তা এনে দেখেন। কাকের মল! মুহূর্তে তিনি নাক কুঁচকে এদিক-ওদিক তাকিয়ে লজ্জা পান। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আজাদ খিলখিলিয়ে হাসছে। আজাদ জমিদারকে চিনতে পারেনি। জমিদার রাগতকণ্ঠে আজাদকে কাছে ডেকে বললেন,



-এই ছেলে, তোমার বাবার নাম কি?



-আব্দুল কাইয়ুম (ভুলু)।



-ওহ্! তাহলে ভুমি ভুলুর ছেলে। তোমার বাপ তো ভালো মানুষ। কিন্তু তুমি কীভাবে এমন বেয়াদব হলে!



মুহূর্তে আজাদের হাসিমাখা মুখখানা কালো হয়ে গেলো।



জমিদার আবার বললেন,



-তুমি কি আমাকে চিনো না?



আজাদ বুদ্ধি খাটিয়ে বললো,



-না, আমি আপনাকে চিনতে পারিনি। কে আপনি?



আজাদের উত্তর পেয়ে জমিদার আবার লজ্জিত হলেন। এরপর আজাদকে কাছে ডেকে কোমল গলায় বললেন,



-তো বাবা, তোমার নাম কী? তুমি কোন ক্লাসে পড়ছো?



-আজাদ। ক্লাস ফোরে।



জমিদার হাসিমাখা মুখে বললেন,



-মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করো। যারা মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করে তারাই জীবনে সহজে উন্নতি করতে পারে।



আজাদ মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে লজ্জিত হয়। সে মনে মনে ভাবতে থাকে,



-আহা! এ আমি কেমন আচরণ করেছি। লোকটা কত ভালো! অথচ আমি তার সাথে সুন্দর করে কথা বলিনি।



জমিদার আবার বললেন,



-আজাদ, তোমার বাবাকে একটু ডাকবে?



-জি্ব, আমি আব্বুকে ডেকে নিয়ে আসছি।



 



এই কথা বলে আজাদ বাসায় ফিরে আসে। জমিদারকে সামনে দেখে আজাদের বাবা বললেন,



-আপনি! এদিকে কখন এসেছেন?



-এই, ঘণ্টাখানেক হবে। এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম। খুব রোদ পড়ছিলো। তোমার সেগুন গাছটার নিচে বসে শান্তি পেলাম।



-চলুন ঘরে গিয়ে বসে কথা বলি।



-না, থাক্। আর ঘরে যাবো না। এখন শোন, যেজন্যে তোমাকে ডেকেছি তা হলো-তোমার এই গাছটা আমার খুব ভালো লেগেছে। আমি এই গাছের কাঠ দিয়ে ঘরের জন্যে কিছু আসবাবপত্র বানাতে চাই। তোমার কোনো আপত্তি না থাকলে আমি গাছটির উপযুক্ত মূল্য দিয়ে কিনতে চাই। কী! তোমার কোনো আপত্তি আছে কি?



আজাদের বাবা মুখে হাসি এনে বললেন,



-না, আপত্তি থাকবে কেনো? আমার গাছটি আপনার পছন্দ হয়েছে। এটা তো আমার জন্যে খুশির খবর। আজাদের বাবার এমন মন্তব্যে জমিদার খুব খুশি হলেন। এরপর এক হাজার টাকার একখানা নোট তার হাতে গুঁজে দিয়ে বিদায় নিয়ে আপন গন্তব্যে চলে গেলেন। আজ আজাদের খুব মন খারাপ। সে মায়ের কাছে জেনেছে, তার প্রিয় সেগুন গাছটি জমিদারের কাছে বিক্রি করা হয়েছে। এই খবর শোনার পর থেকে কিছুই ভালো লাগছে না তার।



সন্ধ্যায় পড়তে বসে মন খারাপ করে আছে আজাদ। কোনোভাবেই পড়া মাথায় ঢুকছে না। মস্তিষ্কে সেগুন গাছটাই বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে। শত চেষ্টা করেও সেগুন গাছটিকে ভুলতে পারছে না সে।



 



মাকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে প্রশ্ন করে,



-মা, কারোর মাথায় কাকে মলত্যাগ করলে সেগুন গাছের কি দোষ?



আজাদের কথায় মা অবাক চোখে তাকিয়ে বললেন,



-কাক আবার কার মাথায় পায়খানা করলো? সেগুন গাছের দোষ হবে কেনো? তোমার কথার মানে বুঝলাম না। খুলে বলো।



-মা, সেদিন জমিদার আঙ্কেল আমাদের সেগুন গাছের নিচে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। হঠাৎ উনার মাথায় গাছের ডালে বসে থাকা একটি কাক পায়খানা করলে তা জমিদার আঙ্কেলের মাথায় এসে পড়ে। তিনি আমাকে সামনে দেখে আরো লজ্জা পেয়ে যান। প্রথমে আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেন। শেষে পরিচয় জানার পর আবার সুন্দর করে কথা বলেন। এখন আমার মনে হচ্ছে তিনি সেদিন রাগ করেই আমাদের সেগুন গাছটা কিনেছেন। কিন্তু মা, তোমরা কি জানতে না, সেগুন গাছটা আমার কতটা আপন!



-?থাক্, মন খারাপ করিস্নে, বাবা। আমরা আবার নতুন করে সেগুন গাছের চারা রোপণ করবো। তখন চারাও বড় হতে থাকবে। আর তুমিও বড় হবে।



-না, মা, আমি আমার সেগুন গাছটি কাটতে দেবো না।



-তা কীভাবে সম্ভব? জমিদারকে তোমার বাবা কথা দিয়েছেন। তাছাড়া জমিদার কি তা মানবেন?



-আমি মানাবো, মা। কাল সকালে আমি স্কুল যাবার আগে জমিদার বাড়ি যাবো। প্রয়োজনে তার হাতে-পায়ে ধরবো। তবু আমার সেগুন গাছকে আমার কাছ থেকে হারাতে দেবো না। আজাদের এমন অনুভূতিতে মা তাকে বুকে জড়িয়ে আদর করে বলেন,



-আর মন খারাপ করতে হবে না। তোমার বাবাকে আমি সব খুলে বলে গাছটা না বেচতে রাজি করাবো। মুহূর্তে মায়ের কথা শোনে আজাদের মন খুশিতে ভরে যায়।



পরদিন স্কুলের পোশাক গায়ে জমিদার বাড়ি আসে আজাদ। জমিদারকে সালাম দিয়ে মাথা নিচু করে ভাবতে লাগলো। কীভাবে কথাটা বলা যায়? আর বললেই কি তিনি রাজি হবেন!



জমিদার আজাদের আপাদমস্তক তাকিয়ে বললেন,



-আজ তোমার স্কুল নেই?



-আছে।



-তবে এ সময় এখানে কেনো এলে?



-আপনার সাথে আমার একটা বিষয়ে জরুরি আলোচনা করা প্রয়োজন।



জমিদার অবাক হয়ে বললেন,



-তোমার সাথে আমার কি এমন জরুরি আলাপ থাকতে পারে? তাড়াতাড়ি সব খুলে বলো।



-দেখুন, আপনি যে গাছটা কিনেছেন তা আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। গাছটিকে ঘিরে আমার সুন্দর পৃথিবী। রোজ গাছের সাথে আমার কতো কতো কথা হয়! "ওকে (সেগুন গাছ) বিক্রি করা হয়েছে।" এ কথা শোনার পর থেকে আমার পড়াশোনায় মন বসছে না। সারাক্ষণ ওকে নিয়ে ভাবছি। ওকে ছাড়া আমি বাঁচবো না। বিশ্বাস করুন, গাছটাই আমার সব। আজাদের কথাগুলো জমিদারের খুব পছন্দ হয়। তারপর তিনি আজাদকে বললেন,



-গাছটা তোমার এতো প্রিয়! ভালোই হলো তুমি আমার বাসায় এসেছ। আমি যদি এ কথা না জানতাম, তাহলে তো কালই গাছটা কেটে ফেলতে লোক পাঠাতাম। তাতে গাছকে ঘিরে তোমার স্বপ্নের মৃত্যু হতো। এই তোমাকে কথা দিলাম, তোমার প্রিয় গাছটি আমি নেবো না।



আজাদ পরম কৃতজ্ঞতায় জমিদারের মুখের দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৬৪৩২
পুরোন সংখ্যা