চাঁদপুর। শনিবার ০৩ নভেম্বর ২০১৮। ১৯ কার্তিক ১৪২৫। ২৩ সফর ১৪৪০
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • --
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৪৩-সূরা যুখ্রুফ


৮৯ আয়াত, ৭ রুকু,' মক্কী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


৭৩। সেথায় তোমাদের জন্যে রহিয়াছে প্রচুর ফলমূল, তাহা হইতে তোমরা আহার করিবে।


৭৪। নিশ্চয় অপরাধীরা জাহান্নামের শাস্তিতে থাকিবে স্থায়ীভাবে;


৭৫। উহাদের শাস্তি লাঘব করা হইবে না এবং উহারা উহাতে হতাশ হইয়া পড়িবে।


 


 


assets/data_files/web

বীরত্বের নির্যাস হলো আত্মবিশ্বাস। -ইমারসন।


 


 


বিদ্যা শিক্ষার্থীগণ বেহেশতের ফেরেশতাগণ কৃর্তক অভিনন্দিত হবেন।


 


 


 


ফটো গ্যালারি
অপেক্ষা
আজিজুর রহমান লিপন
০৩ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+

(গত সংখ্যার পর)

অনেকক্ষণ বিছানায় বসে চুপচাপ ভাবতে থাকে স্বপ্নের ব্যাপারটা। বড়ই লজ্জার ব্যাপার কারো সাথে শেয়ার করা যাবে না। এসব বিষয় মাথা থেকে একদম ঝেড়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয় আরিফ। একগ্লাস পানি খেয়ে একটা সিগারেট জ্বালায়। কিন্তু সিগারেটটাও টানতে ভালো লাগছে না আবার ফেলে দিতেও মন চাইছে না টাকার অঙ্ক বিবেচনা করে সিগারেটটার জন্যে মায়া হয়।

আবেগ-অনুভূতির ক্ষেত্রে কোনো প্রকার কঠোরতাই কাজ করে না। জোর করে বা যুক্তি দাঁড় করিয়ে আবেগ জিনিসটাকে দমিয়ে রাখা যায় না। আরিফ যতোই ভেতরের মানুষটাকে সতর্ক করেছে ততোই সে অবাধ্য হয়েছে। ক্ষণে-ক্ষণে দৃষ্টি সীমায় ধরা দিয়েছে নায়াগ্রা জলপ্রপাতের মতো পরিচ্ছন্ন-সুন্দর একখানা চাহনি।

ফোনে কোনো অচেনা নাম্বার থেকে কল আসলেই ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠে আরিফ। কিন্তু প্রতিবারই বেচারা নিরাশ হয়। কেনো যেনো মনে হয়, মারিয়া ঠিকই তার সাথে যোগাযোগ করবে। হয়তো কোথাও কোনো ভুল হয়েছে। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত কারণে হয়তো মারিয়া তার সাথে যোগাযোগ করতে পারেনি বা পারছে না।

-সামপ্রতিক সময়ে আপনাকে কিছুটা অন্য মনস্ক দেখা যাচ্ছে। ব্যাপার কি আরিফ? আপনার সমস্যাটা কী?

-না স্যার, আমিতো ঠিক আছি। কোন সমস্যা নেই, স্যার।

-তাহলে পারফর্মেন্স এতো খারাপ কেনো?

-ঠিক হয়ে যাবে স্যার, সব ঠিক হয়ে যাবে।

-দেখুন আরিফ, আপনার ব্যক্তিগত সমস্যাবলির দায়ভার অর্গানাইজেশনের নয়। অর্গানাইজেশন চায় আপনার অ্যাচিভম্যান্ট হান্ড্রেট পার্সেন্ট ফুলফিল করুন এবং ভালোভাবে সার্ভাইভ করুন।

এভাবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বেশ কিছু ঝাঁঝালো বাণী হজম করতে হয় আরিফকে। সেই সাথে অফিসের কর্তাবাবুদের শর্তমতে কাগজে-কলমে নাকানি-চুবানি খেয়ে আসতে হয় রিজিওনাল অফিস থেকে।

এমনি করে মাসখানেক পার হয়ে যায়। পেশাগত ঝুটঝামেলায় আরিফ অনেকটাই ভুলতে বসেছে মারিয়ার বিষয়টা।

এক শীতলতম রাতে প্রকৃতি ও পরিবেশ জবুথবু হয়ে পড়ে মাত্রাতিরিক্ত ঠা-ায়। জানা যায়, বিগত চলি্লশ বছরের সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড ভঙ্গ করেছিলো ওই শৈত্যপ্রবাহের দিনটি।

রাত প্রায় এগারোটা বেজে গেছে। ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে সমস্ত শহর। সারাদিনের কাজের সমাপ্তি টেনে আরিফ বাসার উদ্দ্যেশ্য রওনা হয়। কিছু দূর যাবার পর টের পায় পকেটে ফোন বাজছে। কিন্তু বাইক থামিয়ে ফোন রিসিভ করতে ইচ্ছে করে না। কারণ অনেক ক্লান্তিবোধ করছে বেচারা। ফলে বসের জেরার জবাব দেবার মতো যথেষ্ট এনার্জি নেই এখন আরিফের মাঝে। কিছুক্ষণ পর পর ফোন বেজেই চলেছে। বাসায় পেঁৗছে দেখা যায় অনেকগুলো কল করা হয়েছে একটা আননোন নাম্বার থেকে। আরিফ বুঝতে পারে এটা বস হারামজাদার কাজ। মেজাজটা ভীষণ খারাপ হয় বস ব্যাটার উপরে। নিজের ফোন থেকে কল রিসিভ করেনি বলে এখন অন্য ফোন থেকে কল করে ফাঁদ পেতেছে। যেনো রিসিভ করা মাত্রই বক্-বকানি শুরু করা যায়।

আরিফও কম নয়, একদম ফোনটা সাইল্যান্ট করে ফেলে রাখে। যা হবার হবে, কাল কিছু একটা বলে বুঝিয়ে দেয়া যাবে। নিশ্চিন্ত মনে ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবার সেরে বিছানায় নিজেকে বিলিয়ে দেয়। কিছু সময় দম নিয়ে ফোন সেটটা হাতে নেয় ফেসবুক থেকে একটু ঘুরে আসবে বলে। কিন্তু একি তাজ্জব ব্যাপার ওই আননৌন নাম্বার থেকে এখনো কল আসছে! আরিফ দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে যায় রিসিভ করবে, কি করবে না। মনে মনে সাহস সঞ্চার করে।

আরে যা হবার হবে ফোনটা রিসিভ করেই ফেলি,

-হ্যালো (একটা মেয়েলি ভাঙ্গা কণ্ঠে)

-আরিফ বলছেন?

-জি্ব বলছি, আপনি?

-আচ্ছা আপনি মানুষ না অন্য কিছু?

-সরি, বুঝলাম না। কে আপনি?

-আপনাকে এতোগুলো কল দিচ্ছি। আপনার কি একটুও বিবেকবোধ নেই?

-আরে কে আপনি? পরিচয়টা তো আগে বলুন।

-আমাকে চিনতে পারলেন না?

-না

-আমি মারিয়া। (আরিফ হতবিহ্বল হয়ে যায়। তোতলায়ে বলে)

-কোক্ক কোনো মা... রি... য়া...?

-আরে ঢং করতে হবে না। তাড়াতাড়ি প্লাটফর্মে আসেন। আমি খুব ঝামেলায় রয়েছি।

-কেন কী ক্কী হয়েছে? আপনি এতো রাতে ওখানে কেনো?

-সবকথা বলা যাবে, আগে আপনি এসে পড়েনতো।

প্লাটফর্মের নিয়ন বাতির আলোয় মারিয়াকে মোমের পুতুলের মতো লাগছিলো। পরনে জিন্স প্যান্ট ও কামিজ। কাঁধে ঝোলানো ওড়না, ঝরঝরে এলোমেলো চুল, স্রষ্টার নিজ হাতের কারুকাজ খঁচিত চাহনিখানা যেনো ভরা পূর্ণিমার চাঁদ। সমস্ত গড়নে-গঠনে যেনো শৈল্পিক ধাঁচ। জনশূন্য প্লাটফর্মে মারিয়াকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরিফের আবেগপ্রবণ মনে মায়ার সঞ্চার হয়। ভাগ্যিস্, আজকের প্লাটফর্মটায় নিশাচরদের অনুপস্থিতি রয়েছে।

সামনে গিয়ে দাঁড়ালে আরিফকে প্রথমত চিনতে পারে না মারিয়া।

-ম্যাডাম আপনি এতো রাতে এখানে কেনো?

-আপনি আরিফ সাহেব না?

স্ট্রেঞ্জ! আপনি আমাকে চিনতেই পারছেন না?

-না মানে, সেদিন আপনাকে দেখেছিলাম ফরমাল ড্রেসে আজতো ক্র্যাজুয়ালী, তাই একটু গুলিয়ে ফেল্ছি, সরি।

মারিয়ার গায়ে কোনো গরম কাপড়-চোপড় নেই। ঠা-ায় ঠক্-ঠক্ করে কাঁপছে,

গলাটাও বসে গেছে।

-কি ব্যাপার আপনার গায়ে কোনো গরম কাপড় নেই যে?

-আসলে ভেবেছিলাম যথাসময়ে ঢাকা পেঁৗছে যাবো। কিন্তু দুর্ভাগ্য মাত্রাতিরিক্ত কুয়াশার কারণে বাস, ট্রেন সবকিছু চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

-তাই মহাবেকাদায় পড়ে গেলাম।

আরিফ তড়িঘড়ি করে গায়ের জ্যাকেট খুলে মারিয়ার দিকে এগিয়ে দেয়।

-আপাতত কিছু মনে না করে এটা গায়ে জড়িয়ে নিন। নইলে নিশ্চিত আপনি নিউমোনিয়ায় ভুগবেন।

-না না, থাক্ লাগবে না।

আরিফ খানিকটা ধমকের স্বরে বলে

-একদম কথা বলবেন না। এখন এতো ফরমালিটি ম্যানটেইনের সময় নয়। এটা গায়ে দিয়ে চুপচাপ আমার সাথে আসেন।

মারিয়া স্বস্তিদায়ক হাসি হেসে জ্যাকেটটা গায়ে জড়িয়ে নেয়।

তারপর দুজনে প্লাটফর্মের রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসে। মারিয়া কৃতজ্ঞতা স্বীকারের পাশাপাশি ক্ষমা চেয়ে নেয় বিভিন্ন কারণে সেদিন ফোন করতে না পারার জন্যে।

-আরে বাদ দিন তো ওসব। এখন বলুন কী খাবেন?

-কিছু না, আপনি আসার আগে আমি এই রেস্টুরেন্টেই ডিনার করেছি। আপাতত চা খেতে পারি। (ওয়েটারকে দুকাপ চার অর্ডার দিয়ে মারিয়াকে জিজ্ঞেস করে)

-এখন কী করবেন?

-বাসায় যাবো!

-বাসায় মানে? কার বাসায় যাবেন? এখানে তো আপনার কোনো রিলেটিভ নেই।

-না রিলেটিভ আসবে কোত্থেকে? আপনার বাসায় যাবো! নেবেন না?

আরিফ ভেবেছিলো মারিয়া তামাশা করছে। তাই নিজেও তামাশা স্বরে বলে

-ওমা এ কেমন অতিথি! দাওয়াত ছাড়াই যেতে চাচ্ছে?

-না না আমি আপনার সাথে ফান করছি না। আমি সিরিয়াসলি বলছি। সত্যি, আপনার বাসায় যাওয়া ছাড়া এ মুহূর্তে আমার আর কোনো উপায় নেই। রাতটা থেকে কাল সকালে ঢাকায় রওনা হবো। (গরম চা যেনো আরিফের গলায় আটকে যায়। থতমত খেয়ে বলে)

-না না, কীভাবে, মানে...আমি তো বাসায় একা থাকি।

-হুম জানি, সেদিন বলেছিলেন।

আরিফ কি বলবে ভেবে পায় না। মারিয়া আরিফের চোখে চোখ রেখে শীতল কণ্ঠে বলে

-কী? ভয় হচ্ছে জনাব?

-না মানে... কেউ যদি জিজ্ঞেস করে... তো...

-কেউ জিজ্ঞেস করলে যা বলা উচিৎ তাই বলে দেবেন।

-আমি কিছুই বুঝতেছি না আপনি কী যা তা বলছেন।

-আপনাকে অতোশতো বুঝতে হবে না। আপাতত এক কেজি মিষ্টি কিনে নেন।

-শুনুন আপনি একটু ভাবেন তো...

-আহা...আমি ভেবেচিন্তেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এখন উঠুনতো আমি খুব টায়ার্ড বিশ্রাম নিতে হবে।

আরিফের মাথাটায় যেনো জিম ধরে গেছে। কেমন যেনো বমি বমি লাগছে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই পরিস্থিতি হচ্ছে নার্ভাসনেসের বিশেষ রুপ।

তবুও আরিফ জড়ানো কণ্ঠে বলে

-সিস্ সিদ্ধান্ত? কিসের সিদ্ধান্ত?

-বাব্বাহ্...আপনি কী আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাবেন নাকি সারারাত এখানেই বসিয়ে জেরা করবেন।

গেটে নক করলে কেয়ারটেকার নূরু ভাই বেরিয়ে আসে। মারিয়া ওড়না টেনে মাথায় ঘোমটা সাজায়। আরিফের গলাটা শুকিয়ে একেবারে তপ্তকাঠ। নূরু ভাই গেট খুলে অবাক দৃষ্টিতে দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকে। মারিয়া আরিফকে উদ্দ্যেশ্য করে বলে

-এই মামাকে মিষ্টি দাওনা।

আরিফ কিছু বলতে পারে না, মিষ্টির প্যাকেটটা নূরু ভাইয়ের দিকে এগিয়ে ধরে। নূরু মিয়া খুশিতে ডগমগ হয়ে বলে

-আলহামদুলিল্লাহ স্যার বিয়াডা তাইলে কইরে ফেলাইছেন। বালা অইছে খুব বালা অইছে। আইয়েন ম্যাডাম আইয়েন, বিতরে আইয়েন।

বাসায় ঢুকে মারিয়া এমন ভাবসাব জুড়ে দেয় যেনো আরিফ বাসায় অতিথি হয়ে এসেছে। আর মারিয়া যেনো এই বাসার কর্ত্রী।

মারিয়া বাথরুম থেকে বেরিয়ে ধপাস করে আরিফের বিছানায় বসে বেশ প্রশস্ত একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। তারপর হাত-মুখ মুছতে-মুছতে রিল্যাঙ্ মুডে ঘোষণা দেয়

-অ্যাই শোনো, তুমি তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে বিদায় হও। রাতে আর বাথরুমে আসার সুযোগ পাবে না। কারণ সারারাতের জন্য এ ঘরের দরজাটা বন্ধ থাকবে আর তুমি সামনের ঘরে থাকবে। আরিফ কিছু বলতে চাইলে মারিয়া কোনোরূপ সুযোগ না দিয়ে বলে

-তোমার সাথে একদম প্যাঁচাল পাড়তে পারবো না। আমি খুব টায়ার্ড 'সো আই টেক রেস্ট নাউ'। তুমি যাও তো এখন, যাও, যাও না...!

আরিফ ব্যাচলর মানুষ দুই রুমের ছোট্ট একটা ফ্ল্যাট। একটাই বিছানা আর একটাই বাথরুম। বেচারা নিজের কক্ষের সর্বসত্ত্ব মারিয়াকে দান করে নিজে সামনের কক্ষে একটা চেয়ারে বসে নির্ঘুম রাত্রীযাপনে যেতে বাধ্য হয়।

কিছুই বুঝতে পারে না আরিফ। কী হচ্ছে এসব? কী ঘটে চলেছে সরলপ্রান আরিফের সাথে। আরিফের জীরনটা কেটে যাচ্ছে দুঃখ-দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করে, উজানের বীপরিতে তরী বেয়ে। কিন্তু কখনোই এমন বিচিত্র ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়নি। আজন্ম কালের লড়াকু সৈনিক হলেও আরিফ ঘনঘন সূর্যের ন্যায় উত্তপ্ত রনাঙ্গণে থেকেও স্বপ্ন দেখে টুকটুকে লাল রঙ্গের মেহেদীপড়া একখানা কোমল হাতের। যে হাতের মধুর ছোঁয়ায় আরিফের সারাজীবনের ক্লান্তি-গ্লানী সব ধুয়েমুছে পরিপাটি হবে। তাই বলে জীবনটাকে সে আষাঢ়ে গল্প মনে করে না। বাস্তবতার কঠোরতম মন্ত্রে উজ্জীবিত। অবান্তর আকাশ-কুসুম স্বপ্নেরও লালন করে না। কিন্তু সমসাময়িক ঘটনাবলি আরিফের কাছে কিছুতেই স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। আজ যে নাটকের মঞ্চায়ন করেছে মারিয়া তা কখনো সত্য হতে পারে না, সম্ভবও নয়। কিন্তু কেনো আরিফের সাথে এমন সব নাটকীয় ঘটনাবলির দৃশ্যায়ন হবে?

বিষয়টা জামিল ভাইকে একবার জানানো দরকার। আল্লাহ না করুন কী না কী ঘটে যায়। কারণ জামিল ভাই এই শহরে যেমন প্রতিষ্ঠিত, তেমনি আরিফের অতি আপনজন।

মিঃ জামিল ঘটনার বিবরণ শুনে আরিফকে তিরষ্কার করে বলেন

-'বাহ্, চমৎকার! আপনি রাজকুমার বনে গেলেন তো! তাই বিনাযুদ্ধে রাজকুমারী নিজেকে আপনার নিকট সমর্পণ করিয়াছে'। আরিফ বললো, ভাই, আমি বুঝি না আপনার মতো শিক্ষিত, বুদ্ধিমান লোক এমন ধরনের বোকামী করেন কীভাবে?

আরিফকে আরো কিছুক্ষণ তিরষ্কার করে মিঃ জামিল পরামর্শ দেন সাহসিকতার সাথে পরিস্থিস্তি পর্যবেক্ষণ করার জন্যে। তাছাড়া কোনো সমস্যা হলে তাৎক্ষণিক তাকে যেনো ফোন করেন।

সুন্দরী যুবতী একটা মেয়ে আরিফের ঘরে। তাই কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারছে না আরিফ। অতিরক্ষণশীল একটা সমাজে আরিফের বসবাস। নুন থেকে চুন খসলেই কলঙ্কের বোঝা মাথায় চাপবে। একের পর এক সিগারেট জ্বালায় আর ঘরের ভেতর অস্থির পায়চারি করে বেড়ায় অনেক দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত আরিফ। এভাবেই কাটে আরিফের নির্ঘুম স্মরণীয় একটা রাত।

আকাশটা অতো পরিষ্কার হয়ে গেছে বলে মনে হয় না। তবুও খানিকটা মস্নান মুখে সূর্যি দেব পৃথিবীকে রাঙ্গিয়ে তুলেছে। ঠা-ার প্রকোপটাও কমেছে। সাত-সকালে জেগে মারিয়ার মনে পরিচ্ছনতার দোল খায়। জানালার কাঁচ ভেদ করে একচিলতে কাঁচা রোদ মারিয়ার ধবধবে কপালে ছুঁয়ে যায়। জানালাটা খুলে আরো বেশি পুলকিত হয় মারিয়া। জানালার ছোট্ট একটা পরিসরে ঝুলন্ত বাগানে বাহারি সব ফুলের অসাধারণ একটা সমাবেশ ঘটিয়েছে আরিফ। আরিফের ঘরটাও বেশ সাজানো-পরিপাটি। সাধারণত পুরুষ মানুষ হয়ে থাকে কিছুটা অগোছালো, এলোমেলো। কিন্তু আরিফের ক্ষেত্রে তার ভিন্নতা লক্ষ্যণীয়। দরজাটা খুলতেই আরিফ ঝট্ করে দাঁড়িয়ে মারিয়াকে প্রাতঃকালীন শুভেচ্ছা জানায়। কিন্তু মারিয়া তার কোনো জবাব না দিয়ে তাড়াহুড়ো শুরু করে। অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে তাকে ঢাকা যেতে হবে। বাসার সবাই চিন্তা করছে। আরিফও সায় দেয়, কারণ যতো তাড়াতাড়ি মারিয়াকে নিয়ে বাসা থেকে বের হওয়া যায় ততোই মঙ্গল। নতুবা প্রতিবেশীরা দলবেঁধে আসতে শুরু করবে নতুন বউ দেখার জন্যে।

দুজন আবার একই রেস্টুরেন্টে মুখোমুখি বসে ব্রেকফাস্ট করছে। মারিয়া কোনো কথা না বলে খেয়েই চলেছে। আরিফ মনে মনে ভাবে কেমন মেয়েরে বাবা! নিজে নির্ঘুম রাত কাটিয়ে আশ্রয় দিয়েছি। কোথায় একটু কৃতজ্ঞতা জানাবে তা তো নয় বরং এমন ভাব্সাব্ করছে যেনো আমি উনার কেয়ারটেকার।

হঠাৎ খাওয়া থামিয়ে মারিয়া আরিফের দিকে চোখ বড়-বড় করে গভীর মনোযোগে তাকায়।

-কী ভাবছো?

-কই না, না কিছু না!

-শোন এখন থেকে...না থাক্।

-বলেন না, বলেন।

-অ্যাই তুমি দেখতেছো না আমি তোমাকে তুমি করে বলছি?

-হুম

-তো তুুমি আমাকে আপনি বলবা কেনো?

আরিফ কিছু বলতে গেলে ট্রেনের হুঁইসেল বেজে উঠে। মারিয়া ধড়মড় করে উঠে দাঁড়ায়। আরিফের আর কথা বলার সুযোগ হয় না।

মারিয়াকে সীটে বসিয়ে আরিফ নেমে আসবে এমন সময় মারিয়া একটা হলুদ রঙ্গের খাম এগিয়ে দিয়ে বলে

-এটা রাখোতো, আমি আগামী পরশু ফিরে আসবো তখন নিয়ে যাবো।

আর হ্যাঁ, তোমাকে একটা কাজ করতে হবে। আমার জন্য একটা বাসা দেখিও। তবে যেনো তোমার বাসার মতো সুন্দর, ছিমছাম ও খোলামেলা হয়।

-ওকে ম্যাডাম, ভালো থাকবেন।

-আবার!

-ওহ্ সরি

ট্রেন প্লাটফর্ম ছেড়ে চলে যায় কিন্তু আরিফ দাঁড়িয়ে থাকে। অপলক তাকিয়ে থাকে ট্রেনের দিকে।

মফস্বল শহরগুলোতে ব্যাচলর বাসা খুঁজে পাওয়াটা বেশ মুশকিলের ব্যাপার। তার উপরে মারিয়া একা একটা মেয়ে থাকবে শুনলে কেউই বাসা ভাড়া দিতে রাজি হয় না। ব্যাপারটা ফোনে মারিয়াকে জানালে মারিয়া একটা অবাক করা পরামর্শ দেয় আরিফকে।

-তুমি বোকার মতো কথা বল কেনো? তুমি বলবা যে, আমরা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই থাকবো।

-মানে, মানে স্বামী-স্ত্রী?

-ওমা সেটাও তোমাকে বুঝিয়ে বলতে হবে নাকি?

আরিফ গলা খাকি দিয়ে ঢোক গিলে স্বাভাবিক হয়ে নেয়। তারপর গুরু গম্ভীর কণ্ঠে বলে

-মারিয়া আমি এসব কথার কোনো মানে খুঁজে পাই না। তাছাড়া তোমার অদ্ভূত সব আচরণ আমায় ভাবিয়ে তুলছে। কাজেই তোমার সাথে কিছু কথা বলা জরুরি।

-হুম বলো, না এখনো সময় হয়নি। তোমাকে যা বলেছি আপাতত তাই করো।

-কিন্তু মারিয়া শোনো, ব্যাপারটা হচ্ছে...

মারিয়া আর কোন কথা না শুনে হুট করে লাইনটা কেটে দেয়।

উপায়ান্তর না দেখে মারিয়ার পরামর্শ মতো আরিফ একটা বাসা ঠিক করে ফেলে।

মারিয়াকে নতুন বাসায় উঠিয়ে দিয়ে আরিফ মারিয়ার খামটা ফেরত দিতে যায়। মারিয়া ফেরত না নিয়ে জিজ্ঞেস করে

-তুমি দেখেছো এর ভেতরে কি আছে?

-নাহ্, আমি তোমার জিনিস কেনো দেখবো। ওটা তো তোমার আমানত।

-খুব ভালো কথা, ওটা তোমার কাছেই রেখে দাও আমি সময় মতো চেয়ে নেবো। আর শোন, কাল সকাল সাতটার আগে চলে আসবে। আমাকে অফিসে পেঁৗছে দেবে এবং বিকেলে গিয়ে নিয়ে আসবে।

সন্ধ্যার পর মারিয়ার বাসা থেকে বেরিয়ে ডাঃ আব্দুল হাকিমের চেম্বারের উদ্দেশ্যে ছোটে ভিজিট করার জন্যে। বাইক ছোটে আপন গতিতে। কিন্তু আরিফের ভেতরে প্রশ্নের ঝড় বয়ে যায়। সে আসলে ভুল করছে কিনা? কোনো সর্বনাশা পথে হাঁটছেনা তো? সত্যিকার অর্থে মারিয়া কি চাচ্ছে? আরিফকে নিয়ে খেলছে? না বাস্তবিকই কিছু ভাবছে?

সে যাই হোক, আরিফ ডুবে গেছে মারিয়াময় গভীর সমুদ্রের অতলে। মারিয়ার এই বর্ণচোরা খেলায় আরিফ হারাতে চায়। যদি কিছু ভুল হয় তবে হোক না। যদি জীবন নামের উত্তপ্ত রনাঙ্গণে বরাবরের মতো মেঘে-বিদ্যুতে ঝলসে উঠে, তাই হোক, তবে তাই হোক।

মারিয়ার স্পষ্ট ঘোষণা আরিফ আনা-নেয়া না করলে মারিয়া অফিস যাওয়া বন্ধ করে দেবে। আরিফ বেচারা এতোদিন বসকে বিভিন্নভাবে ফাঁকি দিয়ে আসছিলো। সমপ্রতি আর সেটা সম্ভব হয়ে উঠছে না। বস এখন আরিফকে কঠোর নজরে মনিটরিং করছে। ফলে আরিফ ফোন করে মারিয়াকে জানায়

-মারিয়া, আজ যাবার মতো কোনো সুযোগ পাচ্ছি না। বস সকাল থেকে আঠার মতো লেগে আছে। প্লিজ তুমি একটা অটোতে করে চলে আসো না।

আরিফের কথা শুনে মারিয়া কান্নাকাটি জুড়ে যা তা করে ফেলে এবং পরিষ্কার জানিয়ে দেয়

-তুমি না আসলে আমি কোনোভাবেই যাবো না। সারারাত অফিসেই বসে থাকবো। কিচ্ছু খাবো না।

কী আর করা! বসের চোখ ফাঁকি দিয়ে বাইক নিয়ে ছুটতে হয়।

এভাবে এগিয়ে চলে আরিফ-মারিয়ার অঘোষিত পরিছন্ন প্রণয়ের সম্পর্ক।

(চলবে)

আজকের পাঠকসংখ্যা
৪৯৫৭১০
পুরোন সংখ্যা