ঢাকা। শনিবার ১২ জানুয়ারি ২০১৯। ২৯ পৌষ ১৪২৫। ৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ডাঃ দীপু মনি শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন || চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য দীপু মনি শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন || *
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৪৫-সূরা জাছিয়া :

৩৭ আয়াত, ৪ রুকু, মক্কী

২৮। এবং প্রত্যেক সম্প্রদায়কে দেখিবে ভয়ে নতজানু, প্রত্যেক সম্প্রদায়কে তাহার আমলনামার প্রতি আহ্বান করা হইবে ও বলা হইবে, আজ তোমাদিগকে তাহারই প্রতিফল দেওয়া হইবে যাহা তোমরা করিতে।

 


assets/data_files/web

অসৎ আনন্দের চেয়ে পবিত্র বেদনা মহৎ।

-হোমার


দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞান চর্চায় নিজেকে উৎসর্গ করো।

 


ফটো গ্যালারি
ভালোবাসার জলধারা
আজিজুর রহমান লিপন
১২ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


বাঁশের বেড়ার ফাঁক গলে রোদের সরল রেখা সরাসরি এসে গড়াগড়ি খায় পরেশের বিছানায়। এবারে সেই ফাঁক-ফোঁকর গুলিও ঢেকে দিয়েছে তাজা পত্রিকার পাতা দিয়ে। তবে উদ্দেশ্যটা ছিলো ভিন্ন সূর্যের আলো প্রতিরোধ করা নয়। বরং পত্রিকার পাতায় পরেশের প্রাণের মানুষটার ছবি ছিলো। এমনিভাবে সারা ঘরে সাঁটানো আছে কণ্ঠশিল্পী রমা রায়ের বিভিন্ন ধরনের ছবি। এমনকি মানিব্যাগ, আয়নার কোণে বা চোখে পড়ার মতো সবখানেই রয়েছে রমা রায়। আর ছোট্ট টেপ রেকোর্ডারে দিন-রাত বাজতে থাকে রমার অমিয় কণ্ঠ সুধা।



প্রতিদিন কাকডাকা ভোরে বাইসাইকেলটা নিয়ে ছুটে যায় পত্রিকার এজেন্টে। বান্ডেলগুলো সাইকেলে বেঁধে আবার দে ছুট। নির্জন কোনো স্থানে দাঁড়িয়ে একটা-একটা করে পত্রিকা ঘেঁটে খুঁজে ফেরে রমা রায়কে। যেদিন কোনো পত্রিকায় রমাকে দেখা যায় না সেদিনটা বেচারার মাটি হয়ে যায়। গোমড়া মুখ করে সাইকেলের প্যাডেল চাপে। বেচা-কেনায়ও যেনো অমঙ্গল হয়ে যায়।



আর যেদিন রমা দেবির দর্শন মেলে সেদিনটায় পরেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠে। সাইকেল ছোটে হাওয়ার বেগে আর গলা ফাটিয়ে ক্রেতা আকর্ষণ করে-আজকের তাজা খবর, আজকের তাজা খবর...করমদিতে দুই দলের মুখোমুখি সংঘর্ষে...। দ্রুত বিক্রি হয়ে যায় সব পত্রিকা।



দীন-হীন এ হকারের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা একদিন সে রমা রায়ের সামনে দাঁড়াবে। বলবে তার ভালোবাসার কথা। তাতে যা হবার হবে। ধনী-গরিবে কী প্রেম হয় না? সংসার হয় না? ইতিহাসে এমন অজস্র উদাহরন আছে। রাজকন্যা কৃতদাসকে ভালোবেসে প্রাণদ- বরণ করেছে। প্রতাপশালী সম্রাট ভালোবাসার মূল্য দিতে গিয়ে পথের ফকির হয়েছে। লাইলী-মজনু, শিরী-ফরহাদ, চ-িদাশ-রজকিনী সব ইতিহাস পরেশের জানা আছে। কাজেই কোনো কিছুর পরোয়া করে না পরেশ। দরকার হলে নতুন এক ইতিহাস লেখা হবে মহাকালের দেয়ালে। সে ইতিহাসের নায়ক-নায়িকা হবে রমা ও পরেশ। এমনি নানান ভাবনা আর দু চোখভরা স্বপ্ন লালন করে চলে পরেশ।



এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন সারাজীবন। কিন্তু কখনোই বিখ্যাত এ সঙ্গীতশিল্পী রমা রায় এর জবাব দেননি। এড়িয়ে গেছেন বিভিন্ন কৌশলে। তবে আজ এড়িয়ে যাবার মতো সুযোগ মনে হয় আর থাকলো না। নাতনীর বয়সী বর্ণার কাছে হার মানতেই হবে রমা রায়কে। বর্ণার গভীর আগ্রহে প্রাণ উজাড় করা জিজ্ঞাসা-অতুলনীয় রূপে রূপবতী ছিলেন রমা রায়। পঁচাত্তর বছর বয়সেও রমা রায়কে একপলক দেখলেই আন্দাজ করা খুব সহজ হবে তাঁর রূপের জৌলুস কতটা মোহনীয় ছিলো। সমগ্র ভারতবর্ষ যার সুরেলা কণ্ঠে বিমোহিত। খ্যাতি, অর্থ, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য কোনো কিছুরই কমতি নেই। তবে কেনো সারাটা জীবন একাকী কাটিয়ে দিলেন? কেনো তিনি ঘর-সংসার গড়ে তোলেননি? কী সেই অজানা কাহিনি?



এ বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পীর ব্যক্তিগত জীবনের এ অজানা অধ্যায়টি জানার গভীর আগ্রহে মুখিয়ে আছে সমস্ত সংস্কৃতি অঙ্গন। সুরম্য অট্টালিকার প্রশস্ত বারান্দায় মুখোমুখি বসে আছে বর্ণা ও রমা রায়। চশমাটা খুলে টি-টেবিলের উপর রাখলেন। তারপর ঝুলে পড়া চোখের নিচটায় খানিকটা কচলে শরতের মেঘমুক্ত নীল আকাশের দিকে তাকান। বুকের গভীর থেকে বয়ে আসা দীর্ঘশ্বাসটি ত্যাগ করলেন। অতঃপর রমা রায় ফিরে যান পঞ্চাশ বছর পূর্বের এক রাতে।



রমা তখন ক্যারিয়ার নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। উঠতি বয়সের সাধারণ এক সঙ্গীতশিল্পী। বেশ কয়েকটি একক অ্যালবামও বেরিয়েছে। দেশের বিভিন্ন মঞ্চে গান করে বেড়ান। প্রায়ই পত্র-পত্রিকায় দেখা যায়।



ত্রিপুরার একটি কলেজের নবীন বরণের অনুষ্ঠানে গান গাইবেন রমা রায় তাই আগের দিন বিকেলে রওনা হন।



কলকাতা থেকে ত্রিপুরাগামী ট্রেন মহুয়া দুর্বার গতিতে ছুটছে। ভিআইপি কেবিনে একা অবস্থান করছিলেন রমা। রাত প্রায় সাড়ে বারোটা। ঘুম চোখে ঢুলুঢুলু। এমন সময় কেউ একজন দরজায় নক করে। রমা বিরক্তস্বরে বললেন, কে?



-ম্যাডাম আমি।



-আমি কে?



-ম্যাডাম আমি পরেশ।



-কোন্ পরেশ? কী চাই?



(কোনো জবাব নাই)



-ভেতরে আসেন দরজা খোলা।



দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে পরেশ নামের সাতাশ-আটাশ বছরের রোদে পোড়া এ যুবক। হাতে খবরের কাগজের বোঝা। পরনে সেকেলে শার্ট-প্যান্ট। গালভর্তি খোঁচা-খোঁচা দাঁড়ি। সহজ কথায় একটা খবরের কাগজ বিক্রেতা ছেলে যেমন হয়।



রমা কটমট করে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে_



-কী চাই?



ছেলেটা কিছু বলার জন্যে চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। ঠোঁট দুটো ভীষণ কাঁপছে সেই সাথে হাত-পাগুলোও। রমার দিকেও ঠিক মতো তাকাতেও পারছে না চোখ দুটোও বেশ নাচানাচি করছে।



রমা এবারে ধমক দিয়ে বলে



-অ্যাই ছেলে কথা বলছো না কেনো? সমস্যা কী তোমার? যাও এখান থেকে প্যাপার-ট্যাপার লাগবে না আমার।



ছেলেটা খবরের কাগজের বোঝাটা নিচে রেখে ভেতর থেকে খুব যত্ন করে একটি লাল গোলাপ বের করে আনে।



তারপর ধড়মড় করে হাঁটু গেঁড়ে রমার পায়ের কাছে বসে পড়ে। দু হাতে ধরে টক টকে লাল গোলাপটা এগিয়ে ধরে রমার দিকে।



রমা চমকে উঠে দাঁড়িয়ে যায়। বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বলে



-মানে, মানে কী?



ছেলেটা অত্যন্ত কাতর কণ্ঠে বলে



-ম্যাডাম আমি আপনাকে ভালোবাসি। অনেক বেশি ভালোবাসি আপনাকে।



রমা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসতে-হাসতে সিটে বসে। বুকে হাত জড়িয়ে পায়ের উপর পা রেখে দোলাতে-দোলাতে রসিকতা করে বলে



-তুই ভালোবাসিস্ আমায়? আমাকে বিয়ে করবি?



পরেশ তেমন করেই বসে আছে। রমার কথায় শঙ্কিত বদনে উপরে নিচে মাথা ঝাঁকিয়ে হ্যাঁ-সূচক জবাব দেয়।



রমা এবারে হা হা করে উল্লসিত হাসিতে ফেটে পড়ে। বোকা প্রকৃতির যুবক পরেশ সরল চোখে চেয়ে থাকে রমার পানে। রমা এবারে হাসিটা নিয়ন্ত্রণ করে। তারপর সর্দির রোগীর মতো নাক টেনে বলে,



-ঠিক আছে তুই যে আমাকে ভালোবাসিস্ প্রমাণ দিতে পারবি?



পরেশ মাথাটা পঁয়তালি্লশ ডিগ্রি বাঁকিয়ে বলে,



-হ্যাঁ পারবো। বলেন কী প্রমাণ চান আপনি?



-জীবন, আমার জন্যে জীবন দিতে পারবি?



-হ্যাঁ ম্যাডাম, আমি পারবো, আমি তাও পারবো।



(রমার রসিকতার মাত্রা আরো বৃদ্ধি পায়)



-ওমা তাই বুঝি? আহারে আমার প্রাণনাথ এতোদিন কোথায় ছিলে গো? ঠিক আছে সোনা, এতোই যদি ভালোবাসো তবে এই চলন্ত ট্রেন থেকে একটা ঝাঁপ দিয়ে দেখাও তো তোমার ভালোবাসার ধরনটা!



মাঝখানে গভীর নদী আর দু পাশে পাহাড়। দু পাহাড়ের চূড়ায় সুযোগ স্থাপন করেছে বৃটিশদের তৈরি রেলওয়ের সস্নিপার সেতু। খরস্রোতা নদী থেকে প্রায় আঠারশ' ফুট উচ্চতায় হন-হন করে ছুটে যাচ্ছে মহুয়া।



রমার কথা শুনে পরেশ নত মস্তকে উঠে দাঁড়ায়। বুকের ভেতরটা একেবারে শূন্য করে একটা প্রশস্ত নিঃশ্বাস ফেলে। হাতটা যেনো অসাড় হয়ে যায়, গোলাপটা লুটিয়ে পড়ে ট্রেনের মেঝেতে। তারপর ভীষণ আহত কণ্ঠে বলে,



-ম্যাডাম, আমি জানি আপনাকে পাবার মতো ভাগ্য নিয়ে আমি জন্মাইনি! আর আমার এ অনর্থক জীবনটাও অতি তুচ্ছ আপনার বিলাসবহুল জীবনের কাছে। ম্যাডাম, আমি মনে করি আমি সফল হয়েছি। কারণ আজ আমি রমা রায়ের সামনে দাঁড়িয়ে আমার সরল ভালোবাসার কথা বলতে পেরেছি। তাতেই আমি ধন্য, আমি তৃপ্ত। কিন্তু ম্যাডাম আজ আমি আপনার হৃদয়ে একটি গভীর দাগ এঁকে যাবো। যে দাগ আপনি কোনোদিন মুছতে পারবেন না। বয়ে বেড়াবেন আমরণ।



কথাটা শেষ কিছুক্ষণ চলচল নয়নে তাকিয়ে রইলো রমার দিকে। তারপর চলন্ত ট্রেনের খোলা জানালা দিয়ে ঝাঁপ দিয়ে মুহূর্তেই অদৃশ্য হয়ে গেলো ছেলেটি।



ঘটনার আকস্মিকতায় রমা হতভম্ভ হয়ে যায়। বেচারি ভাবতে পারেনি এমন একটা ঘটনা ঘটে যাবে। আতঙ্ক-অস্থিরতায় গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে রমা। লোকজন ছুটে আসে বিপর্যস্ত রমার মুখে ঘটনার বিবরণ জানতে পারে। পরের দিনের পত্রিকায় নদীতে ভাসমান অজ্ঞাত যুবকের লাশের সংবাদ ছাপা হয়। কিন্তু ট্রেনটি কাল বিলম্ব না করে যথারীতি ছুটে যায়। মহাকালও থেমে যায় না। নক্ষত্ররাজী যথানিয়মে কার্য সম্পন্ন করে। শুধু রাতের অাঁধারে হারিয়ে যায় পরেশ নামের ভাগ্যবঞ্চিত আক্রান্ত হৃদয়ের এ যুবক। আর তরতর কর এগিয়ে চলে সময়ের চাকা।



কথা শেষ করে রমা রায় ঠিক তেমনি করে তাকিয়ে রয় শরতের স্বচ্ছ নীল আকাশের দিকে। গালের কুঁচকানো ভাঁজগুলোর উপর দিয়ে দু চোখের পাতা ভিজিয়ে নেমে আসে সরু দুটি জলধারা। সেই জলধারা সিক্ত করে তোলে বর্ণার চকচকে চোখ দুটিও।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৩৯৮২২২
পুরোন সংখ্যা