ঢাকা। শনিবার ১৯ জানুয়ারি ২০১৯। ৬ মাঘ ১৪২৫। ১২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৪৭-সূরা মুহাম্মাদ


৩৮ আয়াত, ৪ রুকু, 'মাদানী'


০২। যাহারা ঈমান আনে, সৎকর্ম করে এবং মুহাম্মাদের প্রতি যাহা অবতীর্ণ হইয়াছে তাহাতে বিশ্বাস করে, আর উহাই তাহাদের প্রতিপালক হইতে প্রেরিত সত্য, তিনি তাহাদের মন্দ কর্মগুলি বিদূরিত করিবেন এবং তাহাদের অবস্থা ভাল করিবেন।


 


 


 


assets/data_files/web

প্রশংসা হচ্ছে আদর্শের ছায়া।

  -এম. এফ. টুপা।


যে পরনিন্দা গ্রহণ করে সে নিন্দুকের অন্যতম।  



 


ফটো গ্যালারি
ভ্রমণ
স্বপ্নের বেলাভূমিতে আমরা
নাজনীন নিশা
১৯ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


গত একবছর ধরে কঙ্বাজার, সেন্টমার্টিনে যাওয়ার প্ল্যানিং চলছিলো আমাদের। ডিসেম্বরের প্রথমদিকে জানতে পারলাম ডিপার্টমেন্ট ট্যুর এখন হচ্ছে না। সবার প্রচ- মন খারাপ হয়ে গেলো। ফাটা বেলুনের মতো চুপসে গিয়ে বাকিদের ট্যুরে যাওয়া ছবি দেখি আর লাইক দেই। হুট করে কীভাবে কি হয়ে গেলো জানি না। ১৭ তারিখ রাতে সাবের ফোন দিয়ে বললো, যাবি? আমি তো এক পায়ে খাড়া। বাকিদের মোটামুটি ম্যানেজ করে পরদিন সন্ধ্যায় টিকেট কাটা শেষ করলাম। তারপরও মনের মধ্যে একটু খুঁতখুঁত ছিলো।



 



শেষপর্যন্ত যাওয়া হয় কি না (বড় স্বপ্নগুলো পূরণ হয়নি সেজন্যে)। দিলাম তন্নীকে ফোন। সেও যাবে। আগের দিন ১৯ তারিখে ঝামেলা হয়ে গেলো। তাসনিম যাবে না, ওর আম্মু সিরিয়াস অসুস্থ। ভীষণরকমের মন খারাপ হয়ে গেলো। ওকে রেখে কী করে যাই...তারপর ও আমাদের একপ্রকার জোর করে যেতে বাধ্য করে। একই সমস্যা নেওয়াজেরও। সে তার আম্মুকে নিয়ে ঢাকা ডাক্তারের কাছে গিয়েছে। আমরা ৫ জন তখন ভাবছি আদৌ আমাদের যাওয়া হবে কি না। আমাদের তখন ৬টা টিকেট কাটা হয়েছিলো। বাকি টিকেটের টাকাটা গচ্ছা দিতে হবে ভাবছিলাম।



 



হুট করে সমাধান হয়ে গেলো; তন্নীর বান্ধবী (ওর নামও তন্বী) রাজি হলো, আমাদের সাথে যাবে। ২০ তারিখ ভোর ৪টা ৩০ মিনিটে রেলস্টেশনের উদ্দেশ্যে বের হলাম। যদিও আগের রাতে আমি আর তন্নী একটুও ঘুমাইনি। সারা রাত গল্প করেছি।



 



প্রথম দিন



ট্রেনে উঠার পর এবার আমার বিশ্বাস হলো আসলেই আমরা ট্যুরে যাচ্ছি। চট্টগ্রাম স্টেশনে নেমে ওখান থেকে সিএনজি করে বাস স্টেশন। সেখানে নাস্তা করে তারপর কঙ্বাজারের বাসে চেপে বসা। যেটা আমার জন্যে সবচেয়ে বিচ্ছিরি অভিজ্ঞতা ছিলো (২ বার বমি করেছি কিনা)। যাই হোক, কঙ্বাজার পেঁৗছলাম বিকেলে। আমরা উঠলাম হোটেল কল্লোলে। 'হান্ডি'তে দুপুরের ভোজ শেষ করে একছুটে বীচে।



 



সূর্যাস্তটা প্রথমদিনে এখানেই দেখা হলো। যেটার সৌন্দর্য্য লিখে প্রকাশ করা যাবে না। চারপাশটা ঘুরে দেখতে দেখতে আর ছবি তুলতে তুলতে আমাদের সময় শেষ হলো। এবার আর হান্ডিতে নয়, রাতের খাবার খেলাম 'কড়াই'তে। তারপর আবার হাঁটতে বের হওয়া। এবার উদ্দেশ্য ঔষধ কেনা আর চা খাওয়া। যদিও আসল ইচ্ছে ছিলো রাতের কঙ্বাজার শহর দেখা। লাইটের আলোতে, চারপাশের দোকানপাট দেখছিলাম; যেটা চাঁদপুরে কখনও ভাবতে পারিনি। ঘরে ফেরার মতো তাড়া নেই, ইচ্ছেমতো সবকিছু দেখছিলাম। ঘুরাঘুরি শেষ করে হোটেলে এসে ঘুম।



 



দ্বিতীয় দিন



পরদিন আমাদের গন্তব্য সেন্টমার্টিন। ভোর ৫টায় মাইক্রোবাসে উঠে যাত্রা শুরু করলাম টেকনাফের উদ্দেশ্যে। আমরা গিয়েছিলাম মেরিন ড্রাইভ ধরে। মেরিন ড্রাইভের রাস্তা হচ্ছে একপাশে পাহাড় আর অন্যপাশে সমুদ্র। আধো আধো কুয়াশা, সাথে পাহাড় আর সমুদ্র এক কথায় একটা অপার্থিব সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছিলো। মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম চারপাশটা। টেকনাফে নেমে নাস্তা করে সেন্টমার্টিনগামী জাহাজে উঠে বসলাম। জাহাজে মানুষের তিল ধারনের জায়গা নেই। বহুকষ্টে নিচে একটু বসার জায়গা পেলাম। জাহাজের সাথে সাথে গাঙচিল উড়ে আসছিলো। আমরা রেলিং-এর জায়গায়টায় দাঁড়িয়ে দেখছিলাম।



 



সেন্টমার্টিনে আমরা উঠলাম 'বেলাভূমি' রিসোর্টে। দুপুরের খাবার খেয়ে আমাদের প্রথম গন্তব্য হলো ছেঁড়া দ্বীপ। ছেঁড়া দ্বীপ আমরা স্পীডবোটে করে গিয়েছিলাম। গভীর সমুদ্রে স্পীডবোটের জার্নিটা সবাই ভীষণ উপভোগ করেছিলো। ওখান থেকে ফিরে বিকোল আমরা বীচে ঘুরলাম। ছেলেরা সাইকেল চালালো। সাবের পেছনে সিটওয়ালা সাইকেল ভাড়া নিয়েছিলো আর আমাকে ও তন্নীকে ২ মিনিট সাইকেলে করে ঘুরিয়েছিলো। রাতের বেলা বার-বি-কিউ পার্টিটা হতে হতেও হয়নি। যদিও ট্রুথ আর ডেয়ার খেলাটা ভালো ছিলো। আমরা খুবই সৌভাগ্যবান বলতে হবে, যখন এমন একটা স্বপ্নের জায়গায় গেলাম তখন ছিলো পূর্ণিমা রাত।



তৃতীয় দিন



এদিন সকালে নাস্তা করে রিক্শা করে সারা শহর ঘুরতে বের হলাম। ওদের রিক্শাটা আমরা সচরাচর যেমন রিক্শা দেখি তেমন না। মোটামুটি ৫ জনের মতো বসা যায়। যদিও আমরা ৬ জন বসেছিলাম, কিছুটা কষ্ট হয়েছিলো বটে। রিক্শায় বসে সারা সেন্টমার্টিনটা দেখছিলাম। শহর না বলে এটাকে গ্রাম বলাই শ্রেয়। নেই বিদ্যুতের সুব্যবস্থা। সারা অঞ্চলটা নির্ভর করে আছে সোলার প্যানেলের উপর। তাও খুব লিমিটের মধ্যে। রাত ১১টার মধ্যে বাতিগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়।



এখানকার মানুষজন শিক্ষা আর চিকিৎসাসেবা থেকেও বঞ্চিত। একটা মাত্র উচ্চ বিদ্যালয় আছে, এর বেশি কেউ পড়তে চাইলে টেকনাফ যেতে হয়। সেটাও সবাই পায় না। এখানে যে সরকারি হাসপাতাল আছে সেখানেও কোনো ডাক্তার এসে ২-১ মাসের বেশি থাকে না। আসলে আমরা যতোই সমুদ্রের প্রেমে পড়ে সেখানে ঘুরতে যাই না কেনো; যখন কাজের খাতিরে নিয়মিত থাকতে হবে তখন আমরা কেউই থাকবো না। আর এটাই চরম সত্য। মূলত ট্যুরিস্ট মৌসুমেই এখানকার মানুষজনের আয়টা বেশি হয়। বাকি ৬ মাস তারা কৃষিকাজ করে বা মাছ ধরে। তবে কেউ কেউ এই ৬ মাসে এতো বেশি আয় করে যে বাকি সময়টা নির্বিঘ্নে বসে কাটাতে পারে। তবে প্রত্যেকের ব্যবহারই অনেক ভালো ছিলো।



 



যাই হোক, রিক্শা করে গেলাম দারুচিনি দ্বীপে। তারপর সেখান থেকে বীচে এসে সবাই মিলে গোসল করা। প্রায় ২ দিন ধরে সামুদ্রিক মাছেরও স্বাদ নেয়া হলো। আমার কাছে 'ফ্লাইং ফিস' আর 'সুরমা' মাছটা বেশি ভালো লেগেছিলো। 'কোরাল'টা খুব একটা ভালো লাগেনি। বিকেল ৩টায় ফিরে যাওয়ার জাহাজে উঠার সময় কেনো জানি খুব মন খারাপ হয়ে গেলো। বারবার মনে হচ্ছিলো থেকে যাই এখানে। এবার আর গাঙচিলগুলো দেখতে পেলাম না। মনে হলো আমাদের চলে যাওয়াতে ওরাও বিষণ্ন। রাতে এসে কঙ্বাজার পেঁৗছলাম। পরদিন আমরা কঙ্বাজার ত্যাগ করবো তাই সবাই কেনাকাটা করতে মার্কেটে গেলো।



 



চতুর্থ দিন



এদিন আমরা সূর্যোদয় দেখতে যাই। সকালবেলা মানুষ বেশি ছিলো না বীচে। সমুদ্রের গর্জনের সাথে সাথে সূর্য ওঠা, অন্যপাশে চাঁদের অস্ত যাওয়া একটা দেখার মতো দৃশ্য ছিলো। বীচে, পাশের ঝাউবনে ঘুরাঘুরি করে, ছবি তুলে দুপুরের মধ্যে আমরা চট্টগ্রামে যাওয়ার বাসে উঠলাম। চট্টগ্রাম গিয়ে রাতের খাবার খেয়ে বিজয় মেলায় ঘুরতে গেলাম। সেখানে সবচেয়ে মজা লেগেছিলো নাগরদোলা। সাবের যে এতো একটা ভীতুর ডিম সেটা আমি আগে কখনোই ভাবিনি। উপরে উঠার পর তার আতঙ্কটা দেখার মতো ছিলো।



 



পঞ্চম দিন



এদিন খুব ভোরে মাহাবুব ফেরত চলে আসে (ওর ছুটি শেষ হয়ে গিয়েছিলো বলে)...আমাদের গন্তব্য ছিলো চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা আর ফয়েজ লেক।



ফয়েজ লেকে আমরা যেই রাইডটাতে উঠেছিলাম সেটাতে তাসনিমকে ভীষণ মিস করেছিলাম। কেনো সেটা বাকিরা বুঝতে পারবে।



দুপুরের খাবার খেয়ে বিকেল ৫টার ট্রেনে আমরা উঠে বসি। এবার যে ফিরে আসার পালা। পুরো ট্রেনে সিট খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পরে টিকেট চেকার এসে দেখে আমাদের ৫টা টিকেটের মধ্যে ২টা টিকেট ছিলো চাঁদপুর থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার টিকেট। আমরা ভয়ে ভয়ে ছিলাম, যদিও কোনো সমস্যা হয়নি। বসতে একটু কষ্ট হয়েছিলো তারপরও আড্ডা, গল্পে কোনো কিছুকেই কষ্ট মনে হয়নি।



শেষে একটা মানুষকে নিয়ে না বললেই নয়। আমাদের সবার প্রিয় আলমগীর হোসেন বাহার স্যার। স্যার থাকাতেই সবকিছু এতো ভালোভাবে শেষ হলো। আপনাকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করবো না স্যার। শুধু বলবো, সবসময় এমন ভালোবাসা দিয়ে আমাদের আগলে রাখবেন। এই ভ্রমণে একমাত্র বিমান ছাড়া আমাদের সব যানবাহনেই ওঠার অভিজ্ঞতা হয়েছিলো। সাইকেল, রিক্শা, ভ্যান, ট্রেন, বাস, জাহাজ, স্পিডবোট সব...।



পরিশেষে একটাই কথা, আমি আবারও ওখানে যেতে চাই। অ..নে..ক মিস করছি। আর আমি মনে করি জীবনে একবার হলেও সবার সমুদ্রকে কাছ থেকে দেখে আসা উচিত। সারা দুনিয়াকে আল্লাহ কত সুন্দর করেই না সৃষ্টি করেছেন; আর সেসব সৌন্দর্য দু চোখ মেলে দেখা উচিত।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৩৩৮৪৭১
পুরোন সংখ্যা