চাঁদপুর, শনিবার ২০ এপ্রিল ২০১৯, ৭ বৈশাখ ১৪২৬, ১৩ শাবান ১৪৪০
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • চাঁদপুরে স্কুল শিক্ষিকা জয়ন্তীর চাঞ্চল্যকর হত্যার রহস্য উদঘাটন * হত্যাকারী ডিস ব্যবসায়ী লাইনম্যান জামাল ও আনিসুর রহমান আটক
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৪৮-সূরা ফাত্হ্


২৯ আয়াত, ৪ রুকু, মাদানী


১। হে মুমিনগণ! আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের সমক্ষে তোমরা কোন বিষয়ে অগ্রণী হইও না এবং আল্লাহকে ভয় কর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।


২। হে মুমিনগণ। তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের উপর নিজেদের কণ্ঠস্বর উঁচু করিও না এবং নিজেদের মধ্যে যেভাবে উচ্চস্বরে কথা বল তাহার সহিত সেইরূপ উচ্চস্বরে কথা বলিও না; কারণ ইহাতে তোমাদের কর্ম নিষ্ফল হইয়া যাইবে তোমাদের অজ্ঞাতসারে।


 


 


 


assets/data_files/web

ভালোবাসার কোনো অর্থ নেই, কোনো পরিমাপ নেই।


-সেন্ট জিরোমি


 


 


নামাজ বেহেশতের চাবি এবং অজু নামাজের চাবি।


 


 


 


ফটো গ্যালারি
বিস্মৃত রক্তস্নান
নাহার তৃণা
২০ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+

ছেলেটাকে চোখে চোখে রাখার জন্য মা আড়মোড়া ভেঙে উঠে পড়ে।

_খাড়া বাজান, আমি আসতাসি।

বাদল মায়ের আগে আগে চপল পায়ে বদনা হাতে বারোয়ারি পায়খানার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। মা খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে চোখ ইশারায় তাকে ভেতরে গিয়ে কাজ সেরে আসার ইঙ্গিত করে। এখন পায়খানার এদিকটায় ভিড়বাট্টা তেমন নাই।

জরিনা বেগমকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ইটভাটায় কাজ করা সেলিনা খালা চিন্তাগ্রস্ত মুখে এগিয়ে আসেন।

_কী গো বাদলের মা, তোমরা এইহানেই থাকবা ঠিক করসো, নাকি সইরা যাইবা?

বুক ঠেলে উঠে আসা দীর্ঘশ্বাসটা ফেরত পাঠিয়ে জরিনা বলে, না গো খালা, যামু আর কই? এইহানেই থাহুম।

নারী দুজন আসন্ন বিপদ নিয়ে নিজেদের মধ্যে কথোপকথনে কিছু সময়ের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

বাদল ভালো মানুষের মতো কাজ সেরে বেরিয়ে, মা আর সেলিনা নানির আলাপে মগ্ন দৃশ্যটা দেখে। মায়ের দিকে হাঁটা দিতে গিয়েও কী মনে হওয়ায় চট করে বাঁক ঘুরে পাশের গলিটায় সেঁধিয়ে যায়। গত দুদিন ঘরে থাকতে থাকতে হাত পায়ে খিল ধরে গেছে। শহরে নাকি কারফু দিছে, তাই ঘর থেকে বের হওয়া মানা। কারফু সে জানে না। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার আনন্দটা বেশ জানে। হাসপাতালের সামনে সবুজ খোলা মাঠ, গাছগাছালির বাগান। খেলাধুলার জায়গা না হলেও ওখানে পা ছড়িয়ে বসে থাকতে বেশ লাগে। রাস্তার ওপাশে মার্বেল খেলে ওর বন্ধুরা। এই সময়টায় মামুন, ফরিদকে বটগাছ তলায় পাওয়া যাবে। এই যে ওকে চোখে চোখে পাহারা দিয়ে আটকে রাখার চেষ্টা। সেটাই বুঝি বাদলকে নিষেধের দেগে দেওয়া রেখা অতিক্রমের হাতছানি দেয়। মুহূর্তে পেয়ে যাওয়া সুযোগটা লুফে নিয়ে কী এক ঘোরে বাদল ছুটতে থাকে হাসপাতালের মোড় লক্ষ্য করে।

ছুটতে, ছুটতে, পথে তেমন গাড়ি-ঘোড়া চোখে পড়ে না বাদলের। লোক চলাচলও তেমন নাই। চারপাশটা কেমন থমথমে। একবার মনে হয় ফিরে যায়। মা বেচারি এখনো হয়তো দাঁড়িয়ে আছেন তার অপেক্ষায়।

এখন ফিরে গেলেও মা বুঝবেন না তাঁর চোখ ফাঁকি দিয়ে সে পালিয়েছিল। পর মুহূর্তেই মনে হয়, ধুর! দেখেই আসা যাক ঘটনা কী। মিলিটারি স্বচক্ষে দেখেনি বাদল। পুলিশ দেখেছে। তার মতো ছোট ছেলেদের মিলিটারি নিশ্চয়ই কিছু করবে না। বড় জোর বকাঝকা করতে পারে। বকাঝকা তো ওদের কাছে গায়ের ময়লা। মৃদু একটা হাসিতে ভরে ওঠে বাদলের গোলগাল মায়াভরা মুখটা।

হাসপাতালের কাছে পৌঁছে হাঁপাতে হাঁপাতে চারপাশটা দেখে অবাক হয় বাদল। এ জায়গা এত সুনসান অবস্থায় সে কখনো দেখেনি। গেটের কাছ ঘেঁষে ছোট্ট দোকানের ঝাপটা বন্ধ। প্রতিদিন যেখানে কিছু রিকশা জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, এখন সেখানটা খাঁ খাঁ করছে। কেউ নাই কোথাও। ফরিদ বা মামুন কাউকেই দেখতে পায় না আশপাশে। গত দুদিন এদিকে আসেনি সে।

বটগাছ তলায় এসে বসে বাদল। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে দেখবে। ফরিদরা এলে ভালো, নইলে সে ফিরে যাবে। সূর্যের দিকে তাকিয়ে কয়টা বাজে আন্দাজ করতে চায় বাদল। প্রতিদিন এই সময়টাতে হাসপাতালের সামনে হইহট্টগোলে আলাদা একটা চেহারা নেয় পুরো এলাকাটা। আজকের এই থমথমে পরিবেশটা বুকে কেমন কষ্ট কষ্ট অনুভূতি ছড়িয়ে দিচ্ছে সন্তর্পণে। বাদলের খামোখাই কেমন কান্না পায়।

এই প্রথম তার মনে হয় কাজটা সে ঠিক করেনি। ঘরে ফেরা দরকার। ঠিক তখন বাদলের চোখ পড়ে হাসপাতালের দালান ঘেঁষে দাঁড়ানো কয়েকজন অস্ত্রধারী সৈনিকের দিকে।

সর্বনাশ! ওরা কারা? মিলিটারি? ওদের জন্যই তাহলে চারপাশ এত সুনসান!

মন বলছে পালাতে হবে। এখনই সরে পড়া দরকার। বাদল আস্তে আস্তে পেছনে ঘুরে চকের দিকে ছুটতে যাবে, এমন সময় বাজখাই কণ্ঠে কেউ ডেকে ওঠে। বাদল তাকিয়ে দেখে ওই বেখাপ্পা চেহারার লোকদের একজন হাতছানি দিয়ে ওকেই ডাকছে। ধরা পড়ে গেল সে। আর উপায় নাই। গুটিসুটি পায়ে এগিয়ে যায় ওদের দিকে।

লোকটা বিজাতীয় ভাষায় কিছু একটা বলছে গাছটা দেখিয়ে। যার অর্থ বাদল কিছুই বুঝতে পারে না। কিছুক্ষণ চেষ্টার পর ব্যর্থ হয়ে, ভেতর থেকে আরেকজনকে ডেকে আনা হয়। সে তাকে ভাঙা বাংলা আর উর্দু মিশিয়ে কিম্ভূত ভাষায় বোঝাতে সক্ষম হয়, বাদলকে সামনের গাছটায় উঠতে হবে। গাছের ওপর একটা পতাকা উড়ছে। ওই রকম পতাকা নিয়ে মিছিল দেখেছে সে রাস্তায়। কয়েক দিন আগেও ওই পতাকা শহরের সবখানে উড়েছে। অলিতে গলিতে, বাড়ির ছাদে ছাদে। মিলিটারির ভয়ে গত কদিনে সবাই নামিয়ে ফেলেছে। কিন্তু এই পতাকাটি রয়ে গেছে। এখন বাদলকে গাছে উঠে বাতাসে অহংকার ছড়িয়ে উড়ছে যে পতাকা, ওটা নামিয়ে আনতে হবে। বাদল অবাক হয়, যেদিন গফুর চাচা এই পতাকাটা গাছে বেঁধেছিল, সেদিন অনেকের সঙ্গে বাদলও উপস্থিত ছিল। কিছু মানুষকে কাঁদতেও দেখেছিল বাদল। সে কান্না আনন্দের না দুঃখের, তার সবটা না বুঝলেও এটুকু বুঝেছিল, এই পতাকা অনেক বড় কিছু, একে সম্মান দেখাতে হয়। উপস্থিত মানুষগুলো সেদিন পতাকার দিকে হাত তুলে সালামের ভঙ্গি করেছিল। পুলিশেরা যেমন করে। কিন্তু এই খাম্বার মতো লোকগুলো পতাকাটা নামিয়ে আনতে বলছে কেন? এরা কারা?

_বুঝ লিয়া?

কিম্ভূত বাক্যটা উড়ে আসার পর মুহূর্তে একটা সবল হাতের তীব্র থাবা বাদলকে গাছের কাছে নিয়ে আসে। বাদল কতবার উঠেছে এই গাছে। শুধু এই গাছে না, যেকোনো গাছ বাইতে ওস্তাদ বাদল। ঘটনার আকস্মিকতায় এখন যেন বুঝই পাচ্ছে না কীভাবে গাছে উঠতে হয়! মুহূর্তকাল থম ধরে দাঁড়িয়ে থেকে জড়তা নিয়েই গাছে ওঠে। পতাকাটা খুলে হাতে নেয় বাদল। নিচে দাঁড়িয়ে থাকা খাম্বাগুলো পতাকাটা নিচে ফেলার ইশারা করে। এমন জিনিস ছুড়ে নিচে ফেলতে বাদলের মন সায় দেয় না। সে যত্ন নিয়ে পতাকাটা ভাঁজ করে বুকের কাছটাতে ধরে। কেমন সুন্দর কর্পূরের গন্ধ পতাকার শরীরজুড়ে! নাকি কোনো ফুলের?

ওদের কথা অগ্রাহ্য করায় নিচ থেকে হুংকার ভেসে আসে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একঝাঁক গুলি ছুটে এসে বাদলকে তীব্রভাবে আলিঙ্গন করে।

গাছের ডালে ডালে বাস করা অসংখ্য পাখপাখালি হঠাৎ নৈঃশব্দ্যের বুক এফোঁড় ওফোঁড় করা গুলির শব্দে দারুণ ত্রাসে উড়ে পালায় দিকশূন্যপুরে। বাদলের শরীরটা একটা মোচড় দিয়ে গাছের ডালে বাড়ি খেয়ে আছড়ে পড়ে নিচের সবুজ ঘাসের গালিচায়। ওর খোলা দুই চোখে তখনো জমাট বিস্ময়! বুকের কাছে ধরে থাকা লালুসবুজ পতাকা ভিজে উঠেছে বুকের রক্তে। সর্বক্ষণের সঙ্গী পকেটে রাখা মার্বেলগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে এদিক সেদিক...।

পাদটীকা : একাত্তরের পঁচিশে মার্চের পর চট্টগ্রাম শহরে ক্যাপ্টেন রফিকের বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালে প্রবর্তক মোড় ও মেডিকেল-সংলগ্ন এলাকা ইপিআর সৈন্যদের নিয়ন্ত্রণে ছিল ২৯ মার্চ ১৯৭১ সকাল পর্যন্ত। সেদিন বিকেলে অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তি জাকির হোসেন রোডে একটি অ্যাম্বুলেন্স পাঠাতে অনুরোধ করে অসুস্থ কাউকে আনার জন্য। অ্যাম্বুলেন্সটি ফিরে এলে অসুস্থ রোগীকে ভেতরে নেওয়ার জন্য ডাক্তার-নার্স ছুটে এলে দেখা যায় দরজা খুলে ভেতর থেকে পাকিস্তানি সৈন্য বেরিয়ে আসছে। এভাবে ভাঁওতা দিয়ে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দখলে নেয় পাকিস্তানিরা।

পরদিন সকালে কারফিউ চলছিল। হাসপাতালের সামনের একটা গাছে বাংলাদেশের পতাকা উড়ছিল। পাকিস্তানিরা একটা কিশোরকে বলে গাছে উঠে পতাকাটা নামিয়ে ফেলতে। কিশোরটি ভয়ে ভয়ে গাছে উঠে পতাকা খুলে নেয়। তারপর কাঁপা কাঁপা হাতে যখন পতাকাটি ভাঁজ করছিল তখন পাকিস্তানি সৈন্যরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে। ছেলেটার নিথর দেহ একটা ভারী পাথরের মতো ঝুপ করে পড়ে গেল গাছের নিচে। তারপর পাকিস্তানিরা হাসতে হাসতে সেখান থেকে চলে গেল।

তথ্যসূত্র : লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে, মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম (পৃষ্ঠা ১৩৫, ১৩৭)। সূত্র : পরবাস।

আজকের পাঠকসংখ্যা
৩০৮৫১৪
পুরোন সংখ্যা