চাঁদপুর, শনিবার ২০ এপ্রিল ২০১৯, ৭ বৈশাখ ১৪২৬, ১৩ শাবান ১৪৪০
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৪৮-সূরা ফাত্হ্


২৯ আয়াত, ৪ রুকু, মাদানী


১। হে মুমিনগণ! আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের সমক্ষে তোমরা কোন বিষয়ে অগ্রণী হইও না এবং আল্লাহকে ভয় কর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।


২। হে মুমিনগণ। তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের উপর নিজেদের কণ্ঠস্বর উঁচু করিও না এবং নিজেদের মধ্যে যেভাবে উচ্চস্বরে কথা বল তাহার সহিত সেইরূপ উচ্চস্বরে কথা বলিও না; কারণ ইহাতে তোমাদের কর্ম নিষ্ফল হইয়া যাইবে তোমাদের অজ্ঞাতসারে।


 


 


 


assets/data_files/web

যাকে মান্য করা যায় তার কাছে নত হও। -টেনিসন।


 


 


যারা ধনী কিংবা সবকালয়, তাদের ভিক্ষা করা অনুচিত।


 


 


ফটো গ্যালারি
সুখপাখির খোঁজে
কবির কাঞ্চন
২০ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+

গভীর রাত। চারিদিকে ঘোর অন্ধকার। বিশালাকার ফ্ল্যাটে একাকী নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন মোবাশ্বের হোসেন। চাইলে সব অন্ধকার নিমিষেই তাড়িয়ে দিতে পারেন। তবু দ্বিধাগ্রস্ত মনে ফ্ল্যাটের বাতি জ্বালাতে চাইছেন না। আজ কেনো জানি শত চেষ্টা সত্বেও তার চোখের পাতাজোড়া যুক্ত হচ্ছে না। জীবনের এতোপথ অতিক্রম করে এসে আজ তিনি নিঃসঙ্গ। একান্ত আপনজনেরা তাকে ছেড়ে দূরে-বহুদূরে চলে গেছে। কেউ ইচ্ছায়। কেউবা স্রষ্টার আহ্বানে। যেদিন শেষবারের মতো প্রিয়তমা স্ত্রীকে বাড়ির দক্ষিণে রেখে এসেছিলেন সেইদিন থেকে তিনি একাকিত্বের বিভীষিকাময় মুহূর্তকে জীবনে আলিঙ্গন করেছেন।

একমাত্র ছেলের সব আবদার রক্ষা করতে ন্যায়-অন্যায়ের পথে দু হাতে সম্পদের পাহাড় গড়েছিলেন। আজ তার চারিদিকে শুধুই শূন্যতা। বাসার সেই পুরানো চাকর রমজান আলীই তাকে ছেড়ে যায়নি। মালিকের প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে সেই রমজান আলীই এখন তার নিত্যসঙ্গী। পরম আপনজন। জীবনের একান্ত দুঃসময়ের সঙ্গী। শরীরটাও এখন আর আগের মতো তার ইচ্ছামতো কাজ করে না। এই ভালো তো এই খারাপ। প্রায়ই বিছানাকে আপন করে নিতে হয়। এ সময় ঘুরেফিরে ওই একটি বিশ্বস্ত হাতই খুঁজে পান তিনি।

রমজান আলীর কিশোরকাল, যৌবনকাল কেটেছে মোবাশ্বের হোসেনের বাসাকে ঘিরেই। নিজের পরিবারের সদস্যদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভাবতে ভাবতে কখনও রমজান আলীকে নিয়ে আলাদাভাবে ভাবা হয়নি। মাস শেষে হাতে কিছু বেতন দিয়েই তিনি তার দায়িত্ব পালন করেছেন। 'রমজান তার জীবনের অধিকাংশ সময় আমাদের কল্যাণে কাটিয়েছে। সে তুলনায় আমি কী আমার সব দায়িত্ব পালন করেছি? এই সামান্য টাকা দিয়ে তার সংসার ঠিকমতো চলে কি না তার কোনো খবর কী নিয়েছি? তার স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে কিংবা বাবা-মাকে নিয়ে আসলে ও কেমন আছে?' আজ বারবার মোবাশ্বের হোসেনের মনে এমন অসংখ্য প্রশ্ন জাগছে।

রাত সাড়ে বারোটা। রমজান আলী বাইরে থেকে দরজার কলিংবেলে আঙুল চাপলো। মোবাশ্বের হোসেন দরজা খুলে রমজানের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি এখনো যাওনি!

-না, আপনাকে এভাবে রেখে আমি কেমন করে যেতে পারি?

-তোমার বৌ, ছেলে-মেয়ে তো তোমার জন্যে অপেক্ষা করছে।

-জি্ব, তা করছে। কিন্তু যে মানুষটির ওসিলায় আমরা সবাই বেঁচে আছি, তাঁকে অসুস্থ রেখে যাওয়া তো অমানুষের কাজ।

-তোমার বৌ, ছেলে-মেয়েরা তোমার সাথে রাগ করতে পারে।

-না, রাগ করবে না। ওরা আমাকে বিশ্বাস করে। খুব ভালোবাসে। আমি না গেলে ভাববে আমি হয়তো কোনো জরুরি কাজে আটকে গেছি।

-ওহ্! আচ্ছা। তোমার ছেলেটার পড়াশোনার কী খবর?

রমজান আলী খুশি মনে বললো, ও এ বছর ইংরেজি বিষয়ে অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা দিবে।

-ওর যাবতীয় খরচাপাতি কীভাবে ব্যবস্থা করো?

-বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় খরচাপাতি বেশি লাগে না। শুধু আসা-যাওয়ায় কিছু খরচ লাগে। ছেলে আমার খুব ভালো। বাবার অবস্থার কথা চিন্তা করে দুটো টিউশনি করে। তাতেই তার হয়ে যায়। তার উপর প্রতি মাসে আমার হাতে কিছু টাকা তুলে দেয়। সত্যি কথা বলতে কী, আমি তা নিতে চাই না। আমি মনে করি, ওর এখন শেখার সময়। শুধু আমাদের সংসারের কথা ভেবে ও তার সে সময় থেকে কিছু সময় টিউশনিতে ব্যয় করছে। এতে আমরা সাময়িক লাভবান হলেও বাস্তবে ওর ক্ষতি হচ্ছে।

-সামনে তো ওর ফাইনাল পরীক্ষা। আপাতত টিউশনি বাদ দিতে বলো। আর হ্যাঁ, আমি ওর জন্যে তোমাকে কিছু টাকা দেবো। আমি চাই তোমার স্বপ্ন সফল হোক।

-না, স্যার, আমাদের অতিরিক্ত কোনো টাকা লাগবে না। আপনি শুধু আমার ছেলের জন্যে দোয়া করুন।

মোবাশ্বের হোসেন আলমারির ভেতর থেকে কিছু টাকা এনে রমজান আলীর হাতে দিয়ে বললেন, আর না করো না। এগুলো তোমার কাছে রেখে দাও। ছেলের জন্যে হঠাৎ দরকার হলে খরচ করবে। দ্যাখো রমজান, তুমি তো দেখেছো আমি আমার ছেলের জন্যে কত টাকা উড়িয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে টিকলো না। কলেজেও পড়বে না। শেষে অনেক টাকা-পয়সা খরচ করে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালাম। তারপর আমাদেরকে না জানিয়ে গোপনে বিয়ে করলো। আবার শ্বশুরের প্ররোচনায় বিদেশে চলে গেলো। কখনও নিজ থেকে কল দেয় না। আমার মন খারাপ হলে যখন কল দিই তখন কল রিসিভ করলেও ওর সাথে মনভরে কথা বলতে পারি না। আল্লাহ আমাকে অনেক দিয়েছেন। কিন্তু তোমার মতো একটি সন্তান দেননি।

-স্যার, মন খারাপ করবেন না। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমার মন বলছে, একদিন ছোট সাহেব নিশ্চয় তার ভুল বুঝতে পারবেন।

-সেইদিনের জন্যেই তো আজও বেঁচে আছি, রমজান।

রমজান আলী দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বললো, স্যার, রাত একটা পনেরো মিনিট। আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন। আমি তাহলে বাসার দিকে ফিরে যাই। ভোরে ভোরে আসবো।

-আগামীকাল আবার কষ্ট করে বাসায় আসার দরকার নেই। ফজরের নামাজ আমরা একসাথে মসজিদে পড়বো। তারপর বাসায় আসবো।

-আচ্ছা।

এ বলে রমজান আলী নিজের বাসার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায়।

ফজরের আযান শুনে মোবাশ্বের হোসেনের ঘুম ভাঙে। এরপর ওযু করে আস্তে আস্তে মসজিদের দিকে হাঁটতে লাগলেন। ততোক্ষণে রমজান আলী মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর জন্যে অপেক্ষা করছে। দুজনে জমায়েতে নামাজ আদায় করলেন। এরপর মর্নিংওয়ার্কে বের হলেন। কিছুদূর অতিক্রম করার পর রাস্তার পাশের ফুটপাতে একজন লোককে পাতলা কাপড় গায়ে মুড়িয়ে শুয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে এসে ভালোভাবে লক্ষ্য করলেন। লোকটা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মোবাশ্বের হোসেন কয়েকবার লোকটাকে ডেকে জাগানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু মধুর ঘুমে মগ্ন মানুষকে জাগানো এতো সহজ না। শেষে রমজান আলী এগিয়ে এসে লোকটার শরীরকে নাড়া দিলে তার ঘুম ভাঙে। লোকটি ঘুমঘুম চোখে বললো, কে আপনারা? আমার এতো মধুর একটা ঘুমকে নষ্ট করে দিলেন।

মোবাশ্বের হোসেন বললেন, এখানে এভাবে ঘুমাচ্ছেন কেনো? আপনার বাসায় গিয়ে ঘুমাতে পারেন না?

-বাসা থাকলেই তো বাসায় গিয়ে ঘুমাতাম।

-বাসা নেই মানে!

-একসময় বাসা ছিল। টাকা-পয়সা ছিলো। পরিবার ছিলো। সবার জন্যে নিজের সুখকে বিসর্জন দিয়েছিলাম।

কখনো আলাদা করে নিজের ভবিষ্যতের কথা ভাবিনি। তাদের সকল চাওয়া-পাওয়া পূরণ করতেই আমি নির্ঘুম রাত কাটিয়েছি। কিন্তু ব্যবসায় লোকসানে পড়ে নিঃস্ব হয়ে গেলে আমার কাছের মানুষেরাও আমায় ছেড়ে দূরে সরে যায়। তবুও আমি তাদের সাথে থাকতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ভাগ্য আমার সহায় ছিলো না। শেষমেশ রাস্তায় নামতে হলো। প্রথম প্রথম খারাপ লাগলেও এখন তা সয়ে গেছে। এখন আর মনে কোনো কষ্ট লাগে না। এখন ভাবি, জীবন তো একটাই। যেনতেন করে চলে যাবে। এখন তো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামায়াতের সাথে পড়তে পারি। আমার সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রাণভরে কাঁদতে পারি। আগে তো আমার অনেক অনেক ব্যস্ততা ছিলো। আগে ঘুমাতে চাইলেও ঘুম আসতো না। আর এখন এ ফুটপাতে গা রাখতেই তৃপ্তির ঘুম নেমে আসে। মোবাশ্বের হোসেনের দিকে তাকিয়ে বললেন, বলুন, জগতে আমার চেয়ে সুখি আর কে আছে?

মোবাশ্বের হোসেন রমজান আলীর মুখের দিকে তাকিয়ে আবার লোকটার দিকে তাকায়। মনে মনে ভাবে কী বিচিত্র এ পৃথিবী! কারো আছে অঢেল সম্পত্তি। রঙ-বেরঙের অত্যাধুনিক সুবিধাময় ভবন। কিন্তু চোখে ঘুম নেই। মনে শান্তি নেই।

আর কারো শোবার ঘর নেই। অথচ তাদের চোখে শান্তির ঘুম। তাদের মনে জগতের সুখ।

আজকের পাঠকসংখ্যা
৩০৬৬৩
পুরোন সংখ্যা