চাঁদপুর, শনিবার ১১ মে ২০১৯, ২৮ বৈশাখ ১৪২৬, ৫ রমজান ১৪৪০
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫০-সূরা কাফ্


৪৫ আয়াত, ৩ রুকু, মক্কী


৯। আকাশ হইতে আমি বর্ষণ করি কল্যাণকর বৃষ্টি এবং তদ্বারা আমি সৃষ্টি করি উদ্যান ও পরিপক্ক শস্যরাজি।


১০। ও সমুন্নত খর্জুর বৃক্ষ যাহাতে আছে গুচ্ছ গুচ্ছ খেজুর-


১১। আমার বান্দাদের জীবিকাস্বরূপ। বৃষ্টি দ্বারা আমি সঞ্জীবিত করি মৃত ভূমিকে ; এইভাবে উত্থান ঘটিবে।


 


 


assets/data_files/web

প্রতিভাবান ব্যক্তিরাই ধৈর্য ধারণ করতে পারে। -ই. সি. স্টেডম্যান।


যে শিক্ষিত ব্যক্তিকে সম্মান করে, সে আমাকে সম্মান করে।


আমি যে বাবা!
সজীব খান
১১ মে, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+

বাবা ডাক শুনছি আজ অনেক দিন। বাবার অর্থ কি! অনুভব করেছি সেদিন, যেদিন ১৪ মাস বয়সের তাহসিন আহম্মেদ খানকে রাত পৌনে ৮টায় বাড়ি থেকে ডাক্তার দেখানোর জন্যে রওনা দিয়ে রাত সোয়া ৮টার মধ্যে বিভিন্ন এমবিবিএস শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের এক চেম্বার থেকে আরেক চেম্বার, মিনিটের পর মিনিট দাঁড়িয়ে থেকে ডাক্তারের গেটে অপেক্ষা, ডাকাডাকি। কোনো চেম্বারেই ডাক্তারের সাড়া শব্দ না পেয়ে এক মানুষিক যন্ত্রণায় বাবা-মা-বৃদ্ধা নানী আর ৯ বছরের ছোট্ট বোনের অপেক্ষা।

কী করবো ভেবেচিন্তে পারছি না। সময় যাচ্ছে, মোবাইলের ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখি রাত তখন ১০টা। ছোট তাহসিনের কান্নাকাটি, ৯ বছরের বোনটির চোখে ঘুম, আর আমাদের ৩ জনকে ঘ্রাস করছে ভীষণ দুঃচিন্তায়। আমাদের চোখে মুখে অমানিশার ঘোড়। কী করবো কোথায় যাবো, ভেবে-চিন্তে পাই না।

অনেক ভেবে-চিন্তে যার হাত ধরে আমি স্বাধীন পেশায় এসেছি; শ্রদ্ধেয় বড়ভাই বিএম হান্নান, মাহবুবুর রহমান সুমন, এম এ লতিফ, তাদেরকে ফোন করে বিষয়টি বললে তারা কালক্ষেপণ না করে এক এক করে চাঁদপুরের স্বনামধন্য শিশু বিশেষজ্ঞদের কয়েকবার ফোন করেন। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। তার ফোনটি ডাক্তার রিসিভ করেননি। তারাও ব্যর্থ। কিন্তু আমি যে বাবা! আমার চিন্তা আরও বাড়তে থাকে। কী করবো, এখন কোথায় যাবো। সাথে ৯ বছরের মেয়েটির চোখেও ঘুম।

হান্নান ভাই ফোন করে এক হাসপাতালে যাওয়ার জন্য বললেন, সেখানে নাকি ওই ডাক্তার যাবেন। ভাইয়ের কথামত সেখানে গিয়ে রিসিপশনে ডাক্তার কখন আসবে জানতে চাইলে তারা কোনো নিদিষ্ট সময় বলতে পারেননি। দুঃচিন্তা আরও আমাদের বাড়তে থাকে। পরিবারের সবাইকে হাসপাতালে বসিয়ে আমি পায়ে হেঁটে পরিচিত আরেক ডাক্তারের চেম্বারের দিকে রওয়না হলাম। পথেই আরেক বড় ভাই সুলতান মাহমুদ, আবু বকর মানিকের সাথে দেখা। তারাও কয়েক ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করে ব্যর্থ। এমন সময় সুলতান ভাই তার পরিচিত একজনকে ডাক দিয়ে মোটর সাইকেলে পালপাড়ায় এক ডাক্তারের কাছে পাঠান। সেখানেও আমরা ব্যর্থ!

সেখান থেকে ফেরার পথে এক হাসপাতালে গেলে তারা এক ডাক্তারের বাসার ঠিকানা দেন। সেখানে শিশু ডাক্তার নিশ্চিত পাওয়া যাবে। এমন সময় সাদা মনের মানুষ বড় ভাই এম এ লতিফ কল করেন। তাকে ডাক্তারের নাম বলা মাত্রই তিনি বলেন, দাঁড়া আমি আসছি, আমি যাবো। ডাক্তারের সাথে আমার ভাল সম্পর্ক। তিনিও চলে এলেন দ্রুত, রাত তখন প্রায় ১১টা।

ডাক্তার দেখালাম, সমস্যার কথা বলার পর তিনি প্রেসক্রিপশন না করে হাসপাতালে ভর্তি করানোর জন্য নির্দেশ দিয়ে বললেন। আমি তো থাকবো না, আমার রেপারেন্সের রোগী অন্য ডাক্তার দেখবে না। এ কথা শুনে মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। অনেক অনুরোধের পর তিনি প্রেসক্রিপশন করে দিলেন, বের হওয়ার সময় পাঁচশ টাকা ভিজিট দেয়ার পর তিনি বললেন, এখানে না বাহিরে। সেখানে ৫শ টাকা দেয়ার পর বললেন ভিজিট ৬শ টাকা লতিফ ভাই পকেট থেকে টাকা বের করে দিলেন। ওষুধ কিনে চলে এলাম বাড়িতে রাত তখন প্রায় পৌনে ১টা। তাহসিনকে ঔষধ খাওয়ানো হল। সবাই বিছানায় শুয়ে, কিন্তু আমাদের চোখে ঘুম নেই। কিছুক্ষণ পরপর শুধু ছেলের মাথায় হাত দিয়ে জ্বর কেমন আছে_ এমন করতে করতেই রাত কেটে যায়। সকালে আবার ঔষুধ খাওয়ানো হলে জ্বর কিছুটা স্বাভাবিক হতে থাকে। ছেলের জ্বর কমার উন্নতি দেখে সকাল সাড়ে ৯টায় আমি আমার কাজে বের হয়ে গেলাম।

বাড়ি থেকে বের হওয়ার কিছুক্ষণ পর ফোন আসলে, ছেলের জানি কেমন করছে। কথাটা শোনার পর আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো, আমি তো বাবা! কী করবো। কোন কথা না বলেই তাড়াতাড়ি চাঁদপুরে নিয়ে আসার জন্য বললাম। আমিও সেখান থেকেই দ্রুত চাঁদপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। এরমধ্যে বড় ভই এম এ লতিফকে ফোন করলে তিনি সেন্ট্রাল হাসপাতালে নিয়ে আসার জন্য বললেন। দ্রুত সেখানে লতিফ ভাই অভিভাবকের মত ছুটি গিয়ে হাসপাতালে কথা বললেন। তারা লতিফ ভাইকে আগের ডাক্তার দেখানোর জন্য বললেন। লতিফ ভাই আমাকে আগে ডাক্তার দেখানোর জন্য নির্দেশ দিয়ে তিনি চলে আসলেন শহরের আরেকজন শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের চেম্বারে। কিছুক্ষণ পর আমিও সেখানে হাজির। চেম্বারে লোকের পরিস্থিতি দেখে লতিফ ভাই হতভম্ব। কী করবে, কাকে কী বলবে, এমন পরিস্থিতি। এ পরিস্থিতি দেখে বড় ভাই বিএম হান্নানকে ফোন করলে তিনি সাথে সাথে ডাক্তারের ব্যক্তিগত নাম্বারে ফোন করে আমার কথা বলে। আমাকে ফের বিএম হান্নান ভাই ফোন করে বললেন, ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে তোকে ডাকবে। এ বলে তিনি রেখে দিলেন। এর মিনিটের মাথায় আমার নাম ধরে ডাকলে আমি সাড়া দিয়ে কাছে গেলাম। ততক্ষণে আমার স্ত্রী ছেলেকে নিয়ে চেম্বারে উপস্থিত। ভেতরে গিয়ে ডাক্তারকে বিষয়টি খুলে বললাম। আগের দিনের অপেক্ষা ও ডাকাডাকির কথা বললাম, তিনি দেখলেন ও ভর্তি দিলেন সেন্ট্রাল হাসপাতালে। আমরা তার কথামত সেখানে ভর্তি করালাম।

আমি বাবা। প্রতিনিয়তই আমাকে ঘ্রাস করছে দুঃচিন্তা। কিছুক্ষণ পরপর শুধু ছেলের মাথায় হাত দিয়ে আদর আর গাল ভরে চুম খেতে গেলেই চোখ দিয়ে জল নেমে আসে। আমার জীবনে প্রথম আমার কাছের মানুষকে হাসপাতালের বেডে, তাও আমার বুক ছেঁড়া ধন, কলিজার টুকরো। এ কথা ভাবতেই হৃদয় পাঁজরটা ভেঙ্গে খান-খান। নার্স এসে ইনজেকশন দেয়ার জন্য। হাতে ক্যানল পরানোর সময় বাজানের কষ্টে আমি হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলাম। সহকর্মী গাজী মোঃ ইমাম হোসেন আমাকে রুম থেকে বের করে নিজেই দায়িত্ব নিয়ে ক্যানল পরাতে নার্সদের সহযোগিতা করলেন।

হাসপাতাল থেকে চলে আসলাম আরেক সমস্যার জন্য এক আলেমের কাছে। তিনিও ব্যবস্থা দিলেন। হাসতপাতালেই ফিরতেই আবার হাতে পরীক্ষার সস্নিপ। কী করবো বুঝতে পারছি না। ছোট্ট মাসুম বাচ্চা। এত কষ্ট কী করে সহ্য করবে।

চলে গেলাম ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। সেখানে গিয়ে বস্নাড নেয়ার সময় বাজানের চিৎকার আমাকে জ্ঞানহীন করে। অনেক ধৈর্য্যের পর পরীক্ষা হল। বাজানকে কোলে নিতেই ঘুমিয়ে পড়লো। আমিও স্বযত্নে বাজানকে কোলে আগলে রাখলাম। হাসপাতালে জীবনে প্রথম এত সময় এক নতুন অভিজ্ঞতা। সন্ধ্যা নেমে আসলো। পরের দিন আবার আলিচা তানহার গণিত পরীক্ষা। ছোট মেয়ে সেও হাতপাতালে আমাদের সাথে একমাত্র ভাইয়ের জন্য সময় দিচ্ছে। অনেক ভেবেচিন্তে চলে আসলাম বাড়িতে। কিছুক্ষণ পরপরই ফোন কী খবর বাজানের?

পরের দিন সকাল তানহাকে স্কুলের জন্য রেডি করে চলে গেলাম হাসপাতালে। সেখানে গিয়ে বাজানকে আগে কোলে নিয়ে দু গাল ভরে চুম খেলাম। বাজানের শরীর কেমন যেন দুর্বল। শরীরটা শুধু কাঁপছে। সেদিনও আগের নিয়মে কেটে গেলো। রাত পৌনে ১২টায় হাসপাতালতে থেকে ফোন। রিসিভ করলে তাহসিনের মা বললেন, ডাক্তার এই মাত্র দেখে গেলেন। বললেন, কাল বাড়িতে নিয়ে যেতে পারবো। মনে একটু স্বস্তি এলো। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলাম।

রাত পোহালেই তানহাকে স্কুলের জন্য তৈরি করে দ্রুত হাসপাতালে। সেখানে গিয়ে বাজানের শরীরের একটু উন্নতি দেখে চোখে মুখে আনন্দ। বাজানকে কোলে নিয়ে হাসপাতালের গলিতে কিছুক্ষণ ঘুরাফেরা। এর মাঝে বাড়ি যাওয়ার জন্য সকল কিছু প্রস্তুত। হাসাপাতালের কাউন্টারে গিলে তারা বিলের কাগজ হাতে তুলে দিলে যে অভিভাবকের মত তাহসিনের অসুস্থতায় অসীম পরিশ্রম করেছেন_ এম এ লতিফ ভাই তাকে ফোন করলাম। তিনি দ্রুত চলে এলেন। হাসপাতালের বিল পরিশোধ করে বাড়ি চলে এলাম। ডাক্তারের পরামর্শ দিলেন নিয়মিত ১০ দিন একটি করে ইনজেকশন দেয়ার জন্য। আল্লাহ অশেষ কৃপায় তাসসিন এখন সুস্থের পথে।

এ পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা, মহান রাব্বুল আলআমিন যেন আমাদের নয়নের মনি, বুকছেঁড়া ধনকে দ্রুত সুস্থ ও দীর্ঘায়ু দান করেন। আমিন।

আজকের পাঠকসংখ্যা
৪১০৫৭৭
পুরোন সংখ্যা