চাঁদপুর, শনিবার ১০ আগস্ট ২০১৯, ২৬ শ্রাবণ ১৪২৬, ৮ জিলহজ ১৪৪০
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫৪-সূরা কামার


৬২ আয়াত, ৩ রুকু, মক্কী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


২৮। এবং উহাদিগকে জানাইয়া দাও যে, উহাদের মধ্যে পানি বন্টন নির্ধারিত এবং পানির অংশের জন্য প্রত্যেকে উপস্থিত হইবে পালাক্রমে।


২৯। অতঃপর উহারা উহাদের এক সংগীকে আহ্বান করিল, সে উহাকে ধরিয়া হত্যা করিল।


 


মা সবক্ষেত্রে সব পরিবেশেই মা।


-লেডি অ্যানি বার্নার্ড।


 


 


মায়ের পদতলে সন্তানদের বেহেশত।


 


 


ফটো গ্যালারি
ছায়ার কাছে হেরে যাওয়া প্রেমিক
সোহেল নওরোজ
১০ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা চোখ এতটা ভয়ংকর হতে পারে মাইশার জানা ছিল না। ছাত্রী হিসেবে সে মাঝারি মানের। টেনেটুনে পাস করে এতটা পথ এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির 'অতি আশ্চর্য' বিষয়টি বাদ দিলে পড়াশোনা নিয়ে তার তেমন সুখস্মৃতি নেই। উচ্চ মাধ্যমিকের ফলাফল দেখে বাসার সবাই সিদ্ধান্তে পেঁৗছে গিয়েছিল, আর যাই হোক এ মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবে না। সে নিজেও বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে স্বপ্ন দেখা বাদ দিয়ে গান শোনা এবং গল্পের বই পড়াতে মন দিয়েছিল। বান্ধবীদের জোরাজুরিতে কয়েকটা ফরম পূরণ করেছিল বটে, কিন্তু শেষমেশ পরীক্ষা দিতে যাবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় ছিল। বীথি মেয়েটা ওমন নাছোড় না হলে হয়তো এক কিছু ঘটত না তার জীবনে। 'আমাকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য হলেও যেতে হবে'-বীথির এই অনুরোধ উপেক্ষা করতে না পেরেই মূলত ওদের সঙ্গী হয়েছিল মাইশা। একটা ইউনিটে পরীক্ষা দিয়েই যা বোঝার বুঝে গিয়েছিল। সেখানেই যতি টেনে, এদিন-সেদিক ঘুরে বান্ধবীদের সঙ্গে বাড়ি ফিরে এসেছিল।



 



সেদিন দুপুরে সমরেশ মজুমদারের একটা বই নিয়ে বসেছিল। কয়েক পৃষ্ঠা পড়তেই কাহিনির ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল। ওদিকে যে মুঠোফোন বেজেই চলেছে, সে খেয়াল নেই। টানা চলি্লশ মিনিট বইয়ের মধ্যে বুঁদ থাকার পর যখন মুঠোফোন হাতে নেয় তাতে সাতটা মিসড কল লেখা দেখাচ্ছে। সব বীথির নম্বর থেকে। ভর্তি পরীক্ষার পর বীথির সঙ্গে যোগাযোগ অনেকটাই কমে গিয়েছিল। নিয়তি হয়তো এটা চায়নি। তাই বীথির সঙ্গে একই ইউনিটে পড়ার সুযোগ পেয়ে যায়। তার নিজেরও ঘটনাটা বিশ্বাস করতে সময় লেগেছে। বাসার কাউকে না জানিয়ে অযত্নে-অবহেলায় ফেলে রাখা প্রবেশপত্র নিয়ে তখনই বীথির কাছে ছুটে যায়। একবার-দুবার নয়, বিভিন্ন পত্রিকা ঘেঁটে ফলাফল বের করে অনেকবার মেলানোর পর যখন নিশ্চিত হয়, এটি তারই রোল নম্বর তখন বীথিকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কান্না শুরু করে। দিনের আলো সরে পড়ার পর পত্রিকাগুলো নিয়ে বীথি আর সে যখন বাড়িতে হাজির হয়, বাবা তখন চায়ের কাপ হাতে নিয়ে পত্রিকার পাতায় চোখ বুলাচ্ছে। বীথিকে নিজের ঘরে পাঠিয়ে সে নিঃশব্দে বাবার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। বাবা চোখ না তুলেই কথা শুরু করেন।



 



'কীরে মা, কিছু বলবি নাকি?'



'এত মনোযোগ দিয়ে কী পড়ছ বাবা?'



'কী আর পড়ব বল, পত্রিকায় ভালো কোনো খবর থাকলে তো! দেশটা নিয়ে মাঝেমধ্যে বড় চিন্তা হয়। আমরা আসলে কোন দিকে যাচ্ছি ঠিক বুঝতে পারি না।'



'আমাকে নিয়ে তোমার চিন্তা হয় না বাবা?'



'কমবেশি চিন্তা তো হয়-ই।'



'বাবা, আজকের পত্রিকায় ছাপা হওয়া একটা খবর আছে, যা হয়তো তোমার চিন্তা অনেকটাই কমিয়ে দেবে। হাজারটা খারাপ খবর ভুলে ওইটাই বারবার দেখবে।'



'কী শুরু করলি, খুলে বল তো কোন খবরটা!'



'খবর বললে ভুল হবে, কেবল একটা সংখ্যা।'



'আমাকে কি তোর নাটক-উপন্যাসের কোনো চরিত্র মনে হচ্ছে। এমন লুকোচুরি করছিস কেন? তাড়াতাড়ি বলে ফেল।'



'এগারো পৃষ্ঠায় যাও।'



'আচ্ছা যাচ্ছি, তারপর?'



'ওখানে একটা বিজ্ঞপ্তি আছে।'



'বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আমি কী করব?'



'আহা যাও তো!'



'এটা তো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার ফল! তার মানে...'



 



আর কোনো কথা না বলে মাইশাকে জড়িয়ে ধরে তার বাবা। ভালো খবরের খোঁজে চাতক হয়ে ওঠা চোখ দুটিতে তখন আনন্দ বয়ে বেড়ানো অশ্রুর সমারোহ। কী আশ্চর্য, মাইশাও খবরটা দেখে বীথিকে জড়িয়ে ঠিক এভাবেই কেঁদেছিল!



 



ক্যাম্পাসের পরিবেশ অনেককে অনেকভাবে বদলে দেয়। মাইশা নিজের ভেতর কোনো পরিবর্তন টের পায় না। পাঠ্যবইয়ের পাতা তাকে কখনোই সেভাবে টানেনি। এখন তো আরো টানে না। এ নিয়ে বাসার কারো মাথাব্যথা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে পাস না করে বেরোবে না, আর সবার মতো তার বাবা-মায়েরও একই ধারণা। পাঠ্যবই না টানলেও একজোড়া চোখের আকর্ষণ মাইশা অস্বীকার করতে পারে না। সে চোখে সর্বনাশের ভাষা স্পষ্ট দেখতে পায়। মুক্ত আকাশে ওড়ে চলা শঙ্খচিলের মতো মনের অলিতেগলিতে বলতে না পারা কথাগুলো ওড়ে বেড়ায়। ছেলেটার মতো নিষ্পলক তাকিয়ে থাকতেও পারে না। চোখে চোখ পড়লেই সরিয়ে নেয়। একবার সামনে দাঁড়ালে ছেলেটি কি আর এভাবে তাকাবে না, নাকি মাইশাও ওর মতোই 'অপলক তাকিয়ে থাকা' ব্যাধিতে সংক্রমিত হবে-তা জানতেই সাহস করে এক দিন রাশিকের মুখোমুখি হয়।



 



'কারো দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা কি ঠিক?'



 



রাশিকের ভাবান্তর হয় না। শুধু সর্বগ্রাসী দৃষ্টিতে মাইশাকে দেখে। মাইশা তাতে পুড়ে যায়। দূর থেকেই যে দৃষ্টির উত্তাপ অনুভব করা যায় কাছে এলে তা এত তীব্র হবে-এটাই স্বাভাবিক।



'এভাবে চুপ হয়ে থাকা কত বড় অভদ্রতা সেটা কি জানেন?'



 



কোনো কথা বলে না রাশিক। কেবল ওপর-নিচে কয়েকবার হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ায়। মাইশার অস্বস্তি তাতে কয়েকগুণ বেড়ে যায়। নীরব থাকা মানুষগুলোকে সে একেবারেই সহ্য করতে পারে না।



 



মাইশার দিকে তাকিয়ে থাকা ছেলেটিকে ঘিরেই এখন সবার আগ্রহ। অথচ শুরুতে আঞ্চলিকতার বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে কী সংগ্রামই না করতে হয়েছে তাকে! আড়ালে-আবড়ালে রাশিককে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ কম হয়নি! ওই অন্তর্ভেদী দৃষ্টির কারণেই বোধহয় ওর প্রতি মায়া হয় মাইশার। সে যতটুকু পেরেছে তার পাশে থেকেছে। প্রথম বর্ষের সমাপনী পরীক্ষায় ঈর্ষণীয় ফল করে অন্যদের দৃষ্টি তার দিকে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করেছে রাশিক। এখন অনেকেই ওকে পাশে পেতে চায়। পরিস্থিতি বদলে গেলেও একটা বিষয় আগের মতোই আছে। মাইশার দিকে এখনো প্রথম দিনের মতোই চেয়ে থাকে সে। তবে এখনকার তাকানো একপক্ষীয় হয় না। দৃষ্টি দিয়ে কথা বলার বিষয়টা রাশিকের কাছ থেকে ভালোভাবেই শিখে নিয়েছে মাইশা। এতে দুটো লাভ হয়েছে। আগের মতো পাঠ্যবইয়ের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে বিরক্ত লাগে না। যার প্রভাব ফলাফলেও কিছুটা পড়েছে। অন্যদিকে রাশিককে তার দৃষ্টিতে বন্দি করে সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারছে।



 



ভালো ছাত্র হওয়ার এক পিঠ দেখে অভ্যস্ত রাশিক অন্য পিঠটাও দেখতে শুরু করেছে। যে পিঠে রয়েছে নানা প্ররোচনা আর প্রলোভন। সবই তাকে দলে ভেড়ানোর জন্য। কমবেশি ক্যাম্পাসে সক্রিয় সব ছাত্র সংগঠনই নিজেদের দলে দেখতে চায় তাকে। মেধাবীরা দলে থাকলে অনেক সুবিধা। একবার তার ওপর নিজেদের দলের সিল সেঁটে দিতে পারলেই হয়। বাকি জীবন অনুগত হয়ে নতজানুভাবে চলতে হবে। নিজেদের কাজেও ব্যবহার করা যাবে যখন-তখন। রাশিক বিষয়টি অনুধাবন করে। তার এসব ভালো লাগে না। জোর-জবরদস্তি দিয়ে মত প্রতিষ্ঠা করতে হবে কেন? ভালোর দিকে এমনিতেই সবাই ছুটে যাবে, পাশে থাকবে। ভালোর সংজ্ঞা হয়তো একেকজনের কাছে একেক রকম। তা না হলে তার অনুষদের অনেক শিক্ষকও কেন ওদের অনুগত হয়ে থাকবে? অন্যায় দাবি-দাওয়াতে সম্মতি জানিয়ে তাদের পক্ষে কথা বলবে, রাস্তায় নামবে!



(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৪৯২৬২৬
পুরোন সংখ্যা