চাঁদপুর, শনিবার ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ৩ কার্তিক ১৪২৬, ১৯ সফর ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫৬ সূরা-ওয়াকি'আঃ


৯৬ আয়াত, ৩ রুকু, মক্কী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


৯৬। অতএব তুমি তোমার মহান প্রতিপালকের নামের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।


 


 


একটা হাত পরিষ্কার করতে অন্য একটা হাতের সাহায্য দরকার।


-সিনেকা।


 


 


নামাজ যাহাকে অসৎ কাজ হইতে বিরত রাখে না তাহার নামাজ নামাজই নহে; কারণ উহা তাহাকে খোদার নিকট হইতে দূরে রাখে।


 


 


ফটো গ্যালারি
ঢাকার গল্প
রিয়াজ মোচ্ছাবির
১৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


দিনটি ছিলো কি বার বা কত তারিখ মনে নেই। তবে সালটা ছিলো ২০০৯। আমি তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। মে মাসে ঢাকা থেকে বাসায় খালামণিরা আসলো। আমি স্কুল থেকে এসে সবাইকে বাসায় দেখি। তাদেরকে দেখে মনের সুখে বিড়বিড় করে গান গাইছি। তবে গানটা কি গান ছিলো সেটাও ঠিক মনে নেই। বাসায় মেহমান আসলে মজাই আলাদা। কারণ স্কুলে যাওয়া হয় না, আম্মু পড়ার জন্যে বকাঝকা দেয় না। যেটুকু বকা দেয় তা মেহমানদের খাতিরে তা সেরে যায়। সবাই মিলে গল্প করি। ঘুরতে যাই। তার উপর ভালো-মন্দ খাবার তো আছেই।



 



খালামণি বললো আমাকে ঢাকা নিয়ে যাবে। তবে আম্মুর আপত্তি ছিলো এই যে, আমার স্কুল যেতে হবে। সামনে সমাপনী পরীক্ষা। আবার প্রাইভেট আছে। কিন্তু দুইদিন পর স্কুলে গ্রীষ্মকালীন ছুটির বন্ধ দিলো। আর কোনো যাওয়ার জন্যে বাধা রইলো না। তবে আমার আগ্রহটাই ছিলো অনেক বেশি। কারণ বই পড়ার সময় পড়তাম ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী, ঢাকায় এটা আছে, ওটা আছে। অনেকে বলতো ঢাকায় আমি থাকি, ঢাকা থেকে আমি এসেছি, ঢাকায় এটা হয়ছে, ওটা হয়েছে, রেডিও টিভিতেও ঢাকার কথা। সেখান থেকে ঢাকাকে জানার জন্যে আপ্লুত থাকতাম। তাই আগ্রহটা ছিলো বেশি। পাড়ার বন্ধুদের বলতাম আমি ঢাকা যাবো। কেউ বলতো...সত্যি!



 



ঢাকায় যাবি। ঢাকায় কি কি আছে আমাদের এসে বলিছ। কেউ আমাকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাসা করতো। কেউ ব্যাঙ্গ করে বলতো আমরা কতো ঢাকা গেছি...। তুই জীবনও ঢাকা দেখস্ নাই বেটা। যে যাই বলুক না কেনো আমার আগ্রহটা ঠিকই ছিলো। অবশেষে অপেক্ষার অবসান ঘটলো। কদিন পর সবাই ঢাকা যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছিলো। আমার প্রস্তুতি ছিলো নজরকাড়া। আমি ব্যাগে জামা-কাপড়, প্রসাধনী, লাটিম, বল, নিলাম। কিন্তু আম্মু জোর করে ব্যাগে বই ঢুকিয়ে দিলো। সবার কাছ থেকে বিদায় নিলাম। অবশেষে স্টিমারে উঠলাম। স্টিমারে কেবিনে ঢুকে সব রেখে বাইরে আসলাম। দেখি চারদিক অন্ধকার। তবে পূর্ণিমার আলোয় টলমলে পানি দেখা যাচ্ছিলো। নদীর মাঝে মাঝে ছোট ছোট নৌকা। আমি তখন স্টিমারের কিনারায় এসে খোলা বাতাসের তালে গান গাইছি আর চারদিক তাকাচ্ছি। এদিকে সবাই কেবিনে খাওয়া নিয়ে ব্যস্ত ছিলো। সেদিকে আমার খেয়ালই ছিল না। মাঝে মাঝে খালতো বোন ডাকতো খেয়ে যাও। সেদিকে কোনো কানই দেইনি। কারণ মনেপ্রাণে শুধু ভাবতেছি ঢাকা দেখতে কি রকম, ঢাকায় কেমন মানুষ থাকে। সেদিন রাতে একটুও ঘুম আসেনি। সারারাত গল্প করতে করতে কেটে যাচ্ছিলো। মাঝে মাঝে ঘুম পাচ্ছিলো। তবে স্টিমারের আওয়াজে জেগে উঠতাম। ফজরের আজানের সুরে কেবিন থেকে বেরিয়ে আসলাম। দেখি বড় নদী থেকে ছোট নদীতে এসে পড়েছি। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। কোথায় থেকে কোথায় আসলাম। খালতো বোনসহ চলে গেলাম স্টিমারের ছাদে। নদীর দুই কিনারায় শুধুই ইটভাটাগুলো চোখে পড়লো। সামনে যেতে যেতে দেখি ইটভাটা কমে, চোখে পড়লো বিশাল বড় বড় দালান। অবশেষে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরবর্তী সদরঘাট পেঁৗছলাম। দেখি কত বড় বড় স্টিমার, নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। সবাই মালামাল নিয়ে নেমে পড়লাম। সবাই গাড়িতে উঠার জন্যে তাড়াহুড়া করছিলো কিন্তু আমি আহসান মঞ্জিল বইয়ে অনেক পড়েছি সদরঘাট এলাকায় সেটি অবস্থিত। সরাসরি দেখার খুব ইচ্ছ ছিলো। খালামণিকে বললাম আহসান মঞ্জিল যাবো। সবাই আমার কথা শোনে বললো এখন না পরে। সবাই গন্তব্যে যাওয়ার জন্যে বাসে উঠলাম। জানালার পাশে বসলাম। খালামণি আমার পাশে বসলো। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি চারদিকে শুধু বিশাল অট্টালিকা আর মানুষ। আমি উত্তোজিত হয়ে এটা কি-ওটা কি বলতে শুরু করলাম। খালামণি সব পরিচয়সহ দেখিয়ে দিলেন। অবশেষে গন্তব্য পেঁৗছলাম। খালামণির ফ্ল্যাট ৪র্থ তালায়। দুইদিন পর বিকেলে ঘুরার জন্যে খালামণি, আমি রিকশায় করে বের হলাম। রিকশায় বসে শুধু চারিদিক তাকিয়ে ছিলাম। আর হা করে বললাম, 'এতো সুন্দর ঢাকা শহর বানাইয়াছে কোন্ কারিগর?'



 



কি সুন্দর ঢাকা শহর...বাপরে বাপ কি বিশাল অট্টালিকা, গাড়ি আর গাড়ি। খালামণি এতো বড় দালালে কারা থাকে। কেনো থাকে, তাদের ভয় করে না এতো উঁচু দালানে থাকতে কত কি জিজ্ঞাসা করলাম। প্রথমে গেলাম সংসদ ভবন এলাকায়, খালামণি বললো এটার ভেতর সকল সংসদীয় কার্যক্রম চলে এবং সংসদ সদস্যরা আসে। আরো কত কি বললো কিছু বুঝি নাই। শুধু তাকিয়ে ছিলাম। তারপর চলে গেলাম জাতীয় চিড়িয়াখানা। খাঁচায় বন্দি কত জানা, অজানা জীবজন্তু। সব থেকে মজার কথা ছিলো বাঘ দেখে আমি খাঁচার কাছে যেতে চাইনি। খালামণি জোর করে নিয়ে যাওয়ার জন্যে টানছিল। আমি হাউমাউ করে কেঁদে দিয়েছি। পরে শহীদ মিনার এলাকায় ঢুকলাম। রাস্তা থেকে শহীদ মিনার দেখে খুবই উত্তোজিত হয়ে গেলাম। এতোটাই উত্তোজিত ছিলাম রিকশায় বসেই জুতা খুলে হাতে নিলাম। খালামণি বললো আরে কি করো কি করো।



সবাই আমার দিকে তাকিয়ে হাসছিলো আমার কা- দেখে। তিনি বললো, ভেতরে ঢুকে নেই। তার হাত ধরে যখন সিঁড়িগুলো অতিক্রম করছিলাম তখন মনে হলো শহীদেরা আমাকে তাদের দিকে আহ্বান করছে। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ঢুকে বিভিন্ন হল দেখলাম। খালতো বোনসহ কিছুদিন পর আবার ঘুরতে গেলাম। তিনি আমাকে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে নিয়ে গেলো। মুক্তিযুদ্ধের অনেক ছবি, সরঞ্জাম দেখলাম। কয়েকদিন পর আম্মু খালামণির কাছে ফোন করলো আমার স্কুল খুলে ফেলছে। কিন্তু আমার ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার কথা ভালো লাগছিলো না। দুইদিন পর আমাকে নেয়ার জন্যে আব্বু এসে হাজির। আব্বুকে দেখে আমার মন খারাপ হয়ে গেলো। বুঝতে পেরেছিলাম আমাকে নিয়ে যাবে। আমি খালামণিকে শিখিয়ে দিলাম দুমি আব্বুরে বলো দুইদিন তোমাদের বাসায় বেড়াতে। আব্বু রাজি হলো। আব্বুকে বললাম, আব্বু আমাকে ঘুরাতে নিবা না? তিনি আমাকে বললো কোথায় যাবে?



 



আমি বললাম সোনারগাঁও। তিনি বললেন সোনারগাঁও তো ঢাকায় না। তাইলে কোথায়? নারায়ণগঞ্জে। আমি বললাম, নারায়ণগঞ্জ কোথায়? তিনি বললেন, এটা অন্য জেলা, আমি বললাম জেলা কি? এটা ঢাকা থেকে অনেক দূরের একটা জায়গা। তোমারে আমি পরে নিয়ে যাবো সেখানে। আমি বললাম, সোনারগাঁ কি স্বর্ণ দিয়ে বানানো গাঁও? তিনি বিরক্ত সুরে বললেন, না। আব্বু খুবই রাগী ছিলো। তাই আমি আর কিছু বললাম না। ওই সময় আমার কোনো জায়গার নাম জানা ছিলো না। তাই আমার আর কোথাও যাওয়া হলো না। পরের দিন সকালে ব্যাগ গোছাতে গিয়ে দেখি ব্যাগে বল, লাটিম। ঢাকায় আসায় এসবের কথা মনেই ছিলো না। আর বই এর কথাতো বলারই দরকার নেই। সবাইকে বিদায় জানিয়ে গাড়িতে উঠলাম। জালানা দিয়ে সবই দেখছি কিন্তু ভয়ে কিছুই জিজ্ঞাসা করেছিলাম না। এসে পড়ি সদরঘাট। স্টিমারে উঠলাম। কিছুক্ষণ পর স্টিমার ছাড়লো। তখন মনে হচ্ছিলো কোন্ মায়াপুরী ছেড়ে চলে আসতেছি। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো। তখনই মনে মনে ভাবতেছি ঢাকা কেনো বাংলাদেশের রাজধানী। তখন আমি ভাবলাম যেখানে অনেক কিছু দেখা যায়, ঘুরাঘুরি করা যায়, যেখান থেকে আসতে মন চায় না, যেখানে বিশাল দালান, অনেক মানুষ থাকে তাকে রাজধানী বলে।



 



আব্বু আমাকে বললো মন খারাপ? আমি বললাম হ্যাঁ। তিনি বললো কয়েক দিন পর আবার আসবো। তখন আমি স্টিমারের কিনারায় গিয়ে মনের আনন্দে নদীর ঢেউ দেখছি।



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
২২২৯৯১
পুরোন সংখ্যা