চাঁদপুর, শনিবার ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ৩ কার্তিক ১৪২৬, ১৯ সফর ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫৬ সূরা-ওয়াকি'আঃ


৯৬ আয়াত, ৩ রুকু, মক্কী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


৯৬। অতএব তুমি তোমার মহান প্রতিপালকের নামের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।


 


 


একটা হাত পরিষ্কার করতে অন্য একটা হাতের সাহায্য দরকার।


-সিনেকা।


 


 


নামাজ যাহাকে অসৎ কাজ হইতে বিরত রাখে না তাহার নামাজ নামাজই নহে; কারণ উহা তাহাকে খোদার নিকট হইতে দূরে রাখে।


 


 


ফটো গ্যালারি
ছবি থেকে যায়
সোহেল নওরোজ
১৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)



শেষমেশ বাধ্য হয়ে একজনকে জিজ্ঞেস করাতে সে বত্রিশ দন্ত বের করে বিগলিত হাসি হেসে বললো, 'ওই যে সামনে!'



সামনের উঁচু উঁচু বিল্ডিং দেখে লিপটু ভরকে গেল। এখানে বাথরুম কোথায়?



শেষে লোকটাই দেখিয়ে দিল সামনের ওই একতলা বিল্ডিংটাই পাবলিক টয়লেট!



পড়িমরি করে ছুটল ওরা। কিন্তু সামনে গিয়েই হোঁচট খেতে হলো! টয়লেট কোথায়! এ তো ঝকঝকে চকচকে অ্যাপার্টমেন্ট!



বাধ্য হয়ে দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করল, 'এখানে আশপাশে পাবলিক টয়লেট আছে কি!'



দারোয়ান অবজ্ঞার হাসি হেসে বলল, 'টয়লেটের সামনে দাঁড়িয়ে টয়লেট খুঁজে পাচ্ছেন না!'



'এটা টয়লেট!' লিপটুর যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না।



বের হওয়ার সময় একজন টাকা চাইল।



'কিছু তো নিয়ে গেলাম না, বরং ত্যাগ করে গেলাম... তবুও টাকা?'



 



লিপটুর কথা কানে তোলার সময় নেই তার। সে তার মুখস্থ কথাই আওড়াতে লাগল, 'ছোট কাজ পাঁচ, বড় কাজ দশ!' লিপটু টাকা দিয়ে খুশি মনে বেরিয়ে আসছিল। তার বিশ্বাসই হচ্ছিল না যে, এত সুন্দর টয়লেট থাকতে পারে! সে মনে করল, পেছনের ওই সুউচ্চ অট্টালিকাগুলো নিশ্চয়ই ফাইভ স্টার হোটেল হবে। আর এগুলো সেই ফাইভ স্টার হোটেলের টয়লেট! 'যাক,' মনে মনে বলল সে, 'ফাইভস্টারে গ্রহণ করতে (খেতে) না পারলেও গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে বিসর্জন (ত্যাগ) করে যেতে তো পারলাম!'



 



ঠিক তখন ওর মোবাইলে এক বন্ধুর কল এল। বন্ধু জানতে চাইল, ওরা এখন কোথায় আছে, লিপটু তখন ভাব দেখাতে গিয়ে বলে বসল, সে ফাইভ স্টার হোটেলে আছে! পাশে যে গার্লফ্রেন্ড উপস্থিত, তা আর তার খেয়ালে ছিল না। ব্যাপারটা লিপটুর গফেরও বোধগম্য হলো! সে বুঝতে পারল, তার বফ তাকে ঠকিয়েছে। ইচ্ছে করেই ফাইভস্টারে না খাইয়ে বরং হোটেল ছালাদিয়ায় খাইয়ে এখন ফাইভস্টারে বিসর্জন করাতে নিয়ে এসেছে!'



'ব্যস! কেস ওখানেই ডিসমিশ!' মাঝখান দিয়ে আরফু আবারও কথা বলে উঠল।



 



হিরু মাথা নেড়ে বলতে লাগল, 'লিপটুর গফ লিপটুর চালাকি টের পেয়ে রিলেশনটা ওখানেই ডিসমিশ করতে চাইল। ওদিকে, লিপটু তখন অকুল পাথারে। এতক্ষণ ধরে সেই দারোয়ান ওদের খেয়াল করছিল। 'দুজনের দুটি পথ দুটি দিকে গেছে বেঁকে...' এই যখন অবস্থা, অর্থাত্ গেট থেকে বেরিয়ে তারা দুজন যখন আলাদা আলাদা দিকে চলে যেতে উদ্যত হলো, তখন দারোয়ানটি লিপটুর কানে কানে বলল, 'স্যার, কিছু বখশিশ দিন। আপনারে বাঁচিয়ে দিই।' ফাইভ স্টার হোটেলে হাজারের নিচে বখশিশ হয়! এই ভাবনা থেকে লিপটু দারোয়ানের হাতে একখানা পাঁচশ টাকার নোট ধরিয়ে দিলো। তাও কাচুমাচু মুখে। দেখলে মনে হবে সে পাঁচশ নয়, পাঁচ টাকা দিয়েছে! দারোয়ান বেচারা বিগলিত হাসি হেসে বলল, 'ম্যাডাম আপনি স্যারকে ভুল বুঝছেন! এটা ফাইভ স্টার হোটেল নয়। পাবলিক টয়লেট মাত্র।'



 



'তাহলে তো ওদের মধ্যে ঝগড়া হওয়ার কথা নয়!' আরফু ফের কথার মাঝখানে আওয়াজ করে উঠল।



হিরু মুচকি হেসে বলল, 'এর পরের দৃশ্যগুলোর জন্য লিপটু যে মোটেও প্রস্তুত ছিল না...।'



'কী তা?'



 



'লিপটুর গার্লফ্রেন্ড হঠাৎ আফসোসের সুরেই বলে বসল, 'কেমন শহর! এখানে কোনো ফাইভ স্টার হোটেল নেই?' কথাটায় দারোয়ান বেচারার যেন অাঁতে লাগে। কী, তার শহরে ফাইভ স্টার হোটেল নেই! এমন তাচ্ছিল্যেভরা কথা! সে ওদের দুজনকে, বলা বাহুল্য লিপটুর অমতেই একটা ফাইভ স্টার হোটেল পর্যন্ত এগিয়ে দিল। তার কী দোষ, সে তো আর লিপটুর চালাকির কথা জানত না। উল্টোদিকে, পাঁচশ টাকা বকশিশ পেয়েছে! এতটুকু তো সে করতেই পারে!'



'তারপর?' এবারে উপস্থিত সবাই সমস্বরে জানতে চাইল।



 



হিরু বলল, 'লিপটু যেই শঙ্কাটা করছিল, শেষপর্যন্ত সেটাই হলো। বিল পরিশোধ করতে না পারায় ফাইভ স্টার হোটেল কর্তৃপক্ষ তাকে বেঁধে রাখল। অবশ্য ওর গার্লফ্রেন্ডকে তারা ছেড়ে দিল। বেচারি বাধ্য হয়ে একাই ফিরে এল।'



'আর লিপটু! তার কী হলো?'



 



'লিপটু যখন পাবলিক টয়লেটে বসে তার বন্ধুদের জানায় যে, সে ফাইভ স্টার হোটেলে আছে, তখন তারা বুঝতে পারে_নিশ্চয়ই লিপটু ফেঁসে গেছে! কেননা, লিপটুর পরিকল্পনার কথা তারা জানত। তখন তারা টাকা ম্যানেজ করে লিপটুকে ছাড়িয়ে আনে!'



 



'তারপর?' আবারও স্বভাবজাত প্রশ্ন করে বসল আরফু। একটা ঘটনা শেষ করার পরও যদি কেউ জিজ্ঞেস করে বসে, 'তারপর?' তখন উপস্থিত সবাই নির্ঘাৎ তাকে ছাগলগোত্রীয় ঠাওরে বসে। কিন্তু দেখা গেল, অন্যরা আরফুকে মৃদু ভর্ৎসনা করলেও হিরু যেন দ্বিগুণ উৎসাহী। সে বলল, 'ওই দারোয়ান মহাশয় যখন লিপটুদের ফাইভ স্টার হোটেল চেনাতে ব্যস্ত, তখন সেখানে মাননীয় মেয়র মশাই এসে উপস্থিত হলেন। তিনি মাত্রই পাশের ওই ফাইভস্টারে লাঞ্চ সেরেছেন। যখন ইমার্জেন্সী চাপল, তখন তিনি ভেবে দেখলেন, দুদিন আগের তার উদ্বোধনকৃত পাবলিক টয়লেটগুলোর কী দশা একটিবার দেখে আসা যাক! এক ঢিলে তিন পাখি মারা আর কী!'



'তিন পাখি মানে!'



 



'মানে হলো, জরুরি কাজও সারা হলো, জায়গাটাও পরিদর্শন করে আসা হলো, আর পাবলিককে আইওয়াশও দেওয়া হলো!'



'আইওয়াশ মানে!'



'মানে হলো, পাবলিক যখন দেখবে স্বয়ং মেয়র মশাই পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করছেন, তখন তার গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যাবে না!'



'আচ্ছা। তারপর কী করলেন তিনি? নিশ্চয়ই পাঁচশ টাকার জন্য ওই দারোয়ান বেটার চাকরিটাই গেছে!'



 



মেয়রের সাঙ্গোপাঙ্গোরা যখন দেখল, দারোয়ান বেটা নাই! কাজে ফাঁকি দিয়ে হাওয়া খেয়ে বেড়াচ্ছে, তখন তারা ক্ষেপে গেল। শেষে দারোয়ান বেটাকে পেয়ে তারা মেয়রের সামনে হাজির করল। বলতে লাগল, 'দেখলেন তো স্যার, আপনি কষ্ট করে ভালো ভালো কাজ করছেন! আর এমন লোকদের কারণে সেগুলো মাঠে মারা যাচ্ছে! এরে তো লাত্থি মেরে বের করে দেওন দরকার!' পুরোটাই তেলবাজি আর কী!



 



দারোয়ান বেচারা তখন কাচুমাচু হয়ে এক দুর্দান্ত প্রেমকাহিনির সম্ভাব্য যবনিকাপাত কীভাবে ঠেকিয়েছে, মেয়রকে সেই ঘটনা সবিস্তারিত খুলে বলল। তার কথার ভেতরে লিপটুর তার বন্ধুকে বলা সেই কথাটাও ছিল। যা শুনে মেয়র মশাই হঠাত্ চিলি্লয়ে উঠলেন। 'ইয়াহু!'



উপস্থিত সবাই ভীষণ অবাক। কী হলো তাদের মেয়রের!



 



ততক্ষণে মেয়রের চামচাদের কল্যাণে (ফোনে) মিডিয়া এসে ভিড় করেছে। তাদের নানা ধরনের প্রশ্নের জবাবে মেয়র মশাই একসময় বলেই বসলেন, 'এটা পাবলিক টয়লেট নয়! ফাইভ স্টার হোটেল। ফাইভ স্টার হোটেলেও আপনারা এমন পরিবেশ পাবেন কি না সন্দেহ!'



পাশ থেকে তার এক চামচা বলে উঠল, 'সে কারণেই তো আমাদের মেয়র মশাই পাশের ওই ফাইভ স্টার হোটেলে লাঞ্চ সেরে এখানে এসেছেন বিসর্জন দিতে!'



 



তিন



'কী বিসর্জনের কথা বললে?' হঠাৎ হরার কণ্ঠস্বর কানে এল সবার। বেচারা চলে গিয়েও 'আরো চাপা পেটানো'র লোভ সংবরণ করতে না পারায় ফিরে এসেছে। পুরো কথা শুনতে না পেয়ে এখন লেজ ধরে কথার মাঝে প্রবেশ করতে চাইছে সে।



হিরু বলল, 'ও কিছু না। এখন বলো তো_তুমি কিভাবে শহরে গিয়ে পাবলিক টয়লেটে ঢুকে ধরা খেলে?'



 



হিরুর এই প্রশ্ন শুনে হরা তো বটেই বাকি সবারও পিলে চমকে গেল। একটু আগেই হরার বলে যাওয়া কথা শুনে ওরা বিশ্বাসই করে ফেলেছিল, হরা সমপ্রতি কোনো এক ফাইভ স্টার হোটেলে রাত কাটিয়ে এসেছে। কিন্তু এখন এ কী বলছে হিরু!



 



হরা বুঝতে পারল তার অতি লোভে তাঁতি নষ্ট হয়েছে। হিরুর সামনে চাপা পেটাতে গিয়ে রামধরা খেয়েছে! সে কাঁচুমাচু হয়ে পুরো ঘটনা খুলে বলল, 'কিছুদিন আগে ঢাকায় গিয়েছিলাম, বুঝলে। যার কাছে গিয়েছিলাম, গিয়ে দেখি সে নেই! বাসায় ইয়া বড় এক তালা ঝুলছে! এমনটা যে হবে তা কল্পনাও করিনি। ভাবলাম, কষ্ট কেন করব! টাকা যখন আছে, থাকি না একদিন কোনো ফাইভ স্টার হোটেলে। একলোককে জিজ্ঞেস করলাম, 'আশপাশে কোনো ফাইভ স্টার হোটেল আছে কি?'



 



হিরু হঠাৎ বলে উঠল, 'নিশ্চয়ই তুমি কোনো প্রোজেক্টের কাজে গিয়েছিলে? টিএ-ডিএও ছিল!' হরা হিরুর ইঙ্গিতটা বুঝতে পেরেও গায়ে না মেখে বলতে লাগল, 'সে বেচারা আমাকে একটা পাবলিক টয়লেট দেখিয়ে বলল, 'ওই যে ওটাই!'



 



বেটা যে এক আস্ত জোকার ছিল, তার মনে যে মেয়র সাহেবের বলা কথাগুলো প্রভাব বিস্তার করে আছে, আমি তা বুঝতে না পেরে সেখানে গিয়ে দুপধাপ রুম বুকিং দিয়ে ফেললাম। অর্থাৎ, কাউন্টারের লোকটার কাছে জিজ্ঞেস করলাম, 'আমার রুম দেখান।' সে একটা রুমের দিকে ইঙ্গিত করল। সেখানে ঢুকে দেখি টয়লেট! এত সুন্দর টয়লেট দেখে মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল। ভাবলাম, ফাইভ স্টার হোটেলের কী আজব কাজ কারবার! আগে টয়লেট! ভেতরে মূল রুম। তখন বাথরুমের চাপও পেয়েছিল বেশ। তাছাড়া, সারাদিন বাইরে বাইরে থাকায় গোসলটাও হয়ে ওঠেনি। আরামে সবকিছু সারতে ঘণ্টাখানিক সময় লেগে গেল। টয়লেট থেকে বেরিয়ে মূল রুমটা আর খুঁজে পেলাম না। পেলাম না সেই কাউন্টারের লোকটাকেও! বাইরে বেরোতে গিয়ে দেখি কেঁচিগেট আটকানো। বাইরে যাওয়ারও উপায় নাই। বাধ্য হয়ে সেখানেই রাতটা পাড় করে দিলাম আর কী!' আরফু ফক করে হেসে দিয়ে বলল, 'সকালবেলায় সেই কাউন্টারের লোকটা আর দারোয়ানটা বকশিশ চেয়ে বসেনি তো, হরা দা?'



 



হরা লাজুক মুখে বলল, 'না, তারা খেয়াল করেনি। কেবল কাউন্টারের লোকটা জানতে চেয়েছিল, ছোট না বড়?' আমি কী মনে করে বলে ফেললাম, 'বড়।'



 



'ছোট দশ। বড় বিশ। এটা ফাইভ স্টার টয়লেট।' 'আফসোস জাগল, কেন যে 'ছোট' না বলে 'বড়' বললাম! 'ক্যান, বাইরে তো ছোট পাঁচ, বড় দশ।' আমি এই কথাটা বলতে গিয়েও আর বললাম না। 'ফাইভ স্টার মানেই তো টাকার খেইল! টাকা তো একটু বেশিই নিবে। ভাগ্যিস, রাত্রি যাপনের কথাটা আর বলিনি। তাহলে হয়তো পকেটে কানাকড়িও আর অবশিষ্ট থাকত না। সবটাই নিয়ে নিত!'



 



হিরু মুচকি হেসে বলল, 'তাহলে তুমি ভাউচার দেখিয়ে ফাইভস্টারে থাকার খরচের টাকাটা তুলতে পারোনি, তাই না?' হরা মুখ গোমরা করে বলল, 'দিলে তো মনটা খারাপ করে। এখন পিলিজ লাগে এককাপ চা খাওয়াও!'



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৬০৭৭৮৮
পুরোন সংখ্যা