চাঁদপুর, শনিবার ৯ নভেম্বর ২০১৯, ২৪ কার্তিক ১৪২৬, ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫৭-সূরা হাদীদ


২৯ আয়াত, ৪ রুকু, মাদানী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


২৪। যাহারা কার্পণ্য করে ও মানুষকে কার্পণ্যের নির্দেশ দেয় এবং যে মুখ ফিরাইয়া লয় সে জানিয়া রাখুক আল্লাহ তো অভাবমুক্ত, প্রশংসার্হ।


 


 


 


 


 


আমরা বই পড়ে মানুষ চিনতে পারি না। -ডিজরেইলি।


 


 


ঝগড়াটে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট অধিক ক্রোধের পাত্র।


 


 


 


 


ফটো গ্যালারি
কয়েন জমানোর গল্প
সাইফুল ইসলাম জুয়েল
০৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


বাসায় ফিরে জামা-প্যান্ট ছাড়ার সময় হঠাৎই উল্টো করে ধরা প্যান্টের পকেট থেকে একটা কয়েন নিচের মেঝেতে পড়ে গিয়ে ঝনাৎ করে একটা শব্দ করে গড়িয়ে গড়িয়ে ঠিক খাটের তলায় গিয়ে লুকিয়ে পড়লো। আর হঠাৎই আমার ভেতরে যেন ছেলেমানুষী ভর করলো। নুয়ে খাটের তলা থেকে কয়েনটা বের করবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কিছুতেই অতোটা দূরে হাত ঢুকাতে পারছিলাম না। ছোটবেলায়ও এমন করে অনেক কয়েন লুকোতে চেষ্টা করতো। কিন্তু সমুদ্রের তলা থেকে হলেও তাকে ঠিকঠিক খুঁজে বের করে আনতাম। এখন আমি ছোটবেলার থেকে অনেকটা বড় হয়ে গেলেও, আমার সেই পুরণো কসরতটা সময়ের সাথে হারিয়ে যায়নি। কয়েনটা নিয়ে খাটের তলা থেকে যখন বের হয়ে এলাম_তখন আমার মুখে বিজয় আর গর্ব মাখামাখি করতে লাগলো।



'কয়েন'-এর এই এক ঝামেলা। পকেটে রাখলে গড়িয়ে পড়ে। আর মানিব্যাগেও রাখা যায় না। টুপ করে যে কোথায় কখন পড়ে যাবে-সে খেয়ালই থাকে না। কয়েন রাখার সবথেকে ভালো জায়গা হলো মাটির ব্যাংক। আমারও একটা মাটির ব্যাংক আছে। একদিন ঢাকার কলাবাগান এলাকার ফুটপথ দিয়ে হাঁটার সময় হঠাৎ করেই একটা বিশাল সাইজের মাটির ব্যাংক কিনি। প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল_এটাকে শো-পিচ হিসেবে ব্যবহার করে ঘরের শোভা বৃদ্ধি করা। তারপর হঠাৎই একদিন অনেকটা খেয়ালের বশেই মাটির ব্যাংকটাতে কয়েন ফেলতে শুরু করি আমি। একটা পাঁচ টাকার কয়েন। এখন আমার হাতের তালুতে মুঠোবন্দি হয়ে আছে। ধীরে ধীরে সেই কয়েনটাকে নিয়ে সেই মাটির ব্যাংকটির দিকে এগিয়ে যাই। কিন্তু যখনই ওটাকে ভেতরে ফেলতে যাবো, চমকে উঠি আমি। আরে ব্যাংকটি যে ভরে গেছে! দুষ্টু এই কয়েনটিকে জায়গা দিতে সে অনেক গড়িমসি করতে লাগলো। এ কাজটাতেও শেষ পর্যন্ত সফল হয়ে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সোজা গিয়ে সোফায় বসে পড়লাম।



চোখের সামনে অনেক গুলি ঘটনা লাফালাফি করছে। এই প্রথম কোনো মাটির ব্যাংক ভরে গেল, কিন্তু আমি সেটাকে ভাঙলাম না! জীবনে অনেক দু টাকার ব্যাংক কিনে টাকা জমিয়েছি। কিন্তু কোনাদিনই সেই ব্যাংকগুলো কয়েনে পরিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেনি। আমার সে দু টাকার ব্যাংকে শিংহভাগ জাগায় দখল করতো একটা টাকা আর আট-আনার (পঞ্চাশ পয়সা) কয়েন। দু'টাকা আর পাঁচ টাকার কয়েন ছিল সেখানে অতিথি কিংবা রাজকীয় মর্যাদায়। আজ আমার এই বিশাল সাইজের ব্যাংকটিতে আট-আনা, এক টাকা এমনকি দু'টাকার কয়েনেরও কোনো জায়গা হয়নি। আজ ব্যাংকটি ভাঙার কোনো তাড়না বোধ করছি না। অথচ অর্ধ ভরাট সেই দু টাকার ব্যাংকগুলো হাতে নিয়ে প্রায়ই লোক চক্ষুর আড়ালে নাড়াচাড়া করতাম। কয়েনের এক ধরনের সম্মিলিত শব্দ আমার মনে আনন্দের ঝংকার তুলতো তখন। মা যেমন তার পেটে হাত বুলিয়ে সন্তানের বৃদ্ধি অনুভবের চেষ্টা করেন, ঠিক তেমনি ভাবে আমিও ব্যাংকটি কতটা ভরলো তা অনুভবের চেষ্টা করতাম। প্রায়ই অনুমাণ করবার চেষ্টা করতাম, 'কতো টাকা জমতে পারে? পঞ্চাশ, ষাট, নাকি ... না, না, একশত টাকা তো অনেক কিছু, অতো টাকা হতেই পারে না!' একবার একটা ব্যাংক ভেঙে গুণে দেখলাম, তিরানব্বই টাকা হয়ে গেছে। মনেতে আনন্দ আর ধরে না সেদিন। এর আগে আমার কোনো মাটির ব্যাংকে এত টাকা হয়নি। তাছাড়া, কয়েকদিন পরেই ফাল্গুন মাস। ফাল্গুন মাসে আমাদের এলাকায় মেলা বসতো। নানা ধরনের খেলনা পাওয়া যেত, আর ছিল বাহারি খাবারের সমাহার। সেই তিরানব্বই টাকার ভারে আমার বুকের ছাতি যেন কয়েক ইঞ্চি ফুলে উঠেছিল! বারবার পকেটে হাত বোলাতাম। বারবার টাকাগুলো গুণে দেখতাম। আমার বাবা প্রায় দিনই বাজার থেকে চাল কিনে আনতে দেরি করতেন। তারপরেও মাকে দেখতাম, দুপুরে ঠিক সময় মতো আমাদের খাইয়ে দাইয়ে পরে সেই চালগুলো চুলোয় চড়াচ্ছেন। দুষ্টুমিতে ভরা সেই দিনগুলোতে দুপুরের খাবারের পরে আমাদের আর পা মাটিতে পড়তো না। হনহনিয়ে মাঠে ছুটে যেতাম। মাঝে মাঝে নিয়ম যে ভাঙতাম না তা কিন্তু নয়। সেদিন মায়ের পাশে বসে চুলোয় লাড়কি ঠেলে দিতাম।



'বাসা থেকে ভাতের ঘ্রাণ পেয়েছি।' বলতে বলতে ঠিক তেমনই কোনো এক মুহূর্তে আফসার ভাই ঘরে প্রবেশ করতেন। এসে ঠিক চুলোর সোজাসুজি স্থায়ীভাবে পেতে রাখা একটা মোড়ায় বসে পড়তেন তিনি। তাকে দেখে আনন্দে চোখে মুখে ঝিলিক দিয়ে উঠতো। ভীষণ আড্ডাবাজ টাইপের মানুষ এই আফসার ভাই। আমাদের বাসায় অবাদ যাতায়াত ছিল তার। নানা ধরনের গল্প শোনা যেন তার কাছে। ছেলে-বুড়ো সবার সাথেই ছিল তার সমান সদ্ভাব। কতদিন যে তার সাথে মিলে ফেলুদা, শার্লক হোমস সমগ্র পড়ে শেষ করেছি, তার ইয়ত্তা নেই। আমাদের এলাকায় সর্বপ্রথম মাল্টিমিডিয়া ফোন সেট এই আফসার ভাই-ই কিনেন। সেই আফসার ভাইয়ের রুমেও আমার এই বড় ব্যাংকটির মতোন একটা ব্যাংক ছিল। সেটাতে তিনি কেবল পাঁচ টাকার কয়েনই ফেলতেন। আমি যখন তার রুমে যেতাম, আশ্চর্য হয়ে তার ব্যাংকটির দিকে তাকিয়ে থাকতাম, আর মনে মনে ভাবতাম, 'অনেক গুলো টাকাই হবে_এই ব্যাংকটা যদি ভরে। শেষ পর্যন্ত কি তিনি ব্যাংকটি ভরতে পারবেন, নাকি আমার মতোই ভেঙে ফেলবেন?'



দিন কেটে যায়। এক সময় আমরা সেই রোজ রোজ ভরদুপুরে বাজার থেকে চাল কিনে এনে রান্না চড়াবার সময়টাও পেছনে ফেলে আসি। এক সময় বোহেমিয়ান আফসার ভাই বিয়ে করেন। শুনেছি বিয়ের পুরো খরচ মেটাতে তিনি তার সেই মাটির ব্যাংকটিও ভেঙে ফেলেন। তারপর দিন দিন তার অন্যের সাথে আড্ডাবাজিও কমতে থাকে। এখন তিনি অনেকটাই নির্জনতা প্রিয়। বন্ধু, এলাকার ছোট ভাইদের সাথে আড্ডায় যান না। বুঝতে পারি, তার যে আর্থিক অবস্থা, তাতে অন্যদের সাথে মানিয়ে নেওয়া এখন আর সম্ভব নয়। তাছাড়া, সন্তান হয়েছে, এখন সংসারের চিন্তায় বিভোর তিনি। অহেতুক আড্ডায় বাজে খরচ কিংবা সময় নষ্ট করা_কোনোটাই তার সাজে না। এখন শখের বশে হলেও মাটির ব্যাংকে কয়েন ফেলি আমি। পাঁচ টাকার কয়েন। না, সেটা ভেঙে বিয়ে করার মতো এতটা আর্থিক দৈন্য আমার নেই। কিন্তু এখন ঠিকই বুঝি, সেই ছোটবেলায় আমাদের তিনবেলা রুটিন করে খাওয়াতে গিয়ে মায়ের কি পরিমাণ কষ্ট করতে হয়েছিল, আমাদের খাইয়ে মা কতোটা দিন অভুক্ত ছিলেন। এখন বুঝি, আমার দু টাকার ব্যাংকটাও সে সময়ে ভরে ওঠার আগেই কেন ভেঙে ফেলতাম, ধৈর্য্যের বাধ আর কতক্ষণই বা আটকে রাখা যায়? আজ আমি বুঝি, একটা কয়েনের কী দাম। আজ বড়ই সেই দিনগুলোকে ফিরে পেতে ইচ্ছে করছে। আল্লাহ তয়ালার রহমতে অনেক মাটির ব্যাংকই কয়েনের ভরতে পারবো, কিন্তু সেই আফসার ভাইয়ের সাথে বসে বসে অমলিন আড্ডা, নিজে অভুক্ত থেকে মায়ের আমাদের খাওয়ানোর প্রচেষ্টা, মাটির ব্যাংকে একটা কয়েন ফেলার আনন্দ...এর কোনোটাই আর হয়তো কখনোই ফিরে পাওয়া হবে না আমার।



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
১৩৫০৬৪
পুরোন সংখ্যা