চাঁদপুর, শনিবার ১৮ জানুয়ারি ২০২০, ৪ মাঘ ১৪২৬, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • --
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৬১-সূরা সাফ্ফ


১৪ আয়াত, ২ রুকু, মাদানী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


১১। উহা এই যে, তোমরা আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলে বিশ্বাস স্থাপন করিবে এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করিবে। ইহাই তোমাদের জন্য শ্রেয় যদি তোমরা জানিতে!


 


 


দুঃখীদের মনের জোর কম থাকে।


-রবার্ট হেরিক।


 


 


যে ব্যক্তি বিদ্যার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন, তিনি মৃত্যুঞ্জয়ী।


 


 


ফটো গ্যালারি
অন্য মানুষ
সাইফুল ইসলাম জুয়েল
১৮ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


ঝিক ঝিক ঝিক!



মৃদু গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে ট্রেনটা। হালকা ঝাকুনিতে ঘুম ঘুম ভাব আসছে। চোখটাকে কোনো রকমে মেলে ধরে চারিদিকটা সন্দেহ পিপাসু দৃষ্টিতে একবার দেখে নিলাম। মাঝে মাঝে ঢাকার অদূরে টুকটাক ট্রেন ভ্রমণকে বাদ দিলে বলা চলে এটাই আমার প্রথম লং জার্নি বাই ট্রেন। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ বলে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও শত ব্যস্ততার মাঝে ট্রেনে কোথাও যেতে পারিনি। আজ অনেক দিন পরে সেই সুযোগটা পেলাম। চারপাশে চোখ বোলাতে গিয়ে কয়েকটা রহস্যময় চরিত্র চোখে পড়লো। আমার সর্বডানে প্রায় সর্বাঙ্গ ঢেকে রাখা এক লোক। তারই পাশে পাঁচ-ছয় বছরের একটা মেয়ে। মেয়েটি একবার আমার দিকে তাকাতেই চমকে উঠলাম। গভীর মায়া জন্মালো তার প্রতি। মেয়েটির পরে আরো দুজন লোক। বিপরীত পাশে আমার সামনাসামনি দুজন পুরুষ ও তিনজন মহিলা। তবে আবছা আলোয় তাদেরকে ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে না। মনের মাঝে একটা ভয় কাজ করছিল_এই অচেনা পথে কোনো পরিচিত লোকছাড়া ভ্রমণটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। বারবার টেনে ধরা চোখের সাথে তাই মনের যুদ্ধটা চলছিলো বারংবার।



 



(২)



চারিদিকের প্রচণ্ড গণ্ডগোলের মাঝে হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেলো আমার। আমি জেগে উঠতে না উঠতেই ট্রেনটা স্টেশন ছেড়ে দিলো। আমার পাশের একজন যাত্রী নেমে পড়েছেন। ছোট্ট মেয়েটি বারবার আমার মুখের দিকে তাকাচ্ছিলো আর আমি চোখ-মুখে তার সাথে দুষ্টুমি করছিলাম। পরে আনমনে কতক্ষণ বাইরে তাকিয়ে রইলাম। হঠাৎ মেয়েটির চিৎকারে ফিরে চাইলাম। ওর পাশের লোকটিও সোজা হয়ে বসেছেন। মেয়েটি মহাখুশিতে তাকে জিজ্ঞেস করলো, 'বাবা, উনি সেই রোহান আংকেল না?'



হঠাৎ আমার মাথাটা ঘুরে গেলো। মনে মনে বললাম, 'কী বলে? আমার নাম জানলো কী করে?' এতোক্ষণে লোকটিও মাথার চাদর সরিয়ে আমার দিতে চাইলেন। এবার আর কারো চোখেই বিশ্বাসের 'পল' পড়ছে না। পরে আমিই তাকে জিজ্ঞেস করলাম, 'আপনি হাসান ভাই না?'



লোকটি মাথা নাড়ালো। তার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে, সাথে আমারও...



 



(৩)



'কোথায় যাচ্ছ?'



'রাজশাহীতে। আপনি?'



'আমার গন্তব্য তো ওটাই। ভালোই হলো এতোদিন পরে তোমার সাথে দেখা হয়ে। আর গন্তব্য যখন একই তখন আরো ভালো হলো_এই গরিবের বাসায় বেড়িয়ে আসতে পারবে।'



সত্যিকথা বলতে কী_অন্য কেহ যদি আমাকে এমন আমন্ত্রণ জানাতো, তাহলে আমি ব্যস্ততার অজুহাত দিয়ে কাটিয়ে যেতাম। কিন্তু কেনো জানি হাসান ভাইয়ের সাথে সেই ছোটবেলার পরিচয়ের পরে আমি কখনোই তাকে এড়িয়ে যেতে পারিনি। আজও পারলাম না। ট্রেনে আর বেশি কথা হলো না।



 



(৪)



আমাদের কামড়ার বাকি সকল যাত্রীই রাজশাহীতে নামলো। হাসান ভাই তার মেয়ের হাত ধরে আমার সাথে সাথে হাঁটছেন। আমি বারবার পেছনে ফিরে তাকাচ্ছিলাম। কিছুক্ষণ পরে তিনি সিএনজি ঠিক করে তাতে উঠে পড়ার পরে আমার আগ্রহটা চূড়ান্ত রূপ লাভ করলো, 'হাসান ভাই, সুমনা ভাবি কোথায়? আমি তো মনে করেছিলাম ওই তিনজন বোরকা পরা মহিলাদের মধ্যেই তিনি থাকবেন। কিন্তু তাদের কেহই তো এদিকে এলেন না।' প্রশ্নটা করার পরেই হাসান ভাইয়ের চোখে চোখ পড়লো। তাতে হঠাৎ করেই মনে হলো_প্রশ্নটা করা মনে হয় ঠিক হয়নি। হাসান ভাইয়ের চোখে জল। মুহূর্তেই তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, 'বাড়ি চলো, সব বলছি।'



 



(৫)



বাড়িটাকে বেশ সুন্দর করে সাজিয়ে তুলেছেন তিনি। শহরের মধ্যেই এ বাড়ির চারপাশটা গ্রামীণ আবহ ধরে আছে। মনে মনে খুশিই হলাম_হোটেলে উঠলে কী এমনটা দেখা যেতো। বাড়ির বামপাশে একটা কবরস্থানও আছে। সেখানে একটিমাত্র বাধানো কবর। হাসান ভাই তার মেয়ে (পরে ওর নাম জেনেছি-বীথি) আর আমাকে ডেকে বাড়ির ভেতরে চললেন। বাড়ির ভেতরটা কেমন যেনো থমথমে। বাসায় ঢোকার পরে হাসান ভাই আমার সাথে আর কোনো কথাই বললেন না। কেবল আমার রুমটা দেখিয়ে তিনি যেনো কোথায় চলে গেলেন।



দুপুর হয়ে এলো। আমি শুয়ে রেস্ট নিচ্ছিলাম। এমন সময় বীথির কণ্ঠস্বর কানে এলো। ফিরে তাকাতে দেখলাম_ওর হাতের একটা ছবির অ্যালবাম। সেখান থেকে খুটে খুটে কয়েকটা ছবি বের করে আমাকে দেখালো। ছবিগুলো হাসান ভাই, সুমনা ভাবি ও আমার। বীথি বললো, 'দেখেছো কাকু, তোমার ছবি। এ ছবিগুলো না বাবা রোজই দেখে। আমাকেও দেখায়। তাই তো আমি তোমাকে দেখেই চিনতে পারলাম।' বীথির ছোটমুখে সুন্দর কথাগুলো শুনে খুুবই ভালো লাগলো। অনেকদিন পরে ওর মায়ের ছবিটা দেখলাম। বীথিও যেনো ওর মায়ের মতোই হচ্ছে।



 



(৬)



দুপুর খেয়ে একটু শুয়েছিলাম। এমন সময় হাসান ভাইয়ের সেই চিরায়ত ঝাড়ি খেয়ে উঠে পড়লাম। একসময় আমার প্রতিটি অলস দুপুরের সাধের ঘুমটা হাসান ভাইয়ের অমন ঝাড়ি খেয়েই দৌড়ে পালাতো। হাসান ভাই আমাকে নিয়ে সেই কবরস্থানের কিছুটা দূরের একটা বেঞ্চিতে গিয়ে বসলেন। তারপর নিজে থেকেই বলতে শুরু করলেন, 'আমার ওপর হয়তো রেগে আছিস? তোর ভাবিকে না দেখে খুব অবাক হয়েছিস্ তাই না? ভাবছিস্, কোথাও বেড়াতে গেছে বোধহয়? হ্যাঁ, সে সত্যিই বেড়াতে গেছে। তবে যেখানে গেছে সেখান থেকে সে আর কখনোই ফিরে আসবে না। ওই দ্যাখ, কী সুন্দর লুকিয়ে আছে আমার থেকে। ওই কবরটার মাঝেই যেনো ওর শান্তি...।'



'বীথিকে দু বছরের রেখে চলে গেছে ও। তারপরে একাই আছি। মেয়েটিই এখন আমার একমাত্র সঙ্গী। গতকাল তোদের এলাকা থেকেই ফিরছিলাম। তোর খোঁজ করেছি। পরে শুনলাম, তুই এখন ঢাকাতে থাকিস্। আজ ওর মৃত্যুবার্ষিকী। ভেবেছিলাম, ওর পরিবারের লোকেরা এলে সবাই মিলে ওর জন্যে দোয়া-মোনাজাত করতাম। কিন্তু তারা কেহই এলো না। তুই একটু আমাদের জন্যে দোয়া করিস।'



হাসান ভাইয়ের কথা শুনে চোখের জল আটকাতে পারলাম না। হাসান ভাইও 'একটু আসছি' বলে ঘরের ভেতরে ঢুকলেন। বুঝলাম, এখন তিনি অঝোর ধারায় কাঁদবেন...।



 



(৭)



এই হাসান ভাইয়ের সুখ-দুঃখের সঙ্গী ছিলাম আমি। বয়সে তিনি আমার থেকে বারো বছরের বড়। আমরা একই পাড়ায় থাকতাম। হাসান ভাইয়ের আপন বলতে কেউ ছিলো না। তবে তার পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া অনেক সম্পত্তি ছিলো। একসময় আমাদের মহল্লারই একটা মেয়ের প্রেমে পড়েন তিনি। তার মনের সকল কথাই আমাকে বলতেন। সুমনা আপু তার থেকে ছয় বছরের ছোট। অসম্ভব সুন্দরী, না দেখলে তা বিশ্বাস করা কঠিন। আমি আর হাসান ভাই সুমনা আপুকে বোঝানোর অনেক চেষ্টা করলাম। ও সময় হাসান ভাইয়ের এক ক্লাসমেট ছিল, শফিক। শফিক ভাই কলেজের ছেলে-মেয়েদেরকে প্রাইভেট পড়াতেন। সুমনা আপুও সেখানে পড়তে যেতেন। আমাদের দু জনার অনেক চেষ্টার পরেও কাজের কাজ কিচ্ছুই হচ্ছিলো না। এর কিছুদিন পরে লক্ষ্য করতাম_সুমনা আপু কেমন যেনো ভীষন্ন থাকতেন। আর জনসম্মুখে খুব কম বের হতেন।



একদিন আমি আর হাসান ভাই নদীর পাড়ে একটা গাছের নিচে বসে গল্প করছিলাম। এমন সময় দেখলাম, সুমনা আপু আমাদের অদূরে নদীর পাড়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। তাকে এখানে দেখে বেশ অবাকই হলাম। নদীর এপাড়ের অংশটা বেশ গভীর। সুমনা আপু সাঁতার জানতেন কিনা জানি না, কিন্তু দেখলাম_হঠাৎ তিনি নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন! মুহূর্তেই আমি পিছু ফিরে দেখলাম হাসান ভাইও নেই। দৌড়ে তিনিও গিয়ে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। আমি গিয়ে পেঁৗছনো মাত্রই হাসান ভাই সুমনা আপুকে কোলে নিয়ে ডাঙায় উঠে এলেন। সুমনা আপুর জ্ঞান নেই। সুমনা আপুর ভেজা শরীরটা ঘাসের উপরে এলিয়ে রেখে হাসান ভাই তার পায়ের তলায় হাত দিয়ে ঘষে উম দিতে চেষ্টা করলেন। কিছুক্ষণ পরে তিনি মহাউল্লাসে আমাকে বললেন, 'ও বেঁচে আছে। কিন্তু সমস্যা হলো_ওকে এখানকার কোনো হাসপাতালে নেয়া যাবে না।'



আমি দৌড়ে গিয়ে নদী পাড়ের এক বাড়ি থেকে একটা গরম কাপড় আর সরিষার তেল নিয়ে এলাম। এতোক্ষণে হাসান ভাই সুমনা আপুর পেট থেকে পানি বের করে ফেলেছেন। বুকে গরম কাপড় জড়িয়ে দিয়ে তিনি তেল দিয়ে হাত আর পাশের নিচের অংশটা গরম করতে লাগলেন। আমার দিতে তাকিয়ে বেশ করুণ একটা মুখ করে বললেন, 'তোকে বলছি। আর কারো কাছে বলবি না কিন্তু। ওর পেটে বাচ্চা আছে! আর সম্ভবত এ কারণেই ও আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি বেঁচে থাকতে তা কখনো হতে দেবো না।'



ধীরে ধীরে সুমনা আপু চোখ মেলে চাইলেন। আমাদেরকে দেখে তিনি কেঁদে ফেললেন। সুমনা আপু আমাদেকে শফিক ভাইয়ের তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করার কথা খুলে বললেন। তিনি আরও বললেন, 'এ অবস্থায় আত্মহত্যা করা ছাড়া আমার আর কোনো পথ খোলা নেই।' হাসান ভাই তার মুখ আলতো করে চেপে ধরে বললেন, 'আমি থাকতে তুমি মরতে পারো না। আমি তোমাকে ভালোবাসি। আর এর প্রমাণস্বরূপ দুদিনের মধ্যে আমি তোমাকে বিয়ে করবো।'



দুঃখ আর ভালোবাসার সংমিশ্রণে সুমনা আপু খুশিতে হাসান ভাইকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন।



দুদিনের মাঝে হাসান ভাই তার পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে দিলেন। কাজী অফিসে গিয়ে তিনি আর সুমনা আপু গোপনে বিয়ে করলেন। তারপর, কয়েকদিনের মাথায় তারা দুজনেই নিরুদ্দেশ হয়ে গেলেন। তখন ব্যাপারটা নিয়ে এলাকায় কম তোলপাড় সৃষ্টি হয়নি। সকলেই হাসান ভাইকে দোষারোপ করতে লাগলেন। আর আমার সাথে তাদের নিয়মিত যোগাযোগ হবে-এমন কথা বলার পরেও সেটা হলো এ দীর্ঘ পাঁচ বছর পরে।



 



(৮)



রাজশাহীতে কাজ শেষে ঢাকার ট্রেনে উঠলাম। হাসান ভাই ও বীথি আমাকে বিদায় জানাতে স্টেশনে এসেছে। ট্রেন ছাড়বে ছাড়বে এমন সময় আমি হাসান ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, 'হাসান ভাই, আবার বিয়ে করেন।' আমার কথা শুনে তিনি একটু অন্য মনস্ক হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে বললেন, 'তখন ওর (বীথিকে দেখিয়ে) আর আমার মধ্যকার এ ফাঁকা দূরত্বটা আরো বিস্তৃতি লাভ করবে। তুই তো সবই জানিস্। আমি কাক হয়েই বাঁচতে চাই। তবে সেই কাকটা_যার কোকিলের বাচ্চার প্রতিও সমান ভালোবাসা আছে...!'



ট্রেনটা ছেড়ে দিয়েছে। হাসান ভাইয়ের শেষ কথাগুলো কানে ঝাপসা হয়ে এলো। কেনো যেনো মনের মধ্যে তখন আরেক চিন্তা কাজ করতে লাগলো-ইনি কি মানুষ, না কি অন্যকিছু? পরের সন্তানকে যে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসে, তার জন্য নিজের জীবনের সুখ-আহ্লাদ সবকিছু বিসর্জন দিতে পারে তার ভালোবাসার ভা-ারটা তাহলে কতো বড়? তাজমহলের মতো একশটি তাজমহলেও কি তার বহিঃপ্রকাশ ঘটবে...?



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৭৫০৫১৩
পুরোন সংখ্যা