চাঁদপুর, শনিবার ০৪ এপ্রিল ২০২০, ২১ চৈত্র ১৪২৬, ০৯ শাবান ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • চাঁদপুর সদর উপজেলায় আক্রান্তের সংখ্যা শত ছাড়ালো : চাঁদপুরে আরো ১৪ জনের করোনা শনাক্ত, জেলা মোট আক্রান্ত ১৮০
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৬৯-সূরা হাক্কা ঃ


৫২ আয়াত, ২ রুকু, মক্কী


 


২০। 'আমি জানিতাম যে, আমাকে আমার হিসাবের সম্মুখীন হইতে হইবে।'


২১। সুতরাং সে যাপন করিবে সন্তোষজনক জীবন;


২২। সুউচ্চ জান্নাতে


 


আল হাদিস


 


যা ইচ্ছা আহার করতে পারো, যা ইচ্ছা পরিধান করতে পারো, যদি তোমাকে অপব্যয় ও গর্ব স্পর্শ না করে।


বাণী চিরন্তন


মধুর ব্যবহার লাভ করতে হলে মাধুর্যময় ব্যক্তিত্বের সংস্পর্শে আসতে হয়। -উইলিয়াম উইন্টার।


 


 


 


 


 


assets/data_files/web

যে যা বলে বলুক, তুমি তোমার নিজের পথে চল।


-দান্তে।


 


 


পুরাতন কাপড় পরিধান করো, অর্ধপেট ভরিয়া পানাহার করো, ইহা নবীসুলভ কার্যের অংশ বিশেষ।


 


ফটো গ্যালারি
বঙ্গবন্ধুর শৈশব ও স্কুলজীবন
আবদুল বাতেন
০৪ এপ্রিল, ২০২০ ১৫:৫৯:০৭
প্রিন্টঅ-অ+


আঁকাবাঁকা মধুমতি নদীর সমিরণে এলোমেলো ঝাউবনের কিনারায় মমতার মতো ছায়া সুনিবিড়, শান্ত দুপুরের ঘুঘুডাকা নির্জনতায় দাঁড়িয়ে আছে ছবির মতো টুঙ্গিপাড়া গ্রাম। শেওলাধরা লাল ইটের শত বছরের পুরোনো দালানের পাশে টিনের ঘরে একদিন শুভ্র সন্ধ্যায় জ¦লে উঠেছিলো একটি বাতি। সেই বাতির আলোর জ্যোতিতে আলোকিত হয়ে উঠেছে হাজার বছরের বঞ্চনায় কালো ইতিহাসের পা-ুলিপি। তাঁর বেড়ে উঠার উদ্যম বাতাস আন্দোলিত করে তুলেছে সময়ের ঘুনেধরা সংসার। তাঁর উত্থিত তর্জনী নিয়ে আসে স্বাধীনতার মেঘের পাহাড়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি নাম, একটি ইতিহাস। সময়ের আবর্তে শেখ মুজিবুর রহমান নামটি একটি ব্যক্তিত্বে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সেই নাম হয়ে উঠেছে জাতির জনকে। হাজার বছরের রক্তঝরা শিকল এ একটি নাম ভেঙ্গে গিয়ে বাংলাদেশ নামক একটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ মানে বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু মানে বাংলাদেশ।

মোঘল আমলের বহু পূর্বে ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমায় টুঙ্গিপাড়া গ্রামে শেখ বোরহানউদ্দিন নামে এক ধার্মিক পুরুষ শেখ বংশের গোড়াপত্তন করেন। সেই বংশের ১৯২০ সালে ১৭ মার্চ সোমবার মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর বাবার নাম শেখ লুৎফুর রহমান। দাদার নাম শেখ আব্দুল হামিদ। জনসাধারণ তাকে ‘খান সাহেব’ বলেই জানতেন। শেখ মুজিবুর রহমানের মায়ের নাম সায়েরা খাতুন। নানাও শেখ বংশের শেখ আব্দুল মজিদ।

শেখ পরিবারে ইংরেজি শিক্ষার প্রচলন ছিলো। ব্রিটিশ শাসনামলে যখন মুসলমানরা ইংরেজি শিক্ষা থেকে দূরে সেই সময় শেখ মুজিবুর রহমানের ছোট নানা শেখ আব্দুর রশিদ চর অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত করেন ইংরেজি এম.ই. স্কুল। সেই স্কুলে পাঠ শেষ করে বঙ্গবন্ধু ৩য় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। বাবা গোপালগঞ্জ শহরে দেওয়ানী আদালতে চাকুরি করতেন। বঙ্গবন্ধু চতুর্থ শ্রেণিতে গোপালগঞ্জে পাবলিক স্কুলে ভর্তি হন। শেখ মুজিবুর রহমানের মায়ের কোনো ভাই না থাকায় তার নানা সায়েরা খাতুনকে সমস্ত সম্পত্তি লিখে দেয়। তার মা সম্পত্তি দেখাশোনা, গ্রামের মায়ায় শহরে স্বামীর সাথে থাকতেন না। শেখ মুজিবুর রহমানের দাদা ও নানার বংশ এক হওয়াতে তাদের ঘর পাশাপাশি ছিলো। বংশের বড় ছেলে হিসেবে শেখ মুুজিবুর রহমান আদরে-আহ্লাদে বড় হয়। বেশির ভাগ সময় তিনি তাঁর বাবার কাছে থাকতেন। বাবার কাছেই ঘুমাতেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে পাওয়া যায়, “আব্বার কাছেই আমি ঘুমাতাম। তাঁর গলা ধরে রাতে না ঘুমালে আমার ঘুম আসতো না”। শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বাবাকেই বেশি প্রাধান্য দিতেন, ভয় পেতেন, দুজন বন্ধুর মতো ছিলেন।

শেখ মুজিবুর রহমান যৌথ পরিবারে বড় হয়েছেন। সমাজবিজ্ঞানের সামাজিকীকরণে একটা কথা আছে, যৌথ পরিবারের সন্তানরা, দরদী, সামাজিক, আত্মত্যাগী, উদার মানবিকতাসম্পন্ন হয়ে থাকে। শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় এতোটাই মানবিক ছিলেন সবাই তাঁকে ‘মিয়া ভাই’ বলে ডাকতো। মা-বাবা আদর করে ডাকতো ‘খোকা’। কথিত আছে একদিন খালি গায়ে স্কুল থেকে খোকা বাড়ি ফিরে আসে। মা জামা-কাপড় কোথায় জিজ্ঞাসা করলে বলে, সহপাঠী একজনের গায়ে কিছু নেই তাই তাকে দিয়ে দিয়েছি।

১৯৩৪ সালে বঙ্গবন্ধু ৭ম শ্রেণিতে পড়াবস্থায় বেরিবেরি রোগে (হাত পা ফোলা) আক্রান্ত হয়ে পড়ে। এ সময় তাঁর হার্ট দুর্বল হয়ে যায়। তাঁকে কলকাতা শিবপদ ভট্টাচার্য, একে রায় চৌধুরী চিকিৎসা করেন। ১৯৩৬ সালে আবার চোখে গ্লুকোমা নামে এক ধরনের রোগ হয়। কলকাতায় তাঁর প্রথম চক্ষু অপারেশন করে ডাক্তার তাকে চশমা ব্যবহার করতে বলেন। ১৯৩৬ সাল থেকে বঙ্গবন্ধু চশমা ব্যবহার করেন। ১৯৩৬ সালে একদিকে বঙ্গবন্ধুর অসুস্থতা অন্যদিকে বাবা শেখ লুৎফুর রহমান চাকুরির কারণে মাদারীপুরে বদলি হয়ে চলে আসেন। তখন সায়েরা খাতুনকে মাদারীপুর নিয়ে আসা হয়। অসুস্থতার জন্যে বঙ্গবন্ধুর পড়াশোনা দুই বছর পিছিয়ে যায়। ৭ম শ্রেণিতে পুনরায় মাদারীপুর হাইস্কুলে ভর্তি করানো হয়। ১৯৩৭ সালে তাঁর বাবা আবার গোপালগঞ্জে ফিরে এলে তাঁকে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে ভর্তি করানো হয়। এ সময় পরিবারের ইচ্ছায় ফজিলাতুন্নেসাকে বিয়ে করেন।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচেতনতা মূলত পরিবার থেকে শুরু হয়। তার পরিবারের পূর্ব পুরুষরা ছিলেন শিক্ষিত সমাজসেবক। শেখ বংশের শেখ কুদরতউল্লাহ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মি. রাইন নামে একজন ইংরেজ কুঠিয়ালের বিরুদ্ধে ইংরেজদের কোর্টে মামলা করে তাকে অপমান করার জন্যে আধা পয়সা (এক পয়সা এক টাকার চৌষট্টি ভাগের একভাগ) জরিমানা করেন। রাইন বলেছিলো, ‘যত টাকা চান দিতে আমি রাজি আছি। আমাকে অপমান করবেন না’। সে সময় আদা পয়সা জরিমানা মানে ভীষণ অপমান। শেখ কুদরতউল্লাহ (লোকেরা কদু শেখ বলে ডাকতো) উত্তরে বলেন, ‘টাকা আমি গুণি না, মেপে রাখি। টাকা আমার দরকার নাই, তুমি আমার লোকের উপর অত্যাচার করেছ, আমি প্রতিশোধ নিলাম’। এইঘটনা অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে পাওয়া যায়।

ছোটবেলা থেকে বঙ্গবন্ধু আনন্দবাজার, বসুমতি, আজাদ, মাসিক মোহাম্মদী, সওগাত ইত্যাদি খবরের কাগজ পরিবারের ঐতিহ্যের কারণে ঘরে বসে পড়তেন। মাদারীপুরে বঙ্গবন্ধুর প্রথম রাজনৈতিক কার্যক্রম শুরু করেন। তখন ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্বদেশী আন্দোলনের (মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন) কারণে বঙ্গবন্ধুর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। মাদারীপুরে স্বদেশী আন্দোলনের অংশ হিসেবে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সুভাষ বোসের দল শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতো। যে সময় বঙ্গবন্ধু গোপালগঞ্জে, মাদারীপুরে মিছিলে যোগ দিতেন। বঙ্গবন্ধু জমিদার তালুকদার ও মহাজনের শোষণ দেখেছেন, যেখানে অন্যায় দেখেছেন সেখানে প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু লিখেন, ‘ইংরেজদের বিরুদ্ধে আমার মনে বিরূপ ধারনা সৃষ্টি হলো। ইংরেজদের এদেশে থাকার অধিকার নাই। স্বাধীনতা আনতে হবে’। এভাবেই বঙ্গবন্ধু ছোটবেলা থেকেই রাজনীতিসচেতন হয়ে উঠেন।

ছোটবেলা থেকেই বঙ্গবন্ধু মানবদরদী ছিলেন। সহজাতভাবে তাঁর মধ্যে মানবতা, দয়া, পরোপকার ইত্যাদি চারিত্রিক গুণাবলি দেখা যায়। এমএসসি মাস্টার কাজী আব্দুল হামিদ লজিং মাস্টার হিসেবে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে থেকে আলাদা ঘরে বঙ্গবন্ধুকে পড়াতেন। সেই লজিং মাস্টার ছিলেন আবার মানবদরদী মানুষ। তিনি মুসলিম সেবা সমিতি গঠন করে মুসলমান ছাত্রদের সহযোগিতা করতেন। বঙ্গবন্ধু সেই সমিতিতে সদস্য হিসেবে কাজ করতেন। মুসলিম সেবা সমিতির কাজ ছিলো প্রতি রোববার মুষ্টি ভিক্ষার (বাড়ি বাড়ি ভাত রান্নার সময় মুষ্টি পরিমাণ চাল জমানো) চাল তোলা, গরিব ছেলে-মেয়েদের সাহায্য করা, বই-কাগজপত্র কিনে দেয়া, মুষ্টি ভিক্ষার চাল বিক্রি করে গরিব ছেলেদের লজিং ঠিক করা। বঙ্গবন্ধু এ সামাজিক কাজ এতোটাই ভালোবেসেছেন যে, কেউ চাল না দিলে জোর করে আদায় করতেন, তাতেও না দিলে ঘরের চালে ঢিল মারতেন। এজন্যে কখনো কখনো বাবার শাসনের মুখে পড়তে হয়েছে। কাজী আব্দুল হামিদ যক্ষ্মারোগে মারা যাওয়ার পর বঙ্গবন্ধু নিজেই মুসলিম সেবা সমিতির হাল ধরেন এবং পরে তিনি সমিতির সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

বঙ্গবন্ধুর প্রিয় খেলা ছিলো ফুটবল। বিভিন্ন কারণে তিনি পড়াশোনায় চার বছর পিছিয়ে যান। ফলে স্কুলে সবার বড় হিসেবে খেলার দলনেতা তিনিই থাকতেন। তাঁর বাবাও ভালো ফুটবল খেলতেন। বাবার দল ও বঙ্গবন্ধুর দল একসাথে একই মাঠে প্রতিপক্ষ হয়ে খেলাধুলা করতো।

বঙ্গবন্ধু তাঁর বন্ধুদের মধ্যেও অনেক প্রিয় ছিলেন। বন্ধুদের নিয়ে একটা দল ছিলো তাঁর। যেখানে যেতেন একসাথে যেতেন, মারপিট করা, খেলাধুলা, মিছিল ইত্যাদি ছিলো তাঁর নিত্যদিনের কাজ। কোনো বন্ধুর কোথাও বিপদ হলে একসাথে সবাই গিয়ে তাকে সাহায্য করতো। মানুষের বিপদ দেখলেই বঙ্গবন্ধু স্থির থাকতে পারতেন না। ছোটবেলা থেকেই নেতৃত্বের যোগ্যতা তাঁর মাঝে ছিলো চির জীবন্ত।

১৯৩৮ সালে বঙ্গবন্ধু ৮ম শ্রেণির ছাত্র। তখন শেরে বাংলা একে ফজলুল হক যুক্তবাংলা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী শ্রমমন্ত্রী হিসেবে দুজনে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে গোপালগঞ্জে আসেন। সে অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু হিন্দু-মুসলমান সহপাঠীদের নিয়ে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করেন। কিন্তু হিন্দু ছেলেরা কংগ্রেসের নিষেধ আছে বলে আলাদা হয়ে যায়। এতে বঙ্গবন্ধু মনে কষ্ট পায়। তবু মুসলমান ছেলেদের দিয়ে সভা সফলভাবে শেষ করেন। সভাশেষে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মিশন স্কুলে পরিদর্শনে গেলে সেখানে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব, কাজ, যোগ্যতা তাঁকে আকৃষ্ট করে। তিনি খুশি হয়ে বঙ্গবন্ধুকে কাছে ডেকে নিলেন, আদর করলেন, ঠিকানা ডায়েরিতে টুকে নিয়ে কলকাতা গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে মুসলীম লীগ গঠন করার ব্যাপারে চিঠি লিখতেন। বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে চিঠি লিখতেন। এভাবেই ছোটবেলা থেকে বড় বড় মানুষের সাথে বঙ্গবন্ধুর সখ্যতা তৈরি হয়।

বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্যকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ গ্রন্থে লিখেন, ‘কৈশরেই তিনি খুব অধিকারসচেতন ছিলেন। একবার যুক্তবাংলা মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা গোপালগঞ্জ সফরে যান এবং স্কুল পরিদর্শন করেন। সেই সময় সাহসী কিশোর শেখ মুজিব তাঁর কাছে স্কুলঘর বর্ষার পানি পড়ার অভিযোগ তুলে ধরে এবং মেরামত করার অঙ্গীকার আদায় করে সবার দৃষ্টি আর্কষণ করেন’।

১৯৩৮ সালে শেরে বাংলা একে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গোপালগঞ্জ ঘুরে চলে যাওয়ার পর হিন্দু এবং মুসলমানদের মধ্যে আড়াআড়ি দেখা যায়। অঘোষিতভাবে মুসলমানরা মুসলিম লীগ আর হিন্দুরা কংগ্রেসের পক্ষে অবস্থান করে। সে সময় অনেক হিন্দু মুসলমানদের উপর প্রকাশ্যে অত্যাচার শুরু করে বিভিন্ন জায়গায়। শেখ মুজিবুর রহমানের এক সহপাঠী, যে তার বাবার বন্ধু খন্দকার শামসুদ্দীন হকের আত্মীয় নাম আব্দুল মালেক। তাকে হিন্দু মহাসভা সভাপতি সুরেন ব্যানার্জির বাড়িতে ধরে নিয়ে মারপিট করা হয়। এ কথা শোনামাত্রই শেখ মুজিবুর রহমান দলবল নিয়ে হিন্দু বাড়িতে যায় এবং মালেককে ছেড়ে দেয়ার অনুরোধ করেন। রমাপদ দত্ত শেখ সাহেবকে গালি দিয়ে বসলো, শেখ সাহেব তার তীব্র প্রতিবাদ জানায়। রমাপদ থানায় খবর দিলে তিনজন পুলিশ আসে। এদিকে খবর পেয়ে শেখ মুজিবের মামা শেখ সিরাজুল হক আরো লোকজন নিয়ে এসে শেখ মুজিবের সাথে যুক্ত হয়, শুরু হয় তুমুল মারামারি। একপর্যায়ে শেখ মুজিব দরজা ভেঙে মালেককে নিয়ে আসে। শুরু হয় শহরজুড়ে উত্তেজনা। হিন্দু-মুসলিম মুখোমুখি অবস্থান সৃষ্টি হয়। হিন্দু নেতারা থানায় বসে খন্দকার শামসুল হককে হুকুমের আসামী, শেখ মুজিবকে খুন করার চেষ্টা, লুটপাট, দাঙ্গা-হাঙ্গামা আসামী এবং শহরের নামিদামি গণ্যমান্য লোকের ছেলেদের আসামী করে মামলা দেয়। সকাল ৯টার আগেই মামা শেখ সিরাজুল হক ও আরো কজনকে গ্রেফতার করা হয়। শেখ মুজিব ভয়ে পালিয়ে যাননি। থানার দারোগা বাড়ির সম্মানের দিকে তাকিয়ে লজ্জায় শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করতে পারছিলেন না। বাড়ির পাশে টাউনহলের মাঠে শেখ মুজিব দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর ফুফাতো ভাই তাঁকে পাশের বাসায় সরে যেতে বলেন। শেখ মুজিব বলেন, ‘যাবো না, আমি পালাবো না। লোকে বলবে, আমি ভয় পেয়েছি’। একসময় দারোগা শেখ মুজিবুর রহমানের বাবার সাথে বাসায় এসে সব মামলার বিষয় খুলে বলেন, কাগজপত্র দেখালেন। বাবা বললেন, ‘নিয়ে যান’, তখন দারোগা একজন সিপাহী রেখে যায়। শেখ মুুজিব খাওয়া-দাওয়া সেরে নিজে থানায় এসে হাজির হন। কোর্টে দারোগা তার নামে মিথ্যা অভিযোগ তুলতে তিনি সরাসরি তার প্রতিবাদ জানান। বলেন, ‘বাজে কথা বলবেন না, ভালো হবে না’। পরে অবশ্য ওই মিথ্যা-বানোয়াট কথা এজাহারে দিয়ে তাঁকে জেলে প্রেরণ করা হয়।

এদিকে কলকাতায় শেরে বাংলা একে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এ ঘটনা জানলেন। দশদিন পর পনেরো শত টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানসহ সবাই জেল থেকে মুক্ত হয়। এটাই ছিলো শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনে প্রথম কারাবরণ।

১৯৩৯ সালে বঙ্গবন্ধু নবম শ্রেণিতে পড়াবস্থায় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সাথে দেখা করে গোপালগঞ্জের ছাত্রলীগ ও মুসলিম লীগ গঠন করার বিষয় নিজে উদ্যোগ গ্রহণ করেন। খন্দকার শামসুদ্দীনকে সভাপতি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সম্পাদক করা হলো ছাত্রলীগের। আবার মুসলিম লীগের ডিফেন্স কমিটিতে সেক্রেটারি করা হলো বঙ্গবন্ধুকে। এভাবেই তিনি ছোটবেলা থেকে নিজ যোগ্যতায় আস্তে আস্তে সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করে। ১৯৪১ সালে ভীষণ অসুস্থ, গলা ফুলা, একশ চার ডিগ্রি জ¦র নিয়ে শুয়ে শুয়ে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় বিভাগে পাস করেন এবং কলকাতা চলে আসেন। পরে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন। পরীক্ষার পর পর তিনি সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হন। সভা, মিছিল, বক্তৃতা, সমাবেশ ইত্যাদি তাঁর নিত্যদিনের কর্মকা- হয়ে গেলো। খেলাধুলায় মনোযোগ নেই। মনে তার একটাই স্বপ্ন, একটাই আশা মানুষের মুক্তি। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু লিখেন, ‘পাকিস্তান আনতেই হবে, নতুবা মুসলমানদের বাঁচার উপায় নাই’।

গ্রামবাংলার একটা কথা আছে, সকালের সূর্য বলে দেয় সারাদিন কেমন যাবে, বঙ্গবন্ধু ছোটবেলা থেকে তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলোতে যা দেখা যায় তা হলো মানবদরদী, বন্ধুপ্রীতি, ধর্মপ্রীতি, পিতা-মাতার বাধ্য সন্তান, উদ্ভাবনী, কর্মচঞ্চল, উদার মানসিকতা, তেজী, নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা, সাহসী, সত্যবাদী, যে কোনো স্থানে কথা বলা, বক্তৃতা দেয়ার সম্মোহনী যোগ্যতা, অপরকে সম্মানবোধ ইত্যাদি গুণাবলি তাঁকে সকালের আলোক উজ্জ্বল সূর্যের মতো করে তুলেছে। তাঁর হাত ধরে হাজার বছরের গ্লানি মুছে যাবে। মানুষ পাবে স্বাধীনতার আনন্দ তা ছোটবেলায়ই প্রকাশ প্রায়।

তথ্যসূত্র :

১। অসমাপ্ত আত্মজীবনী : শেখ মুজিবুর রহমান।

২। শেখ মুজিব আমার পিতা : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

৩। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র।

৪। বাংলাপিডিয়া।

৫। দৈনিক সংবাদপত্র।

৬। বঙ্গবন্ধুর সহজ পাঠ : এবিএম মুসা।

৭। বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীনতা : আনু মাহমুদ ।

৮। জনকের মুখ (গল্পগ্রন্থ)।  


আজকের পাঠকসংখ্যা
২৮১০৬৮
পুরোন সংখ্যা