চাঁদপুর, শনিবার ২৩ মে ২০২০, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ২৯ রমজান ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • চাঁদপুরে আরো ১২ জনের করোনা শনাক্ত, মোট আক্রান্ত ১৫৯
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৬৯-সূরা হাক্কা :


৫২ আয়াত, ২ রুকু, মক্কী


১৬। এবং আকাশ বিদীর্ণ হইয়া যাইবে আর সেই দিন উহা বিশ্লিষ্ট হইয়া পরিবে।


১৭। ফিরিশ্তাগণ আকাশের প্রান্তদেশে থাকিবে এবং সেই দিন আটজন ফিরিশ্তা তোমার প্রতিপালকের আরশকে ধারণ করিবে তাহাদের ঊধর্ে্ব।


 


বেদনা হচ্ছে পাপের শাস্তি।


-বুদ্ধদেব।


 


 


স্বভাবে নম্রতা অর্জন কর।


 


স্বপ্নের চেয়ে বড়
সোহেল নওরোজ
২৩ মে, ২০২০ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


স্বপ্ন ছুঁতে সাহস লাগে। থাকতে হয় বাধা ডিঙানোর শক্তি। প্রাণান্ত প্রচেষ্টা, অসীম কর্মস্পৃহা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তিই স্বাপি্নক মানুষকে তার স্বপ্নপূরণের কাছাকাছি পেঁৗছে দেয়। কেউ আবার নিজের লক্ষ্য ছুঁয়েই ক্ষান্ত হন না; ছাড়িয়ে যান নিজের স্বপ্নকেও। প্রমাণ করেন_মানুষ আদতে তার স্বপ্নের চেয়েও বড়। স্বপ্ন ছাড়ানোর এসব কাহিনী আমাদের অনেকের কাছে 'গল্প' মনে হয়। নেপথ্যের মানুষটি যেনো তার ইচ্ছামতো চিত্রনাট্য সাজাচ্ছেন। এ ধরনের মানুষের আকর্ষণী ক্ষমতাও প্রবল। তারা কেবল নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে চারপাশের মানুষকে স্বপ্ন দেখতে অনুপ্রাণিত করেন, সাহস জোগান। প্রত্যয়ের বীজ বুনে দেন মনের গহীন ভেতর। বেগম রোকেয়া পদক জয়ী গোলাপ বানুও তেমনি স্বপ্নকে ছাড়িয়ে যাওয়া এক বাস্তব চরিত্র। জীবনের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে করতেই তিনি হয়ে উঠেছেন স্বপ্নের চেয়ে বড়।



 



স্বপ্নসীমা পেরোনো মানুষের সানি্নধ্যে যাওয়া পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার। কর্মসূত্রে 'বারিধারা মহিলা সমবায় সমিতি'র প্রতিষ্ঠাতা গোলাপ বানুর সঙ্গে আলাপচারিতায় তার জীবনসংগ্রামের কথা শোনার সুযোগ হয়েছে। যে চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজ তিনি এখানে পেঁৗছেছেন, তাতে যেনো রূপকথার উপাদান মেশানো। তিনি গর্ব নিয়ে বলেছেন নিজের দিন বদলের কাহিনী। অকপটে স্বীকারও করেছেন_আজকের অবস্থানে পেঁৗছানোর কথা তিনি কখনও কল্পনাও করেননি। তার প্রত্যাশা ছিল অভাব-অনটনমুক্ত সচ্ছল জীবনের। নিজের তাড়না থেকেই উদ্যোগী হয়ে উঠেছিলেন কিছু করার। তাই অভাবী নারীদের নিয়ে প্রতিদিনের রান্নার চাল থেকে কিছু অংশ জমিয়ে সঞ্চয়ের সূচনা করেন। সমমনা নারীদের নিয়ে গড়ে তোলেন সমিতি। সেই সমবায় সমিতিই এখন নারীদের সঞ্চয় ও অর্থনৈতিক সচ্ছলতার অন্যতম প্রতিষ্ঠান।



 



দরিদ্র কৃষক পিতার ঘরে জন্ম গোলাপ বানুর। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে গিয়ে তার বাবা কৃষিপণ্য বিক্রি করতেন। বাবার সঙ্গী হতেন গোলাপ বানুও। অঙ্কুরেই চুকে যায় তার পড়াশোনার পাট। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বলতে এক মাসের স্কুলযাত্রা আর ছয় মাসের বয়স্ক শিক্ষা। মাত্র ১৪ বছরের মাথায় বিয়ে হয়ে যায়। অভাবকে নিত্যসঙ্গী করে রাজমিস্ত্রি স্বামীর সঙ্গে শুরু হয় কষ্টের সংসার। বিয়ের চার বছর না ঘুরতেই কন্যা সন্তানের মা হন গোলাপ বানু। স্বামী হুট করে তাদের ফেলে চলে যায়। এর পরই শুরু হয় বেঁচে থাকার সংগ্রাম। নিজেদের অন্ন সংস্থান করতে একটি চটের কারখানায় পেটচুক্তি কাজ নেন। এক বছর পর স্বামীর খোঁজ মেলে। মেয়ের দুরবস্থা দেখে রাজধানীর ভাটারার নুরেরচালায় নিজের জমিতে থাকার ব্যবস্থা করে দেন গোলাপ বানুর বাবা। একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে এলাকার অভাবী পরিবারের শিশুদের পড়াশোনার ব্যবস্থা হয়। ওই সংস্থারই এক কর্মকর্তা গোলাপ বানুর মতো অভাবী নারীদের জন্যে বয়স্ক শিক্ষার পাশাপাশি সমবায় সমিতি গঠনের পরামর্শ দেন।



 



সমবায় আইন অনুযায়ী প্রতি দলে ২০ জন_পাঁচটি দলের ১০০ সদস্য আর পাঁচ হাজার টাকা মূলধন নিয়ে ১৯৯২ সাল থেকে সমিতির কার্যক্রম শুরু করেন গোলাপ বানুরা। ১৯৯৪ সালে তাদের নিয়ে গঠিত হয় 'বারিধারা মহিলা সমবায় সমিতি'। শুরুতে নির্ধারিত হয়, প্রত্যেক সদস্য মাসে ৫০ টাকা জমা দেবে। কিন্তু এই ৫০ টাকার বন্দোবস্ত করাও তাদের জন্যে সহজ ছিল না। তাই রান্নার চাল থেকে দু-এক মুঠো আলাদা করে জমিয়ে তা বিক্রি করে টাকা জোগাড়ের সিদ্ধান্ত হয়। এভাবেই টাকা জমাতে থাকেন গোলাপ বানুরা। ১৯৯৭ সালে উন্নয়ন সংস্থাটি এলাকা ছেড়ে চলে গেলে জমা হওয়া মূলধন নিয়ে নতুনভাবে সমিতির কার্যক্রম শুরু হয়। গোলাপ বানু হন সেই সমবায় সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ভাবতে অবাক লাগে, রাজধানীর ভাটারায় অবস্থিত সমবায় সমিতিটির পুঁজি এখন শতকোটি টাকা ছাড়িয়েছে! সমিতির নিজস্ব জমিতে উঠেছে সাড়ে ছয় তলা ভবন। সমিতির সদস্য সংখ্যা ৪০ হাজারেরও বেশি। সেখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে অনেক নারীর।



 



সমিতির চেহারা বদলালেও মানুষ গোলাপ বানু ঠিক আগের মতোই আছেন। টাকা-পয়সা তার সচ্ছলতা এনেছে বটে, তবে তিনি অর্থকে প্রাধান্য না দিয়ে সমিতির কল্যাণেই নিবেদিতপ্রাণ। সমিতির নানা কাজে যুক্ত থাকলেও মাসিক সম্মানী নেন না গোলাপ বানু। এটিই যেনো তার আরেকটি সংসার। কষ্ট ও যত্নে গড়ে তোলা কানন। সততা ও বিশ্বাসের সঙ্গে অভাবী নারীদের সঞ্চয়ের টাকা হেফাজতের দায়িত্ব তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে চলেছেন। গোলাপ বানুর 'বারিধারা মহিলা সমবায় সমিতি' ২০০২ ও ২০০৯ সালে সরকারিভাবে 'শ্রেষ্ঠ মহিলা সমবায় সমিতি' নির্বাচিত হয়। আর তিনি নিজে ২০১০ সালে জাতীয় পর্যায়ে 'শ্রেষ্ঠ সমবায়ী' নির্বাচিত হন। এ ছাড়া দেশে-বিদেশে একাধিক পুরস্কার অর্জন করেছে এ সমিতি। গোলাপ বানুদের স্বপ্ন থেমে থাকে না। নিজে লেখাপড়া শিখতে না পারার আক্ষেপ প্রায়ই তাকে পীড়া দেয়। তাই সমিতির সদস্যদের জন্যে একটি বৃদ্ধাশ্রম আর সন্তানদের জন্য একটি স্কুল গড়ার স্বপ্ন দেখেন গোলাপ বানু। তার স্বপ্ন পূরণ হবেই। কারণ গোলাপ বানুরা হারতে জানেন না। স্বপ্নের ওপর স্বপ্ন সাজিয়ে তারা এগিয়ে যান।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৫০৬৯৪৪৪
পুরোন সংখ্যা