চাঁদপুর। সোমবার ১০ জুলাই ২০১৭। ২৬ আষাঢ় ১৪২৪। ১৫ শাওয়াল ১৪৩৮

বিজ্ঞাপন দিন

বিজ্ঞাপন দিন

সর্বশেষ খবর :

  • শুক্রবার সকালে হাজীগঞ্জের সৈয়দপুর সর্দার বাড়ির পুকুর থেকে শাহিদা আক্তার মুক্তা নামের এক গৃহবধুর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ॥ স্বামী হাছান সর্দার পলাতক || হাজীগঞ্জের সৈয়দপুর সর্দার বাড়ির পুকুর থেকে শাহিদা আক্তার মুক্তা নামের এক গৃহবধুর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ॥ স্বামী হাছান সর্দার পলাতক
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

২৮-সূরা কাসাস 


৮৮ আয়াত, ৯ রুকু, ‘মক্কী’


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


৭৯। কারূন তাহার সম্প্রদায়ের সম্মুখে উপস্থিত হইয়াছিল জাঁকজমক সহকারে। যাহারা পার্থিব জীবন কামনা করিত, তাহারা বলিল, ‘আহা, কারূনকে যেইরূপ দেওয়া হইয়াছে আমাদিগকেও যদি তাহা দেওয়া হইত! প্রকৃতই সে মহাভাগ্যবান।  


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


 

প্রকৃতির প্রথম এবং প্রধান আইন  হচ্ছে মাতা-পিতাকে মান্য করা        -জাকুইল মিলার।


যখন কোন দলের ইমামতি কর, তখন তাহাদের নামাজকে সহজ কর। 


ফটো গ্যালারি
স্টেশনবিহীন নিঃশ্বাস
মনিরুজ্জামান বাবলু
১০ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+

মায়ের মতো কপাল পুড়ল তাফিজার। সন্তান জন্ম হবার পূর্বেই ঠাঁই মিলল রেল স্টেশনের প্লাটফর্মে। সাত বছর বয়সে বাবা সংসারের হাল ছেড়ে অন্য রমণীর সংসারে জাল বুনেছে। চার মাসের মারিয়াকে নিয়ে রেল স্টেশনের প্লাটফর্মে তাফিজার ভ্রাম্যমাণ জীবন সংসার।

তার স্বামীও চম্পট মেরেছে। পূর্বেই গর্ভে এলো মারিয়া। শাশুড়ির অবিচারের শিকার। স্বামীর সংসার থেকে তাফিজাকে বিতাড়িত করে দিল শাশুড়ি। ফিরে যাওয়ার রাস্তা একটাই-সোজা রেললাইন। যেদিকে রেল যায়, সেদিকে যায় তাফিজার দৃষ্টি। মায়ের সংসার অাঁকাবাঁকা। স্বামীর সংসারেও ঘুরেনি ভাগ্যের চাকা।

লাকসাম রেল স্টেশনে জন্ম নিল মারিয়া। প্লাটফর্মে পায়চারী করা জনতার সামর্থ্যানুযায়ী দেয়া অর্থে তীব্র শীতের দিনগুলো কাটলো মমতাময়ী মা তাফিজা ও শিশু মারিয়ার ভ্রাম্যমাণ সংসারে।

মারিয়া জন্মের পাঁচদিন পর দেখলো নানা আজগর আলীর মুখ। মারিয়ার মা তাফিজা, যেই বাবাকে দেখেছে চৌদ্দ বছরে মাত্র দু'বার। প্লাটফর্মে ভাগ্যক্রমেই বাবার সাথে দেখা। তাফিজাকে জিজ্ঞাসাক্রমেই বেরিয়ে আসলো নির্দয়তার বচন।

তাফিজা বলল, 'বাপের লগে মেলা দিন পর দেহা অইলো। কান্দা-কাডি অইবো! হেতে তো অাঁর মাইয়ারে (নাতনিকে) বেচি দেওনের চেষ্টা কচ্ছিল। অাঁই দেই না। আমাগো মাহে তিন বোইন আর এক ভাইয়েরে লই রেল ইস্টিশনো জীবন কাডাইছে। এহন অাঁইও পারুম। মায় পারছে, অাঁই পারুম না ক্যান?'

সিলেটের বংশধর হলেও তাফিজার জন্ম কুমিল্লায়। হাত বাড়িয়ে খাবার আহরণে রেল লাইনের স্টেশনগুলোতে বেড়ে উঠে। রাতের অন্ধকার আর তাফিজার সংসারের চিত্র একই। শুধু অন্ধকার। অন্ধকারে পথচলার মাঝে ভয় আর লালসার রূপায়ন তাফিজার অচেনা-অজানা নয়। দেড় লাখ টাকা কাবিনে বিয়ে করা জীবনে উপহার এই মারিয়া। মারিয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠছে কিশোরী তাফিজা। রেল লাইনের সেই স্টেশনে যখন রেল পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তা আর বাংলাদেশ টেলি কমিউনিকেশনের কর্মকর্তা ব্যস্ত সময় পার করছেন, তখন তাফিজার ভয় নেই। শীতের শেষে বসন্তের আবহতে তাফিজার বুকের স্পন্দন মারিয়া। তাকে কয়েক ফোঁটা ওষুধ খাওয়াতে দেখলাম। চিকিৎসকের পরামর্শে ঠা-াজনিত রোগের জন্য এই ওষুধ। ব্যয় হয়েছে একশ' টাকা।

কোটি টাকার রেল লাইনে চলছে পাথর ভাঙ্গার কর্মব্যস্ততা। রেল স্টেশনের প্লাটফর্মে কয়েক টুকরা পাথরের ঠাঁই হয়েছে। মারিয়ার জন্য সেই পাথর হয়েছে তোশক। আর মায়ের পোটলা হয়েছে বালিশ। ওষুধ খাওয়ানোর পরও কান্না থামছে না। রেল স্টেশনের সবাইকে পিছ দিয়ে নিজেকে আড়াল করল তাফিজা। একপাশে আড়াল, অথচ অন্যপাশের সবাই দেখলো। বুকের দুধ খাওয়াতে লাগলো তাফিজা। কান্না থেমে যাওয়া মারিয়ার ঘুম ঘুম ভাব। তাফিজা এবার পোটলা আর মেয়েকে নিয়ে উঠে গিয়ে আর একটু আড়ালে গেল। প্লাটফর্মের এককোণে গিয়ে শুয়ে পড়ল। মেয়েকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা। ছড়ায় ছড়ায় মেয়েকে ঘুমের নির্দেশনা দিলো তাফিজা। কান পেতে রই তাফিজার ধ্বনিতে বেজে ওঠা ছড়া_ 'ঘুম পাড়ানি মাসিপিশি/ মোদের বাড়ি এসো/ খাট নাই, পালং নাই/ চৌকি পেতে বসো।'

রেল স্টেশনে ঘটে যাওয়া ঘটনার তদন্ত স্বার্থে পরিত্যক্ত ভবনে গেলাম। সেই ভবনের পাশে আরো কয়েকটি ভবন। প্রায় ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে করা এই ভবনগুলো। বসবাসের অন্ত নেই। দিনের বেলায় ঘটে যায় নানান অপকর্ম। রায়হান নামের ছেলেকে মেট্রিক পরীক্ষা দিতে দেয়নি এই প্লাটফর্ম। কিশোর সন্ত্রাসীরা তাকে জিম্মি করে এই পরিত্যক্ত ভবনে আটকে রেখেছে। বেদম মারধর করে হাসপাতালেও পাঠায়।

দৃষ্টি পড়লো পরিত্যক্ত আরেকটি ভবনে খোলা জানালায় বসে থাকা সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধার প্রতি। খোলা জানালার একপাশে আলো, অন্যপাশে অন্ধকার। কবে এই ঘরে প্রদীপ জ্বলতে দেখেছে, এমন সাক্ষ্য দেয়ার কেউ নেই। এই বৃদ্ধা প্রায় আট/ দশ বছর ধরে রেল স্টেশনের পরিত্যক্ত ভবনটিতে ঘুমায়। মশা আর পোকামাকড়ের কামড়ের কথা অকপটে স্বীকার করল। তবে খাবার খায় বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে খুঁজে খুঁজে। একাধিক প্রশ্ন করেও ওই বৃদ্ধার সংসার আর বংশের ঠিক-ঠিকানা পাইনি।

ক্ষণিক পরে তাফিজা আর মারিয়ার একটি ছবি তুলতে চেয়েও পারিনি। বহু খোঁজাখুঁজির পরও পাইনি। তাফিজা বলেছিল 'আজই এই স্টেশন ছেড়ে লাকসাম জংশনে চলে যাবো। সেখানে কম্বলসহ আরো দুইটা পোটলা আছে। এই স্টেশনের চেয়ে ওই স্টেশনে খাবার জুটে ঠিকমত।'

রেল স্টেশনের প্লাটফর্মে খোলা জানালার পাশে বসা প্রেমিকার হাতে একটি গোলাপ ফুল পেঁৗছে দিতে প্রেমিকের প্রাণপণ চেষ্টা। কিন্তু সময় বসে থাকেনি। ট্রেন চালক গাড়ি ছেড়ে দিলো। ফুলটি আর দেয়া হলো না। কিন্তু ছবিটি বিশ্ববাসীর কাছে আজো প্রাণবন্ত হয়ে আছে। ভালবাসা দৃষ্টান্ত হয়ে ঝুলেছে কত না দেয়ালে আর অজানা ডায়েরির পাতায়। হয়তো দেয়ালে ঝুলবে না আর ডায়েরির পাতায় আসবে না অবহেলিত তাফিজা, মারিয়া আর বৃদ্ধার স্টেশনবিহীন নিঃশ্বাসের বিচিত্র পথচলা।

লেখক পরিচিতি : সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যম কর্মী, মোবাইল-০১৮১৬০৬৩০৪১

আজকের পাঠকসংখ্যা
১১২৬৭৪
পুরোন সংখ্যা