চাঁদপুর। সোমবার ১০ জুলাই ২০১৭। ২৬ আষাঢ় ১৪২৪। ১৫ শাওয়াল ১৪৩৮

বিজ্ঞাপন দিন

বিজ্ঞাপন দিন

সর্বশেষ খবর :

  • --
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

২৮-সূরা কাসাস 


৮৮ আয়াত, ৯ রুকু, ‘মক্কী’


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


৭৯। কারূন তাহার সম্প্রদায়ের সম্মুখে উপস্থিত হইয়াছিল জাঁকজমক সহকারে। যাহারা পার্থিব জীবন কামনা করিত, তাহারা বলিল, ‘আহা, কারূনকে যেইরূপ দেওয়া হইয়াছে আমাদিগকেও যদি তাহা দেওয়া হইত! প্রকৃতই সে মহাভাগ্যবান।  


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


 

প্রকৃতির প্রথম এবং প্রধান আইন  হচ্ছে মাতা-পিতাকে মান্য করা        -জাকুইল মিলার।


যখন কোন দলের ইমামতি কর, তখন তাহাদের নামাজকে সহজ কর। 


ফটো গ্যালারি
বাংলা কবিতায় বিপ্লবের ধারা
পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
১০ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

(ঘ) কবিতায় ধর্মীয় চেতনার বিপ্লব :

প্রাচীন যুগে যদিও ধর্মীয় চেতনা হতে কবিতার জন্ম হয়নি, কবিতার জন্ম হয়েছিল সামাজিক ও দার্শনিক চেতনা হতে, তবুও কালের পরম্পরায় কবিতার মধ্যে ঢুকে গেছে ধর্মীয় চেতনা। বৌদ্ধধর্মের সহজিয়া সম্প্রদায় ও নাথপন্থী সম্প্রদায় কর্তৃক চর্যাপদের চর্চা হলেও তাতে ধর্ম বিষয়ক কোনো প্রচারণা ছিলো না, যদিও পরবর্তীতে কবিতা ধর্মীয় চেতনা ধারণ করে। মধ্যযুগে এসে কবিতায় 'রামায়ণ', 'মহাভারত'-এর মতো ধর্মীয় সাহিত্যের চেতনা পরিলক্ষিত হয়। মঙ্গল কাব্যে চ-ী ও মনসার স্তুতি লিখিত হয় এবং শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলার পাশাপাশি ধর্মীয় চেতনার স্ফূরণ ঘটে। মধ্যযুগের কবিগণ চ-ীর কাছে মনসার দুর্ভাগ্য বর্ণনা করেন এইভাবে-

জনম দুঃখিনী আমি দুঃখে গেলো কাল।

যেই ডাল ধরি আমি, ভাঙ্গে সেই ডাল।।

চ-ীমঙ্গল-এর কবি মুক্তারাম সেন দেবী চ-ীর মহিমা বর্ণনায় বলেন-

সুখমনে পশুগণে যাও নিজালয়

তার ঠাঁই আমি যাই না করিয় ভয়

তদন্তরে নারায়ণী গোধিক্য হইলা

অরণ্যের পন্থমুখে আগুছি রহিলা

এইভাবে ধর্মীয় চেতনার প্রবহমানতা পেঁৗছাতে পেঁৗছাতে শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনে এসে নবতর রূপ লাভ করে। ছন্দ প্রয়োগের কুশলতায় ধর্মীয় চেতনার সাথে মিশে যায় মানবিক বোধ। ফলে তা শিল্প হয়ে যায়-

দিনের সুরুজ পোড়া অাঁ মারে রাতিহো এ দুখ চান্দে।

কেমনে সহিব পরাণে বড়ায়ি চখুত নাইসে নিন্দে

শীতল চন্দন অঙ্গ বুলাওঁ তভোঁ বিরহ না টুটে।

মেদনী বিদার দেউগো বড়ায়ি লুকাও তাহার পেটে

বড়ু চ-ীদাসের শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনে প্রভাবিত হয়ে মুসলিম কবিরা পদাবলি রচনায় এগিয়ে আসেন। এর মধ্যে সৈয়দ মুর্তজা অন্যতম। 'পদকল্পতরু' শীর্ষক সংকলন গ্রন্থে আমরা পাই-

সৈয়দ মুর্তজা ভনে কানুর চরণে

নিবেদন শুন হরি।

সকল ছাড়িয়া রৈনু তুয়া পায়ে

জীবনমরণ ভরি।।

এ রকম আরো অসংখ্য পদাবলী মুসলমান কবিদের হাতে রচিত হয়, যার দ্বারা বুঝা যায়, মধ্যযুগে আসলে খুব চমৎকারভাবে ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় ছিলো। ধর্ম এই সময় সামাজিক সাধারণ মানুষের মনে আজকের মতো গোঁড়া হয়ে বিভেদ সৃষ্টি করেনি। ধীরে ধীরে পরবর্তীতে মুসলমান কবিদের মনে ধর্মীয় চেতনা প্রগাঢ় হতে থাকে। তারা নিজস্ব ধারা তৈরির প্রয়াসে লিপ্ত হয়। এ' থেকেই পুঁথি কিংবা গাজীর গানের উৎপত্তি ঘটে। মহাশ্মশানের মহাকবি কায়কোবাদ মুসলিম জাগরণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন-

ধর বজ্রমুঠে ভীষণ কৃপাণ,

এ ধর্ম সমরে দেও বলি প্রাণ

শত-বজ্র শব্দে গর্জুক কামান,

গাও ভীমরবে ইসলামের জয়।

অনল প্রবাহের কবি সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী কায়কোবাদের সুরে সুর মিলিয়ে বলেন-

কিবা ছিলে, কি হইলে, যদি বুঝিবারে দাও,

অতীত গৌরব-পানে মোসলেম! ফিরিয়া চাও।

মুসলিম জাগরণের লক্ষে কবি ইসমাইল হোসেন সিরাজী কেবল এতেই সন্তুষ্ট নন। তিনি নিরন্তর কবিতায় বলে যান-

আবার উত্থান লক্ষে

বহাও জগৎ বক্ষে

নবজীবনের খর প্রবাহ-প্লাবন।

আবার জাতীয় কেতু

উড়াও মুক্তির হেতু,

উঠুক গগনে পুনঃ রক্তিম তপন।

আধুনিক কালে কবিতায় এই জাগরণের ডাক দিয়েছেন কবি কাজী নজরুল তাঁর 'কা-ারী হুঁশিয়ার' কবিতায়-

আবু বকর ওসমান ওমর আলী হায়দর

দাঁড়ী যে এ' তরণীর নাই ওরে নাই ডর

কা-ারী এ' তরীর পাকা মাঝি-মাল্লা

দাঁড়ী মুখে সারি গান লা-শরিক আল্লা।

যদিও কবিতায় কাজী নজরুল একদিকে অসাম্প্রদায়িক চেতনার কবি এবং সাম্যবাদের কবি, তবুও তার কবিতার এক বিপুল অংশে ইসলামী জাগরণের চেতনা পরিস্ফুটিত হয়েছে। বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পরিষদের সংবর্ধনার জবাবে দেয়া অভিভাষণে কবির এই চেতনা বিকশিত হয় পূর্ণ দল মেলে। মধ্যযুগের কবি শাহ মুহম্মদ সগীরের লেখনীতে উপ্ত ধর্মীয় চেতনার বীজ এসে পূর্ণ অবয়বে বৃক্ষ হয়ে পরিস্ফুটিত হয় 'সাত সাগরের মাঝি'র কবি ফর্রুখ আহমদের 'পাঞ্জেরী' কবিতায়। 'রাত পোহাবার কত দেরী পাঞ্জেরী' বলে তিনি ইসলামী রেনেসাঁর অগ্রদূত, কল্পিত বাহন পাঞ্জেরীকে সাত সাগর পেরিয়ে জাগরণের ভোরকে তাড়াতাড়ি উদয়নের জন্যে উদ্দীপিত করেছেন।

অন্যদিকে মঙ্গলকাব্য ও শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন-এর মাধ্যমে স্তুতি ও ভক্তি নিবেদনের দিন শেষে কবিতায় বাউল কণ্ঠে ফুটে ওঠে অভিন্নতার মানবিক বাণী-

নানা বরণ গাভীরে ভাই একই বরণ দুধ

জগৎভর মিয়া দেখি সবাই একই মায়ের পুত।

পাশাপাশি শ্রী চৈতন্যের কণ্ঠেও বেজে উঠে মানবতার কালজয়ী মৈত্রী-'সবার উপরে মানুষ সত্য তার উপরে নাই'।

নিবিড় পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বাংলা কবিতায় শুরুতে হিন্দু কবিদের হাতে ধর্মীয় চেতনা প্রধান হলেও পরবর্তীতে ধীরে ধীরে মানবিক চেতনা মুখ্য হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। আর অন্যদিকে মুসলিম কবিদের হাতে প্রথম দিকে পদাবলী কীর্তন রচিত হলেও পরবর্তীতে ধর্মীয় জাগরণের আহ্বান কবিতায় প্রগাঢ় হতে থাকে। এক পর্যায়ে তা আধুনিক কালে এসে ইসলামী রেনেসাঁর বাণীতে ঋদ্ধ হয়ে ওঠে।

(ঙ) বাংলা কবিতায় দার্শনিক বিপ্লব :

বাঙালি কখনো দর্শনবিহীন ছিলো না। সবসময় বাঙালি তার নিজস্ব দর্শনে সমৃদ্ধ ছিলো। মোটা ভাত, মোটা কাপড়ে তুষ্ট বাঙালি তার গভীর আত্মদর্শনে নিমগ্ন ছিলো জাতিসত্তার নির্মাণের সূচনাকাল থেকেই। বৌদ্ধধর্মের অভিধর্ম-দর্শন ধারণ করেই চর্যাপদ সমৃদ্ধ হয়েছে বৌদ্ধ সহজিয়া গুরু ও নাথপন্থীদের হাতে। উচ্চচিন্তা আর সরল জীবনযাপনকারী বাঙালি কবিতায় তার আত্মদর্শনকে ফুটিয়ে তুলেছে গভীর চেতনায়। কাহ্নপা রচিত একটি চর্যায় আমরা পাই-

রাগ দেশ মোহ লইআ ছাড়।

পরম মোখ লভই মুক্তি হার

অর্থাৎ যে ব্যক্তি রাগ, দ্বেষ, মোহ, লোভ এই সমুদয় ত্যাগ করতে পারে, পরম মোক্ষ বা নির্বাণ-মুক্তি তার গলাতেই হারের মতো শোভা পায়। এই চর্যার মূল বক্তব্যই হলো অনিত্য সংসারে তৃষ্ণা ক্ষয় করা এবং আসব-মুক্ত হওয়া। ষড়রিপুর তৃষ্ণা কেউ ছিন্ন করতে পারলে পরম মুক্তি তারই কপালে জোটে।

কাহ্নপা রচিত আরেকটি চর্যায় আমরা পাই-

এবংকার দিঢ় বাখোড় মোড়িউ।

বিবিহ বিআপক কান্দন তোড়িউ

এই দুই চরণের মধ্যেই নিহিত আছে মুক্তির সূত্র। সকল প্রকার বাধা-বিঘ্ন দলে বা মর্দন করে, বিবিধ ব্যাপক বন্ধন ছিন্ন করলেই সংসার হতে মুক্তি সম্ভব। অর্থাৎ নির্বাণের পথে সংসার বৈরাগ্যে দৃঢ় মনোবলে সকল বন্ধন ছিন্ন করা আবশ্যক।

বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগে চর্যাপদে যে গভীর দর্শন প্রোথিত ছিল তা মধ্যযুগে এসে নবতর রূপ লাভ করে। এ সময় তা' জীবনবেদ-এর মতো কবিতায় রূপায়িত হয়। মধ্যযুগের কবি গোবিন্দ দাসের কড়্চায় আমরা পাই-

রমণীর প্রেম হয় গরল সমান।

অমৃত বলিয়া তাহা মূর্খ করে পান।।

মৃত্যুকালে পুত্র কন্যা নিকটে আসিয়া।

বলে বাবা মোর তরে গেলা কি করিয়া।।

এই কড়্চা হতে নরনারীর অন্তঃদর্শন-এর পরিচয় পাওয়া যায়। নারী মাত্রেই কুশলী এবং তাদের সকল নান্দনিক মানবিকতার মধ্যেও বাস্তবতা লুকিয়ে থাকে। কাজেই নারীর প্রেম সর্বদা অমৃতের মতো নয় বরং তার উল্টো। তার প্রেমে স্বার্থচিন্তা বরাবর বলবৎ থাকে। কবি ভারত চন্দ্র রায় গুণাকর তার 'অন্নদামঙ্গল' কাব্যে বেশ কয়েকটি দার্শনিক বচন সৃষ্টি করে গেছেন। এর মধ্যে 'মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন' উল্লেখযোগ্য। যে কোন সাধনায় সিদ্ধিলাভ করতে হলে চাই দৃঢ়তা। এই দৃঢ়তা পেতে হলে যে কোনো মূল্যে আপন শপথে স্থির থাকতে হয়। তেমনিভাবে একই কবির কাব্যে 'নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়' কিংবা 'জন্মভূমি জননী স্বর্গের গরিয়সী' ইত্যাদি দার্শনিক বচন পাওয়া যায় যা আজো বাঙালির মননে-মানসে জাগ্রত হয়ে আছে।

কোন একসময় গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ আর নবীন তরুণ কাজী নজরুল ইসলামের মধ্যে 'রক্ত' আর 'খুন' এর ব্যবহার নিয়ে অনেক দূর জল গড়ায় যাতে ঘি ঢালেন প্রমথ চৌধুরী এবং আরো কেউ কেউ। নজরুল তখন আক্ষেপে লিখেছিলেন, 'বড়'র পিরীতি বালির বাঁধ'। নজরুলের এই আক্ষেপের শিরোনামই সৃষ্টি করে গেছেন মধ্যযুগের কবিরা। তাদের কাছেই আমরা পাই-

বড়'র পিরীতি বালির বাঁধ

ক্ষণে হাতে দড়ি ক্ষণেকে চাঁদ।

এই হলো বাস্তবতার দর্শন। ক্ষমতায় বড় কারও প্রেম মানেই যখন তখন তার স্বার্থে ব্যবহার। যাকে এক সময় হাতে চাঁদ পাইয়ে দেয় তাকেই আবার প্রয়োজনে হাতে দড়ি দিয়ে হাজত খাটায়, চোর সাজায়।

মধ্যযুগ পার হয়ে আমরা যখন আধুনিক যুগের দিকে আসি কাব্যে দর্শনের তখন ভিন্নমাত্রা মেলে। তখন আর ইহলোক-পরলোক, নিত্য-অনিত্য কিছুই বাদ থাকে না। স্বভাবতই নশ্বর মানুষ মৃত্যুর পর পরকালের কথা চিন্তা করে এবং তার কর্মানুযায়ী পরকালে শাস্তি বা পুরস্কারের ভাবনায় মশগুল থাকে। কিন্তু কবি শেখ ফজলল করিম সেই রকম কিছু ভাবেন না। তাঁর দর্শনে পৃথিবীতেই স্বর্গ-নরক। তাই 'স্বর্গ-নরক' কবিতায় তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন-

কোথায় স্বর্গ কোথায় নরক

কে বলে তা বহুদূর

মানুষেরি মাঝে স্বর্গ-নরক

মানুষেতে সুরাসুর।

মানবতার কবি কাজী নজরুল শেখ ফজলল করিমের এই দর্শনকেই আরেকটু এগিয়ে এনে তাঁর মানবতার দর্শন প্রকাশ করেন :

মিথ্যে শুনিনি ভাই

এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির কা'বা নাই।

নজরুল কিংবা শেখ ফজলল করিম যখন পরকালের দর্শনকে ইহকালে আনয়ন করেন, রবীন্দ্রনাথ তখন তার মনের গভীরে অন্তরতর নাথের কাছে আশ্রয় খোঁজেন। 'অন্তর মম বিকশিত করো অন্তরতর হে' বলে তিনি যে নাথের নিকট প্রার্থনা করেন, সেই একই নাথের নিকটই তিনি পার্থিব জীবনে শক্তি আর ধৈর্য্য কামনা করে বলেন-

'দাও সহ্য দাও ধৈর্য হে উদার নাথ।'

রবীন্দ্রনাথের এই অন্তরের নাথ কেবল উদার তা-ই নয়। এই নাথ রবীন্দ্রমননের অরূপকর্মা। রবীন্দ্রনাথ তাঁর কবিতায় যাঁর প্রভাবে দর্শনগ্রস্ত হন, যাঁর প্রভাবে তিনি বাউল রবীন্দ্রনাথরূপে পরিচিত হন তিনি আর কেউ নন-বাঙলার বাউল সম্রাট লালন সাঁইজি। লালন সাঁইজির গীতিকবিতা সে যেনো গীত বা গান নয়, দর্শনের অতল ভা-ার। বাউল দর্শনের মানবিকতত্ত্বের সাধক লালন সাঁইজি নিজেই মানুষের প্রশ্ন আউড়ে যান- 'সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে?' লালনের জাত যে কেবল মনুষ্যত্ব এটা যারা জানে না তাদের জন্যেই লালন সাঁইজি অমর গীত রচনা করে বলেছেন-

'ব্রাহ্মণ চ-াল চামার মুচি

এক জলেতে সকল শুচি।'

কাজেই জাত গেল জাত গেল বলে মিছে হায়-হুতাশ, মিছে ভয় পাওয়া। যার জাতই মানুষ তার জাত আবার যায় কিভাবে?

লালনের গীতি কবিতায় যে দর্শন ফুটে উঠে তা মূলত হাওয়ার দর্শন। হাওয়ার দর্শনের চর্চা করতে করতেই এক সময় লালনকে বলতে শুনি-

ধর চোরা হাওয়ার ঘরে ফাঁদ পেতে

সেকি সামান্য চোরা ধরবি কোণা কাঞ্চিতে?

চিরজীবন মনের মানুষের সন্ধানে লালনের কেটেছে কাল। লালনের গীতি কবিতায় সেই আক্ষেপের কথাই বিধৃত আছে। বাড়ির কাছের আরশী নগরের যে পড়শীর কথা লালনের গীতি কবিতায় উঠে আসে সে পড়শী আসলে এক পরমসত্তা। প্রগাঢ় সাধনায় সেই সত্তার পথ মেলে। না হলে সেই পরমসত্তার অচিন পাখিটি দেহের খাঁচা ছেড়ে উড়ে যায়। ধর্মের ভেদাভেদকে দূরে রেখে ধর্মের তত্ত্ব কথাকে ধারণ করে লালন চর্চা করে গেছে মুর্শিদতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, পরমতত্ত্ব, নবীতত্ত্ব, গৌড়তত্ত্ব প্রভৃতির দর্শন। লালনের এই গভীর দর্শনই বাংলা কাব্য সাহিত্যে এক অনন্য সম্পদ।

বাংলা কাব্যের সূচনা যুগে বৌদ্ধধর্মের নির্বাণের যে দর্শন ধারণ করে কাব্যের জন্ম সেই কাব্য দিনশেষে পরিণতি পেয়েছে অন্তরতর নাথের দর্শনে, পরিণতি পেয়েছে লালন সাঁইজির মানবতাবাদী দর্শনে। গৌতমবুদ্ধের মানবতাবাদী দর্শন দিয়ে শুরু হয়ে কবিতায় যে দার্শনিক বিপ্লবের যাত্রা শুরু তা মধ্যযুগে ভক্তিবাদ পার হয়ে আধুনিক যুগে পুনরায় মার্গবাদী ধারার মাধ্যমে শক্তপোক্ত হয়ে যুক্তিবাদ ও যোগবাদে পরিণত হয়েছে। তারই বদৌলতে বাংলা কবিতা আজ অবলীলায় বলতে পেরেছে-

ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই ছোট সে তরী

আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি। (চলবে)

আজকের পাঠকসংখ্যা
২৬১০৩৯
পুরোন সংখ্যা