চাঁদপুর। সোমবার ৬ নভেম্বর ২০১৭। ২২ কার্তিক ১৪২৪। ১৬ সফর ১৪৩৯

বিজ্ঞাপন দিন

বিজ্ঞাপন দিন

সর্বশেষ খবর :

  • ---------
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৩১-সূরা লোকমান


৩৪ আয়াত, ৪ রুকু, ‘মক্কী’


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


২১। তাদেরকে যখন বলা হয়, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তোমারা তার অনুসরণ কর, তখন তারা বলে, বরং আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে যে বিষয়ের উপর পেয়েছি, তারই অনুসরণ করব। শয়তান যদি তাহাদেরকে জাহান্নামের শাস্তির  দিকে দাওয়াত দেয়, তবুও কি?


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


একজন মানুষ দরিদ্র হলেও ভালোবাসতে এবং প্রার্থনা করতে পারে।


                               -জন লিভাগর্ট।

সদর দরজা দিয়ে যে বেহেস্তে যেতে চায় সে তার পিতা-মাতাকে সন্তুষ্ট করুক।


শরৎচন্দ্রের চরিত্রচিত্রণ ও বাস্তবানুগতা
মুহম্মদ খলিলুর রহমান
০৬ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


 



এক.



সমাজ পরিবর্তনের নিগূঢ় বাসনায় প্রচ-ভাবে আলোড়িত অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সর্বজননন্দিত সাহিত্যসাধক হিসেবে বিশ্বসাহিত্যে বরেণ্য ব্যক্তিত্ব। শরৎচন্দ্র সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, "সাহিত্য রচনা করে খ্যাতি অর্জন করেছেন অনেকেই, কিন্তু শরৎচন্দ্রের মতো সর্বজনীন হৃদয়ে আতিথ্য লাভ করতে পারেন নি কেউই।" শরৎচন্দ্র এমনি এক সাহিত্যসাধক, যিনি সাহিত্যিকতা করার জন্যে সাহিত্য রচনা করেন নি, সমাজসংস্কারের বৈপ্লবিক প্রেরণা হতেই সাহিত্য রচনায় হাত দিয়েছিলেন। জীবনের চারদিকে যে কাহিনীগুলোতে শরৎচন্দ্র হীনতা এবং মহিমা লক্ষ্য করেছিলেন সেসবকে তিনি সমাজ পরিবর্তনের প্রয়োজনে বিভিন্ন গল্প-উপন্যাসের কাহিনী হিসেবে নির্বাচিত করেছেন। সামাজিকদের হৃদয়ের অাঁধার ঘুচানোর উদ্দেশ্যই সেখানে মুখ্য। শরৎ সাহিত্যের এ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করে ড. সুবোধ সেনগুপ্ত মন্তব্য করেছিলেন, "সমাজশক্তির বিরুদ্ধে যে প্রচ- অভিযোগ বিদেশীয় সাহিত্যে আন্দোলিত হইয়াছে, তাঁহার রচনায়ও তাহার ধ্বনি পেঁৗছিয়াছে।" যথার্থ মূল্যবোধ হতে বহুদূরে সরে আসা সমাজকে শরৎচন্দ্র নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ হতে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তিনি দেখেছেন, সামাজিক প্রতিষ্ঠা পেয়ে সমাজে যাঁরা নমস্য, তাঁদের অধিকাংশই স্বার্থসন্ধানী, আর সমাজ যাদেরকে মর্যাদা দিতে কুণ্ঠাবোধ করে তাদের অনেকের মাঝেই রয়েছে মহৎ গুণাবলি। শরতের সমাজদর্শনের বাস্তবানুগ বিবৃতি তাঁর সাহিত্যে কবিকল্পনার ঐশ্বর্য মিশ্রিত হয়ে প্রকাশিত হওয়ায় বাংলা কথাসাহিত্যে নতুন দিগন্ত সূচিত হয়। তাঁর বিস্ময় উদ্রেককারী শিল্পকুশলতায় তাঁর দেখা চরিত্রগুলো অসাধারণ মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে অঙ্কিত হয়েছে। চরিত্র চিত্রণই তাঁর কথাসাহিত্যে মুখ্য ব্যাপার। কাহিনী চরিত্রবিকাশের প্রয়োজনে উদ্ভাবিত। এ উদ্ভাবিত কাহিনী তাঁরই প্রত্যক্ষ করা বাস্তবতা থেকে গড়া। বাস্তবের প্রত্যক্ষতা কাহিনীতে এমনভাবে তাঁর সাহিত্যে মিশ্রিত হয়েছে যার ফলে প্রত্যেকটি চরিত্রই অসাধারণ ঔজ্জ্বল্য পেয়েছে। শরৎঅঙ্কিত কয়েকটি চরিত্র বিশ্লেষণ করে এ সত্যের উদ্ভাষণই এ প্রবন্ধের মুখ্য উদ্দেশ্য।



শরৎচন্দ্র নিজের চরিত্রকে প্রতিপাদ্য করে আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস 'শ্রীকান্ত' রচনা করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। শরৎচন্দ্রের একজন শিক্ষক তাঁর পাঠশালার ছাত্রের সাহিত্যিক খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ার পর ডেকে বলেছিলেন, "শরৎ, যা দেখনি, তা লিখো না।" শরৎচন্দ্র সে উপদেশ আজীবন স্মরণ রেখেই সাহিত্য সাধনা চালিয়ে গেছেন। এক সময়ে সাহিত্যিকমহলে মন্তব্য করেছিলেন, তিনি তাঁর শিক্ষাগুরুর উপদেশ আজীবন মনে রেখেছেন। তিনি মানসিক দৃঢ়তা ব্যক্ত করতে মন্তব্য করেছিলেন, "আমি যা দেখিনি তা লিখিনি।" 'শ্রীকান্ত' উপন্যাস শরৎচন্দ্রের দেখা পৃথিবীর সাথে কবিকল্পনার ঐশ্বর্যের সংমিশ্রণ ভিন্ন অন্য কিছু নয়। 'শ্রীকান্ত' উপন্যাস বিচিত্র জীবনপথের পথিক শরৎচন্দ্রের অনন্য সাধারণ চরিত্রের তীব্র জ্যোতিবিচ্ছুরণে চরম ঔজ্জ্বল্য লাভ করেছে। মিথ্যা মূল্যবোধে বিশ্বাসী সমাজের প্রতিষ্ঠার মোহ হতে পূর্ণাংশে মুক্ত শ্রীকান্ত অন্তর্গত সত্যবোধের নির্দেশে যে জীবনাচরণকে যথার্থ বিবেচেনা করেছিল, নিষ্ঠা সহযোগে তার অনুসরণ করতে গিয়ে সামাজিক দৃষ্টিকোণ হতে সে হয়েছে ধিকৃত আর সমাজের দৃপ্ত প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গ যে উদারপন্থী পাঠকের দৃষ্টিকে বিমোহিত করেছে তাদের কাছে চরিত্রটি বিধৃত হলো ভিন্নতর ব্যঞ্জনায়।



কথাসাহিত্যের ইতিহাসে শ্রীকান্ত চরিত্র এক বিস্ময়। শরৎচন্দ্রের জীবনবৃত্ত কল্পনার ঐশ্বর্যের বৈচিত্র্যময় হয়ে চিত্রিত হলো 'শ্রীকান্তে'। দেবানন্দপুর গ্রামের মেয়ে বিজয়কালী রূপ নিয়েছে রাজলক্ষ্মী চরিত্রে। শরৎচন্দ্রের গ্রামের পাশ দিয়েই প্রবাহিত সরস্বতী নদীর তীর ঘেঁষে ছিলো বেদে আর সাপুড়েদের নৌকার বহর। নদীতীরবর্তী এলাকায় বেদেপাড়ারও অস্তিত্ব ছিলো। দেবানন্দপুর গ্রামের মৃত্যুঞ্জয় মজুমদার চরিত্রের ছায়াপাত ঘটেছে শাহজী চরিত্রে। 'বিলাসী' গল্পে এ চরিত্রটিই আরো বাস্তব পটভূমিকায় চিত্রিত হয়েছে। অন্নদা দিদির মতো নারীচরিত্রের সাক্ষাৎও শরৎচন্দ্রের বাস্তবজীবনের ঘটনা। অন্নদা দিদির চরিত্রাদর্শ যে হৃদয়কে সোনা করে তুলেছিলো, যে হৃদয় একমাত্র তারই মতো কোনো সতী সাধ্বী, মমতাময়ী নারীকেই বরণযোগ্যা বলে সায় দিয়েছে সে হৃদয় প্রেমবুভুক্ষু রাজলক্ষ্মীকে ফিরিয়ে দিতে পারে নি। রাজলক্ষ্মী চরিত্রকে ঘিরে যে কাহিনী উপন্যাসে স্থান পেয়েছে তার মাঝে শরৎচন্দ্রের সূক্ষ্মজীবনদৃষ্টি দিয়ে দেখা এক পতিতা নারী এবং বিজয়কালীর সংমিশ্রণ ঘটেছে। শরৎচন্দ্রের নির্মোহ জীবনদৃষ্টির বহু বিচিত্র কাহিনী তাঁর বাস্তব জীবনকে প্রেমের ক্ষেত্রে অনাসক্ত সংসার বিরাগীর মহিমায় উদ্ভাসিত করায় এ চরিত্রটি বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী চরিত্র হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। বহু পুরুষের কামুক দৃষ্টির উৎকট প্রলোভন যে শরীর বয়ে বেড়িয়েছে, চটুল বাকচাতুর্যে যে মুখ বহু মুখের ভাষা কেড়ে নিয়েছে তার মাঝ হতে অকৃত্রিম প্রেমিকা হৃদয়ের পরিচয় আবিষ্কার করা এবং অন্নদা দিদির অনুরূপাকে ভুলে তাকে গ্রহণ করা অত্যন্ত কঠিন কর্ম। ক্ষণিক কামনার বশবর্তী হয়ে শ্রীকান্ত সোনা ফেলে যে পিতলকে গ্রহণ করে নি তার প্রমাণ মেলে তার অসাধারণ সংযম সাধনার পরিচয় হতে। সতীত্বের প্রতি শ্রীকান্তের হৃদয়ে যে মোহ সৃষ্টি হয়েছিলো তাকে ধারণ করার মতো মানসিক কাঠিন্য শ্রীকান্তের ছিলো না বটে; কিন্তু পতিতার রূপ এবং বাকচাতুর্যও তাকে টলাতে পারে নি। শরৎচন্দ্র জীবনে চারবার সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করেছিলেন। সংযম শিক্ষার অভ্যাস তাঁর মাঝে স্থায়ী ছিলো বলেই রাজলক্ষ্মীর মতো বাইজীর জীবনের সম্মোহন তাঁকে অসংযমী করতে পারে নি। বিহারের বিঠৌরা গ্রাম সন্ন্যাসীর জীবনাচরণ শরৎচন্দ্রের বাস্তব জীবনের কাহিনী।



শরৎচন্দ্র বার্মায় কাঠমিস্ত্রীদের সাথে জীবনযাপন করে অত্যন্ত সাধারণ মানুষের মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর প্রথম বিয়ে কাঠমিস্ত্রীর মেয়েকে বিপদ থেকে উদ্ধার করার উদারতার কারণেই সংঘটিত হয়েছিলো। 'শ্রীকান্ত' উপন্যাসে বার্মায় শরৎচন্দ্রের জীবনযাপনের বেশ কিছু ইঙ্গিত রয়েছে।



মূলত শরৎচন্দ্র ভবঘুরে জীবনের পথিক হবার অভিলাষে বিচিত্র কাহিনীর মুখোমুৃিখ হয়েছিলেন। তাঁর ভবঘুরে জীবনের নেশা সত্যান্বেষণের মোহ থেকেই জেগেছিলো। ভাবপ্রবণ শ্রীকান্ত চরিত্রেও অশৈশব সৃষ্টি রহস্যে আন্তনিমগ্ন হয়ে বিশ্বসত্য উদ্ধারে প্রয়াসী হবার বহুকাহিনী রয়েছে। প্রকৃতির রূপমুগ্ধ, আত্মহারা, নেশাবিভোর দর্শক হবার সাধ শ্রীকান্তের মাঝে যত না ছিলো তার চেয়ে বেশি ছিলো সত্যোপলব্ধির উদগ্র বাসনা। মহাশ্মশানে বসে অন্ধকার প্রকৃতির রূপ দেখে শ্রীকান্তের অনুমান হয়েছে, রহস্যাবৃত মৃত্যুর মাঝেও হয়তো এমনি অফুরন্ত সুন্দর রূপের দুয়ার খুলে যাবে। মৃত্যুভয় হতে মুক্ত হয়ে শ্রীকান্ত নির্ভীক জীবনের দীক্ষা নিয়ে গভীর সত্যকেই সেদিন বরণ করার মানসিকতা অর্জন করেছে। জীবনের স্বাভাবিক গতি নির্ধারণের জন্যেই তাকে বেছে নিতে হয়েছিলো প্রথাবিড়ম্বিত অস্বাভাবিক গতিপথ। শ্রীকান্তের অকপট মনের স্বচ্ছপটে উদ্ভাসিত সত্যের দ্যুতি তার পথনির্দেশে সহায়ক হয়েছে। সমাজের বাঁধাপথে ন্যায়জ্ঞান বর্জিত স্বার্থান্ধ এবং অন্ধ অনুসারী নির্বোধের ভিড়ে মিশে সার্থকতার মিথ্যে আত্মপ্রসাদ লাভের উৎসাহ তার কখনও জাগেনি। তাই পারোপকার ব্রতে দীক্ষিত, সত্য ধারণের দৃঢ়চিত্ততার অধিকারী সাহসী ইন্দ্রনাথের পথ তার মন ভুলিয়েছে এবং এ কারণেই শাসন পাশ ছিন্ন করে দশ্যি ছেলের অপবাদ স্বেচ্ছায় বরণ করে শ্রীকান্ত অন্নদা দিদিকে অর্থপ্রদানের জন্য ইন্দ্রনাথের সাথে অসময়ে গৃহত্যাগ করেছে। সমাজপতিদের বিরুদ্ধে গিয়ে একঘরের বাড়িতে মৃত বৃদ্ধা সৎকার করার সময়ও ইন্দ্রনাথের আদর্শই শ্রীকান্তের হৃদয়ে আলো ফেলেছিলো। ইন্দ্রনাথ-শ্রীকান্তের কাহিনী শরৎচন্দ্রের ভাগলপুরে অবস্থানের সময় ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার গল্পরূপ। উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর মামাদের মধ্যে খ্যাতিমান ব্যক্তি। বিপ্লবী বিপীন গাঙ্গুলীও এই মামাদেরই আত্মীয়। পিতার মৃত্যুর পর শরৎচন্দ্র এফ.এ. ক্লাস পর্যন্ত ভাগলপুরেই পড়াশোনা করেছেন। তবে অর্থাভাবে এফ.এ. পরীক্ষা দেয়া তাঁর হয়ে উঠেনি। মাছ চুরির কাহিনী এবং নতুনদার হাস্যরসাত্মক কাহিনীর পটভূমি ভাগলপুর। গঙ্গা নদীর প্রচ- স্রোতের মধ্য দিয়ে নৌকা চালানোর অভিজ্ঞতা এ সময়েরই। এ সময়ে শরৎচন্দ্রের সাহসী সহচর হিসেবে রাজেন্দ্রনাথ মজুমদার তাঁর বহু ঘটনার সাথী ছিলেন।



 



জগৎ ও জীবন সম্পর্কীয় যে দর্শন 'শ্রীকান্ত' উপন্যাসে সত্য প্রতিষ্ঠার পথ খুঁজেছে তা একান্তই শরৎচন্দ্রের নিজস্ব জীবনদৃষ্টি থেকে লব্ধ। জীবনদ্রষ্টা শ্রীকান্তের মমতাবোধের যে বিবৃতি উপন্যাসে রয়েছে তা সম্পূর্ণ শরৎচন্দ্রের মমতামেদুর হৃদয় উৎসারিত এবং তাঁর প্রত্যক্ষ করা বিভিন্ন ঘটনার অভিঘাতেই এর বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। শরৎচন্দ্রের চোখ ছিলো তাঁর বুকে। শ্রীকান্তের সর্বপ্লাবী মমতা ও সহানুভূতি শরৎচন্দ্রের হৃদয়ভাবেরই বহিঃপ্রকাশ। শ্রীকান্তের মমতাপ্লুত হৃদয়ের পরিচয় পেয়ে অন্নদা দিদি তাকে আশীর্বাদ করে বলেছিলেন, "আশীর্বাদ করে যাই, তোমার বুকের ভিতরে বসে ভগবান চিরদিন যেন অমনি করে দুঃখীর জন্যে চোখের জল ফেলেন।" শরৎচন্দ্রের সমগ্র জীবনে মমতাবোধের অসংখ্য কাহিনী রয়েছে। বার্মায় তাঁর পোষা টিয়াপাখির মৃত্যুতে এবং হাওড়ায় তাঁর পোশা কুকুরের মৃত্যুতে কয়েকদিন তিনি শোকার্ত ছিলেন। বৈষ্ণব গায়কদের করুণরসাত্মক গান শুনে তিনি অঝোরে কাঁদতেন। কবি কালিদাস রায়কে ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ করে বলেছিলেন, "দাদাই যদি ডাক, তবে নাম ধরে দাদা না বলে শুধু দাদা বলেই ডেকো।"



সমাজের ক্লেদাক্ত রূপ দেখে, নর-নারীর সম্পর্কের হীন পরিচয় জেনে শ্রীকান্ত হয়ে পড়েছে সংসারবিবাগী। তার অনাসক্ত জীবনদৃষ্টি, তার ভবঘুরে জীবন পর্যালোচনা করে তাকে এক কর্মকুণ্ঠ, সুখপ্রিয়, গুণহীন যুবক বলে ভ্রম হতে পারে। শরৎচন্দ্রের জীবন সম্পর্কেও সমালোচকবৃন্দ অনেকেই এ ধরনের বিরূপ মন্তব্য করেছেন। কিন্তু শ্রীকান্ত চরিত্রের গভীর বিশ্লেষণে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, জীবনদ্রষ্টা শ্রীকান্তের তথা শরৎচন্দ্রের সমস্ত আচরণে গভীরবোধ ক্রিয়াশীল ছিলো। অভিভাবকহীন জীবনে শ্রীকান্ত একদিকে ভোগ করেছে অবাধ স্বাধীনতা, অন্যদিকে অবলম্বনহীনের দুঃখকষ্ট। ইচ্ছেমতো জীবন চালালেও শ্রীকান্ত দুর্বুদ্ধির পরিচয় দেয় নি কোনো ক্ষেত্রেই। তবে সমাজের দৃষ্টিতে যাকে দুর্বুদ্ধি বলা হয় তা দিয়েই অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক প্রগতির পথ উন্মুক্ত হয়। সমাজদৃষ্টিকে ব্যঙ্গ করে এসব প্রগতিবাদীদের গুরুত্ব নির্দেশ করতে বার্নার্ড শ বলেছেন, "অষষ ঢ়ৎড়মৎবংং ফবঢ়বহফং ড়হ ঃযব ঁহৎবধংড়হধনষব সধহ."



শরৎচন্দ্র প্রগতিবাদী মনের পরিচয় দিলেও তাঁর বিশ্বাস ছিলো রক্ষণশীলতার যৌক্তিক কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত। শরৎচন্দ্র মানুষের জীবনকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে ফোটাতে গিয়ে বহু প্রশ্ন, বহু জিজ্ঞাসা পাঠক মনে জাগিয়ে তুলেছেন। এ জিজ্ঞাসার সঠিক উত্তর পেতে হলে শরৎচন্দ্রের মননশীলতার গভীরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে। তিনি আধুনিক জীবনের সঙ্গে বাঙালির স্বাভাবিক হৃদয়াবেগের সংমিশ্রণে প্রাণবন্ত কিছু চরিত্র অঙ্কন করে শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় রেখেছেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর সূক্ষ্ম অনুভূতি এবং প্রখর অন্তর্দৃষ্টি ক্রিয়াশীল ছিলো বলেই জীবনসত্যের গভীর তলদেশ হতে অসংখ্য রত্ন উদ্ধার করে বাংলা সাহিত্যকে মহিমা ও ঐশ্বর্যে পূর্ণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। 'শ্রীকান্ত' উপন্যাসকে রোমা রোল্যাঁ নোবেল পুরস্কার পাবার যোগ্য সাহিত্যকর্ম বলে মন্তব্য করেছেন। শরৎসাহিত্যের রসমাধুর্যের মূল্যায়ন করতে গিয়ে রাধারাণী দেবী মন্তব্য করেছেন, "শরৎ সাহিত্যের বিশেষত্বই হচ্ছে জীবনের কঠোর বাস্তবতার সাথে সুষমা, স্নিগ্ধকল্পনার অপূর্ব সুসঙ্গতি।"



 



মনস্তাত্তি্বকতা আধুনিক উপন্যাস সাহিত্যের একটি মুখ্য দিক। এদিক থেকে শরৎচন্দ্র আধুনিক জীবনের সাথে বাঙালি সমাজজীবনের অসঙ্গতি সংক্রান্ত মানসিক জটিলতাকে উপন্যাসে গুরুত্ব দেয়ায় তাঁর চরিত্র মনোবিশ্লেষণের মূল্যবান উপকরণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বিশ্বপতি চৌধুরীর মন্তব্য 'শরৎচন্দ্র আধুনিক যুগের কথাশিল্পী। সুতরাং নিছক গল্প শুনিয়ে তিনি ক্ষান্ত হতে পারেন নি। সেই সঙ্গে মানব মনের বহু সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম গোপন রহস্য, আমাদের সমাজজীবনের বহু জটিল সমস্যা, আমাদের নীতিবোধের চিরাচরিত গতানুগতিক আদর্শ সম্বন্ধে বহু জিজ্ঞাসাবাদের তিনি অবতারণা করেছেন। তবে শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে মনস্তাত্তি্বক সমস্যা, সামাজিক সমস্যা যতোই প্রাধান্য পাক মানবজীবনকে সেখানে গৌণ করা হয় নি। এ প্রসঙ্গে বিশ্বপতি চৌধুরীর মন্তব্য, "আর পাঁচজনের লেখায় জীবন অপেক্ষা সমস্যা বড় হয়ে উঠেছে। আর শরৎচন্দ্রের লেখায় সমস্যা অপেক্ষা জীবন অনেক বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।" শ্রীকান্ত চরিত্রেও এ সত্য সুস্পষ্টভাবে উদ্ভাসিত। বিধা বাংলা নারী বাইজী হয়েও যখন শ্রীকান্তের ভালোবাসার ভিখিরী সেজেছে, শ্রীকান্ত মানবতাবোধে তাড়িত হয়ে তাকে ফিরিয়ে দিতে পারে নি। আবার বঙ্কুর মা হয়ে রাজলক্ষ্মী যে তৃপ্তি খুঁজে পেয়েছে তা হতেও তাকে বঞ্চিত না করে শ্রীকান্ত কঠোর সংযমে প্রবৃত্তি দমন করেছে। কৌলুষহীন ভালোবাসাকেই শরৎচন্দ্র উচ্চমূল্য দিয়েছে। এ ভালোবাসাকেই শরৎচন্দ্র বড়প্রেম বলে ঘোষণা করতে দ্বিধা করেন নি। 'শ্রীকান্ত' চরিত্রে শরৎচন্দ্রের জীবনদৃষ্টি, তাঁর ধর্মীয় মূল্যবোধ আধুনিক সাহিত্যের শিল্পকৌশলে প্রকাশ পেয়েছে।



শরৎচন্দ্রের সাহিত্যমানসের ব্যাপক পরিচয় এ উপন্যাসে বিধৃত। তাঁর ব্যক্তিক জীবনের বাস্তবতা সাহিত্যশিল্পের অপূর্ব মহিমায় 'শ্রীকান্ত' উপন্যাসে প্রকাশ পেয়েছে। শিল্পী হিসেবে তাঁর জীবনসত্যের বহিঃপ্রকাশের ক্ষেত্রে শরৎচন্দ্র তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি সম্বন্ধে মন্তব্য করেছেন, "জীবনের প্রত্যক্ষ ঘটনাগুলিকে অবিকল অপরিবর্তিত অবস্থায় সাহিত্যে রূপ দেওয়া চলে না। সেই অভিজ্ঞতার ফল একমাত্র সত্যকার সাহিত্যসৃষ্টি করার কাজে লাগাতে পারে।"



শরৎচন্দ্র শিল্পী হিসেবে যে মহিমাকে জীবনে ধারণ করেছেন, তা বর্তমান বাংলা কথাসাহিত্যে একান্তই দুর্লক্ষ্য হওয়ায় শরৎচন্দ্রকে পাঠক সমালোচক শ্রদ্ধা-মমতার সুতীব্র আবেগে স্মরণ করবে। (চলবে)।



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৫৩৩৮১০
পুরোন সংখ্যা