চাঁদপুর। সোমবার ২০ নভেম্বর ২০১৭। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৪। ৩০ সফর ১৪৩৯
kzai
muslim-boys

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৩২- সূরা সেজদাহ

৩০ আয়াত, ৪ রুকু, ‘মক্কী’

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

১১। বলুন, তোমাদের প্রাণ হরণের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা তোমাদের প্রাণ হরণ করবে। অতঃপর তোমরা তোমাদের পালনকর্তার কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে।

১২। যদি আপনি দেখতেন যখন অপরাধীরা তাদের পালনকর্তার সামনে নতশির হয়ে বলবে, হে আমাদের পালনকর্তা, আমরা দেখলাম ও শ্রবণ করলাম। এখন আমাদেরকে পাঠিয়ে দিন, আমরা সৎকর্ম করব। আমরা দৃঢ়বিশ্বাসী হয়ে গেছি।

দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


সংসারে যে সবাইকে আপন ভাবতে পারে, তার মতো সুখী নেই।              

-গোল্ড স্মিথ।


দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞানচর্চায় নিজেকে উৎসর্গ করো।


ফটো গ্যালারি
নবান্ন-অভিজ্ঞান
পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
২০ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


ঋতুকে ভূষণ পরিয়ে দেওয়া হলো স্বতন্ত্র পরিচয়। সম্বোধনের আবরণে ডাকা হলো এক এক নামে। গ্রীষ্মকে চিনি গরমে। বর্ষার বৃষ্টি চিনিয়ে দেয় বন্যার বিপর্যয়। শরৎকে চেনায় শিশির আর শিউলি। চিনিয়ে তোলে শারদীয়া, সুনীল আকাশ আর সাদা মেঘের পরিযায়ী ভেলা। কাশের শুভ্র হাসিতে শরৎ হয় প্রাণখোলা। শীতের হাওয়ায় হাড়ের কাঁপন। বসন্তের পরিচয় কোকিলের কূহুতানে আর দখিনার মনকাড়া মলয়ে। হেমন্তের তবে পরিচয় কী? কনক সোনার ধানে আর কিষাণীর লোনা ঘামের হাসি হেমন্তের যথার্থ পরিচয় কি? কোমল হিম কিংবা ঝরা পাতার বেদনাও হেমন্তের অবগুণ্ঠন সরাতে পারে না উপযুক্তরূপে। তাহলে হেমন্তের কী এতো ঐশ্বর্য? হেমন্তের ঐশ্বর্য নবান্নে। হেমন্তের প্রকৃত পরিচয় নবান্নের ঘনঘটায়। বৈষ্ণব পদকর্তা পদ্মলোচন দাস মধ্যযুগে তাই হেমন্ত বন্দনায় নবান্নকে তুলে এনেছেন তাঁর পদ রচনায়-



 



'অঘ্রাণে নতুন ধান্য বিলাসে



সর্বসুখ ঘরে প্রভু কী কাজ সন্ন্যাসে।'



 



হেমন্ত ভরিয়ে দেয় দিগাঙ্গনার অাঁচল। হেমন্ত আনে সমৃদ্ধি, আনে শীতকে যুজে যাওয়ার কাঙ্ক্ষিত রসদ। হেমবরণী রোদ, কনক ধানের কনক-হাসি আর কোমল হিমেল ক্ষণায়ু দিন হেমন্তের অপরূপ ঐশ্বর্য। কিন্তু প্রকৃত আনন্দের অনন্ত উল্লাস নিয়ে হেমন্ত আসে তার নবান্নের চির নবীন অথচ আবহমান ঐতিহ্যের পার্বনে। নবান্নকে গর্ভে ধারণ করে বলেই হেমন্ত এতো বনেদী, এতো আড়ম্বরপূর্ণ। হেমন্ত আনে নবান্নের নতুন অহনার অপার সম্ভাবনা।



 



নক্ষত্রের নামে মাস দুটি জ্বলজ্বল। কৃত্তিকা নাম নিয়ে কার্তিক আর আর্দ্রা নাম হতে অগ্রহায়ণ। মাস দুটি হেমন্তের স্বল্পায়ু জীবনের বর্ণিল বৈচিত্র্যধারী। মরা কার্তিক কিংবা কার্তিকের মঙ্গার পর হেমন্ত আসে দুঃখের শেষে সুখের পরশ নিয়ে ঐশ্বর্যকে বরণ করে।



নতুন ধান্যে হয় নবান্ন। নবান্ন কেবল একটি অনুষ্ঠানমাত্র নয়। নবান্ন একটি ঐতিহ্য, নবান্ন সৃজন-মননের অফুরান উচ্ছ্বাস। কেবল নতুন ধান্যে তৈরি পিঠা বা পায়েসের মধ্যেই নবান্ন থাকে না থেমে। নবান্ন একটি বাঙালি চেতনার নাম। বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ও বিকাশের এক অনন্য সোপান। বিবাহিতা মেয়ে বছর শেষে শ্বশুর বাড়ি হতে বাপের বাড়ি আসে সে তো হেমন্তের নবান্নে, অগ্রহায়ণের ঘ্রাণে। বাপের বুকে নতুন ফসলের বল, গোলায় নতুন ধান। মেয়ে আসে বাপের কাছে সমৃদ্ধির বীণা হয়ে। কিষাণীর গায়ে নতুন কাপড় ওঠে, নাকে কিংবা কানে সোনার ধানে ওঠে সোনার নোলক কিংবা কানের ফুল। কার্তিকের মরা আর খরা কাটে আঘণের প্রাণের উৎসবে। নবান্নের অন্ন পৌষে পিঠের পার্বন আনে। পূর্ব পুরুষের উদ্দেশ্যে নতুন অন্নের কাকবলী প্রতীকীভাবে ঋণ স্বীকার করায় গুহাবাসী পূর্ব পুরুষদের যাঁরা সূচনা করেছিলেন প্রথম কৃষিকর্মের।



রাজা-রাজড়াদের আগেকার দিনে নবান্নের আনন্দমুখরতা বজায় থাকতে থাকতেই দিতে হতো রাজা ও রাজ্যের খাজনা। অর্থাৎ নবান্ন শুধু ব্যক্তি জীবনেই আনন্দের সঞ্চার করতো না, নবান্ন রাষ্ট্রজীবনে নিয়ে আসতো রাজ্য পরিচালনার মূল্যবান রসদ। রাজকীয় এই খাজনার সওগাত নিয়েই বুঝি বলতে চেয়েছেন নজরুল-



 



'ঋতুর খাঞ্চা ভরিয়া এলো কি ধরণীর সওগাত?



নবীন ধানের আঘ্রাণে আজি অঘ্রাণ হলো মাত।'



 



রন্ধনশিল্পের বিকাশ ও অঙ্কনশিল্পের চর্চার এক বড় মঞ্চ নবান্ন। এমনিতেই গ্রামবাংলার কৃষকের ঘরে দুই পদের বেশি রান্না হয় না। কিন্তু নবান্নকে ঘিরে রন্ধনকুশলীরা বিশ থেকে চলি্লশ পদের ব্যঞ্জন সৃজনে মনোনিবেশ করে। যারা আল্পনায় সিদ্ধহস্ত তারা চালের গুঁড়ো জলে ভিজিয়ে অাঁকেন বিচিত্র নকশা যাতে ফুটে উঠে ধানের ঐশ্বর্যের চেয়েও অধিক মনের ঐশ্বর্য। সুচিন্তার প্রসারিত দিগন্ত উন্মোচিত হয় ঘর লিপে-পুঁছে পবিত্রকরণে।



 



নবান্নে কাজ বাড়ে কিষাণীর। নতুন ধান ঘরে তোলা, উঠোন লিপে তাতে সোনার ফসলের স্তুপ করা, ধান মাড়াই এবং সেই ধানকে ঢেঁকিতে ছেঁটে চাউলে পরিণত করা-এ সব করতে করতেই দিন যায়। ফুরসৎ মিলে না মোটে। তবু তার মুখে হাসি অমলিন। কিষাণ বধূর এমন হাসিতেই বিমুগ্ধ জসীম উদ্দীন বলেছেন-



 



'কিষাণের গায়ে গহনা পরায় নতুন ধানের কুটো



এত কাজ তবু হাসি ধরে না মুখে ফুল ফুটো ফুটো।'



 



নবান্ন মানেই মেয়েলি গীতের ব্যাপক চর্চা। গ্রামের নারীরা একদিকে পিঠে-পুলি বানায় নতুন ধানের চালে আর অন্যদিকে বালিকার দল নানারকম মেয়েলি গীতে মাতিয়ে রাখে আসর। নবান্নে পিঠে-পুলি তৈরির গান যেমন আছে তেমনি আছে ধান ভানার গান, নদীতে কলসী ভরার গান এবং বাসন মাজার গান।



 



নবান্ন উৎসবের সাথে ওৎপ্রোতভাবে মিশে আছে কৃষি প্রধান বাংলার অনন্য সংস্কৃতি। নবান্নের সাথে জড়িয়ে আছে জনজীবন, জড়িয়ে আছে কৃষকের হাসি-কান্না। নবান্নের ধান আমন। বেশিরভাগ আমনই ভাসমান জাতের যার স্থানীয় নাম জলিধান বা পৌষধান। হাকালুকি হাওড়ে নবান্ন আসে বোরো ধানের সমৃদ্ধিতে। নবান্নের পিঠেপুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ভাপা পিঠা, চিতই, দুধ চিতই, দুধ পুলি, পাটিসাপ্টা, তেলে ভাজা পাকান পিঠা, গোলাপফুল পিঠা ইত্যাদি। তৈরি হয় নতুন কাস্তে, ডালি, কুলা, চালুনি, ঝাঁটা, চাটাই ইত্যাদি।



নবান্ন আসে বাঙালির জীবনে সৃজন অভিপ্রায় নিয়ে। যা কিছু পুরাতন তাকে ছেড়ে নূতনের আবাহনে। মেতে ওঠে আবহমান বাংলা কিশোরীদের নতুন সাজে এবং মেয়েলি গীতের মাঝে। নবান্নের অভিলাষ আর কেবল শিরনি, পায়েসে সীমাবদ্ধ থাকে না, হয়ে যায় বিয়ের সামাজিক অনুষ্ঠানের মতোই আনন্দময়। আঘণ মাসের বিয়েতে নবান্নের মৌ মৌ গন্ধ বিরাজ করে।



 



নবান্ন মূলত শস্যোৎসব। শস্যকে বরণের তাগিদে এই উৎসব পালিত হয়। হাল-বলদের কৃষিজীবনে হাসির সঞ্চার হয় নবান্নে নতুন ধানের আগমনে। নবান্নকে নিয়ে জসীম উদ্দীন তাই উচ্চকণ্ঠ-



 



'আশ্বিন গেল কার্তিক মাসে পাকিল ক্ষেতের ধান



সারা মাঠ ভরি গাহিছে কে যেন হলদি কোটার গান।'



 



গ্রামের নবান্নের চেয়ে শহুরে নবান্ন অধিক বর্ণময় কিন্তু প্রাণের উচ্ছ্বাস প্রকৃতস্তরে তাতে থাকে না।



নগরে নবান্ন নামে নতুন ধান্যে নয়। পঞ্জিকা কিংবা বর্ষপঞ্জীর তারিখে। নবান্নের নিজস্ব গীত এখানে ধ্বনিত হয় না। ধ্বনিত হয় ঋতুভিত্তিক রবীন্দ্র-নজরুল। নাগরিক পিঠা উৎসবে বংশ পরম্পরা অধীত বিদ্যার প্রয়োগ নেই বরং রেসিপি বুকই এখানে ভরসা। নগরে কিষাণী নেই, নেই তার হাসি। নেই কোনো ধান মাড়াইয়ের আয়োজন। তবুও নগরে নবান্ন আসে অগ্রহায়ণ আগমনের উছিলায়। আদতে নবান্নের মাধ্যমে অগ্রহায়ণ আসে, নাকি অগ্রহায়ণ নিজেই নিয়ে আসে নবান্ন? গ্রামে নবান্নই নিয়ে আসে অগ্রহায়ণকে। কিন্তু নগরে অগ্রহায়ণই নবান্নকে নিয়ে আসে তারিখের মারফতে। নগরের নবান্ন যদিও পরিশীলিত, কিন্তু কাঠামোবদ্ধ। পল্লীর নবান্ন কাঁচা ও অগোছালো। পল্লীর নবান্নে আছে খোলা জল-হাওয়ার শোভা কিন্তু শহুরে নবান্নে আছে ড্রইং রুমের চোখ ধাঁধানো জলসা।



কবির নবান্ন গভীর বাণীর কল্লোল। কৃষকের নবান্ন সোনার ধানের শ্রম-সার্থকতা। কবির নবান্নে কথার ফুলঝুরি, কৃষকের নবান্ন রোদে পুড়ে জলে ভিজে পাওয়া শ্রম-সন্তান। কবির নবান্নে হাসে অগ্রহায়ণের চেয়েও হেমন্ত অধিক। হেমন্তের হেমরূপে কবি নবান্নের সমৃদ্ধি অবলোকন করেন। কৃষকের নবান্নের শক্তি ভরা গোলা আর সাংবাৎসরিক অন্নের সংস্থান। কিষাণীর নবান্ন শ্রম-তৃপ্তির সুখ আর নব পরিধেয়ের মায়া-মদিরতা। নগরবধূর নবান্নে অনলাইন শপিং আর ম্যাচিং এর রাতভর পরিকল্পনা। কিষাণীর ঘাম মেখে হেসে ওঠে নবান্নের ধান আর নগরবধূর সেল্ফি উৎসবে নবান্ন বেঁচে থাকে অর্থে কেনা সুখের বিজ্ঞাপন হয়ে। কিষাণ দুহিতার নবান্নে পিতৃগৃহে আসার উদ্বেগ মিশ্রিত বিমল আনন্দ লুকিয়ে থাকে। নাগরিক রমনীর নবান্নে মিছে মায়াবী আলোয় চপস্টিকে চাউমিন খাওয়ার রোমাঞ্চ মিশে থাকে। গ্রামীণ নবান্ন ধরে রাখে ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা কিংবা পরম্পরা। কিন্তু নাগরিক নবান্ন আসে যান্ত্রিক জীবনে একফালি প্রাণের স্পন্দন সৃষ্টির পল্কা প্রয়াসে। গ্রামীণ নবান্নে মেতে উঠে পল্লীর প্রতিটি ঘর। কিন্তু নাগরিক নবান্ন আসে শুধু উচ্চ মধ্যবিত্তের ঘরে। শহুরে নবান্ন বুঝি বনসাই। জাঁকজমকের আলোছায়ায় নিয়ে আসে এক চিমটি জৌলুস। গ্রামের নবান্নে শামিল হয় আকাশ-বাতাস আর ফুল-পাখি সবই।



যেভাবেই হোক, ফরমানে হোক, ফরমালি হোক, স্বতঃস্ফূর্ত হোক আর আরোপিত হোক-বাঙালির জীবনে নবান্নের প্রত্যাবর্তন হতে চলেছে পুনরায়। সম্রাট আকবরের খাজনা আদায়ের কৌশলের কাছে অগ্রহায়ণ মার খেয়েছে কালে কালে। ফলে নবান্ন দিয়ে নতুন বছর হওয়ার কথা থাকলেও তা বাস্তবে হয়নি। অথচ নব ধান্যে, নব অন্নে সূচনা হবে নতুন বছরের, এই-ই ছিলো তখনকার গ্রামীণ জনপদের সহজ-সরল মানুষের বড় পার্বন। সেই চর্চা বাধাগ্রস্ত হয় পহেলা বৈশাখের প্রবর্তনে। তারপরও হারিয়ে যেতে বসা নবান্নকে আবারো নিজের স্থানে বসানোর প্রয়াস আজ আশাবাদী করে তোলে আবহমান বাঙালি সংস্কৃতির ঘ্রাণে বেঁচে থাকা মানুষকে। নবান্ন বেঁচে থাক বাঙালির প্রাণের উৎসব হয়ে, বাঙালির শেকড়ের গভীরে টান হয়ে। নবান্ন তৈরি করুক সত্যিকারের এক অসাম্প্রদায়িক চেতনার ও চর্চার বাংলাদেশ।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৮৪২১৭৫
পুরোন সংখ্যা