চাঁদপুর। বৃহস্পতিবার ৭ ডিসেম্বর ২০১৭। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৪। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯
kzai
muslim-boys

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৩৩-সূরা আহ্যাব

৭৩ আয়াত, ৯ রুকু, মাদানী

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

১০। যখন উহারা তোমাদের বিরুদ্ধে সমাগত হইয়াছিল তোমাদের উপরের দিক ও নিচের দিক হইতে,  তোমাদের চক্ষু বিস্ফারিত হইয়াছিল, তোমাদের প্রাণ হইয়া পড়িয়াছিল কণ্ঠাগত এবং তোমরা আল্লাহ সম্বন্ধে নানাবিধ ধারণা পোষণ করিতেছিলে;

১১। তখন মু'মিনগণ পরীক্ষিত হইয়াছিল এবং তাহারা ভীষণভাবে প্রকম্পিত হইয়াছিল।

দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


চা খাদ্য নহে, ইহা মাদক উত্তেজক গুণ বিশিষ্ট।                


-ডাঃ জন ফিসার


কবর এবং গোসলখানা ব্যতীত সমগ্র দুনিয়াই নামাজের স্থান।


ফটো গ্যালারি
পর্ণ কুসুম
ডাঃ পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
০৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+

মানুষ মাত্রেই জীবনের কুসুম। কেউ কলি, কেউ বা আধফোটা। আর কেউ পূর্ণ প্রস্ফুটিত হয়ে ঝরে পড়ে আয়ু শেষে। উৎপল এমনই এক আধফোটা জীবনের কুসুম। জীবনের সরোবরে তার অনিন্দ্য বিচরণ। পর পর তিন বোনের পরেই উৎপলের সংসারে আবির্ভাব। মা সর্বদা রুগ্ন শরীর। তার জন্মের বছর দশেকের মাথায় মায়ের জীবন-নিবাসের দিন শেষ হয়ে যায়। বিপত্নীক পিতা আর মাতৃহারা উৎপল আগলে রাখত সংসার। তার বড় তিন বোন মানবসেবার ব্রত নিয়ে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের পথে নিবেদিত। বড় বোন সরকারি চাকুরি পেয়ে টারসিয়ারি হাসপাতালে রোগ-পীড়িত মানুষের শিয়রে জীবনের দীপ নিয়ে আলো বিলিয়ে চলেন। মেজো বোন স্থানীয় শহরে ব্যস্ত ক্লিনিকে আর ছোট বোন পার্বত্য জেলার এক থানা হেল্থ কমপ্লেঙ্ েস্বাস্থ্য সেবায় আত্মমগ্ন। ছোটবেলা হতেই উৎপল পড়াশুনায় মেধাবী। গ্রামের স্কুলে সে ফার্স্ট হতো সবসময়। সে বাস্তবিক অর্থেই অাঁধারমানিক। অর্থাৎ তার গ্রামের অনগ্রসর অাঁধারে সে মানিকের মতোই সবার আশার দীপ। বিভাগীয় শহরের এক নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় সদৃশ কলেজে অর্থনীতি বিষয়ে স্নাতকের ছাত্র সে। হাতের লেখা তার চমৎকার। নামের অর্থের সাথে হাতের লেখা তার সার্থকতা প্রমাণ করে। স্নাতকে পড়লেও উৎপল দেখতে ছোটখাটো। যে কেউ দেখলে তাকে দশম শ্রেণির ছাত্র বলে ভুল করতে পারে। নগরীর বিজন এলাকা দেবপাহাড়। এরই পাদদেশে ছাত্রদের মেসে উৎপলের স্বর্গ-নিবাস।

একই শহরে থাকেন তার বড়মামা। বড়মামার বড় পরিবার। সমাজে তাঁর খ্যাতিও যথেষ্ট। তাঁর পরিবারে শিক্ষার আলো সবসময় দীপ্যমান। মামার বাসাতে থেকেই সে শহরের নামী কলেজে মানবিক বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিকে পড়াশুনা করেছে। তার চেয়ে বয়সে কিছুটা বড় মামাত ভাই তারই সহপাঠী। সে বিজ্ঞানের ছাত্র আর উৎপল মানবিকের। মামার বাসায় দিনগুলো তার মধুর ছিলো। দীর্ঘদিন পরে সে ফিরে পেয়েছিলো পরিবারের ছায়া, মমতাময়ী স্নেহ। তবে একটাই অসুবিধা ছিলো। বাসার চারতলা বেয়ে দিনে বেশ কয়েকবার দোকানে আর বাজারে যেতে হতো। তবুও এসব কিছু ছাপিয়ে তার দিনগুলো কেটে যেতো আনন্দে। সকালে বারান্দায় টেবিল-চেয়ার পেতে হাল্কা রোদে পড়তে ভালোই লাগতো। এই বাসায় থেকে পড়াশুনার কারণেই সে উচ্চ মাধ্যমিকে মানবিক হতে প্রথম বিভাগ পায়। দুটো লেটারও পেয়েছিলো। যুক্তিবিদ্যা আর অর্থনীতিতে। টারসিয়ারি লেভেলের পড়াশুনা গ্রুপ ডিসকাশনে করতে পারলেই ভালো। তাই উৎপল স্নাতকে ভর্তি হয়ে মেসে উঠে যায়। মেসে উৎপল অবারিত, স্বাধীন। কাউকে তোয়াক্কা করার নেই, কারও বাধা মানারও কেউ নেই। উৎপল ধীরে ধীরে মনের শৃঙ্খলা হারাতে শুরু করে। অবশ্য এই শৃঙ্খলা কোনো খারাপ কর্মে ব্রতী হয়ে নয়। উৎপলের জীবনে আসে বসন্ত। উৎপল ধীরে ধীরে প্রেমে পড়ে এক গ্রামীণ মেয়ের, যার নাম পদ্ম।

উৎপলের মেসে মাঝে মাঝে তার সহপাঠী মামাতো ভাই আসে। উচ্চ মাধ্যমিকের পর সে ভর্তি হয় চিকিৎসা বিজ্ঞান অধ্যয়নে। একদিন সে এসে দেখে?উৎপলের মোজা ছিঁড়ে গেছে। পরের দিন নতুন দুজোড়া মোজা এনে দেয় সে উৎপলকে। উৎপলের বড় ভালো লাগে এই দাদাকে। সহপাঠী হলেও উৎপলের তার প্রতি অগাধ সমীহ, অগাধ শ্রদ্ধা। তাকে দেখলে মনে হয় সে অন্য জগতের মানুষ। সবকিছুতেই চৌকষ, সমান পারঙ্গম। তার পাওয়া পুরস্কারে ভরে গেছে দুটো আলমারী। উৎপল মাঝে মাঝে মুখিয়ে থাকতো?কখন এই দাদা আসে। সে আসতো বিকেলের দিকে। চকবাজারে কোনো এক কোচিং সেন্টারে সে মেডিকেল ভর্তি ইচ্ছুকদের কোচিং ক্লাস নেয়। ঐ ক্লাস শেষ হলেই মাঝে মাঝে সে আসে। উৎপল যে মেসে উঠে তাতে তিনজন বোর্ডার। সে ছাড়া বাকি দুজন হলো তার পিসতুতো বড়ভাই। বড়জন কী জানি এক চাকুরি করে, আবার প্রাইভেট ল' কলেজে পড়ে। ছোটজন পড়ে মাস্টার্সে। মার্শাল আর্টেও সে পারদর্শী। গত চার বছর ধরে সে মার্শাল আর্ট শিখেছে। বস্ন্যাকবেল্ট মনে হয় পেয়ে গেছে। আপন পিসতুতো ভাইদের সাথে উৎপল ভালোই থাকে। তারা তাকে কেউ শাসন করে না, তবে ভালোবাসে। যখন মামাতো ভাই আসে তখন পিসতুতো দাদারা থাকতো না। তারা যার যার কাজে থাকতো। ফলে উৎপলের মামাতো আর পিসতুতো ভাইদের মধ্যে কখনো সাক্ষাৎ হয়নি।

এরই মধ্যে উৎপলের বাবা মারা যায়। বাড়িতে একা একা থাকতো। মাঝে মাঝে সপ্তাহান্তে উৎপল যেতো বাড়িতে। বার্ধক্য চেপে বসেছিলো তার দেহে। বিশেষত সঙ্গীহীন হওয়ার কারণে তিনি দিনকে দিন কাবু হয়ে গেছেন বেশি। বয়সের বার্ধক্যের চেয়ে নিঃসঙ্গতার বার্ধক্য তাকে পেয়ে বসে আরও বেশি। শেষ দিকে তার শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। তীব্র শ্বাসকষ্টে একদিন মারা যায় উৎপলের বাবা সরোজ বাবু। সপ্তাহান্তে ক্রিয়া শেষে মাথা মুড়িয়ে উৎপল ফিরে আসে আপন ডেরায়। ভাতঘুমের দুপুরে মাঝে মাঝে উৎপলের মনে পড়ে বাবার সাথে মধুর স্মৃতি। ক্লাস এইটের বৃত্তি পরীক্ষার সিট পড়েছিলো সেবার শহরের স্কুলে। তাই পরীক্ষা দিতে উৎপল ও সরোজ বাবু শহরে এসে উঠে তার বড় মামার বাসায়। তখন মামাতো ভাইও বৃত্তি পরীক্ষার্থী। এরই সাথে যোগ হয় তার বড়মামার ঘনিষ্ঠ বন্ধু পোস্টমাস্টার বাবু ও তার এইটে পড়ুয়া ছেলে। তারও বৃত্তি পরীক্ষা। শহরের স্কুলে সিট। তিনজন পরীক্ষার্থী এক বাসাতেই। রাতে ঘুমিয়ে পড়লে হঠাৎ করে মাঝরাতে সরোজ বাবুর চিৎকারে সবাই জেগে উঠে। কী ঘটনা? আলো জ্বালাতেই দেখা গেলো সরোজ বাবু চোর ভেবে পোস্টমাস্টার বাবুকে ঘুমের ঘোরে চেপে ধরেছেন। রাতে টয়লেটে যাওয়ার জন্যে পোস্টমাস্টার বাবু উঠলে সে সময় ঘুম ভেঙ্গে যায় সরোজ বাবুর। তিনি দেখেন আবছা এক ছায়া টেলিভিশনের গায়ে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ব্যস্! আর যায় কোথায়? তিনি জাপটে ধরে চোর চোর বলে চিৎকার করে উঠেন। অথচ সরোজ বাবু এবং পোস্টমাস্টার বাবু দুজনই এই পরিবারের পরম আত্মীয়। ঘটনার প্রকৃত সত্যি জানতে পেরে সবার সে কী হাসি! হেসে দেয় সরোজ বাবু এবং পোস্টমাস্টার বাবু নিজেও। বহুদিন সে হাসি বয়ে বেড়িয়েছে সবাই। উৎপল ভাবে-সত্যি! বাবাটা কতো সহজ-সরল ছিলো! দু ফোঁটা অশ্রু উৎপলের গড়িয়ে পড়ে।

পিতৃহারা হওয়ার দুঃখ ভুলে যেতে উৎপলকে সাহায্য করে পদ্ম। পদ্ম উৎপলের পিসতুতো বোন। গ্রামের স্কুলে ক্লাস টেনে পড়ে। তারই বড় দু ভাইয়ের সাথে উৎপল থাকে মেসে। পিসতুতো ভাইদের সাথে মাঝে মাঝে গ্রামে যেতো উৎপল। বিশেষ করে দুই ঈদের লম্বা বন্ধ কিংবা দুর্গা পূজার ছুটিতে। এ সময় উৎপলের ক্লাস থাকতো না। মেসও বলতে গেলে খালি হয়ে যেতো। ফলে পিসতুতো দাদাদের সাথে তাদের গ্রামের বাড়ি বেড়াতে যেতে কোনো অসুবিধা হতো না। এ রকম দু-একবার যাওয়ার পরেই উৎপল খেয়াল করে পদ্মের চাহনি সুবিধার না। তার কথায়-হাসিতে কেমন জানি ভিন্নতা আছে। প্রথম প্রথম সে তাকে ছোটবোনের দুষ্টুমি হিসেবে নিয়েছিলো। কিন্তু পরে যখন তার শার্টের পকেটে পদ্মের চিঠি পেলো তখনই সে বুঝতে পারলো পদ্মের আচরণের মর্মার্থ। গ্রামে ক্লাস টেনে পড়ুয়া মেয়েরা যেন একটু তাড়াতাড়িই বড় হয়ে যায়, পেকে যায়। উৎপলের মনে হলো তার পিসতুতো বোন পদ্মও বুঝি এ রকম অকালে পেকে যাওয়া মেয়ে। চিঠিটা পড়ে সে ছিঁড়ে ফেলে। কাউকে কিছু বলে না। পরের দিন আবার শার্টের পকেটে চিঠি পায় পদ্মের। চিঠিতে লেখা?উৎপল দা, আমার সাথে সম্পর্কে রাজি না হলে তোমাকে পস্তাতে হবে। হয়তো আমাকে আর জীবিত পাবে না। পদ্মের চিঠি পড়ে উৎপল ভাবিত হয়। এইবার সে পদ্মকে অন্য চোখে মাপতে শুরু করে। পদ্ম শ্যামলা, মাঝারি গড়ন। মায়াময় চোখ। মুখশ্রী ধারালো। মাথায় বেণী করা চুল। উৎপল আস্তে আস্তে প্রথম ফাগুনের কাছে হার মানে। পদ্ম ও উৎপলের প্রণয় ধীরে ধীরে জমে উঠে। পদ্মের উচ্ছলতা বাড়ে। উৎপলের পড়াশুনায় মনোযোগ কমতে থাকে। মনে সারাক্ষণ বিচরণ করে পদ্ম। উৎপলের মনোসরোবরে পদ্মের সে কী দাপট! পদ্মকুঁড়ি কখন যে তার মানস কুসুমে পরিণত হয় উৎপল তা টেরই পায় না।

উৎপল আজকাল পিসির বাড়ি বেড়াতে আসলে সহজে যায় না। সপ্তাহখানেক বা তারও বেশি থেকে যায়। পিসি আদর করেন তাকে। পিসতুতো ভাইয়েরাও খুশি হয়। তাদের একমাত্র মামাতো ভাই। তাদের বাড়িতে থাকা মানে আনন্দে থাকা। কিন্তু ধীরে ধীরে উৎপলের রোগ বাড়ে। সে প্রতি সপ্তাহে দু-একদিন কাউকে না বলে পিসির বাড়ি চলে আসে। উৎপলের পিসতুতো ভাইয়েরা এতে কিছুই মনে করে না। তারা জানে, তাদের মায়ের স্নেহে উৎপল হয়তো খুঁজে পায় তার মায়ের মমতা। আসল রোগ ধরা পড়ে না।

কিন্তু যায় দিন ফাগুনো দিন। একদিন উৎপল তার পিসির বাড়িতে। আর এদিকে মেসে দুই ভাইয়ে মিলে পরিষ্কার অভিযান চালাতে শুরু করে। তাদের দুই রুম একদম হিজিবিজি হয়ে গেছে। পদ্মের দুই ভাই রাজীব আর কমল মিলে বিছানাপত্তর, আলনা, খাট-পালঙ্ক সবই নাড়াচাড়া শুরু করে। এই সময় উৎপলের বেডের নিচে পদ্মের চিঠির স্তূপ চোখে পড়ে দুজনের।

প্রায় বিশটি চিঠি। চিঠিগুলো পদ্মের। দু ভাইয়ের আর জানতে বাকি রইলো না, কেন উৎপল ঘন ঘন তাদের বাড়িতে যায়। রাজীব আর কমলদের পারিবারিক অবস্থা বেশ ভালো। গ্রামে তারাই শীর্ষস্থানীয় পরিবার। অর্থে-বিত্তে, সম্মানে তারা যথাবাড়ি। তাদের বাবা দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসী। তাদের লক্ষ্য অনেক উঁচুতে। তারা পদ্মকে অনেক বড় ঘরে বিয়ে দেয়ার স্বপ্ন দেখে।

উৎপল রাজীব ও কমলের মামাতো ভাই। কিন্তু উৎপলের পরিবার ছন্নছাড়া। বোনের জামাই হিসেবে উৎপলকে তারা কল্পনাও করতে পারে না। যতই চিঠিগুলোর কথা মনে পড়ে ততই তাদের জিদ বাড়ে। রাজীব ফোন দেয় তার মাকে? শোন মা, উৎপইল্যারে চোখে চোখে রাখ আর তোমার মাইয়্যারে তার সাথে মিশতে দিও না। আমরা আসছি। দুই ছেলের এমন কথা শুনে উৎপলের পিসির ভয় লেগে যায়। তিনি তাড়াতাড়ি বাইরে এসে উৎপলকে ডেকে নেন। শোন বাবা?তুই এখনই চলে যা শহরে। তোর দাদারা আসছে। তারা তোর উপরে রাগ। আমি জানি না কেন। তবে তোকে হাতের কাছে পেলে মেরে ফেলতে পারে। তুই যা। চলে যা। উৎপলের পিসি গ্রামের সরল মানুষ। ভাইপোর ঘন ঘন আগমনে তার চোখে কোনো দোষ ধরা পড়ে না। তিনি সেরকম কোনো চিন্তাও মনে আনেন না। উৎপল পিসির কথা শুনে দ্রুত গ্রাম ত্যাগ করে। এদিকে রাজীব আর কমল বাড়িতে পেঁৗছায়। উৎপলকে হাতের কাছে না পেয়ে তারা মায়ের সাথে তীব্র রাগারাগি করে। পদ্মকে মারধর করে দুই ভাই। তীব্রভাবে শাসিয়ে দেয়, যাতে উৎপলের সাথে কোনো যোগাযোগ না রাখে। মা'কে পদ্মের লেখা চিঠিগুলো দেখায়। পদ্মের মা অবাক হয়ে চিঠি দেখে। তিনি নির্বাক থাকেন। কোনো কথা বলতে পারেন না। একজন পেটের মেয়ে আর একজন আপন ভাইয়ের ছেলে। নিজের ছেলেদের দাপটের কাছে তিনি কুঁকড়ে যান। দু ভাই পদ্মের স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। পদ্মকে গৃহবন্দী করে রাখে।

উৎপল দ্রুত শহরে এসে তার বাঙ্পেটরা নিয়ে সরে যায় অন্যত্র। রাতে তার দুচোখে ঘুম আসে না। সে চিন্তা করতে থাকে পদ্মের কথা। সে জানে, এরই মধ্যে পদ্মের উপর দিয়ে ঝড় বয়ে যাচ্ছে প্রবলভাবে। দাঁতে দাঁত চেপে সে মনে মনে তার পিসতুতো ভাইদের পি-ি চটকায়। এভাবেই যেতে থাকে সপ্তাহকাল। পদ্মের সাথে সে যোগাযোগের বহু চেষ্টা করে। কিন্তু পদ্মের কাছে কোনো ফোন নেই। এর মধ্যে পদ্মের জন্যে পাত্র দেখছে তার দু ভাই। তাকে যেভাবেই হোক বিয়ে দিয়ে দিবে। প্রবাসী পাত্র পাওয়া গেছে। ইউরোপ প্রবাসী। বিয়ের পর সাথে বউ নিয়ে যাবে পাত্র। রাজীব ও কমল আয়োজন করে বিয়ের। তাদের বাবা মধ্যপ্রাচ্য থেকে এসে পড়ে ঘটনা জানার পর। তিনিও বিয়ে দেয়ার পক্ষপাতী। বাপ-ছেলে তিনজনের তোড়জোড়ে পরেরদিন পাত্র পক্ষ আসবে পদ্মকে দেখতে। পদ্মকে পার্লারে নিয়ে যাওয়া হলো। কড়া পাহারা দিয়ে পার্লারে নিয়ে তাকে পরের দিনের জন্যে তৈরি করে আনা হলো। আধুনিক ডিজাইনে চুল কাটানোর পর পদ্মের চেহারা পাল্টে গেছে বলা যায়। তাকে এখন আরো স্মার্ট এবং আরো সুন্দর দেখাচ্ছে। পার্লার হতে বাড়ি এসে পদ্মের আচরণ পাল্টে যায়। পদ্ম গুনগুন করে গান গাইতে থাকে। মায়ের সাথে টুকটাক কাজে হাত লাগায়। দাদাদের ফুট-ফরমাশ এগিয়ে দেয়। বাবার তদারকি করে। সে জানে আগামীকাল পাত্রপক্ষ আসবে তাকে দেখতে। পাশের বাড়ির বৌদি এসে শাড়ি বাছাই করে দিয়ে গেছে যেটা পরবে কালকে। পদ্মকে খুব খুশি খুশি মনে হচ্ছে। রাজীব ও কমল যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। যাক, তাদের আদরের বোন তাহলে উৎপলকে ভুলে গেছে। দুজনেই হাসে। অল্প বয়সের প্রেম? সেতো শরতের বৃষ্টি। দু ভাই মিলে তৃপ্তির হাসি হাসে।

উৎপল এখন প্রায় উদ্ভ্রান্তের মতো চলাফেরা করে। এক মুখ দাঁড়ি-গোঁফ। ময়লা শার্ট। নিজের দিকে তার খেয়াল নেই। সে কেবল পদ্মের খবর পেতে উদ্গ্রীব। একদিন সে হাঁটছে নিউমার্কেটে উদ্দেশ্যহীনভাবে, এমন সময় তার পিসির গ্রামের এক বয়োজ্যেষ্ঠ লোককে যে যেতে দেখে। দুজনের দেখাদেখি হলে উৎপল জিজ্ঞেস করে, মামা কেমন আছেন? ভদ্রলোকের উৎপলকে চিনে নিতে কষ্ট হয়। পিসির পরিবারে উৎপলকে নিয়ে কী হয়েছে তা আদৌ তিনি জানেন না। উৎপলকে চিনার পরই তিনি বলে উঠলেন, কিরে উৎপল বাবু, তুই কেমন আছিস্? উৎপল জবাব দেয়, আমি আছি ভালো। পিসিরা কেমন আছে? ভদ্রলোক জবাব দেয়, তুই বুঝি জানিস্ না? তোর পিসি তো মেয়ের শোকে দানাপানি ছেড়ে দিয়েছে। উৎপলের বুকে ছ্যাঁৎ করে উঠল। কী! কী হয়েছে মামা? হ্যাঁ রে উৎপল? তুই জানস্ না, তোর পিসির মেয়ে পদ্ম গত এক সপ্তাহ আগে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছে। শুনেছি তার নাকি বিয়ে ঠিক করা হয়। কোনো এক ছেলের সাথে সম্পর্ক ছিলো। ভাইয়েরা বাধা দেওয়ায় বিষ খেয়েছে। উৎপলের কানে বাকি কথাগুলো ঢোকে না। সে বোঝে তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। উৎপল বিদায় নিয়ে দ্রুত হাঁটতে থাকে।

আজ অমাবস্যা। গ্রামে এ সময় ঘনঘোর অন্ধকার। আকাশে কোনো তারা নেই। পদ্মের শ্মশান একটু দূরে। সন্ধ্যায় পদ্মের মা তার শ্মশানে বাতি জ্বালিয়ে বিলাপ করে এসেছে। এখন ঘুটঘুটে অাঁধার। বাতি নিভে গেছে। অাঁধারে কেবল বোঝা যাচ্ছে একটা ছায়ামূর্তি। ছোটখাট ছায়ামূর্তি। শ্মশানের ছাই নিয়ে গায়ে মাখছে। মাঝে মাঝে চাপা কান্নার সুরে ভারী করে তুলছে পরিবেশ। অল্পক্ষণ পর ছায়ামূর্তি লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। গোঙ্গানি শোনা যায়? চাপা কণ্ঠে? জ্বলে যায়, পুড়ে যায়। জ্বলে যায়, পুড়ে যায়।

অমাবস্যার রাত কেটে ভোর হয়। আজ পদ্মের অস্থি সংগ্রহ করে অন্তর্জলী দেয়ার দিন। পদ্মের মা-বাবা, দুই ভাই আসে শ্মশানে। হাতে মাটির পাতিল। এই পাতিলেই পদ্মের হাড় সংরক্ষণ করা হবে। শ্মশানের কাছাকাছি আসতেই তাদের চোখে পড়ে?একটি নরদেহ উপুড় হয়ে পড়ে আছ শ্মশানের স্তূপের উপর। গায়ে হাত দিয়ে দেখে ঠা-া! অনেকক্ষণ আগে মরে গেছে। পাশে একটা বিষের কৌটা। মুখ খোলা, খালি। রাজীব ও কমল উপুড় হওয়া মরদেহ উল্টে দেয়। মৃত ব্যক্তির মুখ দেখেই পালাতে শুরু করে রাজীব ও কমল। দূর হতে ধাবমান দুই মানুষকে দেখে মনে হচ্ছে?দুজন কসাইকে যেনো তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে জবাইয়ের পশু।

আজকের পাঠকসংখ্যা
৮৪২০১৭
পুরোন সংখ্যা