চাঁদপুর। বৃহস্পতিবার ৭ ডিসেম্বর ২০১৭। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৪। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯
kzai
muslim-boys

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৩৩-সূরা আহ্যাব

৭৩ আয়াত, ৯ রুকু, মাদানী

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

১০। যখন উহারা তোমাদের বিরুদ্ধে সমাগত হইয়াছিল তোমাদের উপরের দিক ও নিচের দিক হইতে,  তোমাদের চক্ষু বিস্ফারিত হইয়াছিল, তোমাদের প্রাণ হইয়া পড়িয়াছিল কণ্ঠাগত এবং তোমরা আল্লাহ সম্বন্ধে নানাবিধ ধারণা পোষণ করিতেছিলে;

১১। তখন মু'মিনগণ পরীক্ষিত হইয়াছিল এবং তাহারা ভীষণভাবে প্রকম্পিত হইয়াছিল।

দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


চা খাদ্য নহে, ইহা মাদক উত্তেজক গুণ বিশিষ্ট।                


-ডাঃ জন ফিসার


কবর এবং গোসলখানা ব্যতীত সমগ্র দুনিয়াই নামাজের স্থান।


ফটো গ্যালারি
শরৎচন্দ্রের চরিত্রচিত্রণ ও বাস্তবানুগতা
মুহম্মদ খলিলুর রহমান
০৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

দুই.

'শ্রীকান্ত' উপন্যাসে শরৎচন্দ্রের সাহিত্যিক উদ্দেশ্য বিশ্লেষণে উপন্যাসের উজ্জ্বল চরিত্র হিসেবে ইন্দ্রনাথ ব্যাপক গুরুত্ব বহন করে। বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে কিশোর চরিত্রের সার্থক বাণীরূপ লাভের এমন দৃষ্টান্ত একান্তই বিরল।

শরৎমানস বিশ্লেষণে ইন্দ্রনাথ চরিত্রের ছায়াপাত অত্যন্ত সুস্পষ্ট। ভাগলপুরের রাজেন্দ্রনাথ মজুমদার ওরফে মনি মজুমদার শরৎচন্দ্রের ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে তাঁর জীবনে গভীর ছায়াপাত সৃষ্টি করেছে। অসাধারণ সাহসী কিশোর মনি মজুমদার শরৎচন্দ্রের শ্রদ্ধা ও মমতা আকর্ষণ করে অনুসরণযোগ্য ব্যক্তিত্বের সম্মোহন সৃষ্টি করেছিলো। ভাগলপুরে শরৎচন্দ্র উদাসী, মমতাবুভুক্ষু ও সংগীতপ্রিয় কিশোর হিসেবে আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর হৃদয়ে আকর্ষণ সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁর চারিত্রিক মহিমা সৃষ্টিতে তাঁর পিতা মতিলাল চট্টোপাধ্যায়ের প্রভাব সুস্পষ্ট লক্ষ্য করা যায়। তৎকালীন সমাজে মতিলাল চট্টোপাধ্যায় এফএ (উচ্চ মাধ্যমিক) পাস করে উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তি হিসেবে সমাজে আদৃত হলেও তিনি সংসার অনভিজ্ঞ মহানুভব ব্যক্তি ছিলেন। সাহিত্য রচনায় পিতার যথেষ্ট আগ্রহ শরৎচন্দ্রকে সাহিত্যমনস্কতা লাভে অনুপ্রাণিত করেছে। সংসারের প্রতি ঔদাসীন্যও শরৎচন্দ্র পৈতৃকসূত্রেই পেয়েছিলেন। পিতার মৃত্যুর পর তিনি ভাগলপুরে মামাদের আশ্রয়ে লেখাপড়ায় আত্মনিয়োগ করেন। এ সময়ে ইন্দ্রনাথ অগ্রজের মমতা দিয়ে এবং অসাধারণ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের পরিচয় দিয়ে শরৎচন্দ্রকে প্রচ-ভাবে আকৃষ্ট করেছে। ভাগলপুরে শরৎচন্দ্র ইন্দ্রনাথ তথা মনি মজুমদারের অনুবর্তী হওয়ায় তাঁর পরবর্তী জীবনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যাবলিতে ব্যাপক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। ইন্দ্রনাথ চরিত্র শরৎচন্দ্রের বাস্তবজীবন ও সাহিত্যিকজীবনে অত্যন্ত তাৎপর্যবহনকারী চরিত্র হিসেবে গুরুত্ব লাভ করেছে।

অলোকসামান্য কিশোর চরিত্র ইন্দ্রনাথ কথাসাহিত্যে এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। ভবঘুরে শ্রীকান্ত আজীবন তার হৃদয়ানুভবের নিভৃত প্রদেশে অনেকের স্মৃতিই লালন করেছে। কিন্তু ইন্দ্রনাথ চরিত্রের তীব্র জ্যোতি তার হৃদয়ে যতোটা অমস্নান ছিলো ততোটা অন্য কারো নয়। শরৎচন্দ্রের অনন্যসাধারণ সাহিত্যমানস এবং শিল্পকুশলতা ইন্দ্রনাথ চরিত্রকে বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে অক্ষয় আসনে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। সাহিত্য সমালোচক ড. শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এ সত্য পরিস্ফুট করতে মন্তব্য করেছন, "বর্ণপরিচয়ের রাখাল হইতে আরম্ভ করিয়া অনেক দুষ্ট, লেখা-পড়ায় অমনোযোগী বালকের কাহিনী সাহিত্য বা সাহিত্যের ইতিবৃত্তে লিপিবদ্ধ আছে। কিন্তু সমস্ত বাংলাসাহিত্য ইতিহাস তন্ন তন্ন করিয়া খুঁজিয়াও ইন্দ্রনাথের জোড়া মিলে না।" শ্রীকান্তের চোখে ইন্দ্রনাথের চারিত্রিক মহিমার যে অসাধারণ ভাবমূর্তি ধরা পড়েছিল সাহিত্যের ললিতপটে তার চিত্র হৃদয়ের ব্যাকুল মমতা আর শিল্পী মনের নিষ্ঠা নিয়ে অঙ্কন করেই শরৎচন্দ্র ইন্দ্রনাথকে অসাধারণ করে তুলেছেন।

সমাজে প্রতিষ্ঠার মোহ, সুখৈশ্বর্যের মোহ ত্যাগ করে শ্রীকান্ত যে অনাসক্ত জীবনের পেছনে ছুটেছিলো তার প্রেরণাদাতা ইন্দ্রনাথ। শ্রীকান্তের স্বীকারোক্তি, "কিন্তু কী করিয়া ভবঘুরে হইয়া পড়িলাম সে কথা বলিতে গেলে, প্রভাত জীবনে এ নেশায় কে মাতাইয়া দিয়াছিল, তাহার একটু পরিচয় দেওয়া আবশ্যক। তাহার নাম ইন্দ্রনাথ।" প্রথম পরিচয়ে শ্রীকান্ত দেখেছে, ইন্দ্রনাথ অসমসাহসী এবং মমতাপুস্নত হৃদয়ের অধিকারী। খেলার মাঠে মারমুখো জনতার হাত হতে ইন্দ্রনাথ শ্রীকান্তকে রক্ষা করে তার কৃতজ্ঞতাবোধকে প্রচ-ভাবে আকর্ষণ করেছে। মাছ চুরির দুঃসাহসিক অভিযানে শ্রীকান্তকে নিরাপদে রাখার চেষ্টা করে ইন্দ্রনাথ সাপের দংশন সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করেছে। সে মুহূর্তে ইন্দ্রনাথকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতে শ্রীকান্তের দ্বিধা জেগেছে। বিস্ময়স্তব্ধ শ্রীকান্ত ইন্দ্রনাথের উদ্দেশ্যে বলেছে, "ঐ লোকটা কী? মানুষ? দেবতা? পিশাচ? কে ও?" মানুষের স্বাভাবিক দুর্বলতা আর পিশাচের হীনতা হতে সে ঊধর্ে্ব। ইন্দ্রনাথ অলোকসামান্য মানব চরিত্র।

ইন্দ্রনাথের নির্ভীকচিত্ততা, পরদুঃখকাতরতা, সারল্যের স্নিগ্ধতা শ্রীকান্তকে মুগ্ধ করেছে। "মরতে তো একদিন হবেই" এ সত্য হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করে কর্তব্যবোধের নির্মম নির্দেশ অনুসরণ করে ইন্দ্রনাথ নিঃশঙ্কচিত্তের পরিচয় দিয়েছে। সদ্যমৃত শিশুর প্রেতাত্মা তার কাছাকাছি রয়েছে এ ধারণা তাকে পঙ্গু করতে পারেনি। অথচ শনিবার অমাবস্যা তিথিতে মহাশ্মশানে গিয়ে ডান কানের ওপর কারো হিমশীতল নিঃশ্বাস অনুভব করে শ্রীকান্ত যখন সমস্ত শিক্ষা ও বিশ্বাসে জলাঞ্জলি দিয়ে ভয়ে কেঁপেছে তখন বুঝতে পেরেছিলো, সেখানে "একাকী যে স্বছন্দে আসিতে পারিত সে ইন্দ্র, আমি নয়।"

ইন্দ্রনাথের চরিত্রের রুদ্ররূপ শ্রীকান্তকে তার প্রতি বিরূপ করতে পারেনি। অন্নদাকে প্রচ-ক্রোধে যাচ্ছেতাই বললেও দিদিকে যে ইন্দ্র গভীরভাবে ভালোবাসতো এ বিশ্বাস শ্রীকান্তের ছিলো। আশাভঙ্গে কাতর ইন্দ্রনাথ ক্রোধান্বিত হলেও শ্রীকান্ত তা সহজভাবে গ্রহণ করতে পেরেছিলো। অন্নদা শ্রীকান্তের দান প্রত্যাহার করলেও ইন্দ্রনাথের দান গ্রহণ করেছিলো। এ ব্যাপারে অভিমানের বাষ্পে কিশোর শ্রীকান্তের মন ফুলে উঠলেও সে জানতো "ইন্দ্র আর আমি কি এক ধাতুর প্রস্তুত যে, সে যেখানে দান করিবে, আমি সেখানে হাত বাড়াইব।"

ইন্দ্রনাথের অকপট মুক্ত স্বচ্ছ মনে সত্য স্পষ্টভাবে প্রতিবিম্বিত দেখে শ্রীকান্ত বিস্মিত হয়েছে। ইন্দ্রনাথ তার যুক্তিতর্ক, নিজস্ব দৃষ্টিকোণ দিয়ে হৃদয়ে সত্যবোধের স্বচ্ছতা পোষণ করতে সমর্থ হতো। এ দিকটার ইঙ্গিত করে শ্রীকান্ত বলেছে, "অসত্যকে ইন্দ্র যখন তাহার অন্তরের মধ্যে জানিয়া হোক, না জানিয়া হোক কোনদিন স্থান দেয় নাই, তখন তাহার বিশুদ্ধ বুদ্ধি যে মঙ্গল এবং সত্যকে পাইবে, তাহা বিচিত্র নয়।"

সমাজের সচল প্রবাহ হতে ইন্দ্রনাথ যেদিন হারিয়ে গেছে, সেদিনটার বেদনা শ্রীকান্তের বুকে প্রচ-ভাবে বেজেছিলো। শ্রীকান্ত তার কিশোর জীবনের অনুভূতি আন্দোলক চরিত্রের মাহাত্ম্য প্রচারে বলেছে, "কত দেশ কত প্রান্তর, কত নদ-নদী পাহাড়-পর্বত বনজঙ্গল ঘাঁটিয়া ফিরিয়াছি, কত প্রকারের মানুষই না এ দুটো চোখে পড়িয়াছে, কিন্তু এত বড় মহাপ্রাণ ত আর কখনও দেখিতে পাই নাই।"

ইন্দ্রনাথ চরিত্রের বিকাশকাল কৈশোরেই সীমাবদ্ধ। একালের মহিমামধুর দিনগুলো সম্পর্কে ঐবহৎু ঠধঁমযধহ বলেছেন, "উবধৎ যধৎসষবংং ধমব, ঃযব ংযড়ৎঃ ংরিভঃ ংঢ়ধহ যিবৎব বিবঢ়রহম ারৎঃঁব ঢ়ধৎঃং রিঃয সধহ যিবৎব ষড়াব রিঃযড়ঁঃ ষড়ংঃ ফবিষষং"

ইন্দ্রনাথ চরিত্রে এ সত্য স্পষ্টভাবে প্রতিবিম্বিত। শ্রীকান্ত কৈশোর অতিক্রম করে যৌবনের কামনা উদ্বেগ মনের দুর্বলতায় কিছু না কিছু ভুগেছে। ইন্দ্রনাথ চিরকিশোরের পবিত্রতা নিয়ে পাঠকের মমতাবোধকে দুর্নিবারভাবে আকর্ষণ করে। জীবনের ক্ষুদ্র পরিসরে ইন্দ্রনাথ যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের জন্যে অন্নদা দিদির আশীর্বাদের ঊধর্ে্ব উঠতে পেরেছিলো তা অতিমানবিক। সে তুলনাহীন কিশোর চরিত্রের দীপ্তিতে শ্রীকান্ত উপন্যাসের অন্য সকল চরিত্র নিষ্প্রভ হয়ে পড়েছে। শ্রীকান্ত, ইন্দ্রনাথ এ দুটো চরিত্রের সম্মিলনে যে চারিত্রিক মহিমার ব্যঞ্জনা 'শ্রীকান্ত' উপন্যাসে পাঠক হৃদয়কে দোলা দেয় তার সম্মোহন প্রতিটি বাঙালি পাঠককে মুগ্ধ করে।

শরৎ কথাসাহিত্যের বেশ কিছু চরিত্রে শরৎচন্দ্রের প্রত্যক্ষ জীবনের ছাপ অত্যন্ত সুস্পষ্ট। দেবদাস-পার্বতী চরিত্র শরৎচন্দ্র ও বিজয়কালীর কিশোর প্রেমের বাস্তবতার সাথে সুষমাস্নিগ্ধ কল্পনার সুসঙ্গতির মাঝে সৃষ্ট। নদীর ঘাটে জল আনতে গিয়ে বিজয়কালী তার শ্বশুর বাড়ির নিকটবর্তী এলাকায় শরৎচন্দ্রকে দেখে কিশোরপ্রেমের প্রচ- আলোড়নে আন্দোলিত হয়েছিলো। বিয়ের আগে তাদের সম্পর্কের ব্যাপারটা শাশুড়ির অজানা ছিলো না। তাই বিজয়কালী প্রেমিককে ডেকে নিয়ে বাইরের ঘরে বসালেও তাদের সাথে আর কোনোদিন সাক্ষাৎ ঘটেনি। শরৎচন্দ্রের মামাতো ভাই নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় শরৎচন্দ্রের জীবনী লেখকদের মধ্যে অন্যতম। তিনি এ ঘটনাসহ 'শ্রীকান্ত' উপন্যাসের বিভিন্ন ঘটনার বাস্তবরূপ উদ্ঘাটন করেছেন। শরৎচন্দ্রের সুবিখ্যাত 'বিলাসী' গল্পের চরিত্র ও কাহিনীর পটভূমিকাও তাঁর লিখায় সুপরিব্যক্ত। দেবানন্দপুর গ্রামের মৃত্যুঞ্জয় মজুমদারের কাহিনীই মুখ্যত 'বিলাসী' গল্পের উপজীব্য। দেবানন্দপুর গ্রামের পাশ দিয়ে প্রবাহিত সরস্বতী নদীর ঘাটে ছিলো সাপুড়ে ও বেদেদের নৌকার বহর। গ্রামের এক প্রান্তে বেদেপাড়ারও অবস্থান ছিলো। বাংলাদেশে এখন এসব বেদেপাড়া স্বতন্ত্র জনপদ হিসেবে পরিগণিত নয়। দেবানন্দপুর গ্রামে 'গলায় দড়ের বাগান' নামে বেশ বড় একটা বাগান ছিলো। ভয় পাবার আশঙ্কায় গ্রামবাসী এ বাগানের ভেতর দিয়ে চলাচল করতো না। কিন্তু নির্ভীক শরৎচন্দ্র এবং তাঁর কিছু সহপাঠী হুগলি ব্রাঞ্চস্কুলের ছাত্র থাকা অবস্থায় স্কুলের পথ সংক্ষেপ করার উদ্দেশ্যে এই বাগানের মধ্য দিয়ে যাতায়াত করতো এবং বাগানের ফল চুরি করে খাওয়া তাদের জন্যে আনন্দের ব্যাপার ছিলো। 'বিলাসী' গল্পে এ কাহিনী শরৎচন্দ্রের কৈশোরজীবনের স্মৃতিচারণের উদ্দেশ্যে এবং তৎকালীন পল্লীসমাজের অশিক্ষার কারণ হিসেবে অত্যন্ত সুন্দরভাবে ব্যক্ত হয়েছে। 'বিলাসী' গল্পে ন্যাড়ার সাপ ধরার কাহিনী রয়েছে। বাস্তবে শরৎচন্দ্রও সাপ ধরায় অভ্যস্ত ছিলেন।

হাওড়ার বাজশিবপুরে অবস্থানকালে ভূতনাথ বাবুর বাড়িতে তিনি গল্পের আড্ডায় নিয়মিত হাজির হতেন। সেখানে একদিন গুখরো সাপ ধরে সবাইকে অবাক করে দিয়েছিলেন। 'বিলাসী' গল্পে বিধৃত সমাজচিত্র, চরিত্র শরৎচন্দ্রের একান্তই বাস্তবজীবনের আলোকে উদ্ভাসিত।

শরৎসাহিত্যের শিল্প প্রকরণ অনন্যতায় ভাস্বর। চরিত্রচিত্রণে তাঁর নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। উপন্যাসের ভাষা সৃষ্টিতেও শরৎচন্দ্রের কৃতিত্ব অবিস্মরণীয়। চরিত্রচিত্রণ, জীবনসত্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শরৎচন্দ্র বিস্ময়কর শিল্পকৌশলের পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর ভাষাশৈলী সম্পর্কে সরোজ রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্য, "শরৎচন্দ্রের ভাষার মতো এমন অনাবিল, ভাবানুগত ভাষা দেখা যায় না। কি অল্প কথায় কত বড় ভাবের প্রকাশ ! কোথাও এতটুকু প্রহেলিকা নাই; সাধু ভাষার আড়ম্বর নাই; চলতি ভাষা, অথচ অতি বড় বৈয়াকরণও কোথাও এতটুকু ব্যাকরণ দোষ পাইবেন না। ...সাধু-অসাধু সমস্ত ভাষা আয়ত্ত করিয়া স্বীয় প্রতিভাবলে তিনি এক অপূর্ব ভাষার সৃষ্টি করিয়াছিলেন। তাহা তাঁহার সম্পূর্ণ নিজস্ব।"

চরিত্রচিত্রণের ক্ষেত্রে শরৎচন্দ্রের ছন্নছাড়া, ভবঘুরে জীবন ও বৈপ্লবিক সাহিত্যমানসের অন্তর্গত প্রেরণায় উজ্জীবিত সমাজ পরিবর্তনের দুর্বার আকাঙ্ক্ষা সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে শ্রীকান্ত ও ইন্দ্রনাথ চরিত্রে। এ দুই চরিত্রের রূপ কথাসাহিত্যের ললিতপটে উজ্জ্বল করে রাখার জন্য যে সাহিত্যিক প্রতিভার স্ফূরণ আবশ্যক, শরৎচন্দ্র তার পূর্ণাংশের অধিকারী ছিলেন। শরৎচন্দ্রের মানসগঠনের অসাধারণত্বই এ ক্ষেত্রে সর্বাধিক ক্রিয়াশীল ছিল বলে একাধিক সমালোচক মন্তব্য করেছেন। শরৎসাহিত্যের মুগ্ধ সমালোচক বিভূতিভূষণ ভট্টের উক্তি এ প্রসঙ্গে উলি্লখিত হলো, "শরৎচন্দ্র চিরদিনই বেপরোয়া। কোনো দ্বিধা তাঁহাকে কখনো বাধা দিতে পারিল না এবং শেষজীবনে এই একান্ত নির্ভীকতার ভাবকেই সাহিত্যের মধ্যে প্রবেশ করাইয়া কত না নূতন জীবনের সৃষ্টি এবং নূতন ভাবকে রূপ দিয়া গিয়াছেন।" শরৎচন্দ্রের বহুবিচিত্র এবং গভীর অভিজ্ঞতা চরিত্রচিত্রণে তাঁর নৈপুণ্যকে বিস্ময়পূর্ণ উচ্চতায় নিয়ে যেতে সহায়ক হয়েছে। বাংলার ইতিহাসে পান্ডিত্য ও ঋতি্বকতার সংমিশ্রণে গড়া খ্যাতিমান ব্যক্তি হিসেবে শ্রী অরবিন্দ ঘোষ সবার শ্রদ্ধাভাজন বিদগ্ধপুরুষ। তিনি শরৎচন্দ্রের সাহিত্য মানস সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন-"ধ মৎবধঃ ধহফ ঢ়বৎভবপঃ পৎবধঃরাব ধৎঃরংঃ রিঃয ঢ়ৎড়ভড়ঁহফ বসড়ঃরড়হধষ ঢ়ড়বিৎ"

শরৎচন্দ্র নির্ভেজাল মানবদরদী ও খাঁটি মানুষ ছিলেন বলেই তাঁর সাহিত্যে বিমুগ্ধ হবার উপকরণের অন্ত নেই। সংসারের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মনুষ্যত্বকেই উচ্চমূল্য দিয়েছেন। ভাই-বোনের লালন-পালনের কর্তব্যবোধে তাড়িত হয়ে বার্মায় কষ্টকর জীবনযাপনে দ্বিধাবোধ করেননি। সাহিত্য ও সংগীতে তিনি অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। এ সত্ত্বেও সাহিত্যিক প্রতিভার পরিপূর্ণ স্ফূরণের সার্বিক প্রচেষ্টায় তিনি বেশ বিলম্বে আত্মনিয়োগ করেন। স্বজনদের প্রয়োজনেই তাঁর জীবনের অনেকটা সময় শিল্পচর্চা ব্যতিরেকে কাটাতে হয়েছে। আবার স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি স্বদেশী আন্দোলনকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। যে সামান্য ভালোবাসা নিয়ে তাঁর নিকটবর্তী হয়েছে তাঁর কাছে তিনি কিছুই গোপন করেননি। বাংলাদেশের পাঠক যখন তাঁকে প্রিয় কথাসাহিত্যিকের মর্যাদা দিয়ে, স্বাধীনতা আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে সম্মান ও ভালোবাসা দিয়ে আপন করে নিয়েছে তখন তার স্নেহময় প্রাণটার সমস্তটাই খুলে দিয়ে তাঁর সাহিত্যকে বিস্ময়কর রসাধার হিসেবে সৃষ্টি করে অমর কথাশিল্পীর মহিমা অর্জন করে গেছেন। ব্যক্তিগত জীবনের ঘটনাকে সাহিত্যের উপজীব্য না করে বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে এ মহিমা অর্জনে কেউ সক্ষম হননি। শরৎচন্দ্রের কথাসাহিত্যের এদিকটার প্রতি বিশেষ ইঙ্গিত দান করার উদ্দেশ্যে বিভূতিভূষণ ভট্টের মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ, "রসস্রষ্টার ব্যক্তিগত জীবনের সুখ-দুঃখের মন্থন হইতেই চিরদিন শ্রেষ্ঠ শিল্পসৃষ্টি হইয়াছে।"

লেখক : প্রাক্তন অধ্যাপক,

বাংলা বিভাগ, চাঁদপুর সরকারি কলেজ।

আজকের পাঠকসংখ্যা
৮৪১৩০৪
পুরোন সংখ্যা