চাঁদপুর। সোমবার ১২ মার্চ ২০১৮। ২৮ ফাল্গুন ১৪২৪। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৩৯
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৩৬-সূরা ইয়াসিন

৮৩ আয়াত, ৫ রুকু, মক্কী

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

৩১। তারা কি প্রত্যক্ষ করে না, তাদের পূর্বে আমি কত সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেছি যে, তারা তাদের মধ্যে আর ফিরে আসবে না।

৩২। ওদের সবাইকে সমবেত অবস্থায় আমার দরবারে উপস্থিত হতেই হবে।

দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


সঙ্গ দোষেই মানুষ খারাপ হয়।        


-প্রবাদ।


মানুষ যে সমস্ত পাপ করে আল্লাহতায়ালা তার কতকগুলি মাফ করে থাকেন, কিন্তু যে ব্যক্তি মাতা-পিতার অবাধ্যতাপূর্ণ আচরণ করে, তার পাপ ক্ষমা করেন না।


ফটো গ্যালারি
জাগরণ
পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
১২ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


শত বছরের পুরানো বটগাছটি প্রবীণ রাজার মতো মাঠের মাঝখানে গেঁড়ে বসে আছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় গ্রামের পাহারাদার। বটের ঝুরি নেমে গেছে মাটিতে। চারপাশ থেকে বেশ কয়েকটা ঝুরি কোনোটা ছুঁয়েছে মাটি, কোনোটা দুলছে শূন্যে মাটি ছোঁয়ার প্রতীক্ষায়। সুদেব শুনেছে ছোটবেলায়, এই ঝুরিগুলো নাকি বটের নাতির ঘরের পুতির মতো। অর্থাৎ বট বৃদ্ধ হতে হতে দাদা-পরদাদা হলে তবেই বটের ঝুরি বের হয়। বটের এই নাতি-পুতির সগৌরব সংসার দেখে সুদেবের দীর্ঘশ্বাস বের হয়। পৃথিবীতে সবাই চায় তার বংশধর রেখে যেতে। কোন একদিন হয়তো তার নামে দীপ জ্বালাবে এই আশায়। সুদেব বিয়ে করেছে বছর দশেক হলো। নিজ গ্রামের পাশের গ্রামেই তার শ্বশুর বাড়ি। শ্বশুরের নাম সুখরঞ্জন। তার মেয়ে সুখলতা। আঠার বছরে পড়তেই সুখলতার বাবা মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেয়। সুখরঞ্জন জাতে কৈবর্ত। মাছ ধরা তার জাত পেশা। তার ঘরে শিক্ষার আলো তেমন নেই। এইট পর্যন্ত কোনোমতো পড়িয়ে মেয়েকে তিন বছর ধরে ঘরে বসিয়ে রেখেছে সুখরঞ্জন। এলাকার বখাটেদের ভয়ে আর স্কুলে পাঠায়নি মেয়েকে। মেয়েটার মেধাও খুব বেশি ভালো না। তাই পড়া আর বেশিদূর এগোয়নি। সুদেবের জন্য সম্বন্ধ আসতেই সুখরঞ্জন বিয়ে দিতে আর দেরি করে না মেয়েকে।



 



সুদেবের শ্বশুর সুখরঞ্জন মাছ ধরে খালে-বিলে। সুদেবের পেশাও মাছ ধরা। সে মাছ ধরে নদীতে। বাড়ি মেঘনা নদীর পাড়ে। মেঘনার ভাঙ্গনে তাদের আগের ভিটা বিলীন হয়ে গেছে নদীগর্ভে। ধার-দেনা করে সুদেবের বাবা সুধাম নতুন ভিটায় জায়গা কিনেছেন অল্প। সুদেব তখন ছোট। সেই অবধি নতুন ভিটেতেই সুদেবরা আছে। সুদেব পেশায় ইলিশ জেলে। মেঘনা পাড়ের জেলে মানেই ইলিশ জেলে। নদী ভিটে ভেঙ্গে নিলেও উজাড় করে দিয়েছে মাছে। মেঘনার বুকে ইলিশ ধরেই বেঁচে আছে বংশ পরম্পরায় সুদেব ও তার পিতৃপুরুষ। সুদেবের মা সুরবালা পঞ্চাশোর্ধ গ্রামীণ নারী। গত দশ বছর ধরেই ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে আসছেন যাতে সুখলতার পেটে বাচ্চা-কাচ্চা আসে। অক্ষরজ্ঞানহীন গ্রামীণ নারীর ঈশ্বরই ভরসা। তাই আজও তার ঈশ্বরে আস্থা অবিচল। দশ বছর ধরে এই আস্থায় চিড়্ ধরেনি একটুও। প্রতিদিন দিনে-রাতে দুইবার প্রার্থনায় সে সুদেবের সন্তান কামনায় অর্ঘ্য দেয়। ঠিক একই রকম ভক্তি অটুট ছিলো সুরবালার শাশুড়ির। সেবার যখন মেঘনায় গিলে চলেছে গ্রামের পর গ্রাম, তখন সুরবালার শাশুড়ি সুরদাসীও একইরকম আস্থা নিয়ে ঈশ্বরের কাছে পড়েছিলো ধর্ণা দিয়ে, যাতে মেঘনার ক্ষুধা নিবৃত্ত হয়ে যায়। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। রাক্ষুসে মেঘনা অচিরেই গিলে খেলো পুরানো ভিটা, সুপারি বাগান সবই।



 



আজ থেকে অনেক বছর আগে নদীর তীর ছিলো আরো ষাট মাইল দক্ষিণে। তখন এই এলাকার নাম ছিলো নরসিংহপুর। আজ ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে এসে ঠেকেছে সুদেবদের গ্রামে। গ্রামের নাম চরণদ্বীপ। খুব বেশি সচ্ছল নয় গ্রামটি। গ্রামের অধিকাংশ মানুষেরই জীবিকা হলো মৎস্য আহরণ। নদীতে ইলিশের চালান বেশি হলে তাদের মুখে হাসি ফোটে। নদী যখন কৃপণ হয়ে যায়, ইলিশ যখন রাগ করে আসে না মেঘনায় তখন তাদের কপাল পোড়ে। তাদের হাসি-কান্না সবই বাড়ে-কমে ইলিশের ওপর। এক অর্থে ইলিশই তাদের ভগবানের অবতারের মতো। সুদেব জেলের কাজ করলেও গ্রামের ইশকুল হতে সে এসএসসি পাস করেছে। তার বাবার আদেশে সে চালিয়ে নিচ্ছে বাপ-দাদার পেশা। বাবা-মার একমাত্র ছেলে বলে কথা। তার বড় বোনের বিয়ে হয়েছে দুই গ্রাম পরের গ্রামে। গ্রামের নাম মুক্তিগাঁ। শোনা যায়, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এই গ্রামের অধিকাংশ যুবক ওপার গিয়ে যুদ্ধের ট্রেনিং নেয় এবং পরে যুদ্ধে যোগ দেয়। এই জন্যেই রাজাকাররা নাম দিয়েছিলো মুক্তিগাঁ। অদ্যাবধি সেই নামই বহাল আছে। যদিও নামটি রাজাকাররা মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত করার জন্যই দিয়েছিলো, তবুও স্বাধীনতার পর এই নামটিই হয়ে যায় গৌরবের। তাই কেউ আর এই নাম পাল্টায়নি। বোনের শ্বশুর মুক্তিযুদ্ধে এই গ্রামের প্রথম শহীদ। তিনি যখন যুদ্ধে যান তখন তার বয়স তিরিশ। বোনের স্বামী কেশব মাত্র তখন পাঁচ বছর। আজ সেই কেশব পঞ্চাশ পেরোনো এক ভার-ভারিক্কী মানুষ।



 



সুদেব ছাড়া অন্যান্য জেলে প্রায় সকলেই অশিক্ষিত। অনেকেই আছে বাংলা পড়তে পারে না। এদের ঘরে অভাব-অনটন বেশি। তাদের অভাব-অনটনের সুযোগ নেয় মহাজনরা। ইলিশ জেলেদের নিজেদের নৌকা নেই কারো এই গ্রামে। নৌকার দাম অনেক। এই গ্রামে দুইজন মহাজন আছে যারা মশার মতো রক্তচোষা। অভাবের সময় জেলেদের যে টাকা ঋণ দেয়, মাছ ধরার মৌসুমে তার তিনগুণ মাছ তারা আদায় করে নেয়। মালেক বেপারী আর খালেক গাজী এই দুইজন মহাজনের তাগাদায় গ্রামের জেলেদের নাভিশ্বাস উঠে। জেলে পল্লীতে আজও বিদ্যুৎ আসেনি। তাই কারো ঘরেই ফ্রিজের দেখা মেলেনি। বেশি মাছ ধরে তারা ফ্রিজে রাখবে সে রকম সুযোগ জেলেদের জীবনে নাই। তাই তারা মাছ ধরার মৌসুমে অল্পদামে মাছ বিক্রি করতে বাধ্য হয়। পাশাপাশি যা মাছ ধরে তার তিনভাগের দুইভাগ মহাজনের গদিতে চলে যায়। দাদনের ফল হিসেবে। জেলেরা মাছ ধরার দিনে তাই মাছে-ভাতে খায় আর দু-চার টাকায় পকেট গরম রাখে। কিন্তু মৌসুম শেষে কিংবা মাছের আকাল হলে নদীতে জেলেরা শুকিয়ে মরে।



গত বছর বাপের চিকিৎসা করাতে গিয়ে সুদেব তারে বউয়ের গয়না বিক্রি করে দিয়েছে। কথা দিয়েছিলো, এ' বছর সে গয়না গড়িয়ে দিবে। সুদেব তাই আজকাল অতিরিক্ত পরিশ্রম করে চলেছে। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা উত্তাল মেঘনা কিছুই সুদেবকে দমাতে পারেনি। নদীতে না নামলে তার ভাত নেই, বউয়ের গয়না তো দূরের কথা। সুদেব মালেক বেপারীর নৌকায় মাছ মারে। এইজন্য মালেক বেপারী তার কাছ থেকে অর্ধেক মাছ রেখে দেয়। ফলে কষ্ট সব দিনশেষে জল হয়ে যায় সুদেবের। আসলে নিজেদের নৌকা না হলে সবটাই বৃথা। এদিকে মওসুমও আর বেশিদিন নেই। দিন পাঁচেক পরেই নিষিদ্ধকাল। অর্থাৎ কেউ নদীতে নামতে পারবে না। এটা সরকারি নিষেধাজ্ঞা। এই সময় ঝাঁকে ঝাঁকে ডিমওয়ালা মা ইলিশ আসে মেঘনায় ডিম পাড়তে। সুদেব একদিন সরকারি প্রচারণার একটি কাগজ পেয়েছিলো হাতে। সে পড়ে দেখেছে কাগজটি। এমনিতেই সে বংশ পরম্পরায় ইলিশ জেলে হওয়ার কারণে ইলিশের অনেক কথাই জানে। তারপর কাগজ পড়ে সে মোটামুটি ইলিশের কোষ্ঠি-ঠিকুজি সব বের করে ফেলেছে। সুদেবকে কাগজ পড়তে দেখে তার বউ সুখলতা জিজ্ঞেস করে, সোয়ামি, কাগজে কী এত লেখছে? তুমি আমারে না দেইখ্যা কাগজের দিকে চাইয়া রইছ? সুদেব হেসে দেয় বউয়ের দিকে তাকিয়ে। শোন্ সুখী! কাগজে ইলিশের জীবন-বেত্তান্ত লেখছে। তুই যে ইলিশ খাস্, সেই ইলিশের নাম কি জানস্? সুখলতা অবাক হয়। বলে কী লোকটা? সে হেসে উঠে, ওমা! ইলিশ তো ইলিশই। হের আবার নাম কী? সুদেব বলে, তাইলে শোন্, ইলিশ হইলো এমন মাছ যার কথা মানুষ জানছে আইজ থিক্যা আষ্টশ' বছর আগে। বুঝছস্? তখন মানুষ ইলিশ মাছকে ধরতে পারছে। ইলিশের মইধ্যে আবার পাঁচ রকমের মাছ আছে। তার মইধ্যে আমাগো দেশে পাই আমরা তিন রকমের ইলিশ। জানস্ এদের নাম? এরা হইল পদ্মার ইলিশ, টলি ইলিশ আর কেলি ইলিশ। ইলিশ মাছ তিন থেকে পাঁচ বছর পইরযন্ত বাঁইচ্যা থাকতে পারে যদি... অমনি বউয়ে কথা কেড়ে নেয়, ধরা না পড়ে। বাহ্! বেশ কইছস্ তো! সুদেব লেকচার দিতে জোশ্ পায় আরো। পদ্মার ইলিশেরে কয় হিল্শা। এক একটি মা ইলিশ একবারে একুশ লাখ ডিম পাড়ে। এই সুখী, তুই লাখ চিনস্? চিনুম না ক্যান? হাজার টাকার নোট একশটা অইলে তয় তারে কয় লাখ টাকা। বাহ্ বা তুই দেখি সবই জানস্! দে, এবার একটা পান দে। সুদেব বউকে পান দেয়ার কথা বলে নিজে গিয়ে জালটা দেখে নেয়। আজ রাতে মাছ ধরতে যাবে তারা। আজকে মাছের সবচেয়ে বড় চালান যেনো তার জালে উঠে সে আশায় সুদেব বেশ কয়েকবার ঈশ্বরকে অনুরোধও করেছে। এভাবে রাত জেগে মাছ ধরে আর দিনে ঘুমিয়ে পুষিয়ে নেয় সুদেব।



 



সুখের দিনগুলো সব দ্রুত যেতে থাকে। আজ থেকে নদীতে সরকারিভাবে মাছ মারা নিষেধ। ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছে প্রশাসন। সরকারি তহবিল হতে চাল আর নগদ অর্থ বিতরণ শুরু হয়েছে ইলিশ জেলেদের মধ্যে। সুদেব অবাক হয়। এই তালিকায় অনেকের নাম আছে যারা জীবনে একবারও জাল নিয়ে নদীতে নামে নাই। তবুও তাদের নাম আসে। কারণ এলাকার চেয়ারম্যান তাদের আত্মীয় হয়। তারা চেয়ারম্যানের লোক। তার যোগসাজশেই যারা ইলিশ জেলে না, তারাও এই তালিকায় ঢুকে গেছে। আসলে যারা ইলিশ জেলে তাদের অনেকেই এই সাহায্য পায়নি। জেলেরা অবশ্য এই সাহায্যের জন্য বসে থাকে না। নদীতে তাদের নামতেই হয়। এটা তাদের অভ্যাস। নদীই তাদের মা-বাপ, ভাগ্য-বিধাতা। আজকে প্রথমদিন বলে সুদেব ও তার দল নদীতে নামেনি। গত বছর শুনেছিল সরকারের লোকেরা জেলেদের নদীতে পেলে জেলে নিয়ে যায়। কাউকে অবশ্য এখনও জেলে যেতে দেখেনি। তার বউ সুখলতা আজ সুদেবকে নদীতে যেতে বারণ করেছে। সুদেব নিজেও প্রথম দিনটিতে সাবধান থাকে। সে জানে পয়লা দিনে তোড়জোড় একটু বেশিই থাকে। আজ আবার উপজেলার মাঠে কবিগানের আসর হবে। সুখলতা বায়না ধরেছে, সে কবিগানের আসরে যাবে। সুদেব অবাক হয়। এই কবিগানের আসর এখানে আগে কখনো হয়নি। যদিও তার এলাকায় অনেক আগে কবিয়াল মনি জয় চাঁন, কালশশী চক্কোত্তি, কালীমোহন ঘোষ, হীরেন কবিয়াল-এরা ছিলো, কিন্তু তারা মারা গেছে অনেক আগে। উপজেলায় গিয়ে সুদেব খবর লয়। সে যা ভেবেছে তাই। এই কবিয়ালেরা অত্র এলাকার নয়। এরা এসেছে ফরিদপুর থেকে। কবিয়াল নিধি সরকার আর তার শিষ্য বাসুদেব সরকার আর তাদের দলবল। সরকারি উদ্যোগে এই কবিগানের আসর বসছে আজ উপজেলা মাঠে। গ্রামের অধিকাংশ জেলেই আজ নদীতে যাবে না। তবে সুদেব খবর পেয়েছে, কিছু দুষ্ট জেলে ছোট ছোট ছেলেদের দল নিয়ে আজও নদীতে নামবে। হায়রে লোভ! লোভের জিহ্বা আগুনের জিহ্বার চাইতেও লম্বা। সুদেব ভাবে আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ক্যান যে তার জন্ম নদীভাংতি এলাকায়! কত লোক বিদেশ গিয়া কত টাকা কামায়। আহারে! সেই দিন কি আর আইব?



রাত আটটা থেকে কবিগান। তাড়াতাড়ি খেতে বসে যায় সুধাম ও তার পরিবার। সুখলতা আজ ভালই রেঁধেছে। বেগুন দিয়ে ইলিশ আর ডাল। চারজনে মিলে গপাগপ খেয়ে উঠে যায়। উপজেলা মাঠ তাদের গ্রাম হতে একটু দূরে আছে। জোর কদমে হাঁটা লাগায় তারা সবাই। পথে যেতে যেতে আরো অনেকের সাথেই দেখা। সবাই যাচ্ছে কবিগান দেখতে। অত্র এলাকায় বিনোদন তেমন নাই। কারেন্ট নাই বলে টেলিভিশনও দেখা যায় না। প্রত্যেকেই হাতে একটা করে টর্চ নিয়ে গ্রামের পথ পাড়ি দিতে শুরু করেছে।



 



উপজেলা মাঠে একটা মঞ্চ করা হয়েছে। মঞ্চের চারদিকই খোলা। কেবল উপরে একটা শামিয়ানা টানানো। তাতে দুটো এনার্জি সেভিং লাইট জ্বলছে। বেশ আলো লাইট দুটার। মঞ্চের উচ্চতা মাটি হতে তিনফুট। শামিয়ানার নিচে দুটো মাইক্রোফোন ঝুলানো আছে। এখনও শুরু হয়নি। উপজেলা স্যার আসলে তারপর শুরু হবে। মাঠে লোক আর ধরে না। কবিয়ালের দল মঞ্চে আসন নিয়েছে। একটু পরে উপজেলা স্যার আসলেন। তিনি মাইকে কী জানি বললেন। সুখলতার কানে সব ঢুকল না। সে অধীর হয়ে বসে আছে কখন কবিগান শুরু হয়। একসময় কবিয়াল সর্দার নিধি সরকার ও তার শিষ্য বাসুদেব সরকারের নাম মাইকে বলা হলো। দুইজনই করজোড়ে মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছে। উপজেলা স্যার দু জনের গলায় দুটো ফুলের মালা পরিয়ে দিলেন। সবাই জোরে জোরে তালি দেয়া শুরু করল। তারপর উপজেলা স্যার মঞ্চের সামনে নিচে সোফায় আসন নিলেন।



নিধি সরকার এবং বাসু সরকার ফুলের মালা গলায় নিয়ে বসে পড়ল মঞ্চের এক কোণায়। বাদ্যবাজনা বেজে উঠল। ঢোল, হার্মোনিয়াম, নাল ইত্যাদি। তিনজন মেয়ে মুখে প্রসাধন মাখা, উঠে দাঁড়াল। শুরু হলো বন্দনা গীত-



লোককথার এক কাহিনী, চাঁদ সওদাগর ছিলো



আগের দিনের শহর লোকে তাঁর নামেতেই দিলো।



আর কেউ বলে কোড়ালিয়ার চাঁদ ফকিরের নাম



সেই নামেরই পুণ্য চুয়ে জন্মেছে এই ধাম।



বার ভূঁইয়া চাঁদ রায় বা চাঁদ শাহ্-এর নাম



চাঁদপুরেরই জন্মকথায় সবাই পেলো দাম।



ভক্তি লয়ে চরণ চুমি সকল গুণীজনে



কবিগানের আসরে আজ বন্দিলাম এই ক্ষণে।



বন্দনা গীত শেষ করে বসে গেলো মেয়েদের দল। সবাই তালিতে ফেটে পড়লো সমবেতভাবে। বন্দনার পর শুরু হলো 'আগমনী'। যে মেয়েটি 'আগমনী' গাইতে উঠল সে তেমন স্বাস্থ্যবতী নয়। ক্ষীণস্বাস্থ্য। কিন্তু তার কণ্ঠ উদার। সে রাধার গান না শুনিয়ে শোনাল ইলিশের গান-



ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর



মেঘনা পাড়ের মেয়ে



সাগর জল ডাগর হলে



মেঘনাতে যায় ধেয়ে



জাটকা নাতি জন্ম দিতে



আসলে মেয়ে বাড়ি



যত্ন যে তার হয় নিতে খুব



বাপ-ভাই আর মা'রই।



ইলিশ তোমার বোন হয় গো



ইলিশ আমার মেয়ে



চাঁদপুরে তার ঘর বাড়ি তাই



ধন্য তারে পেয়ে।



 



'আগমনী' শুনে সুদেব বুঝল, আজকের কবিগানের বিষয় 'ইলিশ'। সুখলতা ফিসফিস করে স্বামীর কানে বলছে, ওমা গো! কী সুন্দর করেই না কইলো ইলিশ চাঁদপুরে মেয়ে। সুখরঞ্জন খুশিতে মাথা দোলায়। সুরবালাসহ অন্য মহিলাদের মুখে দেখা দেয় খুশির ঝিলিক।



একে একে সখী সংবাদ, বিরহ, মালসী, ধূয়া প্রভৃতি পরিবেশনের পর মঞ্চে উঠে দাঁড়াল কবিয়ালের সরকার নিধু বাবু। চারিদিকে হাতে তালি। আকর্ণবিস্তৃত হাসি নিয়ে নিধু বাবু গাইতে শুরু করলেন-



জাল যার জলা তার



তাইতো আমি জেলে



মেঘনা নদীর ইলিশ মারি



কারেন্ট জাল ফেলে।



শিক্ষা নাই, জমি নাই



মেঘনা খালি ভাঙ্গে



মাছ না পাইলে বউ-ঝিয়েরা



ক্ষুধায় ভিক্ষা মাঙ্গে।



নিধু বাবুর পরিচয়ে দর্শকেরা চুপ হয়ে যায়। সব সত্যি কথা। তাদের জীবনের কথা। ইলিশ ধরার নিষিদ্ধ মৌসুমে তারা মহাজন আর দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে সংসার চালায়।



নিধু বাবু পুনশ্চ গাইতে থাকে-



আমি হলাম জাত জল্লাদ



মাছ মারিরে ভাই



আমার চেয়ে বড় ঘাতক



এই দুনিয়ায় নাই।



জাটকা ইলিশ ডিমের ইলিশ



কেউ বাঁচে না তাই



মাছ মারি আর পেট পুরে খাই



পরাণে সুখ পাই।



নিধু বাবু পরিচয় শেষ করে বসে পড়লেন। দোহারিরা গাইতে থাকল-



জাল যার জলা তার



তাইতো আমি জেলে



মেঘনা নদীর ইলিশ মারি



কারেন্ট জাল ফেলে।



এরই মধ্যে মঞ্চে উঠে দাঁড়াল বাসু সরকার। দোহারিরা থেমে যায়। বাসু শুরু করে গাইতে-



বাবার বাড়ি চাঁদপুরে মোর



মেঘনা নদীর পাড়



সাগর মোরে ডাগর হলে



পাঠায় মায়ের দ্বার।



চাঁদপুরেরই মেয়ে আমি



মেঘনা আমার মা



মেঘনা নদীর অাঁতুর ঘরে



প্রসব করি ছা।



বাসুদেব এর কবিগান শুনে সবাই বুঝে গেলো সে হচ্ছে 'মা ইলিশ'। অর্থাৎ আজকে জেলে বনাম মা-ইলিশের কবির লড়াই। বাসুদেবের মুখে মা ইলিশের পরিচয় পেয়ে দর্শকদের মধ্যে উসখুস বাড়ে। সত্যিই তো! তারা তো কখনও মা ইলিশকে এভাবে চিন্তা করেনি।



বাসুদেব গেয়ে যায়-



চাঁদপুরেরই মেয়ে আমি



জোড় হাতে আজ কই



মোর বাছারা রত্ন দেশের



বোঝা তো আর নই।



অবল শিশু তাগড়া হলে



তখন ফেলো জাল



ডলার-দিনার অনেক পাবে



ফিরবে ফের কপাল।



বাসুদেবের আকুতি যেনো সত্যিকার এক ইলিশ মায়ের আকুতি। সুখলতাকে ছুঁয়ে গেলো ইলিশ মায়ের কষ্ট। সুখরঞ্জন বাসুদেবের কথা শুনে মাথা দোলায়-ঠিক! ঠিক!



বাসু সরকার শেষ করে আনে তার পরিচয় পর্ব।



মামা হয়ে জাটকা নিধন



আর করো না তাই



আমার বাড়ি চাঁদপুরে আর



তোমরা আমার ভাই।



বাসু সরকার জোড় হাতে আকুতি জানিয়ে বসে পড়ে। দোহারিরা গাইতে থাকে-



আমার বাড়ি চাঁদপুরে আর



তোমরা আমার ভাই।



নিধি বাবু উঠে দাঁড়ায় এবার। মুখে রুক্ষতা এনে ভেংচি কাটে বাসু সরকারের দিকে। দর্শকের উদ্দেশ্যে বলে উঠে- শুনেছেন! ইলিশ মাছে কয় কী? আরে মাছ না মারলে আমরা খামু কী? বলেন ভাই সকল-



সবাই সমস্বরে বলে, হ্যাঁ হ্যাঁ, আমরা খামু কী?



নিধি বাবু এবার বল পায়। জোরালো কণ্ঠে শুরু করে তার পালা



বলতো দেখি ইল্শা মাছ



ক্ষুধা পেলে তুই কী খাস্?



আমার পেটে লাগলে ক্ষুধা



বাঁধবো কি হে পাথর-গাছ?



নিধু বাবুর প্রশ্ন শুনে সবাই হাতে তালি দেয়। সুদেব ভাবতে থাকে-কড়া একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে নিধু বাবু। দোহারিরা গাইতে থাকে-



আমার পেটে লাগলে ক্ষুধা



বাঁধবো কি হে পাথর-গাছ?



বাসু সরকার উঠে দাঁড়ায়। গুরুর দিকে একটা মুচকি হাসি দেয়, অতঃপর গুরুর চাপান-এর উতোর দেয়-



নিধু তোমার নাই কি বধূ



তুমি মৌমাছি খাইবা মধু?



আমরা খাই প্লাংকটন



কেবল ক্ষুধা লাগে যখন।



মা ইলিশের উতোর শুনে সবার মধ্যে একটা অস্বস্তি তৈরি হয়। প্লাংকটন কী? কেউ চিনে বলে মনে হলো না সুদেবের। তবে সে ইশ্কুলে পড়েছিলো বাস্তুতন্ত্রে। সে জানে, প্লাংকটন হলো মাছের খাদ্য। বাসু সরকার গেয়ে যায় তার গান-



সারাজীবন ইলিশ মেরে



মূর্খ রাখলি পুত আর ঝিরে



শিক্ষা যদি দিতি তারে



খাওয়াত সে বাপ আর মা'রে।



মা ইলিশের উত্তরে এবার অনেক দর্শকই আফসোস করতে থাকে। তাইতো! কেন যেন আমরা আমাদের পোলা-মাইয়ারে শিক্ষিত করলাম না। সুদেব ভাবতে থাকে-মা ইলিশের উত্তর বড় বাস্তব। দেখা যাক কী হয়।



এদিকে বাসু সরকার পাল্টা চাপান দেওয়া শুরু করলো-



তোর ঘরে কি পুত-ঝি নাই



মা ইলিশ তুই মারিস সদাই?



নিষেধকালে মাছ না মেরে



সুযোগ দে যাই আমরা বেড়ে।



এতো অধীর কেনরে তুই



পাছায় ফুটিস্ নিত্য সুঁই?



বাসু সরকারের চাপান শুনে হাসির রোল পড়ে গেলো দর্শকের মধ্যে। এ' ওর মুখ চাওয়া-চাওয়ি শুরু করে দিলো। সুখলতা সুদেবের দিকে চেয়ে মুচকি হাসে। সুরবালা সুখরঞ্জনের পিঠে একটা চিমটি কেটে হেসে দেয়।



বাসু সরকার প্রশ্ন রেখে বসে পড়ে। দোহারিরা শেষ দুই লাইনের পুনরাবৃত্তি করতে থাকে-



এতো অধীর কেন রে তুই



পাছায় ফুটিস্ নিত্য সুঁই?



বাজনা থেমে যায়। নিধু বাবু চিন্তিত মুখে উঠে দাঁড়ায়। মনে মনে ভাবে-বাসুটা আজ বেশ জমিয়েছে। নিধু বাবু উত্তর দিতে শুরু করে-



পেটে যদি জ্বলে আগুন



করতে পারি মায়েরেও খুন!



ক্ষুধার কষ্ট বুঝবি কী তুই



অনাহারে না খেয়ে শুই।



নিধু বাবুর উত্তরে হেসে দেয় উপজেলা স্যার। কথা সত্য। ক্ষুধার আগুন বড় তীব্র। জেলেদের মধ্যে যিনি মনা কাকা- তিনি উঠে নিধু বাবুর গলায় দশ টাকার একটা মালা পরিয়ে দেন। মালা পেয়ে তেঁতে উঠে নিধু বাবু। এবার সে চাপান দেয় পাল্টা-



তুই যতই কর অভিনয়



তুই বাঁচবি তা কভু নয়



মৎস্য মারিব খাইব সুখে



কারেন্ট জালে ধরব তোকে।



মহিলাদের মুখের দিকে চেয়ে সুদেবের মনে হলো অতি উৎসাহে নিধু বাবু ভুল করে ফেলেছে। যদিও মনা কাকার টাকার মালা নিধু বাবু পেয়েছে, কিন্তু মায়েদের মনে ঢুকে গেছে মা ইলিশ।



বাসু সরকার উত্তর দিতে উঠে-



তোর সমাজেই এমন হয়



ছেলের হাতে মা খুন হয়



তোরাই বলিস্ বুঁজিয়ে চোখ



মাছের মায়ের পুত্রশোক!



বাসুর উত্তর শুনে সুদেব বুঝতে পারে-এই লোক তীব্র জ্ঞানী। আজ তার হাতে গুরুর নিস্তার নেই।



বাসু সরকার বলতে থাকে-



তুই কি কভু দিয়েছিস্ দানা



মাছের গায়ে করবি হানা?



মা ইলিশ ক্রমশঃ গভীরে ঢুকতে শুরু করে। এতোক্ষণ জেলের পক্ষে ছিলো বাতাস। এবার আস্তে আস্তে বাসুদেব শক্ত হয়ে উঠে-



মা ইলিশকে বাঁচাতে



সরকার দেয় তোর হাতে



নগদ টাকা চাল সাথে



আর কী চাই বল হাভাতে?



দোহরিরা গেয়ে গায়-



নগদ টাকা চাল সাথে



আর কী চাই বল হাভাতে?



বাসু সরকার বসে গেলে নিধু বাবু উঠে দাঁড়ায়। বাজনা শুরু হয়। নিধু বাবু উত্তর দেয়-



মহাজনের মহা ঋণ



ক্যামনে আমার ফিরাই দিন



আমি অচল জাল ছাড়া



যেমন ঘর চাল ছাড়া।



নিধুবাবুর উত্তর শুনে সুদেবের মনে পড়ে যায়- বউয়ের গয়না গড়িয়ে দেওয়ার কথা। কিছুক্ষণের জন্যে আনমনা হয়ে উঠে সুদেব। এরই মধ্যে কবিয়াল সরকার চাপান দেয়-



শোন্ ইল্শা কান খুলে



নেবো তোর আজ জান শূলে



জেলে আমি মাছের যম



বাঁচার কথা যাস্ ভুলে।



এভাবে বেশ কয়েক দফা গুরু-শিষ্যে চাপান-উতোর চলতে থাকে। সুখলতা স্বামীকে ইশারা করে-দু' টাকার বাদাম আনতে। সুদেব এই সুযোগটাই চাইছিলো। তার অনেকক্ষণ ধরে প্রস্রাব ধরেছে। এই ফাঁকে নিজেকে হালকা করা যাবে। বাদাম ওয়ালা আশেপাশে নেই। অনেক লোক তাদের পিছনে। সবাইকে ঠেলে গিয়ে বাদাম আনতে আনতে কবিগান প্রায় শেষের কাছাকাছি এসে পড়ে। সে এসে দেখে, মা ইলিশ বলছে-



শোনো আমার জেলে ভাই



তোমার কাছে ভিক্ষা চাই



জাটকা যদি না হয় বড়



দেশের ক্ষতি বড়সড়



ডিম না দিলে ইলিশ শেষ



তখন কি আর বাঁচবে দেশ?



বাসু সরকার তার শেষ চাপান দিয়ে বসে পড়ে। দোহারিরা এ' পর্যায়ে এসে একটু জোর পায় গলায়। তারা গাইতে থাকে-



ডিম না দিলে ইলিশ শেষ



তখন কি আর বাঁচবে দেশ?



বাজনা থেমে যায়। গলা একটু কেশে নিয়ে নিধু বাবু উঠে দাঁড়ায়। তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি হেনে মা-ইলিশের দিকে চায়। তারপর শুরু করে তার পালা-



অতোশতো বুঝি না



দেশকে কোথাও খুঁজি না



মা-জাটকা মারবোই



ডিমের ইলিশ ধরবোই।



না! ধরবে না! কখনো না! তীব্রস্বরে সুখলতা দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করে। সুদেব অবাক হয়। অবাক হয় সুখরঞ্জন। অবাক হয় মনাকাকা। উপজেলা স্যার চমকে উঠে। সুখলতার সাথে সাথে উঠে দাঁড়ায় সুরবালা। না, মা মাছ ধরবে না। ডিমের মাছ ধরবে না। সুরবালা, সুখলতার সাথে সাথে অন্যসব মেয়েও উঠে দাঁড়ায়। তারা দ্রুত এগিয়ে যায় মঞ্চের দিকে। তাদের আক্রোশ গিয়ে পড়ে নিধু বাবুর উপর। নিধু বাবু অবস্থা বেগতিক দেখে পালিয়ে গা ঢাকা দেয়। পেছনে পড়ে থাকে ফাঁকা মঞ্চ আর যন্ত্রীদল। এখানে সেখানে পড়ে থাকে মেয়েদের স্যান্ডেল। কোনটা কার চেনা যায় না। শুধু বুঝা যায়-মঞ্চের দিকে একটু আগেই একটা তীব্র স্যান্ডেল-ঝড় বিপুল বেগে বয়ে গেছে।



 



লেখক পরিচিতি : ইলিশ বিষয়ক ছড়াকার, প্রাবন্ধিক ও কথা সাহিত্যিক।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৯৩১৪৮৫
পুরোন সংখ্যা