চাঁদপুর । সোমবার ৩০ জুলাই ২০১৮ । ১৫ শ্রাবণ ১৪২৫ । ১৬ জিলকদ ১৪৩৯
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • ফরিদগঞ্জের চান্দ্রার খাড়খাদিয়ায় ট্রাক চাপায় সাইফুল ইসলাম (১২) নামের ৭ম শ্রেনীর শিক্ষার্থী ও সদর উপজেলার দাসাদি এলাকায় পিকআপ ভ্যান চাপায় কৃষক ফেরদৌস খান নিহত,বিল্লাল নামে অপর এক কৃষক আহত হয়েছে।
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৪০-সূরা আল মু’মিন

৮৫ আয়াত, ৯ রুকু, মক্কী

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

৮। হে আমাদের পালনকর্তা, আর তাদেরকে দাখিল করুন চিরকাল বসবাসের জান্নাতে, যার ওয়াদা আপনি তাদেরকে দিয়েছেন এবং তাদের বাপ-দাদা, পতি-পতœী ও সন্তানদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করে তাদেরকে। নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

৯। এবং আপনি আমাদেরকে অমঙ্গল থেকে রক্ষা করুন। আপনি যাকে সেদিন অমঙ্গল থেকে রক্ষা করবেন, তার প্রতি অনুগ্রহই করবেন। এটাই মহাসাফল্য।

দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন

 


সময় মানুষকে পরিপক্ক করে, কোনো মানুষ জ্ঞানী হয়ে জন্মলাভ করে না। 


-কার্ভেন্টিস।

                         


রসূলুল্লাহ্ (দঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোন লোকের  সঙ্গে ধোঁকাবাজি করে সে আমার (দলের বা উম্মতের) বাইরে।



 


ফটো গ্যালারি
মাহবুব আনোয়ার বাবলুর রস রচনা
মেজাজ
৩০ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


শুক্রবার। শুক্রবারে আমি সকাল ১১টার আগে ঘুম থেকে উঠি না। সপ্তাহের এ দিনটিতে একটু আরাম আয়েস করে অধিক বেলা পর্যন্ত ঘুমানো কোনো দ-নীয় অপরাধ নয়। কিন্তু আমার কপালে সুখ সইলো না। আমার প্রিয়তমা স্ত্রী সকাল ৮টায় আমাকে ধাক্কিয়ে ঘুম থেকে তুলে কড়া কণ্ঠে নির্দেশ দিল, 'শুন ক'দিন পর বাচ্চার পরীক্ষা। বাচ্চাকে তো তুমি পড়াও না, আমার মাথা ব্যথা করছে, আজ তুমি বাচ্চাকে পড়াও। আমি সুবোধ বালকের মতো উঠে পড়লাম। স্ত্রীকে কিছুই বললাম না। কারণ সুপ্ত আগ্নেয়গিরিতে অগ্ল্যুৎপাতের ভয়। এক রিঙ্াওয়ালা একদিন আমাকে বলেছিল 'জানেন ভাই উপরে আল্লাহ আর নিচে ট্রাফিক ছাড়া দুনিয়ায় আর কাউরে ডরাই না'। আমার অবস্থাও তার কাছাকাছি। প্রাতঃকালীন প্রাকৃতিক কর্মকা- ও নাস্তা সেরে বাচ্চাকে পড়াতে বসলাম। এতো সকালে ঘুম ভাঙানোর কারণে মেজাজ খারাপ হয়ে আছে। যদিও তা প্রকাশ করছি না।



পড়াতে বসলাম। আমার পুত্র সন্তানের নাম কুন্তল। চাঁদপুর মিশন স্কুলে ক্লাস ওয়ানে পড়ে। তাকে যেই প্রশ্ন করছি সেটাই সে পারছে। ঝটপট উত্তর দিচ্ছে। এবার দুটি কঠিন যোগ অঙ্ক দিলাম। নিমিষে করে ফেললো। এবার কঠিনতর দুটি বিয়োগ অঙ্ক দিলাম, তাও করে ফেললো। আমার মেজাজ তো সেই ঘুম ভাঙানো থেকেই খারাপ। এখন আরও খারাপ হচ্ছে। এত কঠিন অংক পারবে কেন? এত পারলেতো আর পড়ানোর দরকার নেই। কোথায় সে আমাকে বলবে 'আব্বু অংকটা পারছি না, আব্বু তুমি করে দাও', তা-না ঝটপট করে ফেলছে। হঠাৎ সে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, আচ্ছা আব্বু, কোন্ গাছ সবচেয়ে তাড়াতাড়ি বড় হয়? উত্তরটা আমার জানা নেই। আন্দাজে বললাম, কলা গাছ। কলা গাছ সবচেয়ে তাড়াতাড়ি বড় হয়। সে হেসে বললো, হলো না, সবচেয়ে তাড়াতাড়ি বড় হয় বাঁশ গাছ। 'আচ্ছা বলো তো কোন্ পাখি একনাগাড়ে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে উড়তে পারে'? এবারও আন্দাজে বললাম 'চিল'। সে আবারও হেসে বললো, হলো না, পায়রা সবচেয়ে বেশি সময় ধরে একনাগাড়ে উড়তে পারে। আমার মেজাজ চরমে উঠছে, কারণ মানুষ যখন লজ্জা পায় তখন তার মেজাজ খারাপ হয়, আমিও সম্ভবত মানুষ। ক্লাস ওয়ানের বাচ্চার প্রশ্নের জবাব দিতে পারছি না আমি! এবার কুন্তল বললো, পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট পাখির নাম কি বলতো? আমি অতি কষ্টে আইনস্টানের মতো প-িত সুলভ হেসে বললাম, এটা কোনো প্রশ্ন হলো?_পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট পাখি হচ্ছে টুনটুনি। এবার আমার সন্তান হেসে কুটি কুটি হয়ে বললো, 'এটাও পারলে না, পৃথিবীর সবেচেয়ে ছোট পাখির নাম 'হামিংবার্ড'। আমার পা-িত্যসুলভ হাসি কর্পুরের মতো উবে গেল। কঠিন কণ্ঠে বললাম, আমাকে আর প্রশ্ন করতে হবে না, ওয়েল ইউর অউন মেশিন। এ সেনট্যান্সের অর্থটা তুমি জান? আমার ধারণা ছিলো এই সেনট্যান্সের অর্থ সে জানে না। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে বললো ওয়েল ইউর অউন মেশিন অর্থ হচ্ছে 'নিজের চরকায় নিজে তেল দাও'। মনে মনে ভাবলাম আমার সন্তানতো বেশ ভালো ছাত্র, এতে তো আমার খুশি হয়ে তাকে চুমু খাওয়ার কথা। কিন্তু খুশি হতে পারছি না। কারণ সে আমার সাথে মাস্টারি ফলাচ্ছে। এসব প্রশ্ন করে পরীক্ষা করছে মাস্টার হিসেবে আমি কতোটা উপযোগী। তাকে মোস্তাক গাছ দিয়ে পেটাতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু মোস্তাক গাছতো দূরের কথা একটা থাপ্পড়ও দেওয়া যাবে না। কারণ সংগে সংগে গগণবিদারী চিৎকার করে উঠবে, সঙ্গে সঙ্গে ওর মা তেড়ে আসবে, তারপরতো কুরুক্ষেত্র।



কুন্তল বোধহয় আমার মনের অবস্থা বুঝে ফেললো। বাচ্চাদেরকে আমরা যতটা বাচ্চা ভাবি তারা কিন্তু অতটা বাচ্চা নয়। সে গভীর আগ্রহের সাথে বললো 'আচ্ছা আব্বু দুটি ইংরেজি প্রশ্ন করে তোমাকে ছেড়ে দিচ্ছি, আজকের মতো তোমার ছুটি'। বলে কি ছেলে? আমি কি তার ছাত্র? আমি? বললো 'বলতো আব্বু, ঝিনুক ইংরেজি কি?' কঠিন কণ্ঠে বললাম, কী পড়াশোনা কর, ঝিনুক ইংরেজি জান না'। সে বললো, আমি জানি, তুমি জানো কি না বলো। আমি কোনো জবাব দিলাম না। ঝিনুক ইংরেজি আমি জানি না, বলবো কী? সে বললো, ঝিনুক ইংরেজি ঙুংঃবৎ। আচ্ছা আরেকটা প্রশ্ন, 'বলতো শসা ইংরেজি কী'? ক্ষেপে গিয়ে বললাম, ঝিনুক ইংরেজি, শসা ইংরেজি না জানলে জগৎ সংসারের কোনো ক্ষতি হবে না। আমরা ইংল্যান্ড, আমেরিকায় বাস করছি না, বাংলাদেশে বাস করছি। বাজারে গিয়ে ১ কেজি শসা দাও বললেই দোকানদার বুঝবে। কথাটা বলেই মনে হলো, এটা কী বললাম? আমি জানি না বলে আমার সন্তানও জানবে না এটা কেমন কথা। তাছাড়া ওকেতো এসব পড়াচ্ছে, সে না জানলে পরীক্ষায় পাস করবে কীভাবে। কুন্তল বললো, শসা ইংরেজি ঈঁপঁসনবৎ। তার কোনো প্রশ্নের জবাব দিতে পারিনি মেজাজ এখন সপ্তমে। সে বললো 'শেষ প্রশ্ন : আচ্ছা বলতো'... তার কথা শেষ হওয়ার আগেই বল্লাম চুপ, একদম চুপ। আর কোনো প্রশ্ন না। নিজে নিজে পড়ো। বাপের সাথে মাস্টারি? সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, বাচ্চাকে আর কখনো পড়াতে বসাবো না। আমাদের আমলে কত সহজ প্রশ্ন ছিলো। আর এখন? ওরে বাপ। আমি পড়ানো রেখে উঠে গেলাম।



মনে পড়লো ছেলেবেলার একটা ঘটনা। হাসান আলী প্রাইমারী স্কুলে ক্লাস থ্রিতে পড়ি। সেদিন ছিল স্কুলে বার্ষিক মিলাদ মাহফিল। বড় হাসান আলী স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন মরহুম হামিদ মজুমদার স্যার। তিনি আমাকে খুব আদর করতেন। মিলাদ আরম্ভের আগে ইসলামী গান, গজল চলছে। আমি প্রাইমারীতে পড়লেও বড় হাসান আলীর হেডমাস্টার হামিদ মজুমদার স্যার আমাকে ধরে নিয়ে বললেন, 'মাহবুব : তুই গজল পারিস্, মানে ইসলামী গান আর কি?' আমি বললাম, জ্বী স্যার পারি। তিনি আমাকে মাইকের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বললেন, নে একটা গজল ধর। আমি দেখছি হলভর্তি ছাত্র-শিক্ষক। ভয়ে আমি গজল ভুলে গিয়ে মাইকে গলা ফাটিয়ে বলতে শুরু করলাম, 'বাকবাকুম পায়রা, মাথায় দিয়ে টায়রা, বউ সাজবে কালকি, চড়বে সোনার পালকি'। সবাই তো হেসে কুটি কুটি। হামিদ মজুমদার স্যার আমার কান ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে আমার দু গালে চারটা থাপ্পড় মেরে বললেন, এটা গজল? গজল এটা? তোর বাকবাকুম পায়রা আজ আমি ছুটাবো। সেদিন গজল না পেরে এবং সবার সামনে স্যারের হাতে মার খেয়ে ভীষণ লজ্জা পেয়েছিলাম। কিন্তু সে বয়সে স্যারের হাতে মার খাওয়া তেমন ভয়াবহ ব্যাপার না। কিন্তু আজ পরিপূর্ণ বয়সে এসে বাচ্চার প্রশ্নের উত্তর না দিতে পারার লজ্জা আমি কোথায় লুকাই? লজ্জায় এখন আমার মেজাজের পাড়া আরও ঊর্ধ্বগামী। এক ডাক্তারকে ফোন করলাম, মেজাজটা ভীষণ খারাপ হয়েছে, কী ঔষধ খাবো। তিনি বললেন, একটা কুশিয়াম ট্যাবলেট খান। মেজাজ ঠা-া হয়ে যাবে। কুশিয়াম ট্যাবলেট ঘরেই ছিল, খেয়ে ফেললাম। কুশিয়ামে বোধহয় রিঅ্যাক্ট করলো, মেজাজ আরও খারাপ হলো।



এতক্ষণ লক্ষ্য করিনি, আমার স্ত্রী কিন্তু পাশের ঘরে কাজ করছিল। সেখান থেকে সে বাপ-বেটার পুরোটা ব্যাপারই শুনেছে এবং আমার যে চরম মেজাজ খারাপ হয়েছে তাও বুঝেছে। আমি বারান্দায় এসে বসলাম। আমার স্ত্রী আমার কাঁধে হাত রেখে বললো, 'শোনো, তুমি তো বাচ্চাকে পড়াও না, তাই বোঝ না ব্যাপারটা কতো কঠিন। তাই যাই হোক, তোমার যে মেজাজ খারাপ হয়েছে তা আমি বুঝেছি এবং ভয়াবহ লজ্জা পেয়েছ তাও বুঝেছি। কিন্তু শোনো লক্ষ্মী, শীষ্য এবং সন্তানের কাছে পরাজয়ে কোনো গ্লানি নেই। অতএব লজ্জা ঝেড়ে ফেল এবং মেজাজ ঠা-া কর। আমি কি এককাপ চা বানিয়ে দেবো? স্ত্রীর মধুর কণ্ঠের সান্ত্বনায় এবং চায়ের কথা বলায় আমার মেজাজের পাড়া নিম্নগামী হতে শুরু করলো।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
১১৪৯৯৪৯
পুরোন সংখ্যা