চাঁদপুর । সোমবার ৩০ জুলাই ২০১৮ । ১৫ শ্রাবণ ১৪২৫ । ১৬ জিলকদ ১৪৩৯
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • ফরিদগঞ্জের চান্দ্রার খাড়খাদিয়ায় ট্রাক চাপায় সাইফুল ইসলাম (১২) নামের ৭ম শ্রেনীর শিক্ষার্থী ও সদর উপজেলার দাসাদি এলাকায় পিকআপ ভ্যান চাপায় কৃষক ফেরদৌস খান নিহত,বিল্লাল নামে অপর এক কৃষক আহত হয়েছে।
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৪০-সূরা আল মু’মিন

৮৫ আয়াত, ৯ রুকু, মক্কী

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

৮। হে আমাদের পালনকর্তা, আর তাদেরকে দাখিল করুন চিরকাল বসবাসের জান্নাতে, যার ওয়াদা আপনি তাদেরকে দিয়েছেন এবং তাদের বাপ-দাদা, পতি-পতœী ও সন্তানদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করে তাদেরকে। নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

৯। এবং আপনি আমাদেরকে অমঙ্গল থেকে রক্ষা করুন। আপনি যাকে সেদিন অমঙ্গল থেকে রক্ষা করবেন, তার প্রতি অনুগ্রহই করবেন। এটাই মহাসাফল্য।

দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন

 


সময় মানুষকে পরিপক্ক করে, কোনো মানুষ জ্ঞানী হয়ে জন্মলাভ করে না। 


-কার্ভেন্টিস।

                         


রসূলুল্লাহ্ (দঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোন লোকের  সঙ্গে ধোঁকাবাজি করে সে আমার (দলের বা উম্মতের) বাইরে।



 


ফটো গ্যালারি
পরের বাড়ি
তছলিম হোসেন হাওলাদার
৩০ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


'বাপের বাড়ির আটাইল্যা মাটি/যেমন ইচ্ছা তেমন হাঁটি, পরের বাড়ির বাইল্যা মাটি/হাঁটতে লাগে ফাটাফাটি'_প্রবাদের লাইন দুটি আওড়িয়ে জহুরা বেগম দম নেয়। তারপর আবার বলে, কতো কইরা মাইয়্যাডারে কতাগুলান বুঝাইছি। কইছি, হুশে চল্ মাইয়্যা। মাইয়্যাগো জীবন বড় কঠিন। বাপের বাড়ি যেমন তেমন কইরা পার করলেও পরের বাড়ি পার করা মুশকিল। কিন্তু মাইয়া আমার কথা হুনে নাই। হুনবে কেন, আমিতো অর আপন মা না। জহুরা বেগম রাগে গজগজ করতে থাকে।



জ্যৈষ্ঠের বিকেল। দুপুরের দিকে এক পশলা বৃষ্টি হয়েছে। এখন বৃষ্টির আভাস নাই, যদিও আকাশ ভরা মেঘ। রাস্তায় কিছু পানি থাকলেও সমস্যা হচ্ছে না। গ্রামের পাকা রাস্তা। দুপাশে গাছপালা, ফসলি জমি। রিঙ্া চলছে ধীর লয়ে।



জহুরা বেগম আবারও গজগজ করতে থাকে, 'আমি অর আপন মা না, তাই বইল্যা আমি কি অর খারাপ চাইছি? চাইতে পারি? আমি একজন মা না? মা অইয়া কেউ কি কোনো মাইয়ার খারাপ চায়, চাইতে পারে? আমিও চাই নাই বইলা এটা ওটা নিয়া ডাক দিছি। কিন্তু ও-ই আমার দোষ অইছে। মাইয়া যেমন আতারে পাতারে কইছে, বাপেও না বুইজা মাইয়ার পক্ষ নিছে। আমারে দোষছে? আর অহন? অহন কার ভোগান্তি অইতাছে? মাইয়ারই অইতাছে। হেই লগে আমাগও। বেআক্কইল্যা মাইয়া কোনাইকার।'



রিঙ্ায় বসে একদিকে তাকিয়ে এতোগুলো কথা বললেও পাশে থাকা স্বামীটি নিশ্চুপ। কিছুই বলছে না। বিষয়টি টের পেয়ে জহুরা বেগম স্বামীর মুখের দিকে তাকায়। পরে লোকমান মিয়ার পেটে গুতা দিয়া বলে, 'কি হইছে, কানে তুলা গুইজ্জা রাখছেন নি? কতা কননা ক্যা? আর মুখটা অমন শামুকের মতন খিইট্যা রইছেন ক্যান? আমি তো একটা মানুষ। পাশে বইস্যা মানুষইতো কতা কইতাছি, নাকি?'



স্বামী লোকমান মিয়া তারপরও স্ত্রীর কথার জবাব দেয় না। সে ভাবনার সাগরে ডুবে আছে। ভাবছে পেছনের কথা। প্রথম স্ত্রী মনোয়ারা বেগম চলে যাওয়ার পর দুই মেয়ে নিয়ে বড় বিপাকে পড়েছিলো। ক্ষেত-গেরস্থি দেখবে না মেয়েদের দেখবে। ঘটনার আকস্মিকতায় বিমূঢ় হয়ে পড়ায় বিয়ে করবে না করবে সে সিদ্ধান্তে আসতেও সময় নিতে হয়ছে তাকে। এই ফাঁকে মেয়ে দুটো একটু বেয়াড়া হয়ে গেছে। এরপর জহুরাকে ঘরে আনে। জহুরার স্বামী রোড অ্যাঙ্েিডন্টে মারা গেছে। বয়স বিবেচনায় তাই দুজনের মধ্যে সমন্বয় ঘটে ত্বরিত। কিন্তু জহুরা যখন মেয়েদের নিয়ে কথা বলতে শুরু করে তখন তাদের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। লোকমান মিয়ার মনে হয়েছে, পরের মেয়ে বলেই সব কিছু বাড়িয়ে বলছে। রিঙ্ায় বসে এক মনে এখন সেসব কথাই ভাবছিলো। ভাবছে ভুলটা হয়তো তারই ছিলো।



জহুরা বেগম ও লোকমান মিয়া যাচ্ছে বড় মেয়ের বাড়ি। ছোট মেয়ে এবং জহুরার পক্ষের ছেলে আছে বাড়িতে। জায়-ঝামেলার মধ্যেও বড় মেয়েকে মেট্টিক পর্যন্ত পড়িয়েছে। আইএ পড়ার আধা আধিতে বড় বোন এসে ধরেছে, ভাইজিকে বউ করে নিবে। শর্তও ছিলো একটা। ছেলের চাকুরির জন্যে কিছু টাকা দিতে হবে। ধার হিসেবেই নেবে, পরে শোধ করে দেবে। লোকমান মিয়া রাজি হয়ে যায়। ছেলে আপন ভাগনা, জানা-শোনা এবং দেখতে-শুনতেও ভালো। তাছাড়া বোনের ঘরে যাবে, বোন খারাপ-ভালো জেনে-বুঝেই মেয়েকে বউ করে নিচ্ছে_তাই নিশ্চিত ছিলো যে মেয়ের দিন ভালো যাবে। মেয়ে সুখে থাববে। কিন্তু তার ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ক'দিন পরপরই মেয়েকে নিয়ে ঝামেলা হচ্ছে। আজও যাচ্ছে তেমনি এক ঝামেলা মিটাতে। জহুরা বেগম এতোক্ষণ কানের কাছে মাছির মতো ভনবনালেও তাই তার কথা মাথায় ঢুকেনি। আর ঢুকলেও ইচ্ছে করেই সেসব আমলে নেয়নি লোকমান মিয়া। মন পড়ে আছে মেয়ের কাছে। এবার কি হবে আল্লাই জানে।



 



দুই.



সন্ধ্যার পর সবাই বসেছে। লোকমান মিয়া, তার স্ত্রী জহুরা বেগম, বড় বোন আনজুমান, বর্তমানে বেয়াইন। জামাই ইলিয়াস পবন, বড় ভাগনা মিজান এবং বাড়ির আরো দু-চার ঘরের মহিলা। জহুরা বেগমই প্রথম আলোচনার সূত্রপাত ঘটায়। 'আপা কনতো দেহি এবার কি নিয়া ঝামেলা হইছে?'



আনজুমান বেগম সারা শরীরে ঝাক্কি দিয়ে বলে উঠলো, কি আর কইমু বইন, সবই আমর কর্মফল। জাইনা-শুইনা আমি কেন ভাতিজিরে বউ কইরা ঘরে আনলাম এটাই হইল আমার বড় পাপ। ভাতিজি ভালো না এটা আমি জানতাম। তারপরও ভাবলাম, ফুফু অইয়া আমি অরে ঠিক করমু। কিন্তু জাতস্বভাব কি আর বদলায়?



জাত নিয়া কথা বলায় লোকমান মিয়া রেগে যায়। বোনের উদ্দেশ্যে বলে, আমার মেয়ের জাত আর তোমার জাত কি আলাদা?



না আলাদা না। তয় জাতের মধ্যেও ভেজাল আছে। এক ঝাড়ের বাঁশ সব কি এক হয়? হয় না।



কথা এভাবেই গড়াচ্ছিলো। খুব একটা উত্তপ্তও না, আবার উত্তপ্ত। এই ফাঁকেই বড় ভাগনা মিজানের বউ আছমা একখান পেঁচ খেলায়। সে তার মেঝো দেবর নিজামকে বিচার সভার কথা ফোনে রেকর্ডিং করে শোনায়। নিজাম মিয়া এখন ঘরের মাতব্বর। এই সংসারের নিয়ম হলো, যার যখন রুজি বেশি থাকে তখন সেই হয় মাতব্বর। আগে এই মাতব্বর ছিলো মিজান মিয়া। এ সময় হঠাৎই মোবাইলে নিজাম মিয়ার চড়া গলা শোনা যায়। 'ওই ঘরে এতো হৈচৈ ক্যান? কি হইছে? আমি আইলে কিন্তু কেয়ামত ঘটাইয়া ফালামু। এবার পবইন্নার বউর কল্লা কাটমু কইলাম।' লাউড স্পিকার দেয়া ছিল বলে নিজামের কথা সভার সবাই শুনতে পায়। নিজাম কুমিল্লা থাকে। চাকুরি করে। চাকুরিজীবী বলে মেজাজ যেমন কড়া, কথার ধাচও তার আলাদা।'



ঘটনা এবার ভিন্নদিকে মোড় নেয়। পবনের স্ত্রী টুম্পা গলা ছড়িয়ে দেয়। 'হুনলেন তো আপনারা সবাই আমার মেঝো ভাসুরের কথা! সে যখন তখন আমারে এভাবেই ধমকায়। আমার কল্লা কাটতো কয়। এইদিকে বড় ভাসুর তার বউ এবং ছেলেরা আমারে লাঠি নিয়া পিটাইতে আইয়ে, পিটাইছেও কয়বার। টুম্পা ঘরের অন্য মহিলাদের উদ্দেশ্যে বলে, আপনারাতো সব জানেন, বলেন না কেনো কেউ কিছু?



আমি কি মিথ্যা কইছি?



টুম্পার কথার জবাব কেউ না দিলেও জবাব দেয় আনজুমা বেগম। বলে, তুই বড় ভালা। এজন্যেই তোরে সবাই আদর কইরা মারতে আইয়ে। বোনের খোঁচা মারা কথা লোকমান মিয়া বুঝেছে। বুঝেই বোনের কথার জবাবে বলে, আমার যা বুঝার বুইজ্যা ফালাইছি। আমার মাইয়া বালানা এইটা আমিও কই। তাই বইলা সবাই মিইল্যা মাইয়াডার উপর অত্যাচার করবো, এটাওতো মাইনা নেওন যায় না। ঠিক আছে, আমার মাইয়া আমি অক্ষণি নিয়া যামু।



এই কথা বলার পরই জহুরা বেগম হায় হায় করে উঠে। বলে আরে আপনারা ভাইয়ে-বইনে কি শুরু করলেন এসব। আচ্ছা জামাই পবন মিয়া কই? তার মুখের কথাও তো কিছু শোনা দরকার।



পবন মিয়া দরজার বাইরেই দাঁড়ানো ছিলো। ছেলে অয়নকে স্ত্রীর কাছে থেকে আনতে চেষ্টা করছে দুবার, ব্যর্থ হয়ে দরজায় ঠেস দিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থেকেছে। অয়ন মায়ের অাঁচল শক্ত করে ধরে আছে আর একটানা কেঁদে চলেছে। পবনকে কাছে আসতে বলে জহুরা বেগম বললো, বলোতো বাবা, তোমার কথা একটু শুনি।



ইলিয়াস পবন স্ত্রীর তেমন বদনাম করলো না। বললো, টুম্পা এমনিতে খারাপ না। বিশেষ করে আমার সাথে সে কখনই তেমন খারাপ ব্যবহার করে না। তার জিদ একটু বেশি কিন্তু কাজ-কর্ম সবই ঠিকঠাক করে। তবে কথা হইলো সে ঘরের অন্য সবার সাথে এডজাস্ট করে চলতে পারে না। এটাই হইলো তার বড় দোষ।



জহুরা বেগম বললো, তা বুঝলাম। কিন্তু তোমার বউরে যে সবাই কথায় কথায় মারতে আসে, একজনতো তার কল্লাই কাইটা ফালাইতো কয়, এসবতো ঠিক না। এখানে তো তোমার একটা দায় আছে। আছে না?



ইলিয়াস পবন একথার জবাবে স্পষ্ট বলে যে, 'এ ব্যাপারে আমার কিছুই করার নাই। আমি ভাইদের কাছে অনেক ঋণী, বিশেষ কইরা মেঝো ভাইর কাছে। আমি তার কথার বাইরে কিছু বলতে পারবো না। বলতে গেলে সে আমারই কল্লা কাইটা ফাইলাইবো।'



 



তিন.



টুম্পার স্বামী ইলিয়াস পবনের কথার পর কারোরই তেমন আর কথা থাকলো না। তারপরও উপস্থিত সকলে মিলে একরকম জোর করে বিচার শেষ করে এই কথা বলে যে, অন্তত ছোট্ট অবুঝ ছেলেটার দিকে তাকিয়ে হলেও সংসারটা টিকিয়ে রাখা দরকার। রাগ-গোস্যা বাদ দেয়া দরকার। লোকমান মিয়াও মেয়েকে বুঝালো। আবেগঘন গলায় মেয়ের হাত মাথায় নিয়া বললো, 'কথা দে মা আর যেনো কোনো বিচার-সালিস নিয়ে আমাদের এ বাড়িতে না আসতে হয়।



বাবার কথার জবাবে ছোট্ট করে টুম্পা বললো, 'আচ্ছা'।



এবারের মতো ঝামেলা আপাতত মিটলো। বাড়ির মহিলারা চলে গেলো যার যার ঘরে। লোকমান মিয়া এবং তার স্ত্রী জহুরা বেগমও রাত মাথায় নিয়ে বাড়ি ফিরে। রিঙ্া আফডাউন ভাড়া করা ছিলো।



এদিকে বিল বাদিয়ায় ঘন হয়ে রাত নামে। দূরে কুকুরের ডাক তীক্ষ্ন হয়। ক'দিনের টানা বৃষ্টিতে বেঙ ডাকতে থাকে ডোবা-নালায়। রাত বাড়ছে কিন্তু টুম্পার চোখে ঘুম নেই। সে পাশ ফিরে স্বামী পবনকে দেখে, অঘোরে ঘুমুচ্ছে। ছেলেকে দেখে, ঘুমুচ্ছে সেও। রাত জাগার ক্লান্তি নিয়ে টুম্পা আকাশ-পাতাল ডেবে চলে একা। এই মুহূর্তে তার কি করা উচিৎ বুঝে উঠতে পারছে না। সে বুঝতে চেষ্টা করে এটা কি তার জীবনের কর্মফল, নাকি মেয়ে হয়ে জন্মানোর পাপ? স্বামী পবনের কথাগুলোও কানে বাজতে থাকে প্রবলভাবে, বেঙের ডাক ছাড়িয়ে_'আমি



ভাইদের কাছে অনেক ঋণী, বিশেষ করে মেঝো ভাইর কাছে। আমি তার কথার বাইরে কিছু বলতে পারবো না। বলতে গেলে সে আমার কল্লাই কাইটা ফালাইবো'। টুম্পার মনে প্রশ্ন জাগে, তবে কি ভাইই সব, আমি কিছু না? ভাই যদি বলে আজই স্ত্রী বিদায় করে দাও, তবে তাই দিবে? একে কি বলে বিবাহিত জীবন? স্বামীর ঘর করা?



প্রশ্নের পর প্রশ্নের আঘাতে টুম্পার মাথার ভেতরের তস্ত্রীগুলো সব ছিঁড়ে যেতে থাকে। তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে থাকে। নিস্তেজ হতে থাকে শরীর। পাশেই ঘুমিয়ে থাকা ছেলে অয়নকে বুকে টানতে চেয়ে টানতে পারছিলো না কিছুতেই।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
১৪১০৫
পুরোন সংখ্যা