চাঁদপুর। সোমবার ৮ অক্টোবর ২০১৮। ২৩ আশ্বিন ১৪২৫। ২৭ মহররম ১৪৪০
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৪২-সূরা শূরা

৫৪ আয়াত, ৫ রুকু, মক্কী

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

২৪। তারা কি বলে যে, সে (রাসূল) আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা বানিয়েছে, সুতরাং যদি আল্লাহ ইচ্ছা করেন তবে তোমার হৃদয় মোহর করে দিবেন। আল্লাহ মিথ্যাকে মুছে দেন এবং নিজ বাণী দ্বারা সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেন। অন্তরে যা আছে সে বিষয়ে তিনি সবিশেষ অবহিত।

২৫। তিনিই তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করেন এবং পাপ মোচন করেন এবং তোমরা যা কর তিনি তা জানেন।

২৬। তিনি মু’মিন ও সৎ আমলকারীদের আহ্বানে সাড়া দেন এবং তাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ বর্ধিত করেন; কাফিরদের জন্যে রয়েছে কঠিন শাস্তি।

দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


প্রকৃতি নিয়ম মানতেও জানে আবার ভাঙতে জানে।                           


 -সিসেরো।


যাবতীয়  পাপ থেকে বেঁচে থাকার উপায় হলো রসনাকে বিরত রাখা।



 


ফটো গ্যালারি
অতৃপ্ত যাত্রা
কাদের পলাশ
০৮ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


রাস্তার পশ্চিম পাশে রুস্তমের দোকান। এখানে সকাল বিকেল হৈচৈ জমে থাকে। যদিও দোকানটি আলোকিত হয় কেরামত উল্লার বদৌলতে। হাইওয়ে সড়কের উপর দিয়ে প্রতিনিয়ত শ-শ ছোট বড় যান ছুটে চলে। চলে স্বপ্নবাজ যেমনি তেমনি চালবাজ মানুষও। কয়েক বছর আগেও এটি ছিলো গেঁও পথ। ফসলি জমির চেয়ে কিছুটা উঁচু। কাঁদা মাটির রাস্তা। এ পথ ধরে মানুষ পায়ে হেঁটে বাজারে যেতো। যেতো বিবিধ গন্তব্যে। বাবার আঙুল ধরে এ পথ হেঁটেই কত সন্তান বড় হয়েছে। সমাজে প্রতিষ্ঠিত। সেসব সন্তানও আজ বাবা হয়েছেন।



ঝুঁপড়ি ঘরের মতো দোকানটি রুস্তমের দাদার। বাবা টিন দিয়ে কিছুটা সময়োপযোগী করে তোলে। রুস্তম আলী দোকানটিতে আর কোনো পরিবর্তন আনেনি। একবার আধাপাকা করতে গিয়ে বাবার ধমক খেয়েছে। দোকানের সুরত পাল্টালে নাকি লক্ষ্মী চলে যায়। বেচা-বিক্রি কমে যায়। সাথে আয় রোজগারও। এমন শঙ্কায় বাবার হাতে গড়া দোকানেই ব্যবসা করে চলছে রুস্তম আলী। অবশ্য সামনে পাতানো টেবিলের রূপ পাল্টেছে। ভাঙা নড়বড়ে কাঠের টেবিলের পরিবর্তে ইট বালির পাকা টেবিল হয়েছে। এ টেবিলের দক্ষিণ মাথায় প্রতিদিন সকাল-বিকেল বসেন কেরামত আলী। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা। প্রায়দিনই গ্রামবাসীর ঝগড়া নিরসনে কথা বলেন। সঠিক বিচার করায় সবাই খুব মান্য করে। শ্রদ্ধাভক্তি করে। সালিসে ভাড়ায় কখনো খাটেনি। অর্থাৎ নীতির বিরুদ্ধাচরণ করেনি। যে কারণে প্রত্যাশিত রায় পায় বিচার প্রত্যাশীরা। কোনোদিন দরবার সালিস না থাকলে বসে বসে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনায়। যুদ্ধে কত কেরামতি দেখিয়েছেন সব ইনিয়ে-বিনিয়ে বলেন আর নেভি সিগারেট ফুঁকেন। দোকানের সম্মুখভাগে ঝুলিয়ে রাখা কলা কখনো একা খেতে পারেননি। একেক করে উপস্থিত সবার হাতে দিয়ে তারপর নিজের হাতে একটা কলা রাখেন। কলার খোসা সরিয়ে খেতে খেতে গল্পটা আরো নাতিদীর্ঘ করেন। শুনতে শুনতে কেরামত উল্লার যুদ্ধগল্প গ্রামের সবার মুখস্ত হয়ে গেছে। তবে লোকমান মিয়ার যুবতি কন্যার সাহসের প্রশংসা প্রতি গল্পের আগেই করেন। না হয় যেনো তার যুদ্ধের গল্প বলায় প্রাণ পায় না।



বীরাঙ্গনা কাঞ্চন বালা পাগলের ভান ধরে ঢুকে পড়তো পাকবাহিনী ক্যাম্পে। কোনো কোনো পাক সেনা কাঞ্চন বালাকে সুস্থ বলে সন্দেহ করতো। বেশ ক'জন গায়ে হাতও দিয়েছিলো। তখন পাগলের ঢঙে পরনের কাপড় হাঁটুর উপর তুলে বলতো, তোরা আর কত জুলুম করবি? কইরা যা। তোরাতো দেশটারেই খাইয়া শেষ কইরা ফালাইছস্। মোরে বাদ রাইখা কী অইবো?



কাঞ্চন বালার কথা বুঝতে না পারলেও আচরণ দেখে মিলিটারিরা নিশ্চিত হতো মেয়েটা আসলেই পাগল! এ সুযোগে সব তথ্য নিয়ে এসে আমাদের দিতো। আমরা পরের রাতেই হামলা দিতাম ক্যাম্পে। তখন আমাদের সাথেই থাকতো মা মরা কাঞ্চন বালা। বাবা লোকমান মিয়া বারণ করলেও তা অমান্য করেই যুদ্ধের সময় আমাদের সাথে ছিলো। তখন নভেম্বর মাস। আমরা দেশ স্বাধীনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করি। কমান্ডার রাঙ্গাচরের মিলিটারি ক্যাম্পে হামলা দেয়ার পরিকল্পনা করে। কেরামত উল্লাহ কিছুক্ষণ চুপ থেকে দম নেয়। কাঞ্চন বালা আগের মতো একই বেশে গিয়ে উঠে ক্যাম্পে। ততক্ষণে আশপাশের আর্মি ক্যাম্পে টের পেয়ে যায়। একটা পাগলী মেয়ে ক্যাম্পে আসে। পরদিন রাতেই ওই ক্যাম্পে হামলা চালায় মুক্তিবাহিনী। রাঙ্গাচরের ক্যাম্পের মিলিটারিরা বুঝতে পেরে কাঞ্চন বালাকে আটক করে রাখে। এরপর দফায় দফায় বর্বরতা চলায় নরপিশাচের দল। তাতেও ক্ষান্ত হয়নি। চালায় নির্মম নির্যাতন। কাঞ্চন বালা ফিরে না আসায় ওই ক্যাম্পে আক্রমণ করতে বেশ কিছু দিন বিলম্ব হয়েছিলো। এ অভিযানে সামনে থেকে কেউ নেতৃত্ব দিতে সাহস না করলেও কেরামত উল্লা অগ্রভাবে অবস্থান নিয়ে আক্রমণ চালায়। রাঙ্গাচরে সেদিন আটজন মিলিটারি সদস্য মারা গিয়েছিলো। কমান্ডার পাশের একটা রুমে গিয়ে দেখে দশ বারোজন নারীর মৃতদেহ পড়ে আছে। তিন চার জনের নিচে পড়ে ছিলো কাঞ্চন বালার লাশ। কমান্ডার সাহেবের কী যে কান্না। আমরা সবাই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি। তবে আবার শক্ত হয়েছি। দেশটাকেতো স্বাধীন করতে হবে।



স্বাধীনতা যুদ্ধে কেরামতি দেখাতে পারলেও জীবন গল্পের কেরমাতিতে খেই হারিয়েছেন বারবার। আসলে জীবন খুব সহজ। মানুষ জীবনকে জটিল করে তোলে। কারণ মানুষের মতো করে জীবন চলতে পারে না। জীবন জীবনের মতো করে চলে বাধাহীন। রাজধানী শহরে একমাত্র ছেলে রায়হান চাকুরি করে। পরিবার নিয়ে স্যাটেল হয়েছে। তিন বছর হয় গ্রামে আসেনি। সময় স্বার্থ মানুষকে পাথর করে। ভুলে যায় মায়া। দায়িত্ব ও কর্তব্য। অতীত স্মৃতি।



কেরামত উল্লাহ অপেক্ষা করে। রুস্তমের দোকানে শুধু শুধু বসে গল্প করা নয়। একটা উদ্দেশ্য মনে ডানা ঝাপটায়। কেউ জানে না। কাউকে বুঝাতেও পারে না। সবাই জানে মুক্তিযোদ্ধা কেরামত উল্লার ছেলে মস্তবড় অফিসার। সময় সুযোগ পেলেই বিদেশে চলে যায়। এলাকায় আসার সুযোগ পায় না। মানুষের এমন ধারণাতেই স্বস্তি খুঁজে কেরামত। সন্তানের মুখ দেখার যে অপেক্ষা তা কাউকে বুঝতে দেয় না। শুধু রুস্তমের দোকানের সামনে দিয়ে শো শো শব্দে চলে যাওয়া যানগুলোর দিকে নজর রাখে। কোন্ গাড়িটা দোকানের সামনে এসে গতি থামায়। গত তিন বছর প্রত্যাশার গাড়িটি থামে না। শেষ যেদিন ছেলে বাড়ি এসেছিলো রুস্তমের দোকানেই পেয়েছিলো কেরামতকে। দোকানের সামনে বাবাকে জড়িয়ে ধরে কি যে আনন্দ চিৎকার। কাজে ফেরার সময় বলে গিয়েছিলো, অফিসের কাজের খুব চাপ। এরপর আসতে হয়তো অনেক সময় লাগবে। চিন্তা করবে না। মাকে বললো, বউ খোঁজ করো। এসে বিয়ে করবো। সেই চলে যাওয়া, আর ফিরেনি ছেলে রায়হান। অথচ ছেলে কখন ফিরবে দিনের পর দিন বছরের পর পছর সে অপেক্ষায় থাকে কেরামত।



তিন একরের বাড়ি। সাজানো ঘোছানো বাগান। দেশীয় কোনো ফল গাছ বাদ যায়নি। আছে সব। তবুও কোথাও যেন আলো নেই। বাড়ির আয় দিয়েই চলে কেরামতের সংসার। অবশ্য মুক্তিযোদ্ধা ভাতা কিছুটা সঞ্চয় করলেও বাকী টাকা গরিবের মাঝে বিলিয়ে দেন। মেয়ের বিয়েতে খরচ করতে হবে তাই অপচয় করেন না। যদিও প্রয়োজনের খরচ উদার হাতেই করেন।



কেরামত উল্লার একমাত্র মেয়ে তানিয়া পড়ালেখা করছে। খুব দুর্বল। পড়ালেখা মাথায় ঢুকতে চায় না। তিনবার পরীক্ষা দিয়ে রেপাটে মেট্রিক পাস করেছে তানিয়া। তারপরে পড়ালেখা বন্ধ। দেখতে কোমলমতি হওয়ায় ফুফাতো ভাই জমির উল্লা তাকে পছন্দ করে। তানিয়াও যে জমির উল্লাকে পছন্দ করতো না তা কিন্তু নয়। সম্পর্ক কতদূর গড়িয়েছে পরিবার জানে না। তবে দুজনের মেলামেশায় দু পরিবারের তরফ থেকে কোনো আপত্তিও আসে না। বরং দুই পরিবারের মধ্যে কথাবার্তা চূড়ান্ত করে রাখা হয়েছে। একবার এক অনুষ্ঠানে কেরামত উল্লাহ ছোটবোন শায়লা বেগমকে বলেন, তোর ছেলের সাথে আমার মেয়েটাকে বেশ মানাবে। তাই না?



-হুম। তাইতো মনে হচ্ছে মিঞাভাই। আমিতো সাহসের জন্যে কথাটা আপনারে কইতে পারি নাই।



-তাহলে চল, জমিরের পড়ালেখা শেষ হলে শুভকাজ সম্পন্ন করে ফেলি।



-ঠিক আছে।



পড়ায় অমনোযোগী মেয়েকে বোনের ছেলের হাতে তুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত কেরামত উল্লাকে স্বস্তি দেয়। তারপরেও মাঝে মাঝেই চিন্তায় ভেঙে পড়েন। একটা চাকুরি দিতে পারলে মেয়ের জীবনটা আরো সুন্দর হবে। ছেলেকে নিয়ে এখন চিন্তা হয় না। সেতো ভালো আছে। ভালো থাকুক বলে লম্বা একটা দম নেয় কেরামত। এ নিঃশ্বাসে পাহাড়সম অপেক্ষার কষ্ট।



একটা সরকারি অফিসে সহকারী হিসেবে তানিয়ার সরকারি চাকুরি হয়। চাকুরির কয়েক মাসের মধ্যেই সহকর্মীকে বিয়ে করে তানিয়া। বাবা মাকে না জানিয়ে। দুই ছেলে মেয়ে পছন্দসই বিয়ে করেছে। গ্রামের মানুষ জানে না। মাঝে মাঝে কেরামত উল্লাকে মানুষ প্রশ্ন করে। কী মিঞাভাই, ছেলে মেয়েকে বিয়ে দিবেন না?



কেরামত অপমান আর লজ্জামাখা কণ্ঠে উত্তর দিয়ে বলেন, আরে আজকাল বিয়ে দিতে হয় না। নিজের ইচ্ছে মতো করে। এখন আর বিয়ে করতে বাবা-মায়ের দোয়া লাগে না! এমনিতেই বিয়ে করে সংসার শুরু করে দেয়। ওসব নিয়ে কোনো আগ্রহ নাই। ছেলে মেয়ে সুখে থাক, পৃথিবীর সকল বাপমায়ের এটাই চাওয়া।



মানুষ কেরামত উল্লার মুখে এমন এমন কথা শুনে দ্বিতীয়বার কিছু বলার দুঃসাহস করে না। অথচ ছেলের বিষয়ে কোনো বিড়ম্বনায় পড়তে না হলেও মেয়ের বিয়ের বিষয়ে বোনের কাছে কী জবাব দিবেন। এমন খবর শুনে ভাগিনা জমির দুঃখ পেলেও কখনো প্রকাশ করেনি। অবশ্য এরপরে আর মামার বাড়ি আসেনি সে।



দিনদিন কেরামত উল্লাহ একা হতে থাকেন। মানুষের কাছ থেকে নিজেকে আড়াল করতে থাকেন। বিষণ্নতা তাকে আগলে ধরে। আত্মসম্মানের ভয়ে নিজেকে খোলসবন্দি করে ফেলেন। এখন চেষ্টা করেও যুদ্ধগল্প সম্পূর্ণ মনে করতে পারে না। কোনো মতে দিন কাটছিলো স্ত্রী কিসমতি বেগমকে নিয়ে। নিরানন্দ আর নির্ভেজাল দুজনের সংসার চলছে। কিসমতি বেগমের বয়স পঞ্চাশের উপরে হলেও বুঝা যায় না। শরীরের বান বলে ত্রিশ-বত্রিশ বছরের যুবতি।



বিয়ের তিন মাসের মাথায় স্বামীসহ তানিয়া মিষ্টি নিয়ে হঠাৎ বাবার বাড়ি উপস্থিত। স্বামীসহ ছুটির দিনগুলো এ বাড়িতেই কাটাবে। এ নিয়ে প্রতিবেশিরা কিছু না বললেও কানাঘুষা কম করে না। কেরামত উল্লা বিব্রত হয়। লজ্জা হয়, মেনে যায়। সন্তান যত বড় অপরাধই করুক মায়েরা মেনে নেয়ার মতো বড় মন বুকে ধারণ করেন। কিসমতি বেগম মেয়ের আগমনকে স্বাভাবিক ভাবেই নেন। কিন্তু কেরামত উল্লা মেয়েকে মেনে নেয়া না নেয়ার বিষয়ে দ্বন্দ্বে রয়েছেন। স্ত্রী কিসমতি



বেগমের মাধ্যমে কেরামত জানতে পারেন তানিয়া মা হবে। খুশিতে আটখানা কেরামত। যদিও মুখে তা প্রকাশ পায় না। মাঝবয়সে সব বাবাই নাতি নাতনির স্পর্শ পেতে উদগ্রীব হয়ে থাকেন। হোক ছেলে সন্তান কিংবা মেয়ে। তবে মেয়ে সন্তানের প্রতি দরদ বেশি থাকে এমন কথা সমাজে প্রচলিত রয়েছে। ছেলের সন্তান আদর-সোহাগ কড়ায়-গ-ায় পুষিয়ে নিবে কন্যার সন্তানকে দিয়ে। খুশিতে কেরামত যেন টইটুম্বর। মুখ ভর্তি হাসি নিয়ে রস্তমের দোকানে গেলে শূন্য দৃষ্টি যায় পিচ ঢালা সড়কে। গাড়ির গতির পানে। যদি একমাত্র ছেলে বাড়ি এসে হাজির হয়। কিন্তু আসে না। কবে আসবে তাও জানে না। সবশেষ কবে কথা হয়েছে তাও মনে পড়ছে না। দীর্ঘদিন মোবাইল বন্ধ থাকায় যোগাযোগ করাও সম্ভব হচ্ছে না। মনের পায়চারি থামিয়ে বাড়ি এসে মেয়ের সন্তানের কথা ভাবে। নাতি হবে, না নাতিন? মনে মনে নাম ঠিক করে। ছেলে হলে কানের কাছে আযান দেবে। আর মেয়ে হলে প্রথম কোলে তুলবে।



তানিয়া সন্তান সম্ভবা। বাসায় একজন কাজের বুয়া প্রয়োজন। অল্প হলেও কাপড়চোপড় ধোয়া, রান্না-বান্না। আবার অফিস ডিউটি। সবমিলয়ে ত্রাহি অবস্থা। এ সময়ে একজন কাজের লোক না হলেই নয়। এ নিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়েও মানুষ পাওয়া গেলো না। আজকাল অতিদরিদ্রদের লাজ সরম মনে হয় কমে গেছে। ভিক্ষাবৃত্তি করবে, কাজ করবে না। কাজের বুয়া এক বিশেষ শ্রেণীর প্রাণী। কিছুদিন বাদে তাদের মুখ চিড়িয়াখানায় দর্শন করতে হবে। বিভিন্ন লোকের মাধ্যমে কাজের লোক খোঁজে ব্যর্থ হন তানিয়ার স্বামী। এদিকে দিনদিন তানিয়ার শরীর ভারী হচ্ছে। কাজ করা আরো কঠিন হয়ে পড়ছে।



ছেলে-মেয়ের চিন্তায় অসুস্থ হয়ে পড়েন কেরামত উল্লা। হার্টে সমস্যা, প্রেসার, ডায়বেটিসসহ বিভিন্ন রোগ শরীরে বাসা বেঁধেছে। নিয়মিত ওষুধ না খেলে অসুস্থ হয়ে পড়েন কেরামত। আজেবাজে চিন্তায় শরীরটাকে বেশি খারাপ বানিয়েছে অভিযোগ স্ত্রী কিসমতি বেগমের। ওষুধ খাওয়ানোর সময় কানের কাছে এমন প্যানর প্যানর প্যান করতেই থাকে। রান্না বান্না আর স্বামীর সেবা-শুশ্রষা নিয়েই থাকেন কিসমতি বেগম। মেজাজী মানুষটা কত নীরব হয়েছে গেল কয়েক বছর ধরে। সবশেষ গেলো মাসে ঘনিষ্ট বন্ধু রহমান সাহেব মারা যাওয়ার পর মানসিকভাবে আরো বেশী ভেঙে পড়েন। অথচ এই মানুষটাই কত তেজি ছিলেন। মানুষ বয়সের কাছে অনেক সখ আহ্লাদ ইচ্ছে সমর্পণ করে। যেমনিক করেছেন কেরামত।



অপরদিকে কাজের বুয়া না পেয়ে হতাশ হয়ে তানিয়া স্বামীর সাথে পরামর্শ করে। তানিয়া বলে কী করা যায়?



_মাকে বাসায় নিয়ে আসলে কেমন হয়? বাসায়তো একজন কাজের বুয়া প্রয়োজন। মা চলে আসলেতো আর বসে থাকবে না। টুকটাক কাজতো করবেই। মেয়ের শরীরের আরাম পেতে একটু কষ্টতো করবেই। বাইরের লোকের চেয়ে ঘরের লোক থাকলে চুরির টেনশন করতে হবে না। মা কি আসবে? জানতে চায় স্বামী।



তানিয়া খুব কনফিডেন্টলি বলে, আসবে না কেন? অবশ্যই আসবে। দেখবে আমি মাকে বললে মা কখনো কথা ফেলবে না। চলো কাল বাড়ি যাই। বাবাকে বুঝিয়ে মাকে সাথে নিয়ে আসি।



_তবে মাকে কিছু বলার প্রয়োজন নেই। বুয়া দুষ্প্রাপ্ততা প্রকাশ না করাই আমাদের জন্যে শ্রেয়। বরং বলবে, অনেকেই আসতে চায়। বিশ্বাস করতে পারি না। বুয়ারা চাল চুরি, তেল চুরি, লবণ চুরি করে। বিভিন্ন সমস্যা বলে দুদিন পরপর কাজে আসে না।



_তাহলে চলো আগামী বৃহস্পতিবার বাড়ি যাই। একরাত থেকে মাকে বুঝিয়ে সাথে করে নিয়ে আসি।



-ঠিক আছে।



বাবাকে বুঝিয়ে মাকে দু দিন বেড়ানোর জন্যে নিয়ে আসে তানিয়া। শহরে ফ্ল্যাট বাসা। একদিন দুই দিন করে সপ্তাহ চলে যায়। কিসমতি বেগম কেরামতের কাছে ফিরে না। কেরামতও অভিমান করে খবর নেয় না। মেয়েও আসে না। ছেলেও আসে না। নিজের ওষুধ নিজেই খায়। রান্নাবান্নাও যতটুকু সম্ভব কেরামত নিজেই করে। অসুস্থ শরীরে সব সময় রান্না করা হয়ে উঠে না। অবশ্য কেরামতের দুঃখ দেখে কয়েকদিন রুস্তম বাসা থেকে খাবার পাঠিয়েছে। খাবার-দাবারে একটু সমস্যা ছাড়া ভালো কাটছে সময় দাবি করে কেরামত। বলে ছেলে মস্ত বড় অফিসার। মেয়েটার বাচ্চা হবে । মা কাছে না থাকলে কেমন হয়? আমি বুড়ো মানুষ, আমাকে নিয়ে অযথা কারো চিন্তার দরকার আছে? নাই। আমার দিনতো এমনিতেই চলে যায়। এই দোকানে আসি, গল্প করি, চা সিগারেট খাই। সবতো ঠিকঠাকই আছে।



কেরামত বিশ্বাস করে, বুড়োদের দুঃখ করতে নেই। তিনি এখন অচীন পথের যাত্রী। যে পথের শেষ নেই। যে গন্তব্যে পেঁৗছুলে আর ফেরা যায় না। যেখানে স্বপ্ন নেই, যেমনি নেই তৃপ্তি-অতৃপ্তি। স্ত্রী সন্তানের মুখ দেখার অপেক্ষা নেই। গত সপ্তাহে এক প্যাকেট নেভি সিগারেট নিয়ে রাত করে ঘরে ফিরে কেরামত। এরপর আর দোকানে যায়নি। রুস্তম মনে মনে ভাবে, কেরামত চাচা মনে হয় ছেলে বা মেয়ের কাছে গেছেন। না হলে তো সাত-আট দিন দোকানে আসবে না, তা তো হয় না।



রুস্তম দুপুরে বাড়ি যাবার সময় কেরামত উল্লার বাড়িতে যায়। তিন একর বাড়ির উত্তর মাথায় ঘর। দোকান থেকে যেতে যেতে প্রায় দশ মিনিট সময় লাগে। রুস্তম বিভিন্ন ভাবনায় কেরামতের আঙিনায় হাজির হয়। ঘরের দরজায় তালা নেই। তাইলে তো মনে হয় ঘরের ভেতরেই আছে কেরামত চাচা, ভাবে রুস্তম।



গলা খ্যাক দিয়ে রুস্তম বলে, কেরামত চাচা ঘুমান নাহি? বেড়াইয়া বাড়ি আইলেন কবে? দোকানে আইসাতো একটু ঘুরান দিবার পারতেন। কোনো সাড়া শব্দ নেই। জানালার ফাঁক দিয়ে দেখেন ঘরের মেঝেতে ঘুমিয়ে আছেন কেরামত। ভেতর থেকে কেমন ভ্যাপসা গন্ধ বেরুচ্ছে।



রুস্তম কণ্ঠস্বর বড় করে ডাকে। ও চাচা। চাচা। ও চাচা। কেরমাত আলীর ঘুম ভাঙে না। সোয়া থেকে উঠে না। উঠতে পারে না। শরীরের নূ্যনতম চেষ্টাটুকুও নেই। রুস্তম গ্রামের অন্য লোকজন খবর দেয়। লোকজন পুলিশ খবর দেয়। পুলিশ এসে দরজা ভাঙে। দরজা খোলার শক্তি অনেক আগেই হারিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা কেরামত উল্লা।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৬৪৩৫৭৬
পুরোন সংখ্যা