চাঁদপুর, সোমবার ৩ জুন ২০১৯, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ২৮ রমজান ১৪৪০
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫০-সূরা কাফ্


৪৫ আয়াত, ৩ রুকু, মক্কী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


২৮। ইহাতে উহাদের সম্পর্কে তাহার মনে ভীতির সঞ্চার হইল। উহারা বলিল, 'ভীত হইও না।' অতঃপর উহারা তাহাকে এক জ্ঞানী পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিল।


২৭। তখন তাহার স্ত্রী চিৎকার করিতে করিতে সম্মুখে আসিল এবং গাল চাপড়াইয়া বলিল, 'এই বৃদ্ধা-বন্ধ্যার সন্তান হইবে?'


 


 


assets/data_files/web

একজন ভাগ্যবান ব্যক্তি সাদা কাকের মতোই দুর্লভ। -জুভেনাল।


 


 


ধর্মার্থে প্রাণ উৎসর্গকারী শহীদের রক্ত অপেক্ষা বিদ্বান ব্যক্তির কলমের কালি অধিক পবিত্র।।


 


 


ফটো গ্যালারি
ঈদের খুশি বাজলো প্রাণে
পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
০৩ জুন, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


যার যার আচরণ তার তার পরিণাম। এ কথা যেমন ব্যক্তিজীবনে সত্য তেমনি লোকোত্তর জীবনেও সত্য। অন্য লোকেরা হাজার চেষ্টা করেও ব্যক্তির লোকোত্তর পরিণাম পাল্টাতে পারে না। এজন্যেই ধর্ম যার যার। কিন্তু সেই ধর্মাচরণের উপলক্ষে যে উৎসব তার আনন্দ সবার। ঈদ একটি বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব। এর ধর্মীয় অংশটা ছাপিয়ে সামাজিক উৎসবের আমেজটাই বড় হয়ে ওঠে। ঈদের খুশি তাই সবার। রোজা পনেরটা পার হতে না হতেই ঈদ আনন্দের আমেজ শুরু হয়ে যায়। এই যে আগমনীর আনন্দ তা বিস্তৃত হতে হতে সমাজের প্রতিটি অংশকে স্পর্শ করে করে যায়। বস্ত্রব্যবসায়ী হতে শুরু করে রেডিমেইড গার্মেন্টস্, জুতোর দোকান, দর্জি, পরিবহন ব্যবসায়ী, মুদির দোকানদার, কাঁচাবাজার, মনিহারী দোকানী, বিউটি পার্লার ইত্যাদি প্রতিটি স্থানে ঈদ আসে বাণিজ্যের পশরা নিয়ে। আগেকার দিনে কার্ডের দোকানে, ছবি তোলার স্টুডিওতে এবং প্রেক্ষাগৃহে ঈদের আনন্দের হুলস্থুল লেগে যেতো। কিন্তু আজকাল এই তিনটি স্থানে কালের বিবর্তনে জটলা কমে গেছে। ছবি তোলার স্টুডিও তো চলেই গেলো। কার্ডেরও তেমন প্রচলন নেই। রাজধানী ছাড়া প্রেক্ষাগৃহগুলোও সাংবাৎসরিক দর্শকের অভাবে একে একে বন্ধ হয়ে গিয়ে তাতে গড়ে উঠছে বহুতল অত্যাধুনিক শপিং মল। ঈদের এই আনন্দ কালের গতিধারায় বিস্তৃত হয়েছে সংবাদপত্রগুলোর ঈদের সাময়িকী বা ঈদ সংখ্যায়। আগের চেয়ে প্রিন্ট বা অনলাইন মিডিয়াতে ঈদের আনন্দ বেড়ে গেছে অনেক। যদিও এইসব সাময়িকী বা ঈদ সংখ্যার মান যাই হোক পাঠক নিয়ে অনেকেই সন্দিহান। ইলেকট্রনিক মিডিয়া সাতদিনব্যাপী ঈদের অনুষ্ঠানমালা তৈরি করলেও দর্শক হাতে রিমোট নিয়ে টুকরো টুকরো অনুষ্ঠান উপভোগে ব্যস্ত থাকে। অর্থাৎ চ্যানেল আর অনুষ্ঠানের সমারোহে দর্শক অনুষ্ঠান উপভোগে খাবি খায়। আসলে সমারোহ যদি বেশি হয় তবে বেছে নিতে কষ্ট হয় উপযুক্ত অনুষ্ঠানটি।



বাংলাদেশে বারশ পাঁচ সালে মুসলিম শাসন কায়েম হলেও আটশ সালের দিকে তুর্কি বণিকদের আগমনের কারণে এদেশে ওইসময়ই প্রথম ঈদ উদ্যাপিত হয়। এরপর মোগল আমলে ঈদের আনন্দ পূর্ণভাবে আসে এ বাংলায়। ঊনিশশো সাতচলি্লশের পূর্বে পূর্ববঙ্গে ঈদের নামাজ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন, অনেকেই ধূতি কাছা মেরেও ঈদের জামাতে এসেছেন এবং কাতারে দাঁড়িয়ে কাছা খুলে আবার কাতারে দাঁড়িয়ে কাছা বেঁধেছেন। তবে ওইসময় গ্রামবাংলার কৃষকদের দারিদ্র্য ছিলো বিধায় তাদেরকে ঈদের খুশি ছুঁয়ে যেতে পারতো না সেরকম ভাবে। ঊনিশশো একাত্তরের যুদ্ধকালীন সময়ে ঈদ এসেছে নভেম্বরের কুড়ি তারিখ, অগ্রহায়ণ মাসে। নভেম্বরের কুড়ি তারিখ ঈদে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করা হয় স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে। প্রচারিত অনুষ্ঠানমালার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিলো ও আলোড়ন তুলেছিলো 'চাঁদ তুমি ফিরে যাও.../দেখো মানুষের খুনে খুনে রক্তিম বাংলা/রূপসী অাঁচল কোথায় রাখবো বলো?' শীর্ষক অমর এই গানটি। ঈদের খুশির চাঁদকে ফিরে যেতে বলার মতো বেদনাদায়ক ঘটনা-একাত্তরের আগে এবং পরে শুধু বাঙালি মুসলমানদের জন্যে নয়, মুসলিম বিশ্বের আর কোথাও ঘটেনি। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাঙালির জন্যে একাত্তরের ঈদ কতটা দুঃখের ছিলো_এই গানের মাধ্যমে তা খুবই জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠে সে সময়। গানটির মানবিক আবেদন এতো তীব্র ছিলো যে, শুধু মুক্তিযোদ্ধাই নয়, সাধারণ মানুষও ঈদের দিন এই গান শুনে কেঁদে বুক ভাসিয়েছে। গানের আরও দুটো লাইন ছিলো এমন,



'ওরে বাংলার মুসলিম তোরা কাঁদ



এনেছে এজিদ বাংলার বুকে মোহাররমের চাঁদ।'



 



দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু কারাগারে অন্তরীণ থাকাকালীন বেশ কয়েকটি ঈদ এসেছে তাঁর জীবনে। ঊনিশশো সাতষট্টি সালে দুটো ঈদই তিনি কারাগারে কাটিয়েছিলেন। তাঁর অনিচ্ছা সত্ত্বেও জেলার সাহেব তাঁকে ঈদের নামাজে নিয়ে যান। ঈদের আগের দিন বেগম মুজিব তাঁর সাথে কারাগারে দেখা করতে এলে তিনি জানতে পারেন, তাঁর ছেলে-মেয়েরা সেবার ঈদের জামা-কাপড় কিনে নাই। তিনি কারাগারে তাই কারও মনে ঈদের আমেজ নাই। বঙ্গবন্ধু তাঁর ডায়রিতে লিখে রাখেন, যেদিন বাঙালি এই অন্যায়-জুলুম হতে মুক্তি পাবে সেদিনই বাঙালি ঈদের প্রকৃত আনন্দ উপভোগ করতে পারবে।



 



ঈদকে কবিতায় যথার্থভাবে ধারণ করেছেন কবিরা। কবি কায়কোবাদ, কাজী নজরুল ইসলাম, গোলাম মোস্তফার কবিতা পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেছে।



কবি কায়কোবাদ ঈদকে মিলনের উৎসব হিসেবে দেখে বলেছেন :



'আজি এ ঈদের দিনে হয়ে সব এক মনপ্রাণ,



জাগায়ে মোসলেম যাবে গেয়ে আজি মিলনের গান।'



ঈদের খুশি মানুষে মানুষে বিলিয়ে দিয়ে কবি নজরুল ইসলাম লিখেছেন :



'পথে পথে আজ হাঁকিব, বন্ধু,



ঈদ মুবারক! আসসালাম।



ঠোঁটে ঠোঁটে আজ বিলাব শিরনী ফুল-কালাম।



বিলিয়ে দেওয়ার আজিকে ঈদ।'



 



কবি গোলাম মোস্তফার আনন্দ ঝরে পড়েছে ঈদের নতুন চাঁদ দেখায়। তিনি ডাক দিয়ে সবাইকে বলছেন,



'আজ নূতন ঈদের চাঁদ উঠেছে



নীল আকাশের গায়।



তোরা দেখবি কারা ভাই-বোনেরা



আয়রে ছুটে আয়।'



 



ঈদকে নিয়ে 'শাওয়ালের চাঁদ' কবিতায় শান্তি বর্ষণের আহ্বান জানিয়েছেন।



'রমজানের চাঁদ' শিরোনামে কবিতায় ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ঈদকে ঈদরাণী বলে অভিহিত করেছেন। চলি্লশ দশকের মুসলিম জাগরণের কবি ফররুখ আহমদ 'আকাশের বাঁক ঘুরে চাঁদ এলো ছবির মতন' বলে খুশিতে উদ্বেল হয়ে উঠেছেন।



'ঈদের কবিতা'তে কবি ফররুখ আহমদ আরো বলেছেন :



'আজ ঈদগাহে নেমেছে নতুন দিন,



চিত্তের ধনে সকলে বিত্তবান,



বড় ছোট নাই, ভেদাভেদ নাই কোন;



সকলে সমান-সকলেই মহীয়ান।'



কবির এ উচ্চারণে ঈদের আনন্দে সাম্যের কথাকে তুলে ধরেছেন চমৎকারভাবে।



 



ঈদের প্রকৃত তত্ত্ব তুলে ধরেছেন সাম্যের কবি কাজী নজরুল তাঁর 'ঈদ মোবারক' কবিতার মাধ্যমে। তিনি বলেছেন :



'শত জনমের কত মরুভূমি পারায়ে গো



কত বালুচরে কত অাঁখিধারা ঝরায়ে গো



বরষের পরে আসিলে ঈদ!



.........................................



ঈদ-অল-ফিতর আনিয়াছে তাই নববিধান



ওগো সঞ্চয়ী উদ্বৃত্ত যা করগো দান



ক্ষুধার অন্ন হোক তোমার।



ভোগের পেয়ালা উপচায়ে পড়ে তব হাতে,



তৃষ্ণাতুরের হিসসা আছে ও-পেয়ালাতে,



দিয়া ভোগ কর বীর দেদার।'



 



আজকের ঈদ যতোটা না খুশির তার চেয়ে অধিক বাণিজ্যের পশরার। অন্তত এই বাংলাদেশে। পণ্যমূল্য বাড়িয়ে ঈদের নামে মেতে ওঠে ব্যবসাযজ্ঞে। এক টাকার জিনিস কুড়ি টাকায় বিক্রি করে সারা বছরের মুনাফা তুলে নিচ্ছে দোকানি ও ব্যবসায়ী। টিভি সিরিয়ালের প্রতি এদেশের মানুষের আকর্ষণকে পুঁজি করে বিভিন্ন নায়ক-নায়িকার নামে চলছে পোশাকের রমরমা বাণিজ্য। এতে প্রতারিত হচ্ছে সাধারণ ক্রেতা। তবুও ঈদের খুশি তাদের লেগেছে প্রাণে। আজ-কালকার ঈদে নতুন আনন্দের অনুষঙ্গ যুক্ত হয়েছে, ঈদের সেলফিবাজি। যার যেমন মোবাইল ফোন আছে সে তা দিয়েই সেলফি উৎসবে মেতে ওঠে। কখনো একক, কখনো দলবেঁধে।



 



ঈদের খুশি মূলত নাড়ির টানে। ঈদের খুশি মায়ের প্রাণে। শেকড়ের টানে ছুটির আমেজ নিয়ে সবাই ফিরে যায় গাঁয়ে। এখানেই পোঁতা আছে শৈশবের আনন্দ-বেদনার হীরের খনি। ঈদ তাই ফিরে পাওয়ার আনন্দও বটে। যে শৈশব হারিয়ে গেছে, যে দিনগুলো লুকিয়ে গেছে গ্রামের মেঠোপথে, ঈদের ছুটিতে নাড়ির টানে সেই হারিয়ে যাওয়া আনন্দ ফিরে আসে নতুন হয়ে। ঈদের খুশি এভাবেই প্রাণে আনে দোলা, মনকে করে স্মৃতিভারাতুর।



 



 



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৮৮৫৩৭২
পুরোন সংখ্যা