চাঁদপুর, সোমবার ৮ জুলাই ২০১৯, ২৪ আষাঢ় ১৪২৬, ৪ জলিকদ ১৪৪০
jibon dip
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫২-সূরা তূর


৪৯ আয়াত, ২ রুকু, মক্কী


৪৭। ইহা ছাড়া আরও শাস্তি রহিয়াছে যালিমদের জন্য। কিন্তু উহাদের অধিকাংশই তাহা জানে না।


৪৮। ধৈর্য ধারণ কর তোমার প্রতিপালকের নির্দেশের অপেক্ষায়; তুমি আমার চক্ষুর সামনেই রহিয়াছো তুমি তোমার প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর যখন তুমি শয্যা ত্যাগ কর,


৪৯। এবং তাহার পবিত্রতা ঘোষণা কর রাত্রিকালে ও তারকার অস্তগমনের পর।


 


 


assets/data_files/web

মনের যাতনা দেহের যাতনার চেয়ে বেশি। -উইলিয়াম হ্যাজলিট।


 


পবিত্রতা ঈমানের এক অঙ্গ।


 


 


 


ফটো গ্যালারি
প্রতিবাদী কবি কণ্ঠ ফাদওয়া তুকান
আব্দুর রাজ্জাক
০৮ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


কবি কণ্ঠ যুগে যুগে নির্যাতিত, নিপীড়িত, শোষিত এবং বাস্তুহারা মানুষের অধিকার আদায়ে সোচ্চার রয়েছে। তেমনি ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী গণমানুষের আস্থার স্থল প্রতিবাদী কবি কণ্ঠ ফাদওয়া তুকান। ইসরায়েলী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদের ভাষা তীব্র বেগে আরব বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এবং মুক্তিকামী মানুষের নজর কাড়ে। ফিলিস্তিনের নিপীড়িত মানুষের পক্ষে তথা বিশ্বব্যাপী পরাধীন ও অধিকার বঞ্চিত মানুষের কাছে তিনি ছিলেন এক সুপরিচিত মুখ। কবি ফিলিস্তিনের ন্যাবুলস নামক স্থানে ১ মার্চ ১৯১৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মস্থানকে ব্রিটিশ মেন্ডেট অব প্যালেস্টাইনও বলা হয়। এ মেন্ডেট ছিল প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের পর উসমানীয় সাম্রাজের দক্ষিণ সিরিয়ার অংশ থেকে আলাদা করা। এটি ছিল ব্রিটিশ পরিচালিত একটি ভৌগোলিক অঞ্চল। ১৯২০ সাল থেকে ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বেসামরিক প্রশাসন ফিলিস্তিন নামক অঞ্চলটি শাসন করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুর্কি উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনের পর প্যালেস্টাইন বা ফিলিস্তিনসহ বেশিরভাগ আরব এলাকা চলে যায় এ ব্রিটিশ মেন্ডেটে। ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার জেমস বালফোর ইহুদীবাদীদেরকে লেখা এক পত্রে ফিলিস্তিন নামক ভূখ-ে একটি ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কবির মাতৃভূমিতে ১৪ মে ১৯৪৮ সালে ৪৫ শতাংশ ভূমি ফিলিস্তিনি বাকি ৫৫ শতাংশ ইহুদীবাদীদের হাতে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এই দখলদারিত্ব শুরু হয় কবির জন্মকালীন সময় থেকেই। তিনি যখন বুঝতে শিখেছেন তখন নিজ চোখে দেখা এই অন্যায় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কবি প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন এবং তাঁর দেশের জনগণকে পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্ত হওয়ার আহবান জানান। জন্মের পর কবি তেরো বছর পর্যন্ত স্কুলে গিয়েছিলেন। এর পর অসুস্থতার জন্যে তিনি স্কুল ছাড়তে বাধ্য হন। তাঁর বড় ভাই ইব্রাহীম তুকান ছিলেন জর্ডানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী। কবির শিক্ষার দায়দায়িত্ব ভাই ইব্রাহীম তুকান গ্রহণ করেন। তাঁর পড়াশোনার জন্যে অনেক বই সংগ্রহ করে দেন। ইংরেজি ভাষায় তুকানকে দক্ষ করে করে গড়ে তুলেন এবং পাশ্চাত্যের সাহিত্যের সাথে তাঁর ভাই পরিচয় করিয়ে দেন। এ সুবাধে কবি অঙ্ফোর্ডে উপস্থিত হয়ে ইংরেজি সাহিত্য অধ্যয়ন করেন। তাঁর জ্ঞানের ভা-ার আরো সমৃদ্ধ হতে থাকে। বৈশি্বক পরিসরে তাঁর মননশীলতা শাণিত হয়। মাতৃভূমির প্রতি প্রগাঢ় মমত্ববোধ এবং দেশপ্রেম তাঁর কাব্য সাধনায় অগ্রাধিকার পায়। মাতৃভূমির প্রতি প্রেম এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা তাঁর কবিতার উপলক্ষ হয়ে ওঠে। সচ্ছল পরিবারে জন্মগ্রহণ করায় তিনি ন্যাবলুসের জনগণের জন্যে অনেক সেবামূলক কাজ করেন। পাশাপাশি মাতৃভূমির দখলদারদের প্রতি ঘৃণা ও ক্ষোভ তাঁর মনে বেদনার জন্ম দেয়। প্রিয় মাতৃভূমির এই ক্লান্তিকাল যেনো তাঁর জীবনব্যাপী। সেই ১৯১৭ সালে তাঁর জন্ম এবং তাঁর মাতৃভূমি ১৯২০ সাল থেকে ইসরায়েলী দখলদারিত্বের আগ্রাসনে নিমজ্জিত হয়। কবি ছিলেন এ সকল ঘটনার জীবন্ত সাক্ষী। তিনি অভিবাসী ইহুদীদের নিজ মাতৃভূমিতে আসতে দেখেছেন। 'হাগানাহ' নামক সন্ত্রাসীর সংঘবদ্ধ হামলায় ফিলিস্তিনিদের ঘর-বাড়ি, ক্ষেত-খামার দখল করে এবং তাদের নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত করে। হাট-বাজারসহ ভিন্ন স্থানে বোমা ফাটিয়ে মানুষ হত্যা করে। এসব হত্যাকা- কবিকে প্রচ-ভাবে ব্যথিত করে। তাই একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক হিসেবে কবিতার ছন্দে ছন্দে তিনি প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠেন এবং ইসরায়েলী দখলকৃত ভূখ-ে মানুষের চরম দুর্ভোগ সারা বিশ্বব্যাপী জানিয়ে দিতে সক্ষম হন। ফিলিস্তিনি মানুষের দুঃখ-কষ্ট বর্ণনায় তিনি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন। ১৯৬৭ সালে ইসরায়েল, মিশর, জর্ডান এবং সিরিয়ার মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধকে জনযুদ্ধ বলা হয়। এ যুদ্ধকে আবার আরব ইসরায়েলী যুদ্ধও বলা হয়। যুদ্ধ সংঘটিত হলে সিনাই উপদ্বীপে ইসরায়েলী সীমান্তে মিশরের সেনা সমাবেশের পর ১৯৬৭ সালের ৫ জুন মিশরীয় বিমান ক্ষেত্রে ইসরায়েলী বাহিনীর অতর্কিত হামলার মাধ্যমে এ যুদ্ধ শুরু হয় এবং ইসরায়েলী বাহিনী ফিলিস্তিনি মানুষের উপর বর্বর আক্রমণের মাত্রাও বাড়িয়ে দেয়। এ অনাকাঙ্ক্ষিত যুদ্ধ ও অমানবিক হামলা কবি হৃদয়কে ভীষণভাবে দগ্ধ করে তোলে। স্বদেশের প্রতি প্রগাঢ় টান এবং মমতাবোধ থেকে কবির বিদ্রোহী উচ্চারণ, 'আমার প্রিয় জন্মভূমি/ স্বৈরতন্ত্রের এই জঙ্গলে/ যতই ওরা জাঁতায় পিষুক তোমাকে/ অবর্ণনীয় যন্ত্রণায় আর দুঃখে/ কখনই সফল হবে না তারা।/ দখলদার ও স্বৈরশাসকের প্রতি কবির কঠোর হুঁশিয়ারি ফিলিস্তিনিদের হৃদয়ে সংগ্রামের অনুপ্রেরণা এবং প্রতিরোধী হতে সাহস সঞ্চার করেছে। তুকানের কবিতা ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষের মুক্তি-সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়েছে। তাঁর কবিতায় দেশপ্রেমের গভীর নিদর্শন বিধৃত হয়েছে এভাবে, 'তোমার চোখগুলো উপড়ে ফেলতে/ অথবা তোমার আশা আর স্বপ্নগুলো মেরে ফেলতে/ অথবা তোমার জেগে ওঠার ইচ্ছাকে ক্রুশবিদ্ধ করতে/ অথবা আমাদের সন্তানদের মুখ থেকে/ হাসি কেড়ে নিতে/ অথবা ধ্বংস ও অগি্নসংযোগ করতে/ কেননা আমাদের গভীর সব কষ্ট থেকেই/ আমারে ঝরানো রক্তের শীতলতা থেকেই/ জীবন আর মৃত্যুর স্পন্দন থেকেই/ তোমার ভেতরে প্রাণ আবার নতুনভাবে জন্মাবে'।/ ফিলিস্তিনের মানুষের আশা এবং স্বপ্নগুলোকে দখলদার বাহিনী কেড়ে নিয়েছে। শিশুদের বেড়ে ওঠায় তারা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং তাদের মুখের হাসিটুকু মস্নান করেছে। কবি তাঁর কাব্যে মানুষের মাঝে দেশপ্রেমের চেতনা ব্যাপৃত করে দিয়েছেন। মানুষের হৃদয়ে স্বাধীনতার স্বাদ রোপণ করেছেন। মুক্তিকামী মানুষকে এ বলে আশা জাগিয়েছেন, 'আমাদের গভীর সব কষ্ট থেকেই/ আমাদের ঝরানো রক্তের শীতলতা থেকেই/ জীবন আর মৃত্যুর স্পন্দন থেকেই/ তোমার ভেতরে প্রাণ আবার নতুনভাবে জন্মাবে'।/ কবি ফাদওয়া তুকান দৃঢ় বিশ্বাস আর ইস্পাতসম মনোবল নিয়ে ইসরায়েলী দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তুকানের এই বজ্রকণ্ঠের ঢেউ ফিলিস্তিনে এবং আরব বিশ্ব অতিক্রম করে ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর পরাধীন দেশের মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে। তাঁর সাহিত্য চর্চা মূলত নিপীড়িত মানুষের জন্যে। তাই আরব বিশ্বে তাঁর বই ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তিনি 'ওয়াহদী মায়াল আইয়্যাম' নামক গ্রন্থে পুরুষতান্ত্রিক আরবে নারীদের বিভিন্ন দুর্ভোগের চিত্র সুচারুরূপে তুলে ধরেন। ফাদওয়া তুকানের বেশ ক'টি বই বিশ্বের বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তাঁর মহান সৃজনশীল কর্মসমূহ, 'আমার ভাই ইব্রাহীম (১৯৪৬)', 'যুগের সাথে একাকী (১৯৫২)', 'আমি তাকে পেয়েছি (১৯৫৭)', 'আমাদেরকে ভালোবাসা দাও (১৯৬৭)', 'রাত্রি ও অশ্বারোহী (১৯৬৯), 'শেষ সুর (২০০০)', 'তুকান ফাদওয়া : আত্মজীবনী'। ২০০৩ সালের ১২ ডিসেম্বর আল-আকসায় ইন্তিফাদা তুঙ্গে থাকাকালে এ মহান দেশপ্রেমিক কবির প্রতিবাদী কণ্ঠ চিরতরে স্তিমিত হয়ে যায়। সেদিন তাঁর নিজ শহর ছিল অবরুদ্ধ। মৃত্যুর পর তুকান ফিলিস্তিনের মানুষের কাছে মুক্তির প্রতীক এবং আরব সাহিত্যে অন্যতম প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্বে পরিগণিত হয়।



লেখক : আবদুর রাজ্জাক, কবি ও প্রাবন্ধিক।



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৬৭৬১৪৬
পুরোন সংখ্যা