চাঁদপুর, সোমবার ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২৫ ভাদ্র ১৪২৬, ৯ মহররম ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫৫-সূরা রাহ্মান


৭৮ আয়াত, ৩ রুকু, মাদানী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


৬৬। উভয় উদ্যানে আছে উচ্ছলিত দুই প্রস্রবণ।


৬৭। সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন্ অনুগ্রহ অস্বীকার করিবে?


৬৮। সেথায় রহিয়াছে ফলমূল -খর্জুর ও আনার।


 


 


 


assets/data_files/web

বাণিজ্যই হলো বিভিন্ন জাতির সাম্য সংস্থাপক। -গ্লাডস্টোন।


 


 


যখন কোনো দলের ইমামতি কর, তখন তাদের নামাজকে সহজ কর।


 


 


 


ফটো গ্যালারি
জয় বাংলার হাসি
পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
০৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


বিয়ের আসরে তেমন কেউ নেই। খুবই সাদামাটা বিয়ে। কোনো বরযাত্রী নেই। কোনো খাদ্য-পানীয়ের সমাহার নেই। বাজেনি কোনো সানাই কিংবা কোনো নহবত। বিয়ের বাজারও করেনি কেউ। তবুও বিয়েটা হতেই হলো। অথচ বিয়েটা এত তাড়াতাড়ি হওয়ার ছিল না। বর আর কেউ নয়, শাশ্বত। শাশ্বত হচ্ছে সেই ছেলেটা যে শ্বাতীদের ক্লাসে সবচেয়ে সাহসী ছিল। তারা দুজনেই এমএ ক্লাসের শিক্ষার্থী ছিলো। দুজনেই বাংলার। অবশ্য বাংলায় পড়লেও শাশ্বত লিখতে পারতো না। সে কেবল মিছিল-মিটিং নিয়েই থাকতো। যেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ও পা দিয়েছে সেদিন থেকেই সে মিছিলে শ্লোগান দেয়। তার গলার বেইজ অনেক শক্ত। সে শ্লোগান ধরলে পেছনেও সবাই শুনতে পেতো। মিছিলে কণ্ঠ দিয়েই শাশ্বত শ্বাতীর নজর কেড়েছে। একবার সেই যে কাড়লো তা আর দ্বিতীয় কেউ কেড়ে নিতে পারেনি। শাশ্বত এরপর থেকে কীভাবে যে শ্বাতীর হয়ে উঠলো বলা মুশকিল। ক্যাম্পাস বা লাইব্রেরী, ক্যান্টিন বা চত্বর সবখানেই শাশ্বত-শ্বাতী জুটি বেঁধে হাঁটতো, শুধু মিছিলের সময়টুকুন বাদে। বন্ধুরা তাদের যে কত খেতাব দিয়েছে! লাইলী-মজনু, শিরি-ফরহাদ কত কী! শ্বাতীর লেখার হাত ভালো। ইতোমধ্যেই ডিপার্টমেন্টের ম্যাগাজিনে তার দুটো কবিতাও ছাপা হয়ে গেছে। শাশ্বত না লিখলেও কবিতার সমঝদার ছিল। অবশ্য বাংলায় পড়ুয়া অনেকেই লিখতে পারে না। শাশ্বত তাই তা নিয়ে চিন্তা করে না। সে ভেবেছিল এমএ-টা দ্রুত শেষ করে গ্রামের কলেজে পড়াবে। কিন্তু তার সে আশায় গুড়েবালি। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেছে অনির্দিষ্টকালের জন্যে। তাই যে যার গ্রামে বা ডেরায় ফিরে গেছে।



গ্রামে ফিরে এসে সময় কাটে না শাশ্বতের। শুধু শ্বাতীর কথা মনে পড়ে। শ্বাতীও তার গ্রামে গিয়ে যেন খাঁচায় বন্দী। খুব একটা ঘর থেকে বের হয় না। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে ঢাকায়। এখনো ছড়িয়ে পড়েনি সারা দেশে। শ্বাতীর বাবার একটা ট্রানজিস্টর আছে। তাতে খুব লো ভলিউমে খবর শোনেন তিনি। বাঙালিরা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে। মুক্তিবাহিনী গঠন হয়ে গেছে। রেডিওতে খবর শুনেই শ্বাতীর বুকে কাঁপন ধরে গেছে। শাশ্বত কি তবে যুদ্ধে গেছে? আর কি দেখা হবে না তার সাথে? পাশাপাশি গ্রাম। খুব বেশি দূর নয়। শ্বাতীর আর মন টেকে না। বড় অস্থির হয়ে গেছে সে। নিশ্চয়ই শাশ্বত যুদ্ধে চলে গেছে। শ্বাতী ঘুমুতে যায়। ঘুম আসে না। রাতে সে ঘুম ভেঙ্গে উঠে যায়। পায়চারি করতে থাকে। গ্রামের যুবকেরা পাহারা-চৌকি বসিয়েছে। সবাই পালা করে টহল দেয়। শ্বাতীর মনে সকালের প্রহর ফোটার অপেক্ষা।



শাশ্বত অস্থির। উঠোনে হাঁটে আর ধোঁয়া ছাড়ে। সিদ্ধান্তটা সে নিয়েই ফেলেছে। যুদ্ধে যাওয়ার আর দেরি করলে চলবে না। একে একে গ্রামের যুবকরা সবাই যুদ্ধে গেছে। তাকে তো যেতেই হবে। আরো আগেই যেতো। কেবল শ্বাতীর সাথে দেখা না করে কেমনে যাবে এই ভাবতে ভাবতেই তার দেরী হয়ে গেল। আর নয়। অনেক হয়েছে। কপালে থাকলে যুদ্ধ জয় করে এসে আবার দেখা হবে। বন্ধুদের সাথে তার কথাও পাকা হয়ে গেছে। তারা প্রথমে আগরতলা যাবে আখাউড়া হয়ে। তারপর মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং ক্যাম্পে নাম লেখাবে। তাদের দলটা দশজনের। সবাই দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। শাশ্বতই কেবল একটু সময় নিতে চেয়েছিল মনে মনে। কিন্তু না। আর দেরি নয়। আগামীকাল রাতেই সীমান্ত পার হবে সে। সিদ্ধান্তটা নিতে পেরে নিজেকে হাল্কা লাগছে শাশ্বত'র। একগ্লাস পানি ঢক ঢক করে খেয়ে সে ঘুমোতে গেল নিশ্চিন্তে। তার গ্রামে আজ অন্যদের টহল। যে দায়িত্ব পায় সে খুব আন্তরিকতা দিয়ে টহল দেয়। টহলদারের দায়িত্ব হলো কোনো রাজাকার আসছে কি না কিংবা কোনো আর্মি আসলো কি না তা দেখে সবাইকে সজাগ করে তোলা।



সকালের আলো ফুটে গেছে। সূর্য উঠেছে রাঙা করে চারদিক। শ্বাতী তার মাকে বলে রওনা দিলো ছোটভাইকে নিয়ে শাশ্বতদের গ্রামে। শাশ্বতদের গ্রামের নাম পদ্মপুর আর শ্বাতীদের গাঁয়ের নাম সোনাঝুরি। শ্বাতীর কথা শাশ্বতদের বাড়িতে সবাই জানে। শাশ্বত'র কথা কেবল শ্বাতীর মা জানে। মা-ই শ্বাতীর সবচেয়ে বড় বন্ধু। পথ হেঁটে ঘণ্টা দুয়েক পরে শ্বাতী পেঁৗছে গেল শাশ্বতদের বাড়ি। তাকে দেখে শাশ্বত'র মা খুব খুশি হয়ে গেল। শাশ্বত'র মাকে সালাম করতেই তিনি চিবুকে আদর করে জড়িয়ে ধরলেন তাকে। তারপর বলে উঠলেন, এতদিন পরে এলি মা। কীভাবে তুই এলি? সাবধান সাবধান। চল ঘরে ঢোক। ঘরে ঢুকেই কথায় কথায় জানতে পারে, আজ রাতেই শাশ্বত যুদ্ধে যাবে। ভাগ্য ভালো তুই এসেছিস। যা ওর ঘরে যা। ঘুমুচ্ছে। এই বলে শাশ্বত'র মা অপরাজিতা শ্বাতীকে ছেলের ঘরে পাঠিয়ে দেন। দরজা ভেজিয়ে রাখা শাশ্বতের ঘরে ঢুকেই শ্বাতীর হাসি পেয়ে যায়। শাশ্বতকে আদর করে 'শ্বাস' নামেই ডাকে শ্বাতী। তার ঘুমোবার ঢং দেখে শ্বাতীর হাসি পায়। যেন আস্ত এক কোলা ব্যাঙ।



নাকে সুড়সুড়ি দিয়ে সে তাকে জাগিয়ে তুললো ঘুম হতে।



ঘুম হতে চোখ খুলেই শ্বাতীকে দেখে শাশ্বত'র চক্ষু চড়কগাছ। ধড়ফড় করে জেগে উঠলো শাশ্বত। জমে উঠল এতোদিনের না বলতে পারা কথাকাব্য। এর মধ্যে নাশতা আসে। শ্বাতীর ছোটভাই শাশ্বত'র ছোটবোনের সমবয়সী। তারা নিজেরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজেদের মতো গল্পে। শাশ্বত শ্বাতীকে জানায় তার যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা। শ্বাতী বাধা দেয় না। বরং আরো উৎসাহ দেয়। তুমি না গেলে আর কে যুদ্ধে যাবে। তবে যাওয়ার আগে কাজটা সেরে যাও। বলে ওঠে শ্বাতী। কোন্ কাজ? জিজ্ঞেস করে শাশ্বত। আরে আমাদের বিয়ে! শ্বাতী আহ্লাদ মেখে জবাব দেয়। বিয়ে! পাগল নাকি? মানুষ মরছে পুড়ে অঙ্গার হয়ে আর তুমি বলছ বিয়ে! দেশের এখন বিয়ে দরকার নেই, দেশের দরকার বীরের। দেশ আমার, চেয়ে আছে আমাদের পথ। অনেক অশ্রু ঝরেছে। আর না। পরাধীন দেশের রক্তস্রোতে ভেসে বিয়ের মতো বিশ্বাসঘাতকতা আমি করতে পারবো না। আরে! তোমাকে বিশ্বাসঘাতকতা করতে বলছে কে। তুমি শুধু বিয়ে করে আমাকে বেঁধে রেখে যাও বন্ধনে। আমি বীরের বউ হতে চাই। আমি চাই সময়ের সাহসী সন্তানের প্রেরণা হতে। তোমার পথ চেয়ে আমি অাঁধার সময়কে জয় করার শক্তি চাই শাশ্বত। তাদের কথা শুনে শাশ্বত'র মা এসে ঢোকে ঘরে। তিনি ভণিতা ছাড়াই বলতে শুরু করলেন, হ্যাঁ বাবা, তুই যুদ্ধে যা, তবে যাওয়ার আগে শ্বাতী মাকে আমার হাতে তুলে দিয়ে যা। তার মুখের দিকে চেয়ে আমি তোর চেহারাটা ভাববো বাবা। শাশ্বত আর কথা আগাতে পারে না। শুধু বলে, বেশ, তবে তাই হোক। কিন্তু বিয়ের আর কোনো আচার-অনুষ্ঠান এখন হবে না। আমি এসব আচার অনুষ্ঠান দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে করতে চাই। আমি চাই আমার সন্তান স্বাধীন দেশেই জন্মাক এবং বড় হোক। মা এবং শ্বাতী সমস্বরে জবাব দেয়, বেশ তাই হবে।



দ্রুত শ্বাতীদের বাড়িতে লোক পাঠানো হলো। শ্বাতীর বাবা খবর পেয়ে আর দ্বিমত করলেন না। একে তো যুদ্ধের সময়, তার ওপর শ্বাতী আবার অরক্ষণীয়া। হারামির বাচ্চা রাজাকার আর হানাদার আর্মিরা এদেশের মা-বোনকে নিয়ে যা করছে বলে খবর আসছে তাতে প্রতি মিনিটে আতঙ্ক জাগে মনে। শ্বাতীর বাবা-মা এসে পড়লেন তড়িঘড়ি করে। আসার সময় শ্বাতীর মা দুটো স্বর্ণের বালা, একজোড়া কানের দুল, একটা হার যা তার নিজের ছিলো তাই সাথে করে নিয়ে আসলো। শ্বাতীর বাবা মেয়ের বিয়ের জন্যে শখ করে আগেই একটা বেনারসি কিনে রেখেছিলেন। তিনি তাই-ই নিয়ে আসলেন। শাশ্বত'র বাবা পুকুরে জাল ফেলে কিছু রুই পেলেন আর তার মা মুরগীর আড়ালের ভিতর ঢুকে পালিত মুরগী চারটে ধরে জবাই করালেন। ব্যস্! দুপুরে কাজী ডেকে দুটো ভালোমন্দ খাইয়েই বিয়েটা হয়ে গেলো। লোক বলতে তারা দুই পরিবার আর গ্রামের দু'চারজন আত্মীয়। সব মিলে মোট জনা বিশেক। তাড়াতাড়ি খেয়েই সবাই চলে গেল যে যার ঘরে। বিকেল হতে না হতেই বিয়ে বাড়ি নিঝঝুম। আর ঘণ্টা দুয়েক পরে শাশ্বতরা বের হয়ে পড়বে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে। রাত আটটায় মোটামুটি গ্রামে অাঁধারের মেলা বসে। তখন আর পথে-ঘাটে টর্চ বা হারিকেনের আলো ছাড়া কিছুই দেখা যায় না। শাশ্বত ছোট একটা ব্যাগে গুছিয়ে নেয় টুকটাক জিনিসপত্র। একটা ডায়েরি, দুটো কলম, ছোট একটা মাথা ব্যথার বাম, একটা বেস্নড, একটা গামছা, একটা লুঙ্গি এরকম জরুরি জিনিস। পুরানো অ্যালবাম ঘেঁটে পরিবারের একটা ছবি মানিব্যাগে রাখে। ক্রমশঃ প্রতীক্ষায় থেকে সময় ঘনিয়ে আসে। অপরাহ্নের বিয়ের আসরের পর হতে শাশ্বত এবং শ্বাতী আর কথা বলেনি। শ্বাতী তার শাশুড়ির সাথে রান্নাঘরে অকারণ ব্যস্ত আর শাশ্বত তার বাবার সাথে সেরে নিচ্ছে জরুরি কথাবার্তা। কিছুক্ষণ পর সবাই বসে একসাথে রাতের খাওয়া শুরু করল। আজকের খাওয়াটা একটু তাড়াতাড়িই হলো। অন্যদিন রাত নয়টা-দশটা করে খায়। শাশ্বত'র বাবা একটা পান মুখে পুরলেন। শাশ্বত'র মা অাঁচলের খুঁটে চোখ মোছেন। আর শ্বাতী নির্বিকার বাইরে। ভেতরে কালবোশেখী। মনে মনে ভাবছে, কেন যে এ'সাহসটা সে আরো আগে দেখাতে পারেনি। অন্তত আরো দুটো দিন কাছে পেতো। যুদ্ধে তো সে শাশ্বতকে পাঠাতোই। মনে মনে কথার মালা গাঁথার ফাঁকে শাশ্বত'র বন্ধুরা এসে পড়লো। তবে কেউ ঘরে ঢুকলো না। ঘরে ঢুকলেই মায়া বেড়ে যাবে। যার যার ঘরে মাকে-বাবাকে, বউকে-সন্তানকে বুঝিয়ে আসতে কষ্ট হয়েছে। শাশ্বত দেরি করে না। মা-বাবার দোয়া নিয়ে শ্বাতীকে আসি বলেই বেরিয়ে পড়ে। তারা কেউ আর ঘরের বের হয় না। এমনিতেই সবদিকে রাজাকারের দল ওঁৎ পেতে আছে। বের হলে বুঝে ফেলবে। কেবল জানালার শিক ধরে যে যার মতো চেয়ে আছে। অাঁধারের গর্ভ চিরে তাদের টর্চের আলোর বিন্দুগুলো মনে হচ্ছে মহাকাশের তারকা পুঞ্জের মতো। শ্বাতীর মনে নির্মিত হতে থাকে একের পর এক অমর কবিতার পংক্তি।



যুদ্ধের প্রতিটি দিন নবজন্ম লাভের দিন। প্রতিটা ভোর নতুন জীবনের স্মারক। ভোরের আলো না ফোটার আগে কেউ বুঝতে পারত না আদৌ আরো একটা দিন বেঁচে থাকবে কি না। একদিকে পশ্চিমা পাক হানাদার বাহিনীর গুলি-বেয়নেট আর আগুনের ত্রাস আর অন্যদিকে রাজাকারদের দৌরাত্ম্যে জীবন যেমন বিপন্ন তেমনি খাদ্য সংকটও প্রবল। ভাতের জায়গা নিয়েছে আটার রুটি। দুই বেলার স্থলে খাবার হয়েছে একবেলা। এভাবেই দিনগুলো চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। এই আতঙ্ক আর অভাবের মাঝে একটুকরো সুখ এনে দিতো স্বাধীন বাংলা বেতারের জাগরণী গান আর চরমপত্র। যখনই শত্রুসেনা ঘায়েল হওয়ার খবর আসতো তখনই অন্যদের মতো শ্বাতীর চোখও জ্বলে উঠতো রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মতো দৃপ্ত প্রভায়। শ্বাতী তখন যেন হয়ে উঠতো বাঘিনী। হারিকেনের আলোয় শ্বাতীর মুখে ফুটে উঠতো হিংস্রতা, জয়ের জন্যে হিংস্রতা। শাশ্বত যুদ্ধে যাওয়ার মাস দুয়েক পরে খবর পেয়েছিলো, তারা এক নম্বর সেক্টরের অধীনে যুদ্ধ করছে। এরপর অনেকদিন হয়ে গেলো আর কোন খবর পায়নি তাদের। এই গ্রামে ক্রমশ রাজাকারের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। তাদের শরীরী ভাষা সহ্য করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন। গ্রামে এখন আর যুদ্ধে যাওয়ার মতো তরুণ বা যুবক নেই। যারা আছে তারা নেহায়েৎ কিশোর এবং ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ।



অক্টোবরের প্রায় শেষ। কিছুদিন পরেই শুরু হবে অঘ্রাণ। হায়রে অঘ্রাণ! কী সুন্দর সোনার ধান থাকতো মাঠজুড়ে অঘ্রাণে। আর এখন মাঠজুড়ে বিরাণভূমি যেন। হানাদারদের পোড়ামাটি নীতির কারণে সোনার বাংলা পুড়ে শ্মশান হয়ে গেছে। হঠাৎ গ্রামে সকাল থেকেই চাউর হয়ে গেল, আর্মিরা নাকি প্রাইমারী স্কুলে ক্যাম্প করেছে। দুপুরের পর যে কোনো সময়ে তারা হামলা করবে গ্রামে। শাশ্বত'র মা শ্বাতীকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ছেলের আমানত। খুব যত্নে সে আগলে রেখেছে। কিন্তু আর্মি আসলে সে এই বৌকে কীভাবে রক্ষা করবে! চিন্তায় চিন্তায় তার ঘাম ছুটে গেছে। তালি দেয়া পুরানো শাড়ি পরিয়ে তাকে কালিঝুলি মাখিয়ে রাখলো। পাশের বাড়ির এক বছরের বাচ্চাটাকে তার কোলে তুলে দিল শাশ্বত'র মা। পই পই করে বলে দিল, এই বাচ্চাটাকে যেন সে কোল থেকে না ছাড়ে। আর্মি জিজ্ঞেস করলে যেন তার বাচ্চা বলে। স্বামী কই জিজ্ঞেস করলে যেন বলে শহরে কাজে গেছে। দুই-চারবার দোয়া-দরূদ পড়ে ফুঁ দিলো বউমার গায়ে। যদি রক্ষা করে খোদায়। কিন্তু কপালে যার দুর্গতি তারে ঠেকায় কে? বিকেলের দিকে আর্মি এলো। তারা সংখ্যায় পাঁচজন। কিন্তু এদেশী রাজাকার আছে জনা দশেক। সবার হাতে অস্ত্র। এমনকি রাজাকারদের হাতেও দেশী আগ্নেয়াস্ত্র এবং ধারাল কিরিচ। মেজরকে নিয়ে মইত্যা রাজাকার ঢুকল তাদের ঘরে। মেজর উর্দুতে জিজ্ঞেস করে, আপ মুসলমান হ্যায়? তোতলাতে তোতলাতে শাশ্বত'র বাবা জবাব দেয়, জ্বী হুজুর, জরুর। তখন মেজর আবার জিজ্ঞেস করে, আপকি বেটা মুক্তি কাঁহা? শাশ্বতের বাবা বলতে থাকে, মেরি বেটা শহর মে গ্যায়া। লেকিন্ ও মুক্তি বিলকূল নেহি হ্যায়। সাথে থাকা রাজাকার শামসু বলে উঠে, স্যার, ইয়ে লোগ ঝুট বলতা হ্যায়। ইসকি বেটা জরুর মুক্তি হ্যায়। এর মধ্যে রাজাকার শামসু'র চ্যালা দেইল্যা রাজাকার ঘরের ভিতর গিয়ে শ্বাতীকে টেনে নিয়ে আসে। শ্বাতীর দিকে চোখ যেতেই ক্রমশ মুড বদলাতে থাকে মেজরের। শাশ্বতের বাবার গায়ে বেয়নেট দিয়ে খোঁচায়। তারপর পিঠমোড়া দিয়ে বেঁধে রাখে উঠোনের আম গাছের সাথে। আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে যত বই-পুস্তক। এই নিরীহ বইদের প্রতি তার মায়া অসম্ভব। নিজে না খেয়ে ঐ টাকা দিয়ে বই কিনেছেন গ্রামের মানুষের জন্য শাশ্বতের বাবা। মইত্যা রাজাকার বইয়ের উপরে আরো পেট্রোল ছিটায়। এই বইকেই তাদের ভয়। বাঙালি বই পড়ে অনেক কিছুই জেনে গেছে। একে একে আশেপাশের বাড়িগুলো থেকে সবকটা তরুণী মেয়েকে বের করে জড়ো করে উঠোনে রাজাকাররা। গ্রামকে সর্বস্বান্ত করে মেয়েদেরকে বলির পাঁঠার মতো গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে যায় পাকিস্তানী আর্মিরা। সেই দিন হতে শ্বাতীর আর খোঁজ পাওয়া যায় না।



যুদ্ধ এখন শেষ হয়ে গেছে। মিত্রবাহিনীর তৎপরতায় মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বে বাংলাদেশ নয় মাসেই স্বাধীন হয়ে গেছে। সবাই একে একে ঘরে ফেরে। শুধু ঘরে আসে না শাশ্বত, আসে না শ্বাতী। সেদিন যে মেয়েদের ধরে নিয়ে গিয়েছিলো ক্যাম্পে তাদের সবাই নির্যাতিতা, বীরাঙ্গনা। কেউ ঘরে ফিরেছে, কেউ নিখোঁজ। কেউ বা পাগল হয়ে গেছে। আর কেউ আত্মহত্যা করে লজ্জা মিটিয়েছে। শ্বাতীকে পাওয়া যায়নি কোথাও। পুত্রের পথ চেয়ে শাশ্বত'র মা অধীর হয়ে থাকে। প্রতীক্ষায় থাকে একদিন খোকা ঠিকই আসবে ফিরে। কিন্তু মা তো আর জানে না, তার ছেলে দারুণ লড়াই করে হানাদারদের ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। যেদিন তার হাতে অপারেশনের নেতৃত্ব সঁপেছিল কমান্ডার, সেদিন শাশ্বত ছিলো যেন বিশ্বজয়ী বীর। তাকে ঠেকানো যাচ্ছিল না। অপারেশন সফল করে ফেরার পথে পেছন থেকে গুলি লাগে শত্রুসেনার। এভাবে কেউ কাপুরুষোচিত গুলি ছুঁড়তে পারে জানা ছিল না। গুলিটা তার পিঠে লেগে বুক দিয়ে বের হয়ে যায়। বার বার মা আর শ্বাতীর নাম জপতে জপতে ছেলেটা ঢলে পড়লো বীরোচিত শেষ শয়ানে। তার মৃতদেহ নিয়ে সহযোদ্ধারা কত যে কেঁদেছে! যথাযোগ্য মর্যাদায় স্যালুট দিয়েই তারা সমাহিত করে শাশ্বতকে। তার জানাজার নামাজে ইমামতি করেন কমান্ডার নিজে। যার অধীনে শাশ্বত লড়াই করে তার কাছে শাশ্বত'র ঠিকানা ছিলো না। তাই যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলেও তার শহীদ হওয়ার খবর পরিবার পায়নি।



দেশ স্বাধীন হয়েছে আজ পঁচিশ বছর। শ্বাতী এখন স্কুলের মাস্টার। শহরে মেয়েদের একটা স্কুলে সে পড়ায়। এখানে কেউ তাকে চিনে না। তার ছেলেটা সাথে থাকে। বিয়েশাদী আর করেনি শ্বাতী। জাতির কাছে শ্বাতীরা এখন বীরাঙ্গনা। অবশ্য যে এলাকায় শ্বাতী থাকে সেখানে কেউই এ তথ্য জানে না। আজ দীর্ঘ পঁচিশ বছর পরে শ্বাতীর সেই ভয়াল রাতের কথা মনে পড়ে যায়। ক্যাম্পে ধরে নেওয়া প্রতিটা মেয়েকে উলঙ্গ করে তারা সেদিন হেসেছে লোভাতুর হায়েনার হাসি। নরম নারীদেহে নখ আর দাঁতের আঘাতে তারা দলবেঁধে ক্ষত-বিক্ষত করে তুলেছে। মেজরের শিকারে পরিণত হওয়ার পর রাজাকারের হাতে আরও একবার নির্যাতিতা হয় শ্বাতী। তারপর জ্ঞানহারা হয়ে পড়ে থাকে ক্যাম্পে। পরদিন গাড়িতে উঠিয়ে তাদের আধামরা করে তারা ছেড়ে দেয় শহরের রাস্তায়। টলতে টলতে কোনমতে একটা হাসপাতালের গেটে গিয়েই সম্বিৎ হারায়। তারপর আর কিছু মনে নেই। যেদিন তার পুরোপুরি জ্ঞান আসে সেদিনই সে জানতে পারে, দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। তার সবকিছু মনে পড়ে যায়। কিন্তু এই অপবিত্র দেহ নিয়ে সে আর কীভাবে ফিরে যাবে? তাই ধীরে ধীরে নিজের অতীতকে চাপা দিয়ে নতুন করে বাঁচতে শুরু করে। হাসপাতালের বুড়ি এক আয়ার মায়ায় সে ঠাঁই পায় তার ঘরে। আয়ারও তার মতো এক মেয়ে ছিল। তারও অবস্থা হয়েছিল শ্বাতীর মতো। মেয়েটা তাদের অত্যাচার সইতে না পেরে রক্তক্ষরণে মারা গেছে। সেই মেয়ের কথা ভেবেই আয়া তাকে নিয়ে আসে বাড়িতে। মাঝে মাঝে নিজেকে শেষ করে দেয়ার কথা ভেবেছিল শ্বাতী। কিন্তু শাশ্বত'র মুখটা মনে পড়ে যাওয়ায় সে নিজেকে নিবৃত করে রেখেছে। বেঁচে থাকলে কোন একদিন যুদ্ধজয়ী বীর শাশ্বতকে সে দেখতে পাবে।



কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক! কিছুদিন থেকেই তার ভয়াবহ বমি আর মাথা ঘোরা রোগ দেখা দিয়েছে। সে বুঝতে পেরেছে নিজেই, তার পেটে শত্রুবংশ এসে পড়েছে। একবার অ্যাটেমপ্ট নিয়েছিলো এমআর করানোর। কিন্তু ততদিনে তার মধ্যে মাতৃত্ব জেগে উঠেছে। মনে একটা কোমল ভাব তৈরি হয়। বাচ্চাটার কী দোষ। তাই সে আর ভ্রূণ নষ্ট করার কথা ভাবে না। এদিকে যতই তার ছেলেটা বড় হচ্ছে ততোই তার চেহারা হয়ে যাচ্ছে রুক্ষ। এই চেহারার সাথে বাঙালি চেহারার মিল নেই কোনো। সে যে শত্রুবংশের রক্তধারা তা বুঝতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। যদিও স্কুল-কলেজে পড়ানোর সময় বাবার নামের স্থলে সে শাশ্বত'র নাম লিখেছে, তবু এটা তার পছন্দ নয়। না পারতে সে এ নাম ব্যবহার করেছে। নচেৎ তার উপায় ছিল না। ভেবেছিল নিজের আদর্শ দিয়ে তাকে মানুষ করবে। কিন্তু তার সবকিছু কেমন যেন আলাদা। ছেলেটা ভাত-মাছের চেয়ে রুটি-মাংস পছন্দ করে বেশি। ক্রিকেট তার পছন্দের খেলা কিন্তু পছন্দের দল পাকিস্তান। এ নিয়ে মা-ছেলের অনেক দ্বন্দ্ব হয়েছে। তবু ছেলে তার পছন্দ পরিবর্তন করেনি। ছেলেটা গত ক'দিন ধরে বিশ্বকাপ ক্রিকেট নিয়ে মেতে উঠেছে। ঘরের ভেতর পাকিস্তানের পতাকা এনে ভরিয়ে ফেলেছে।



আজ দুপুর হতেই সে টিভি সেটের সামনে বসে আছে। আজকের খেলা বাংলাদেশ বনাম পাকিস্তান। পাকিস্তানের জার্সি আর ক্যাপ কিনে এনে সে পরে বসে আছে। পাকিস্তানী ছোট পতাকা হাতে নিয়ে বসে আছে যেন সে মাঠের গ্যালারিতে আছে। এর মধ্যে খেলা শুরু হয়ে গেছে। বাংলাদেশের ব্যাটিং। বাংলাদেশের দুই ওপেনার বেশ ভালো খেলছে। পাকিস্তানী বোলারদের পিটিয়ে প্রথম পনর ওভারে বাংলাদেশ একশ রান পার করে ফেলেছে। শ্বাতী হাতে তালি দিয়ে উঠলো। সাবাশ টাইগার সাবাশ। মায়ের সাবাশ শোনার সাথে সাথেই ছেলে টিভি বন্ধ করে দিয়ে খুব খারাপ একটা গাল দিলো। 'শালা বাঙ্গাল' বলে। শ্বাতী আর এ গাল সহ্য করতে পারলো না। ছেলের গালে কষে চড় লাগালো। চড় খেয়ে ছেলেটা আবারও লাফালাফি শুরু করে দিলো, জিতেগা রে জিতেগা, পাকিস্তান জিতেগা। শ্বাতী রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে রান্নাঘরে দৌড় মারলো। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছেলের গলা বরাবর ধারাল মাংস কাটার ছুরিটা ভরে দিল। নিমিষেই ঘটে গেল ঘটনা। গল গল করে রক্তের বাণ ছুটলো। ছেলেটা হাত-পা ছোঁড়াছুঁড়ি করে জোরে একটা শেষ কম্পন দিয়ে থেমে গেল। শ্বাতী সে রক্ত নিজের গায়ে মেখে খলখল করে হেসে উঠল। বড় প্রাঞ্জল সে হাসি।



শ্বাতী আজ অনেকটাই হাল্কা বোধ করছে। এতোদিন একটা বোঝা বোঝা লাগতো। আজ সে বোঝা মুক্ত হলো। একটু পরেই তাকে রিমান্ডে নেয়া হবে। সে জানে রিমান্ড মানেই অত্যাচার। তবুও তার মুখে হাসি। এ হাসি জয় বাংলার হাসি।



 



 



 



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৩৪৫৪৮৯
পুরোন সংখ্যা