চাঁদপুর, সোমবার ৪ নভেম্বর ২০১৯, ১৯ কার্তিক ১৪২৬, ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫৭-সূরা হাদীদ


২৯ আয়াত, ৪ রুকু, মাদানী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


১৯। যাহারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ঈমান আনে, তাহারাই তাহাদের প্রতিপালকের নিকট সিদ্দীক ও শহীদ। তাহাদের জন্য রহিয়াছে তাহাদের প্রাপ্য পুরস্কার ও জ্যোতি এবং যাহারা কুফরী করিয়াছে ও আমার নিদর্শন অস্বীকার করিয়াছে, উহারাই জাহান্নামের অধিবাসী।


 


 


সভ্যতাই সভ্যলোক তৈরি করে।


-গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড।


 


 


বিদ্যা শিক্ষার্থীগণ বেহেশতের ফেরেশতাগণ কর্তৃক অভিনন্দিত হবেন।


 


ফটো গ্যালারি
জনমানসে সাহিত্য ও সাহিত্যে অশ্লীলতা
পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
০৪ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


সমাজের সকলেই সাহিত্যিক নয়। সাহিত্য সকলের পছন্দের তা-ও নয়। সবাই সাহিত্যপ্রেমী বা কর্মী তা-ও নয়। কিন্তু প্রাত্যহিক জীবনে সমাজ সাহিত্যকে আশ্রয় করে। সে আশ্রয় চেতনে বা অবচেতনে। সমাজের সাধারণ জনগণ তাদের মানসে ঐতিহ্য এবং আধুনিকতাকে প্রজ্ঞায় বা জ্ঞাত হয়ে ধারণ না করলেও অবচেতনে তারা প্রাত্যহিকতায় ধারণ করে। এই ধারণের প্রয়াস ফুটে উঠে তার দৈনিক অণু-অণু কর্মকুশলতায়।



সমাজের প্রাত্যহিক জনমানস নিতান্তই দৈনিক কর্ম সম্ভূত। তার দৈনন্দিন কর্মের অংশবিশেষে সে ধারণ করে অবচেতনের সাহিত্য প্রয়াস। ধর্মের গ্রন্থগুলো সাহিত্যের আওতায় ধরা হয়। এইসব গ্রন্থে নিরেট সত্যকে উদাহরণ যোগে কিংবা সরাসরি প্রকাশের প্রয়াস রয়েছে। মানুষ তার নিত্য কাজে, নিত্য ধর্ম চর্চায় এমন অনেক কিছুই করে যাতে সাহিত্যের প্রয়াস থাকে। পবিত্র গ্রন্থ হতে পাঠ, পবিত্র বাণী হতে পাঠের মাধ্যমে সাহিত্য-প্রয়াস তৈরি হয়। অর্থাৎ ব্যক্তি তার নিজ ভাষায় ধর্মচর্চার স্থলে গ্রন্থের ভাষাকে ভক্তি ও প্রেমের রসে আপ্লুত করে তার নিত্য চর্চা অব্যাহত রাখে।



সোনামণি শিশুর আদরে মা থেকে শুরু করে অপরিচিত ফেরিওয়ালা, পথিক_সবাই সাহিত্যের আশ্রয় নেয়। 'লক্ষ্মীসোনা চাঁদের কণা' বলে আদরের যে প্রয়াস তাতে কিন্তু ছন্দোবদ্ধ ছড়া ও মিলান্ত ছড়ার ধ্বনির প্রকাশ থাকে। খুব বাজখাঁই কিংবা কর্কশভাষী ব্যক্তিও ছোট সোনামণিকে আদর করতে গেলে চাঁদকে মামা ভাবেন, সিংহকে মামা ভাবেন। এভাবেই তারা ছন্দে ছন্দে বলতে থাকেন 'সিংহমামা সিংহমামা করছো তুমি কি' কিংবা 'চাঁদমামা চাঁদমামা টিপ দিয়ে যা।' শিশুকে ঘুম পাড়াতে, ভয় দেখাতে কিংবা আনন্দে দোল দোলাতেও গ্রামের শিক্ষাহীন মায়ের বুকে সাহিত্যের স্রোত বয়। 'সোনামানিক আমার, কলিজার বঁটু' বলে সরলা পল্লী বালা ছড়ার ছন্দে ঘুমপাড়ায় তার নাড়ীছেঁড়া ধনকে। অল্প কাল আগেও মানুষ নিত্য প্রয়োজনে একে অপরকে পত্র লিখার অভ্যাস ছিলো। সেই পত্রেও কেজো কথার বাইরে সাহিত্যের প্রয়াস থাকতো। দু কলম লিখে দেওয়ার প্রবণতায় সাহিত্যের নির্যাস তৈরি হতো। স্ত্রীর পত্রে কিংবা স্বামীর পত্রেও সাংসারিক কথার ফাঁকে দু-চার লাইন সাহিত্য ঝরে পড়তো। এমন করেই জন্ম নেয়-'আমার হৃদয়ের রাণী, তোমার কথা জানিতে মন ক্যামন করে' কিংবা 'কাঁচা হাতে তোমার কাছে লিখছি যখন চিঠি, দূর আকাশের দশটি তারা জ্বলছে মিটি মিটি'_এই ধরনের সাহিত্য-প্রয়াস।



রাস্তাঘাটে একে অন্যের কুশলাদি বর্ণনায় রসের চর্চা থাকে স্বল্প মাত্রায় হলেও। 'ভাই ক্যামন আছেন?'-এই নিরেট কুশলের জবাবে কাউকে কাউকে বলতে শুনি-'থাকার আর কি জোগাড় আছে? কালতো প্রায় প্রাণটাই গেছিলো, অল্পের জন্যে রক্ষা!' এই ধরনের জবাবে আসলে জনমানসের সাহিত্য প্রীতির পরিচয় ফুটে উঠে। মাঠে-ময়দানে, হাটে-বাজারে কথার মধ্যে রসের চর্চা সেই প্রাচীন কাল হতে। 'ডজন খানেক কলা দাও তো ভাই' এই বাক্যেই সাহিত্য প্রয়াস লক্ষণীয়। যেমন লক্ষণীয় ফেরিওয়ালার ফেরিকরা সুর। যারা ফেরি করে তারা যেমন সুরে সুরে বলে, তেমনি ছন্দে ছন্দেও বলে। 'পুরানো দা-ও ধারাই, তালার জং সারাই' বলে যখন তালা-চাবি বা দা-ধারানির লোক হাঁক দেয় তখন মনের মাঝে বেজে উঠে সুরের ধ্বনি। ভ্রাম্যমাণ নাপিত যখন বলে-'চুল কাটা একটাকা, দাড়ি কাটা আট আনা, দুটো এক সাথে একটাকার বেশি না', তখন বোঝাই যায়, তার মানসে সাহিত্য-প্রয়াস আছে বলেই সে সুরে-ছন্দে ফেরি করে আর জন-মানসের অবচেতনে সাহিত্যপ্রীতি আছে বলেই তা' শুনতে কান উৎকর্ণ থাকে।



মানুষ যখন রুগ্ন হয়, রোগে কাতর হয় তখন তার ভাষাশৈলীতে সাহিত্য বেশি করে নান্দনিক হয়ে উঠে। রোগের পূর্ণ বর্ণনার জন্যে রোগী তখন তার ভাষ্যে অলঙ্কার, উপমা এবং বাড়তি অনুষঙ্গ আনয়ন করে। 'জ্বরে গা ফেটে যাচ্ছে' কিংবা 'দশরাত দুচোখের পাতা এক করা যায়নি' এরকম বর্ণনায় রোগকে ফুটিয়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা থাকে। আর এভাবেই তার ভাষায় সাহিত্যের প্রয়াস ভর করে। কোন কোন রোগী তার মাথা ব্যথাকে প্রকাশ করার জন্যে বলতে শোনা যায়, 'ডাক্তার সাহেব, মনে হয় আমার মাথায় কয়েক হাজার পোকা কিলবিল করে।' বাস্তবে মাথায় পোকা থাকে না, কিন্তু তার বেদনাকে পোকার কামড়ের সাথে তুলনা করে সে অন্যজনের নিকট প্রকাশিত করে তুলতে চায় বেদনার স্বরূপ। আবার পেটের ডাককে ডাক্তারের কাছে ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে রোগী মাঝে মাঝে 'গাঙের জোয়ার' অনুভব করেন তার তার তলপেটে। কখনো কখনো চরমপন্থা অবলম্বন করে চিকিৎসককে বুঝিয়ে ব্যক্ত করার জন্যে বলেন, 'স্যার আমার গত চারদিন পায়খানা-প্রস্রাব বন্ধ।' আদতেই কি তাই? ডাক্তার যখন প্রশ্ন করেন, 'একেবারেই কি হয়নি?' এ প্রশ্নের জবাবে রোগী বলেন, 'জ্বী হয়েছে। তবে স্বাভাবিক হয় নি।'



 



প্রেমিক-প্রেমিকা মাত্রই তার নিত্য আলাপে কাব্য করে কথা বলার প্রয়াস পায়। এমনকি দুজনের ছোট ছোট চিঠির মৌচাকে সাহিত্য রস তৈরির সুযোগ তৈরি হয়। যে কথা আটপৌরে লোকে বলে সে কথাই প্রেমিক-প্রেমিকার কাছে রসময় হয়ে উঠে সাহিত্যের স্পর্শ পেয়ে। 'তোমার জন্যে আমি হতে পারি দূর আকাশের তারা' কিংবা 'তুমি আমার হাজার বছর আলোর ঝর্ণাধারা' এ রকম সংলাপে দিনান্তে যা মনে দাগ কাটে তাতো সেই সাহিত্যিক প্রয়াসই।



ব্যক্তিমাত্রই নিত্য কাজে কর্কশ হলেও কোথাও বক্তব্য-বিবৃতিতে কাব্য প্রয়াসের ঘনঘটা থাকে। নিজের বক্তব্যকে কিভাবে হৃদয়গ্রাহী করা যায় সেদিকে চেষ্টা থাকে সবার। আর এই কারণেই তার কথামালায় উঠে আসে সাহিত্যরস। সাহিত্য সবচেয়ে অধিক দৈনিক হয়ে উঠে ঘটনা বর্ণনা কালে। কোন ব্যক্তি যদি কারও কাছে ঘটনার বিবরণ দেন, তবে তাতে সত্যির সাথে কিছু আপন সাহিত্যের মিশ্রণ থাকে। ধীরে ধীরে বলতে থাকে-'চৌধুরী বাড়ির দাওয়াত সে এক এলাহী কারবার। কতো লোক বাটি ভরে ভরে খাওয়া নিয়ে গেলো সংখ্যা নাই। যে রসগোল্লা তারা খাওয়ালো তার স্বাদ আমি এ জীবনে আর পাইনিকো।' এভাবে ঘটনার বর্ণনায় নিজের কথা যোগ করে, নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে বলে যায় ব্যক্তি যাতে শ্রোতার কাছে তার কদর বাড়ে। ব্যাপারটা এমনই, 'লাখে লাখে মরিতেছে কাতারে কাতার, শুমার করিয়া দেখে কয়েক হাজার'।



 



ছোট খোকাটি যখন মামাবাড়ি বেড়িয়ে আসে মাকে ছাড়া এবং মাকে যখন তার ভ্রমণের গল্প বলে তখন তাতে থাকে মাকে বিস্ময়াভিভূত করার প্রয়াস। মা-ও অবাক হবার ভান করে মনে অঢেল খুশি নিয়ে জিজ্ঞেস করে-তোর মামী কী কী খাওয়াল?_খোকা তখন মার কাছে নানা বাড়ির গল্প এমনভাবে বলে যেন মা ঐ বাড়ির মেয়েই নয়।



ঘরে ঘরে ভাইবোনে নিত্য ঝগড়া লাগে না এমন বাড়ি বিরল। যখন বাবা কিংবা মা এই ঝগড়া সুরাহা করে তখন সাহিত্যের রস ঢেলে শুনানি হয় বাদী-বিবাদীতে। ও আমাকে অাঁচড় দিয়ে মাংস খুলে নিয়েছে। সে আমাকে ঘুষি দিয়ে দাঁত নাড়িয়ে দিয়েছে। এভাবে পরিস্থিতিকে কথার অলঙ্কারে মারাত্মক করে তুলতে জনমানসে সাহিত্যের প্রভাব ও প্রয়াস লক্ষ্যণীয় হয়ে উঠে।



সাহিত্য আদতে জীবনেরই অংশ। সাহিত্য মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনাকে ফুটিয়ে তোলে। আর প্রাত্যহিক জনমানস সেই সাহিত্যকে অবচেতনে কিংবা চেতনে দৈনন্দিনে ধারণ করে জীবনকে রস ও রঙ্গে রাঙ্গাতে চেষ্টা করে। এভাবেই জীবন কেবল কেজো কথার নিরেট কিতাব না হয়ে হয়ে উঠে হাসি-আনন্দ ধারার কল্ কল্ স্রোতস্বিনী। জনমানসের প্রাত্যহিকতায় সাহিত্যের প্রয়াস মানুষকে আনন্দের স্রোতস্বিনীতে সঞ্জীবিত হতে উদ্যমী করে তোলে।



 



সাহিত্যে অশ্লীলতা



সভ্যতা মানুষকে যে ক'টি নান্দনিক তত্ত্ব শিক্ষা দিয়েছে শ্লীলতা বিষয়ক জ্ঞান তার অন্যতম। মানুষ ক্ষেত্রবিশেষে দিগম্বর, মানুষ ক্ষেত্রবিশেষে উদুম্বরও বটে। সকল ক্ষেত্রে দিগম্বরতা অশ্লীলতা যেমন নয়, তেমনি সকল ক্ষেত্রে উদুম্বরতাও শ্লীলতার নামান্তর নয়। পোশাকি নগ্নতার মানুষও মনে-মননে পরম শ্লীল হতে পারে। আবার বাহারি পরিপাটি পোশাকের ব্যক্তিও মনে-মননে চরম অশ্লীলতা বহন করে। অর্থাৎ শ্লীলতা বা অশ্লীলতা বিষয়টি যতোটা না ব্যক্তিনির্ভর তার চেয়ে অধিক উদ্দেশ্য নির্ভর। তাই কেবল নগ্নতাই অশ্লীলতা নয়, আবার কেবল পোশাকাচ্ছাদনেই সম্পূর্ণ শ্লীলতা নয়।



 



সাহিত্যে শ্লীলতা-অশ্লীলতার বিষয়টি কিঞ্চিৎ জটিলও বটে। সাদা চোখের অশ্লীলতা হয়তো বা সাহিত্যে কোনো শিল্পমূল্য যোগ করতে পারে। আবার সাহিত্যের অশ্লীলতা কারও কারও নিকট শ্লীলতাতেও পর্যবসিত হতে পারে। সাহিত্যে অশ্লীলতার পরম উদাহরণ 'লেডী চ্যাটার্লিজ লাভার'। দীর্ঘদিন ধরে অশ্লীলতার কারণে বইটি নিষিদ্ধ ছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে তা ছাড়পত্র পায়। শ্লীলতার মাত্রা তাতে ছাড়িয়েছিল বটে। অশ্লীলতা তাতে টইটম্বুর ছিলো ঠিকই। কিন্তু সেই অশ্লীলতার মধ্যেও শিল্প হয়ে ফুটেছিলো অরণ্য-বর্ণনা আর বুনোজীবন। প্রমাণ করা সম্ভব হয়েছিলো যে যৌনতা 'লেডী চ্যাটার্লিজ লাভার' নামক গ্রন্থে জোর করে আসেনি, এসেছে কাহিনীর আপন গতিতে। অশ্লীলতা ছিলো আল মাহমুদের 'জলবেশ্যা' গল্পে। যদিও তারা রূপোপজীবিনী, বেদে। নদীতে নদীতে নৌকা ভিড়িয়ে তাদের জীবনাতিপাত। দিনের বেলায় মাদুলি, কাঁচুলি, শিকড়-বাকড় বিক্রি করাই তাদের ব্যবসা। আর রাত নামলে তারা হয়ে যায় যেনো এক একজন জলেশ্বরী। অতঃপর আদিম ব্যবসায় তারা ব্যস্ত হয়ে উঠে। কথাকারের বর্ণনায় এখানে যৌনতা এলেও তা কেবল সমাজের তথাকথিত উঁচুতলার ভদ্রবেশী বড় লোকদের কামলোলুপতাকে বুঝানোর জন্যে এসেছে। জলবেশ্যারা এখানে নিমিত্ত মাত্র। এখানে তাদের দেহের যতোটা না অংশগ্রহণ থাকে তার চেয়ে বেশি থাকে তাদের দারিদ্র্য পীড়িত জীবনের কষ্ট। তাই তারা পাথরের মতো ঠা-া, শীতল ও নিষ্প্রাণ হয়ে থাকে যখন তাদের দেহ খাবলে ধরে ভদ্রবেশী জান্তব হাতগুলো। এখানে যৌনতা অশ্লীলতার প্রকাশ করে না। বরং শিল্পিত হয়ে ধরা দেয় নিষ্পেষণ আর নিপীড়নের বর্ণনা। তারাশংকর-এর 'কবি' উপন্যাসে আমরা ঝুমুর গানের একটা দলকে পাই যারা দিনের বেলায় ঝুমুর গান করে আর খ্যামটা নাচে, রাত গভীর হলে তারা খদ্দেরদের মানভঞ্জন এবং মনোরঞ্জন করে। লেখক এখানে ঝুমুর গায়িকাদের একজন, বসন্ত তথা বসনের জীবনের করুণচিত্র এঁকেছেন। যৌন চর্চার বর্ণনা এখানে জীবনের চেয়েও অধিক শ্লীল বলে প্রতীয়মান। বসনের জীবনে স্বামী-সংসার-পুত্র-কন্যার আকাঙ্ক্ষা থাকলেও প্রৌঢ়া মাসিদের টানে তারা সেই জীবনের বাইরে আসতে পারে না।



 



অশ্লীলতা এসেছে হুমায়ূন আহমেদের প্রথম উপন্যাস 'নন্দিত নরক'-এ। মধ্যবিত্ত জীবনে লেখক পাশের ঘরে ঘুমন্ত বাবা-মায়ের দাম্পত্য-যুগলের ভাষা কিংবা ধ্বনি শুনতে পান। তার এই বর্ণনা কাহিনীকে অশ্লীল করে তোলে না বরং ঘটনাকে বাস্তবতার নিরিখে শিল্পিত করে তোলে।



 



মহাকাব্য 'মেঘদূত'-এ বিরহী যক্ষ মেঘদূতের নিকট তার বিরহিনী প্রিয়ার দেহের বর্ণনা দিতে গিয়ে শারীরিক বর্ণনা দিয়েছেন খোলামেলা। কিন্তু যক্ষের এই বর্ণনায় যৌনতা কোথাও এতটুকু শ্লীলতা হারায়নি। বরং তার এই বর্ণনা যাত্রাপথের শিল্পরূপের সাথে বিরহিনী যক্ষপ্রিয়ার দেহরূপের অপূর্ব শিল্পমিলন রূপেই পরিস্ফুটিত হয়েছে। মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যেও যৌনতা এসেছে। কিন্তু সেই যৌনতায় ছিল না অশ্লীলতা। সহস্র এক আরব্য রজনীর গল্পে বর্ণিত কাহিনীগুলোতে যৌনতা উঠে এসেছে প্রাধান্য পেয়ে। কিন্তু কোনো যৌনতাই শেষমেষ অশ্লীলতায় রূপায়িত হয়নি। নজরুলের প্রবন্ধ 'তুর্কী মহিলার ঘোমটা খোলা'-এ তুর্কী রমণীদের রূপ-সৌন্দর্য তিনি বর্ণনা করেছেন শিল্প-সুষমা দিয়ে। কিন্তু কোনো বাক্যেই অশ্লীলতা ফুটে উঠেনি। বরং যৌনতা শিল্পের বাণী হয়ে ভাষাময় হয়ে উঠেছে।



 



'বেল পাকিলে কাকের কী' বলে প্রাচীন কবি যে অশ্লীলতার ইঙ্গিত করেছিলেন কালের বিবর্তনে তা' হতে অশ্লীলতা মুছে গিয়ে সময়ের কাছে আজ এক শিল্পিত প্রবাদে পরিণত হয়েছে। বাঁশেতে ঘুণ ধরলেও বাঁশিতে ঘুণ ধরে না বলে দেহতাত্তি্বক গানে যে যৌনতার ইঙ্গিত থাকে তা অশ্লীল না হয়ে অসম্ভব শিল্পঋদ্ধ এক উপলব্ধিতে রূপায়িত হয়। ইমদাদুল হক মিলনের 'ও রাধা ও কৃষ্ণ' উপন্যাসখানিতে যৌনতা এসেছে কিছুটা অশ্লীলতার মাত্রায়। তবুও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় তা এক সময় ইচ্ছাকৃত বলে প্রতীয়মান হয় না বরং কাহিনীর প্রয়োজনে, কাহিনীকে বাস্তব রূপ দেয়ার জন্যেই আনীত হয়েছে বোধ হয়।



 



অশ্লীলতা জোর করে আনীত হয় বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনের গদ্যে। পুরুষকে প্রতিপক্ষ ভাবতে গিয়ে তিনি যৌনতাকে অশ্লীল মাত্রায় উপস্থাপন করেন। পাঠক এখানে যৌনতাকে তথ্য হিসেবে পায় না বরং সুড়সুড়ি হিসেবে মনে করে। তেমনি করে আধুনিক কবিতায় কারণে-অকারণে অনেককেই যৌনতাকে অশ্লীলতার মাত্রায় ফেলে অবলীলায় আনয়ন করতে দেখা যায়। এই কারণে ঐসব আধুনিক কবিতা নামক পদবাচ্যগুলো খুব একটা কালের নিরিখে জয়ী হয়নি। আমরা তার বিপরীতে রফিক আজাদের খিস্তি-খেউড়কে পাই, যা কালের বুকে শিল্প হয়ে বেঁচে আছে। আজ কেউ যদি শোনেন, 'ভাতদে হারামজাদা



নইলে মানচিত্র খাবো।-'



তখন তার কাছে এর চেয়ে শিল্পিত লাইন আর আধুনিক কবিতায় আছে কিনা দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। কিংবা যখন স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার প্রশ্ন এসে যায় তখন কবি বলেন, 'সব শালা কবি হতে চায়।' এখানে একটা গালাগালই বরং পংক্তিটিকে শিল্পের মর্যাদা দিয়েছে।



 



আমরা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়-এর 'পদ্মানদীর মাঝি' উপন্যাসে যৌনতার কিছু চিহ্ন দেখি। উপন্যাসে বর্ণিত জেলেপল্লী ও তার সরল-সহজ, দারিদ্র্য পীড়িত মানুষেরা যে ভাষায় কথা বলে, যে ভাষায় আচার-আচরণ করে তাতে শতকরা নব্বই ভাগই অশ্লীলতার পর্যায়ে পড়ে। কিন্তু কথাশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যখন সেই অশ্লীলতাকে উপন্যাসে তুলে ধরেন তখন তা আর অশ্লীলতা থাকে না, হয়ে উঠে শিল্পের অংশ। কুবের যখন তার পঙ্গু স্ত্রী মালাকে গালাগাল দেয় 'তোর কাম শুধু পোলা বিয়ান' তখন এই গালি অশ্লীল না হয়ে সমাজের নীচু শ্রেণীর মানুষের জীবনযাত্রাকে ফুটিয়ে তোলে শিল্পিত রূপ দিয়ে। পুকুরে স্নানের সময় কুবের যখন মালার বোনকে স্পর্শ করে, আমরা তখন তার মুখে শুনি 'আমারে না মাঝি, কলস ধর মাঝি কলস ধর।' এই সংলাপটিতে শারীরিক গন্ধ মিশানো থাকলেও তা আসলে সমাজের গতর খাটানো, নিম্নস্তরের মানুষের দৈনন্দিন জীবন যাত্রাকে প্রকাশিত করে। মানিকের ছোটগল্পেও অশ্লীলতা বাঙ্ময় হয়েছে। তার 'প্রাগৈতিহাসিক'-এর মধ্যেও অশ্লীলতা শিল্প হয়ে ফুটে উঠেছে।



একালের ঔপন্যাসিক হরিশংকর জলদাসের উপন্যাসেও ফুটে উঠেছে সমাজের নীচুতলার মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যবহৃত অশ্লীলতা। তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, তাঁর শৈশব এ রকম এক আবহে কেটেছে। তাই ঐ জীবনের অশ্লীলতাকে তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খ জানেন। আর এই খুঁটিনাটি বিষয়ই হরিশংকর জলদাসের উপন্যাসে ফুটে উঠেছে শিল্পিত হয়ে। এখানে অযথা গালাগাল দেয়ার জন্যে খিস্তি-খেউড় আনেননি বরং উপন্যাসের প্রয়োজনে তিনি নীচুস্তরে ব্যবহৃত গালাগাল ও তার ধারণাকে তুলে ধরেছেন নান্দনিক শিল্প-সৌকর্যে। ডুয়র্সের চা-বাগানে বড় হওয়া সাহিত্যিক সমরেশ মজুমদারকে আমরা দেখি 'কালপুরুষ' উপন্যাসে অশ্লীলতাকে নাড়াচাড়া করে শিল্প তৈরি করতে। অনিমেষ আর মাধুরীলতার সন্তান অর্ককে আমরা বড় হতে দেখি সোনাগাছির কোনো এক বস্তির কলোনীতে। কলতলায় জলের জন্যে দাঁড়ালেই শোনা যায় অশ্লীল খিস্তি-খেউড় আর রগরগে যৌনতার কথা । কিন্তু লেখক সমরেশ মজুমদার এই অশ্লীলতাকে জোর করে আনেননি, এনেছেন উপন্যাসের চরিত্র চিত্রণের প্রয়োজনে।



 



উপন্যাস-সাহিত্যের চেয়ে আধুনিক কবিতায় আজ অশ্লীলতার অধিক ছড়াছড়ি। আধুনিক পরাবাস্তববাদীরা আজ কবিতার নামে সাহিত্যে আমদানি করে চলেছেন উৎকট যৌনতা আর অশ্লীলতা। এই কবিতা পাঠে মনে হয় চিন্তার ধারাপাতও বোধ হয় শেষ ধাপে পৌঁছেছে। নয়তো আধুনিক কবিরা কেনো সাদামেঘের ভেলাতেও খুঁজে বেড়াবেন কিশোরীর স্তন আর বাতাসের বয়ে চলার মধ্যে শৃঙ্গারের ডাক। এ যেনো এক নষ্ট সময়ের পদ্যে পরিণত হতে চলেছে আজকের অধিকাংশ কবিতা। এরই সর্বশেষ নজির আমরা পাই সদ্য প্রথম আলো পত্রিকার মাধ্যমে ঘোষিত কবিতার বইয়ের পুরস্কারে। কবিতার বইটিতে কারণে-অকারণে, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে অশ্লীলতা ও যৌনতা এবং গালাগাল ভেসে উঠেছে বন্যার মতো। তারপরও তা সেরা বই হওয়াতে এ কথা প্রশ্ন হয়ে দেখা দেয়, তবে কি পরাবাস্তব সাহিত্যের বাঁক বদল হচ্ছে যৌনতার মাধ্যমে আর অশ্লীলতার চর্চায়? অথচ আধুনিক শ্রেষ্ঠ কবি জীবনানন্দ দাশের 'ক্যাম্পে' কবিতায় কেবল ঘাই হরিণীর কথা উল্লেখ করায় তার অধ্যাপনার চাকুরি চলে যায়। কিন্তু পরবর্তীতে তার 'ক্যাম্পে' কবিতাটি একটি উৎকৃষ্ট কবিতারূপে বিবেচিত হয়। এখানে তিনি ঘাই হরিণীর কামাতুর ডাককে অন্য হরিণ ধরার কাজে শিকারীদের ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছিলেন। এই ব্যবহার ছিলো অত্যন্ত শিল্পসম্মত এবং কালোত্তীর্ণ। অথচ আজকের সাহিত্যে অশ্লীলতাকে দেখে মনে হয় নিতান্ত পর্ণোগ্রাফি কিংবা গুহাযুগের আদিমতা।



 



সাহিত্য জীবনের কথা বলে, বাস্তবের কথা বলে। জীবনের সমুদয় বাস্তবতা সাহিত্যে ফুটে উঠে শিল্পিত হয়ে, নান্দনিক হয়ে। শিল্প আর নান্দনিকতার বাইরে যা কিছু আনীত হয় তা অশ্লীলতার নামান্তর। সাহিত্য এই ধরনের অশ্লীলতাকে এড়িয়ে চলে, ঘৃণা করে। সাহিত্য সুড়সুড়ি দেয় না বরং মানবিক বোধ সম্পন্ন মানুষ তৈরিতে অগ্রণী অবদান রাখে। তাই আধুনিক এবং পরাবাস্তববাদী যারাই সাহিত্যে অশ্লীলতাকে আমদানি করেন এবং করবেন তারা যেনো এই কথা ভেবে নেন যে, অনাগতকালে অপ্রয়োজনীয় অশ্লীলতার স্থান কিন্তু আস্তাকুঁড়।



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
১৩৪৫৪৫
পুরোন সংখ্যা