চাঁদপুর, সোমবার ৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১১ রবিউস সানি ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫৯-সূরা হাশ্র


২৪ আয়াত, ৩ রুকু, মাদানী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


৩। আল্লাহ উহাদের নির্বাসনের সিদ্ধান্ত না করিলে উহাদিগকে পৃথিবীতে অন্য শাস্তি দিতেন; পরকালে উহাদের জন্য রহিয়াছে জাহান্নামের শাস্তি।


 


 


 


assets/data_files/web

অবসরকে দর্শনশাস্ত্রের জননী বলা যায়। -টমাস হবর্স।


যে মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ নয়, সে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ নয়।


 


 


ফটো গ্যালারি
হেমন্ত-শীতের সংবেদী কবি
পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
০৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


আসলে কবি জীবনানন্দ দাশ কিসের কবি?



কবি একজন জীবনের মানস-কুসুম। বাস্তবতা থেকে পরাবাস্তবতা, জীবন থেকে কল্পনা, কাল থেকে কালান্তরে কবির বিচরণ পথ। তাই কবিকে নিছক একটি অভিধায় আটকে রেখে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। তবুও কবির কবিতায়, ভাবনা ও দর্শনে কিংবা মনের জানালায় কখনো কখনো বিশেষ কিছু বিষয় মূর্ত হয়ে উঠে কিংবা অতিরিক্ত সজ্ঞান প্রশ্রয় লাভ করে। কবিকে নির্মোহ পাঠ করলে কখনো মনে হয় কবি বুঝি এক নদীকুমার, যার সখ্য সন্ধ্যা, কীর্তনখোলা, ধানসিঁড়ি কিংবা কালীদহ আর কীর্তিনাশার সাথে। কখনো রূপসার ঘোলাজলও কবিকে টেনে নেয় জলমাতার কাছে। কবিকে কখনো মনে হয় অতীতচারী এক পথভুলো কুমার, যে হাজার বছর আগের সভ্যতা গায়ে মেখে ভুলে চলে এসেছে বর্তমানে। অ্যাসিরিয়, ব্যাবিলনীয় সভ্যতার নান্দনিক সুঘ্রাণ নিয়ে কবি এক পথভোলা কালের কুসুম। গোধূলিসন্ধির নৃত্য অবলোকন করে বড় হওয়া কবি কখনো মিথ আর পুরাণের বাহক। কখনো কবি মৃত্তিকা মায়ের অাঁচলে বসে থাকা ভূমিসূত। কবিকে অন্তরে ধারণ করতে করতে একসময় মনে হয় কবি বুদ্ধের সমসাময়িক এক মহান পরিব্রাজক, যার কবিতার পরতে পরতে উঠে আসে তথাগতের স্মৃতি ও চেতনার নির্যাস। উঠে আসে বৌদ্ধ সভ্যতার অপার মৈত্রীমাখা নিদর্শনসূত্র।



নাম নিয়ে তাঁর সঙ্কট মিটেনি কখনো। তেমনি তাঁর উপাধি নিয়েও মিটেনি সংশয়। বাবা সত্যানন্দ জ্যেষ্ঠপুত্র ছাড়া সপরিবারে ব্রাহ্ম হয়ে বরিশালে থিতু হওয়ার আগে তাদের বংশগত পদবী ছিল দাশগুপ্ত। গুপ্তবিদ্যায় পারদর্শিতার কারণে এই পদবী তাদের কাঁধে সওয়ার হলেও ব্রাহ্ম হওয়ার পরে 'গুপ্ত' পদবী উঠাতে জীবনানন্দকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। তাঁর নামের বানানেও অনেকে একটা দন্ত্য ন কম লিখে বিভ্রাট তৈরি করতেন। ব্যক্তি নামের বাইরে কবি হিসেবেও তাঁকে ডাকা হয় বিভিন্ন নামে। কখনো নির্জনতার কবি, কখনো নিঃসঙ্গ কবি। কখনো ধূসর পান্ডুলিপি কিংবা রূপসী বাংলার কবি। তাঁর মা কবি কুসুম কুমারী দাশ থেকে জায়গা নিয়ে 'ব্রহ্মবাদী'-তে বর্ষ আবাহনের কবিতা দিয়ে তাঁর কবি জীবনের সূচনা। তারপর 'ঝরাপালক'-এ কাজী নজরুল ইসলামকে ভাবের কেন্দ্রে রেখে কাব্যগ্রন্থের জনক হলেও পরবর্তীতে খুঁজে পেয়েছেন নিজের মৌলিক পথ। একেবারে অন্যরকম সে পথ। কখনো এপথ বিশ্বসভ্যতাকে নিয়ে এসেছে পাঠকের কাছে, কখনো নাগরিক পাঠককে নিয়ে গেছে কুয়াশাস্নাত গ্রামীণ জীবনে। কবি জীবনানন্দ যেমন একদিকে রূপসী বাংলার কবি তেমনি অন্যদিকে তাঁর কবিতায় হেমন্ত আর শীতের রূপও ফুটে উঠেছে দারুণ নান্দনিকতায়। কবির কবিতাগুলো তাই শীত ও হেমন্তের শব্দচিত্র যেন। কবিকে নিবিড় অধ্যয়নে একদিকে হেমন্তের প্রতি তাঁর পক্ষপাত দেখি আর অন্যদিকে শীতের প্রতি তাঁর শঙ্কা-সন্ত্রস্ততা পরিস্ফুটিত হতে দেখা যায়।



 



হেমন্তের কবি জীবনানন্দ



জীবনানন্দকে পাঠ-পাঠান্তরে যতকিছুই মনে হোক না কেন, সকল কিছু ছাপিয়ে কবিকে অবিসংবাদিতভাবেই মনে হয়েছে-তিনি হেমন্তপুত্র। হেমন্তে বুঁদ হয়ে ছিলেন জীবনভর। তাইতো রোম্যান্টিক ফাল্গুনের জাতক হয়ে কবি হেমন্তে বিদেহী হয়েছেন, খুঁজে পেয়েছেন পরম মাতৃ-জঠর। সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা সকল দেশের রাণীর অঙ্গে ষড়ঋতুর যে ফ্যাশান বছর বছর প্যারেড করে যায় র‌্যাম্পে তার সবগুলোই কবি ধারণ করেছেন কবিতায়। কিন্তু তবুও মনে হয় হেমন্তের প্রতি কবির পক্ষপাত একটু বেশিই। 'এসো হে বৈশাখ বলে' রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গ্রীষ্মকে নিয়েছেন কব্জা করে আর নিজেকে 'শ্রাবণ প্লাবন বন্যা' বলে শাওন রাতের কবি নজরুল বর্ষায় নিজের জমিদারি ফলিয়েছেন। জীবনানন্দ নদীমাতৃক এলাকার কবি বলে তাঁর চোখে ফসল আর ফসলের ক্ষেত এনেছে জীবনের বার্তা। তাই নবান্নের ঋতু হেমন্তই হয়ে উঠেছে জীবনানন্দের শিল্পঋতু।



ঝরাপালক, ধূসর পা-ুলিপি, রূপসী বাংলা, বনলতা সেন, মহাপৃথিবী, সাতটি তারার তিমির, বেলা অবেলা কালবেলা, শ্রেষ্ঠ কবিতা শীর্ষক আটটি কাব্যগ্রন্থসহ অগ্রন্থিত অনেকগুলো কবিতায় কবি স্মরণ করেছেন হেমন্তকে। হেমন্ত কবিকে যাদু করেছে তার সমৃদ্ধির রূপ দিয়ে যেমন, তেমনি মায়ার ঘেরাটোপেও রেখেছে আবদ্ধ করে। কবির কবিতায় হেমন্ত কখনো তার স্বনামে মূর্ত হয়েছে, কখনো কার্তিক আর অঘ্রাণ হয়ে বেড়ে উঠেছে কবিতার দেহে। কখনো কেবল শিশিরের জল, হিমরাত হয়েও হেমন্ত লুকিয়েছিল কবির মনন-গর্ভে। 'ঝরাপালক'-এর একদিন খুঁজেছিনু যারে, আলেয়া, কবি, শ্মশান, সেদিন এ'ধরণীর ইত্যাদি কবিতাগুলোতে হেমন্ত হয়েছে বাঙ্ময়। হেমন্তের হিমঘাসে কবি একদিন কাউকে খুঁজে বেড়িয়েছিলেন সুঘ্রাণে মাতোয়ারা কামিনী ফুলের ঝরো ঝরো বেদনার সঙ্গীতে। নিশির শিশিরস্নাত ঘাসের ওপর সাদা চাদরের মতো বিছিয়ে থাকা শুভ্র কামিনীর রূপে নয়, ঝরে পড়ার বেদনাই কবিকে বিমোহিত করে রেখেছিলো একদিন। হেমন্তের হিমলাজে গুটানো সন্ধ্যায় কবি যাকে খুঁজে ফিরেছেন সে ছিলো মানবী নয় আলেয়া। হেমন্তের হিমগলানো পথে বারবার সেই আলেয়াকে খুঁজে ফিরেছেন কবি ভগ্নদূতের মতো।



কখনো কখনো হেমন্ত কবিকে আরো কবি করে দেয় তার নিটোল কোমল রূপে। কবিও হেমন্তের কোমল কুয়াশার রহস্য ফুঁড়ে বকবধূটির মতো শাদা ডানা মেলে কল্পনায় উড়ে যান হেমন্তের হিম মাঠে। আকাশের আবছায়া আর কবির কল্পনার যুগলবন্দীতে হেমন্ত হয়ে উঠে মায়াবী। পৃথিবীর শেষ বিকেলের ছবি কবিকে স্মরণ করিয়ে দেয়, একদিন যেতে হবে জীবনের বৃন্ত হতে ঝরে, হেমন্তের পাতাঝরা দিনের মতো। সেদিন এ ধরণীর হেমন্তের হিমে ভেজা ঘাস, জোনাকির ঝাড়, মৃত্তিকা-মা তাকে ডাকবে পিছে, কবি পার হয়ে যাবে হিমানী পাথার। 'শ্মশান' কবিতায় কবির এই বেদনার সুর যেন বয়ে গেছে তার জীবনের পথ ধরে ঘাতক ট্রামের চাকার গতি পেয়ে। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ 'ধূসর পা-ুলিপি'-তে কবি নিজেকে নিজের মতো করে তৈরি করে নিয়েছেন আপন কাব্য-প্রকৌশলে। এই কাব্যগ্রন্থের নির্জন স্বাক্ষর, পেঁচা, কার্তিক মাসের চাঁদ, অনেক আকাশ, অবসরের গান, জীবন, পিপাসার গান কবিতায় আপন করে পেয়েছেন হেমন্তকে। জীবনের পথে শীতের আগে হেমন্ত এসে হয়তো কবিকে ঝরিয়ে নিয়ে যাবে অনন্তের পথে, কিন্তু তখনও কবির জীবন রয়ে যাবে অগাধ। ঝরে গেলেও কবির সকল গান তার প্রাণের অন্তরতম সখার জন্যে নিবেদিত হবে। পথের ঝরা পাতা যেমন অাঁকড়ে থাকে মৃত্তিকার বুক তেমনি কবির ভালোবাসাও কি তাকে বুকে নিয়ে শুয়ে রবে অনন্তকাল, এ জিজ্ঞাসা কবিকে করুণ করে তোলে। হেমন্ত যে কেবল পাতাঝরা দিনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় তা-ই নয়, হেমন্ত আনে ভরা গোলার নবান্ন। কৃষকের মুখে নতুন সোনার ধানের সোনালি হাসি সে-ও আসে হেমন্তের হাত ধরে। কবিও তাই সুখের আলাপ পেয়ে 'পেঁচা' কবিতার মধ্য দিয়ে লক্ষ্মী পেঁচার সৌভাগ্য দেখতে পেয়ে বলেন,



প্রথম ফসল গেছে ঘরে,-



হেমন্তের মাঠে- মাঠে ঝরে



শুধু শিশিরের জল,



অঘ্রাণের নদীটির শ্বাসে



হিম হয়ে আসে...।



মাটির সাথে বাংলার কৃষকের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। কৃষক গ্রহীতা আর মাটি দাতা কেবল নয়, মাটি ও কৃষকের আলাপনে প্রেমিক ও প্রেমিকার বন্ধন তৈরি হয় যেন। তাইতো কৃষক মাঠে চাষ করে চলে গেলেও থেকে যায় আড়ালের গল্প। এই গল্পগাঁথা হেমন্তের নদী হয়ে ক্ষুধিতের মতো দীর্ঘশ্বাস তোলে। এই দীর্ঘশ্বাসে মাঝে মাঝে অনুরণিত হয় কার্তিকের মঙ্গার বেদনার গীত। তখন ক্ষেতজুড়ে হাতছানি দেয় সমৃদ্ধির আগামী। আজকের দুঃখের অশ্রু আগামীর সুখের হাসিতে পরিণত হবে বলেই কবি 'অবসরের গান' শুনতে পেয়ে লিখেন-



শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপরে মাথা পেতে



অলস ধোঁয়ার মতো এইখানে কার্তিকের দেশে।



হেমন্তে ধান ওঠে ফলে



দুইপা ছড়ায়ে বস এইখানে পৃথিবীর কোলে।



 



হেমন্তে নির্মিত হয় কবির জীবনের বোধ। এই জীবনবোধের শক্তিতেই হেমন্তের নতুন ফসলের আগমনী হাওয়া পৃথিবীজুড়ে দোলা দিয়ে বাসি হিসেবের জীর্ণ খাতা নিয়ে যায় উড়িয়ে দূর পাহাড়ের পার। কবির প্রণয়ে হেমন্ত আনে হিমের পরশ। বনের পাতা কুয়াশায় হলুদ হওয়ার আগেই কবি চেতনার অন্তরতর বৃন্ত হতে ঝরে পড়েন বিগত প্রথম প্রণয়ীকে কার্তিকের ভোরবেলা দূরে যেতে দেখে। শরৎ পেরিয়ে হেমন্তের সোনালী বিভায় কবির বেড়ে যায় নান্দনিকতার পিপাসা। নিজের দেহখানি তার কাছে হয়ে উঠে অলস মেয়ের প্রতীক, যে হেমন্ত ঋতুর পুরুষালি সোহাগে হয়ে উঠে অবশ। হাল্কা হিমের রোমান্সে দেহ চায় লেপের ওম। বিকালের রোদ শুষে দেহ নেয় সন্ধ্যার প্রণয়। অঘ্রাণের মাঝরাত রক্তহীন সাদা কঙ্কালের হাতে অলস দেহকে ধরে। দেহখানি গলে যায় সকালের অরুণের তাপে।



'রূপসী বাংলা'র জীবনানন্দ হেমন্তকে এঁকে নেয় ইতিহাসে, লোকাচারে। কবির কল্পনায় আজও শশাঙ্কের গৌড়ীয় বাংলায় কার্তিকের অপরাহ্নে হিজলের পাতার মতো সাদা উঠোনে হেমন্তের রাজ্য উঠে ফুটে। সেই স্মৃতিভারাতুর হয়ে কবি আবারো জন্মাতে চান এই নবান্নের বাংলাদেশে, যেখানে কার্তিকের মাঠে ছড়ানো সোনার ধান কাক হয়ে খুঁটে খাবেন তিনি, গায়ে লেগে রবে সোঁদা মাটির সিক্ত ঘ্রাণ। চিনিচাঁপা গাছে চড়ে বসা রাঙারোদ, ধানঝরা অঘ্রাণ আর হলুদ সর্ষে ফুলের আমোদে ভরে কবি হেমন্তকে উপভোগ করেন একান্ত নিজের করে। কার্তিকের সন্ধ্যায় পরলোকগত জ্ঞাতির স্মরণে আকাশ প্রদীপ জ্বেলে কবিও জেগে ছিলেন হেমন্তে মাঠ থেকে ভেসে আসা গাজনের গানের উচ্ছ্বাসে। অসংখ্য কাকের কাতর স্বরে কবির বুকে বাজে নিকটজনের বিয়োগ ব্যথা, যাকে মনে মনে খুঁজে কবি থেকে যান সমাধানহীন। হেমন্তের আদরে ঝরা বটের শুকনো পাতায় কবি পেয়ে যান যুগান্তের গল্প, যে গল্পে হরষিত কৃষাণের হাসি বিস্তৃত হয়ে উঠে চাঁদের ঘোলাটে আলোয়। ক্ষান্ত কার্তিকের মাঠে রাঙারোদের প্রেমে পড়া কবি আশঙ্কায় আকুল থাকেন। তার মনে জাগে সংশয়, হয়তো বা হেমন্তের পাকা ধানের হাসিটুকু বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে তার জীবনের সারাদিন হতে।



 



হেমন্তে বিমুগ্ধ কবি 'বনলতা সেন'-এ এসে নাটোরের নীড়াক্ষি, কৃষ্ণকুন্তলবতী বনলতার প্রেমে পড়েন। কিন্তু তবুও 'কুড়ি বছর পরে' কবিতায় কার্তিক মাসের ধানের ছড়ার পাশে তার সাথে দেখা হওয়ার বাসনা ব্যক্ত করেন। জোনাকির দেহ হতে ঠিকরানো আলোয় সন্ধ্যার নদীর জলে বনলতাই যেন হয়ে যায় শঙ্খমালা, যাকে অঘ্রাণের অন্ধকারে ডানা মেলে চলা ধূসর পেঁচার মতো দক্ষতায় কবি খুঁজে ফেরেন সেই রকম সন্তর্পণে, শব্দের উৎস খুঁজে খুঁজে। প্রকৃতিতে হেমন্তের সন্ধ্যা বাঙ্ময় হয়ে উঠে জাফরান রঙের নরোম সূর্যে, চিলের সোনালি ডানা রূপান্তিত হয় খয়েরি বর্ণে, ঘুঘু আর শালিকের ঝরে যায় পালক। এতসব পরিবর্তনের মাধ্যমে আসা হেমন্ত কিন্তু এতো কিছুর আগে চলে আসে প্রেমিক কবি ও তার দয়িতার মনে।



'মহাপৃথিবী'র কবি জীবনানন্দ দাশ বেদনাহত অনুভূতিতে সফলতা স্পর্শ করার আগে অল্পায়ু হেমন্তের দিনের অন্তিমতায় আক্ষেপ করেন। তিনি এই কাব্যগ্রন্থের সিন্ধুসারস, লাশকাটা ঘরে, মনোবীজ, প্রেম অপ্রেমের কবিতাতে হেমন্তকে টেনে নেন নিরাশার দেলাচলে দুলে। হেমন্তের বিকেলের গায়ে সুপক্ব যবের ঘ্রাণ পেয়েও জীবনের এই সাধ তিনি উপভোগ করতে পারেন না কেবল তার সঙ্গিনীর অসহ্যবোধের কারণে।'সাতটি তারার তিমির' কাব্যগ্রন্থে হেমন্ত মূর্ত হয় হরিতকী গাছের পিছনে বিকেলের গোল-রাঙা সূর্যে, তারাহীন রাতের আকাশের কোরাসে। আরও মূর্ত হয় একটানা সমুদ্রে ভেসে চলা নাবিকের বিগত স্মৃতিতে। সময়ের কাছে হেমন্তের স্পন্দন বুকে ধরে কবিও দাবি করেন মনুষ্যত্বের। হেমন্তের ভোরে আদিনারীশরীরিণীকে কবি জনান্তিকে খুঁজে নেন স্মৃতি হাতড়ে।'বেলা অবেলা কালবেলা'র জীবনানন্দ ঋতুর কামচক্রে হেমন্তরাতকে ক্রমশঃ ক্লান্ত,অধোগামী ভেবে নেন। নিজেকে সামান্য মানুষ হিসেবে মনে করে কবি জানিয়ে যান, এমন অদ্রষ্টব্য হেমন্ত গোলাকার পৃথিবীতে ঢের গেছে কেটে এবং এই হেমন্তরাই তার হৃদয়কে অবরুদ্ধ করে রেখেছে স্তব্ধতায়। 'হেমন্তরাতে'র কবিতায় হেমন্তকে কবি কল্পনা করেন হেমন্তলক্ষ্মীরূপে যেন সে আসে গোলা ভরে দিতে। বিস্ময়মাখা ইতিহাসযানে চড়ে হেমন্তের রৌদ্র-দিনে অতীত হওয়া পুরুষ ও জ্ঞাতিরা পায় তর্পণ। 'শ্রেষ্ঠ কবিতা'র জীবনানন্দে অঘ্রাণের বিকেল হয়ে যায় কমলা আলোক যেন পাখির মতো। ঊনিশশো ছেচলি্লশ-সাতচলি্লশ সালে ধর্মীয় দাঙ্গা লেগে অনেক হিন্দু দেশ হতে ঝরে যায় হেমন্তের অবিরল পাতা ঝরার মত। অগ্রন্থিত কবিতার জীবনানন্দ সরাসরি বলে ফেলেন, তিনি অঘ্রাণকেই ভালোবাসেন। অর্থাৎ হেমন্ত তার। এই হেমন্তই একদিন বেদনায় তাকে ডুবিয়ে রেখেছিল গভীর রাত।



মিথের কবি জীবনানন্দ তার কবিতায় পেঁচা, রোদের নরম রোম, হেমন্তলক্ষ্মী, হিমের শিশির, অঘ্রাণের পৃথিবী, হেমন্তের কুয়াশা প্রভৃতি শব্দকে মিথের আদল দিয়েছেন। চমৎকার উপমায় তিনি হেমন্তের দিনকে অল্পপ্রাণ বলে অভিহিত করেছেন। যেমনটি বলেছেন জাফরান রঙের সূর্য, ধূসর পেঁচার মতো ডানা ইত্যাদি উপমাগুলোতে। হেমন্ত কবির কাছে ঋতু নয়, মহাকাল হতে পাওয়া চিত্রপট যেন। যে হেমন্ত কবিকে করেছে বিমোহিত, সে হেমন্তই কবিকে নিয়েছে কেড়ে পৃথিবীর জীর্ণ বুক হতে। তিনি কবিতায় চেয়েছেন হেমন্তে ঝরে যেতে এই পৃথিবী হতে। বাস্তবিকভাবে তিনি হেমন্তেই ঝরে গেছেন ট্রামের চাকার ঘায়ে। হয়তো ভবিষ্যৎদ্রষ্টা কবি অবচেতনে দেখতে পেয়ে পরিণতি বলে গিয়েছেন অবলীলায়, 'যদি আমি ঝরে যাই একদিন কার্তিকের নীল কুয়াশায় যখন ঝরিছে ধান বাংলার ক্ষেতে ক্ষেতে মস্নান চোখ বুঁজে।'



 



জীবনানন্দের কবিতায় শীতের রূপক



ঋতু বৈচিত্র্যে নিপুণা নিসর্গ পৌষ-মাঘে এসে শীতে কাতর। শীত সবসময় যে কাতরতা নিয়ে আসে তা নয়। শীত কখনো খুশিও আনে। কখনো আনে বেদনার ঝুড়ি কিংবা নস্টালজিয়ার মধুর পেয়ালা। কবিতায় শীত বর্ষা বা গ্রীষ্মের পরে প্রাণবন্ত। অনেক কবির কবিতাতেই শীত প্রধান চরিত্র। কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতায় হেমন্ত প্রাধান্য পেয়েছে বারে বারে। তবে তার পরেই শীতের দাপট। শীত যে সব সময় জীবনানন্দীয় কবিতায় ঋতু হিসেবে এসেছে তা নয়। শীত কখনো কখনো এসেছে দূত হয়ে, কখনো বা উপমা বা রূপক হয়ে অফুরান কাব্যরস ছড়িয়ে। শীতে নিসর্গ গুটিয়ে রয়। কিন্তু কবি ও কবিতা গুটিয়ে থাকে না। কবি ও কবিতা শীতে হিম মেখে চাদরের ওমে উষ্ণতা উপভোগ করে মনের রৌদ্র-তাপে। কবির কোমল মনোভূমে শীত এসে গোপনে তৈরি করে যায় সংবেদন। এ সংবেদনে সাড়া দিয়ে কবিও চিত্রায়িত করে তোলেন গ্রামবাংলার শীতকে তাঁর কবিতায়।



 



জীবনানন্দের কবিতায় 'হিম' ও 'শিশির' শব্দ দুটি অধিকবার এলেও তারা শীতের কথা সবসময় বলেনি। তারা বেশির ভাগ সময়েই হেমন্ত আর কার্তিকের বারতা নিয়ে এসেছে। জীবনানন্দ কবিতায় শীতকে কখনো আদর করে নিমন্ত্রণ জানিয়ে ডাকেননি। শীত এসেছে জীবনানন্দের কবিতায় অপারতপক্ষে, কোনো রকম পক্ষপাত ছাড়া, যথাযথের চরম নমুনা হয়ে। জীবনানন্দীয় কবিতায় 'শীত' সরাসরি যতটা না এসেছে তার চেয়ে বেশি এসেছে 'পউষ' কিংবা 'পউষ সন্ধ্যা'। শীতের হাওয়ার হিমের নাচন জীবনানন্দের প্রাণের গহীনে বয়ে গেলেও কবিতায় জীবনানন্দ শীতকে নিয়ে খুব বেশি উল্লাস প্রকাশ করেননি। কেবল অন্য বিষয়ে বলতে গিয়ে জীবনানন্দ শীতকে টেনে এনেছেন কখনো সাক্ষী হিসেবে, কখনো অপরিহার্য পরিষদ হিসেবে। 'শীত' প্রধান কুশীলব হয়ে জীবনানন্দের কবিতার দেহে এসেছে খুব কমই। তবুও কবি জীবনানন্দ 'শীত'কে কম জায়গা ছাড়েননি।



'ঝরাপালক' জীবনানন্দের প্রথম দিকের কবিতার বই। তখনও কবিখ্যাতি পায়ে এসে লুটিয়ে পড়েনি। কবি জীবনানন্দও আজকের কবি হয়ে উঠেননি। এমনই এক সময়ে 'নবনবীনের লাগি' কবিতায় কবি জীবনানন্দ প্রথম শীতকে টেনে আনেন কবিতায়। শীত এখানে মৃত্যুর প্রতীক। সেই শীতকে তিনি শ্মশানে বসে প্রত্যক্ষ করেন। মৃতের অস্থি, মাথার খুলি চারিদিকে ছড়ানো-ছিটানো। অর্থাৎ যে কালে বসে কবি এ কথা বলছেন সে এক মৃতপ্রায় সময়ের কথা। কেবল ধ্বংস, বিনাশ আর মৃত্যুময় জগৎ ছিল সেই সময়। সেই মৃত্যুময়, খুলিময় জগৎ হতে নব-নবীনকে জেগে উঠে নতুন পৃথিবী নির্মাণের কথা বলেছেন কবি জীবনানন্দ। মৃত্যুপুরীর ধ্বংস প্রলয়ের শেষ চিহ্নকে দূর করে জীবনের জয়গান গাইতে হলে চাই ঝড়ের বাতাস যা সকল জীর্ণকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে নিমেষে। নব-নবীনের দল সেই মৃত্যুপুরীর ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আশার কিরণ জাগিয়ে তুলবে আজ। তাই কবি নব-নবীনকে আহ্বান করে বলেন,



'ঝড়ের বাতাস চাই!



চারিদিকে শীতের কুহেলি, শ্মশান পথের ছাই



ছড়ায়ে রয়েছে পাহাড়প্রমাণ মৃতের অস্থিখুলি,



কে সাজাবে ঘর দেউলের 'পর কঙ্কাল তুলি তুলি?'



 



শ্মশানপুরীতে মৃত্যুর ধ্বংসযজ্ঞে শীতের কুহেলিকার দেখা পেলেও কবি নিরস্ত হননি একটুও। কবি খুঁজতে থাকেন তাকে, যার দেখা পেলে কবির সমস্ত বিষণ্নতা দূর হবে, জেগে উঠবে জীবনের স্বপ্নের গান। সেই একজনকে খুঁজতে খুঁজতে , 'একদিন খুঁজেছিনু যারে' কবিতায় কবি তার অতীত অভিসার কিংবা প্রিয়া দর্শনের নস্টালজিয়ায় ভুগতে ভুগতে আবারো আক্রান্ত হন বিচ্ছেদে। এবারের বিচ্ছেদ আসে পউষের রূপ ধরে শীতাকাতর আকাশের নীরবতায়। কবি জানাচ্ছেন আমাদের,



 



'মনে হয় শুধু আমি, আর শুধু তুমি



আর ঐ আকাশের পউষনীরবতা



রাত্রির নির্জনযাত্রী তারকার কানে-কানে কতকাল



কহিয়াছি আধো আধো কথা!



আজ বুঝি 'ভুলে গেছ প্রিয়া!'



বিচ্ছেদের নস্টালজিয়ায় অতীত রোমন্থন করে কবি শীতের পাতাঝরা অাঁধারের রিক্ত মুসাফির বনে যান। অথচ একদিন, পউষের হিম-নিথর আকাশের সাথে মিতালি মেখে কবি গোধূলির সহচর হয়ে তার প্রিয়াকে সঙ্গ দিয়ে ভাসিয়েছেন যুগলবন্দিতার মহাকাব্যস্রোতে।



কিন্তু সে অতীত প্রেমের প্রিয়া যেনো এক আলেয়া। ধরা দেয় না কভু। তবু বেঁচে থাকে মিটিমিটি আলেয়ার আলো হয়ে। 'আলেয়া' কাব্যে তাই আবারো স্মৃতিভারাতুর কবি 'বিরহী'র প্রতীক রূপে শীতের পউষকে টেনে আনেন কবিতায়। রিক্ত-নিঃস্ব কবি বিহ্বল বিরহী হয়ে ছুটতে থাকেন আলেয়ার পেছনে প্রেমের অফুরান আবেদন নিয়ে। তারই বর্ণনা পাই কবির ভাষ্যে,



'রাত্রি পারাবারে



ফিরিতেছ বারম্বার একাকী বিচরি!



হেমন্তের হিম পথ ধরি,



পউষ আকাশতলে দহি দহি



ছুটিতেছ বিহ্বল বিরহী



কতশত যুগজন্ম বহি!



কারে কবে বেসেছিলে ভালো



হে ফকির আলেয়ার আলো।'



আড়চোখে শীতকে তার বুকে ঠাঁই দিয়েছেন কবি জীবনানন্দ 'ছায়াপ্রিয়া' কবিতায়। শীত এখানে অশুভতার লক্ষণ। শীত এখানে অমঙ্গলের উপমা। শীত এখানে পউষের রাতের বেশে তেপান্তরের বুকে জেগে উঠেছে পাখির কু-ডাক হয়ে।



জীবনানন্দীয় কয়েকটা চরণে আমরা পাই,



'কাঁদছে পাখি পউষ নিশির



তেপান্তরের বক্ষে!



ওর বিধবা বুকের মাঝে



যেনো গো কার কাঁদন বাজে!



ঘুম নাই আজ চাঁদের চোখে,



নিদ নাই মোর চক্ষে!



তেপান্তরের বক্ষে!'



কবি এস.টি. কোলেরিজের 'বলাড'-এ আমরা মৃত্যুকে দেখি হিমশীতল রূপে, সফেদ বরণ। ঠোঁটে লাল অধর-রঞ্জক। কবি জীবনানন্দও শীতকে মৃত্যুদূতের উপমায় দেখেছেন 'নির্জন স্বাক্ষর' কবিতায়। কবি যেনো স্বয়ং মৃত্যু দূত হয়ে আউড়িয়ে বলেছেন,



'আমি সেই পুরোহিত সেই পুরোহিত!



যে নক্ষত্র মরে যায়, তাহার বুকের শীত



লাগিতেছে আমার শরীরে'।



মৃত্যু ও শীত এই দুয়ের মাঝে কখনো রয়ে যায় কিছু ভৌতিক উপাদান। মৃত্যুর কাহিনীতে যেমন ভৌতিক উপাদান চলে আসে তেমনি শীতের মাঝেও ভৌতিক হয়ে উঠার উপকরণ আছে। 'সহজ' কবিতায় শীতকে যেনো ভৌতিকরূপে কল্পনা করে তুলেছেন চরণে। তিনি বলেছেন,



'যেখানে গাছের শাখা নড়ে



শীত রাতে, মড়ার হাতের শাদা হাড়ের মতন!



যেইখানে বন



আদিম রাত্রির ঘ্রাণ



বুকে লয়ে অন্ধকারে গাহিতেছে গান!



তুমি সেইখানে!'



শীত প্রকৃতিকে শক্তি দেয় না, বরং শক্তিহীন করে তোলে। প্রকৃতি যেনো কুয়াশার চাদর মুড়ে গুটিয়ে থাকে। গুটানো শীতে ক্রমশ গুটায় মনকে, মননকে। তাই কবি জীবনানন্দ এক সময় শীতকে শক্তিহীনতার রূপকে দেখতে পান। 'কয়েকটি লাইন' কবিতায় কবি বলেন,



'তাই যার পায়ে



চলিবার শক্তি আর নাই;



সবচেয়ে শীত, তৃপ্ত তাই।'



শীত শক্তিহীনতা থেকে আবার মুক্তির উপমা খুঁজে পায় কবির কল্পনায়। যে শীত মৃত্যু ও ভৌতিকতার রূপ টানে সেই শীত মুক্তির রূপেও বিকশিত হয় 'পরস্পর' কবিতায়,



'দেশ ছেড়ে শীত যায় চলে



সে-সময় প্রথম দখিনে এসে পড়িতেছে বলে



রাতারাতি ঘুম ফেঁসে যায়,



আমারো চোখের ঘুম খসেছিল হায়।'



কবি জীবনানন্দের জীবনে অবসর মেলেনি তেমন। তবুও ছিটেফোঁটা যে অবসর কবির জীবনে এসেছে তারই কয়েকটা ক্ষণে কবি সুর বেঁধে রচনা করেছেন অবসরের গান। 'অবসরের গান' কবির মনোভূমে ক্রীড়ামত্ত শব্দ-সম্ভার যা কবিতায় রূপ পায়। এখানেও শীত হানা দেয়। শীত এখানে পড়ন্ত বেলার কথা বলে। শীত এখানে মলিনতা আর সৌন্দর্যের বিনাশের রূপ হয়ে আসে। কবিতার তিনটি চরণে আমরা পাই



'আমি সেই সুন্দরীরে দেখে লইনুয়ে আছে নদীর এপারে



বিয়োবার দেরী নাই, রূপ ঝরে পড়ে তার,



শীত এসে নষ্ট করে দিয়ে যাবে তারে!'



'অবসরের গান' কবিতায় শীত হানাদার। শীতের ছোবলে সুন্দরীর সৌন্দর্য একদিন নষ্ট হয়ে যাবে। জীবনের যৌবনও একদিন যেমনটি বার্ধক্যে জরায় ঝরে পড়ে। হানাদারী শীত এক সময় জরার বাঁধন হয়ে 'জীবন' কবিতায় জীবন্ত হয়। জীবনের যে পাতা সবুজ-সজীব ছিল তা একদিন হলদে-ম্রিয়মান হয়ে যাবে। শীতের জরায় একসময় ঝরে পড়বে পাতা, যেমনটি জীবনের প্রতিপল বার্ধক্যে ঝরে যাবে তারুণ্যের অবসানে।



'জীবন' কবিতার জরারূপী শীত যুবার মুখে ক্ষয় আনে, নুয়ে পড়ে জীবন এক সময় জরার আঘাতে। তাই কবি বলে যান,



'যে পাতা সবুজ ছিল তবুও হলুদ হতে হয়,



শীতের হাড়ের হাত আজো তারে যায় নাই ছুঁয়ে;



যে মুখ যুবার ছিল, তবু যার হয়ে যায় ক্ষয়,



হেমন্ত রাতের আগে ঝরে যায়, পড়ে যায় নুয়ে;



জীবনানন্দীয় রূপকে শীত মনের জরা হয়ে কাঁপিয়ে দেয় তরুণ তনুর বুড়ো মনকে। তাই তরুণ তনয়ের বার্ধক্য প্রবীণের বার্ধক্যের চেয়েও খারাপ। কবি 'জীবন' কবিতাতেই বলেছেন শীত রাত ঢের দূরে তবুও অস্থিমজ্জা কেঁপে উঠে। অর্থাৎ, জীবনের বার্ধক্য আসার আগেই ভয়ে-ভীরুতায়, জড়তা ও জরায় পেয়ে বসে দুর্বল তারুণ্যকে। তাই কবি শীতকে অত্যন্ত নিপুণতায় আগাম জরার জুজুভীতি রূপে পরিস্ফুটিত করে বলেন,



'শীত-রাত ঢের দূরে, অস্থি তবু কেঁপে উঠে শীতে!



শাদা হাত দুটো শাদা হাড় হয়ে মৃত্যুর খবর



একবার মনে আনে, চোখ বুঁজে তবু কি ভুলিতে



পারি এই দিনগুলো! আমাদের রক্তের ভিতর



বরফের মতো শীত, আগুনের মতো তবু জ্বর! 'মৃত্যুর আগে' কবিতায় জীবনানন্দ' 'পউষ' মাসকে শীতের প্রতিনিধিরূপে টেনে এনে কুয়াশার সৌন্দর্য বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ এখানে পউষের কুয়াশা যেনো কোনো শিল্পীর চিত্রিত কুসুম-কমল। ' মৃত্যুর আগে' আমরা দুটো চরণে পাই,



'আমরা হেঁটেছি যারা নির্জন খড়ের মাঠে পউষ সন্ধ্যায়, দেখেছি মাঠের পাড়ে নরম নদীর নারী ছড়াতেছে ফুল কুয়াশার।'



শীত কখনো কখনো জীবনানন্দীয় কবিতায় খুশির খবর নিয়ে এসেছে। যে শীতের রাতে আমের বউল দিয়েছিল, সে রাতে মনোরমা নামে এক নারী কবিকে দেখা দিয়ে গেছে। কবি তারই বর্ণনা দিয়েছেন' এ-সব কবিতা আমি' কবিতায়



'নিভু দীপ আগলায়ে মনোরমা দিয়ে গেছে দেখা



সঙ্গে তার কবেকার মৌমাছির...কিশোরীর ভিড়



আমের বউল দিল শীত রাতে; আনিল আতার হিম ক্ষীর।'



কোনো একদিন হয়তো পৃথিবীর অনেক কিছুই হারিয়ে যাবে। কিন্তু শীত তবু রয়ে যাবে চিরকালীন এক অনুভূতি হয়ে। ' এখানে প্রাণের স্রোত' কবিতায় কবি শীতকে এমনভাবেই দেখেন। তার ভাষ্যে আমরা পাই,



' মনে হয় একদিন পৃথিবীতে হয়তো এ জ্যোৎস্না শুধু রবে,



এই শীত রবে শুধু, রাত্রি ভরে এই লক্ষ্মীপেঁচা কথা কবে।'



শীত জীবনানন্দের কাছে এক সময় অতীত ছেঁকে স্মৃতি হাতড়ানোর সম্পদ হয়ে দাঁড়ায়। 'কুড়ি বছর পরে' কবিতায় কবি জীবনানন্দ তাই শীতের মাঝে খুঁজে ফিরেন তার হারানো শৈশব, প্রতারিত যৌবন আর অমল কৈশোর। কবি এক সময় আক্ষেপের সুরে বলেন,



' ...নাইকো ধান ক্ষেতে আর,



ব্যস্ততা নাইকো আর,



হাঁসের নীড়ের থেকে খড়



পাখির নীড়ের থেকে খড়



ছড়াতেছে; মনিয়ার ঘরে রাত, শীত আর শিশিরের জল।'



শীত কবিতায় এক মূল্যবান অনুষঙ্গ। শীত সাহিত্যেও এসেছে জাঁকিয়ে, ঝাঁপিয়ে। জীবনানন্দ তাঁর কবিতায় শীতের শাসন মেনেছেন পংক্তিতে পংক্তিতে। তাইতো তাঁর জীবনও শেষের বিকেল হয়ে, নিস্তেজ শীতের সূর্য হয়ে নিভে গেছে কবিতার শীতের মতো।



 



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
১৪১০৫৮
পুরোন সংখ্যা