চাঁদপুর, মঙ্গলবার ১৪ জানুয়ারি ২০২০, ৩০ পৌষ ১৪২৬, ১৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • চাঁদপুর সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কসহ আরো ৯ জনের করোনা শনাক্ত, মোট আক্রান্ত ২১৯
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৬১-সূরা সাফ্‌ফ


১৪ আয়াত, ২ রুকু, মাদানী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


৭। যে ব্যক্তি ইসলামের দিকে আহূত হইয়াও আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রচনা করে তাহার অপেক্ষা অধিক যালিম আর কে? আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।


 


ব্যবসায়ীদের নিজস্ব কোনো দেশ নেই। - জেফারসন।


 


 


যদি মানুষের ধৈর্য থাকে তবে সে অবশ্য সৌভাগ্যশালী হয়।


ফটো গ্যালারি
নজরুলের জীবনে চাঁদপুরের নাসিরউদ্দিন : সেতুবন্ধ 'সওগাত'
পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
১৪ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


একজনের জন্মের প্রায় একশ' নয় বছর এবং অন্যজনের জন্মের প্রায় একশ' বিশ বছর আগে সতরশ' ঊনআশি সালে ইংরেজ জরিপকারী মেজর জেমস্ রেনেল মানচিত্রে সর্বপ্রথম চাঁদপুর নামে এক অখ্যাত জনপদ চিহ্নিত করেন যা কালক্রমে তিন নদীর মিলনস্থল ও বিশ্ববিদিত ইলিশের অনন্যতার জন্যে খ্যাতিমান হয়ে ওঠে। এই দুই খ্যাতিমানের একজন চাঁদপুরে ঊনিশশো একুশ সালের আট জুলাই তারিখে প্রাণের বন্ধু মোজাফফর আহমদসহ কুমিল্লা হতে কোলকাতা ফেরার পথে যানবাহনের ভাড়া সঙ্কটে পড়ে তাঁর পদরেণু রেখে যান আর অন্যজন এ মৃত্তিকারই স্তন্যে লালিত সন্তান। এই যুগলের বয়সে যিনি জ্যেষ্ঠ তিনি হলেন সওগাত সম্পাদক নাসিরউদ্দীন আর অনুজ ব্যক্তি স্বয়ং কাজী নজরুল ইসলাম। দুজনেই তাঁরা স্বশিক্ষিত। দুজনেই জীবনের আগুনের কারখানায় পুড়ে পুড়ে খাঁটি সোনা। একজন অধ্যবসায়ী আর অন্যজন আজন্ম প্রতিভাধর। সম্পাদক হিসেবে দুজনেই কিংবদন্তী। একজন এনেছেন 'সওগাত'। তুর্কী শব্দ 'সওগাত' মানে উপহার। এই সওগাত বা উপহার নিবিড়ভাবেই সাহিত্যের সওগাত, সাহিত্যিকের সওগাত। অন্যজন কখনো চষেছেন 'লাঙল', কখনো 'ধূমকেতু' হয়ে অলক্ষণের তিলক রেখা জাতির ভাগ্যাকাশ হতে বিতাড়নের চেষ্টা করেছেন। কখনো বা নিজেই ধারণ করেছেন 'যুগবাণী'। এরই ফাঁকে নাসিরউদ্দিনের 'সওগাত' পেয়ে হাত পেতে নিয়েছেন 'লাঙল'-এর সাহিত্যিক চাষা। নজরুল ও নাসিরউদ্দিনের সম্পর্কের রসায়ন তাই অনেকটুকুই অন্তঃসলিলা। বাইরে যতটুকু প্রতিভাত তার চেয়ে অধিক অন্তর্বহমান।



দুজনেরই উৎস নদীর চলমান সঞ্জীবনী ধারা। একজন চুরুলিয়ার পাথুরে অনুর্বর লাল মাটির সন্তান হলেও অজয় নদের ধাবমান ধারায় তার মনে তৈরি হয়েছে চঞ্চলতা। যতই চুরুলিয়ার দুখু মিয়া 'বিদ্রোহী' কবিতার নজরুল হয়ে উঠেছেন ততই হাজী পাহলোয়ানের মাজারের হাওয়ায় জন্ম নেওয়া শিশুটি পরিণত হয়েছে বড় খোকায়। কিন্তু অন্যদিকে মেঘনার তীরবর্তী চাঁদপুরের ইব্রাহিমপুর ইউনিয়নের পাইকারদি গ্রামের উর্বর পলিতে জন্ম নেয়া নাসিরউদ্দিন পদ্মা-মেঘনা-ডাকাতিয়া বিধৌত হয়ে নির্মিত হয়েছেন এক ধীরস্থির সাংগঠনিক বটবৃক্ষ রূপে।



পেশার পরিবর্তন দুজনেরই জীবনে এসেছে বারংবার। একজন পেশাকে গ্রহণই করতেন পেশা পরিবর্তন করবেন বলে। অন্যজন পেশা পরিবর্তন করেছেন জীবনের প্রয়োজনে, সংসারের চাহিদা মোতাবেক। দুজনেই শৈশব হতে নেমেছেন অর্থ উপার্জনের সংগ্রামে। একজনের জন্মমাস মে আর অন্যজনের প্রয়াণের মাস মে। নজরুল জন্মেছিলেন পঁচিশে মে আর 'সওগাত' সম্পাদক নাসিরউদ্দিনের জন্ম নভেম্বরের কুড়ি তারিখ। আটাশি আর নিরানব্বইতে যত ব্যবধান বাস্তবে এই দুয়ের চারিত্রিক ব্যবধান আরো বিস্তর। দুজনেই অল্প বয়সে পিতৃহারা। একজন শৈশবে মক্তবে শিক্ষকতা দিয়ে এবং হাজী পাহলোয়ানের মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ দিয়ে নেমে পড়েন অর্থ উপার্জনে। তারপর লেটো গান আর ওয়াহেদ বঙ্রে রুটির দোকানে চাকুরি। এমনকি রেলের খ্রিস্টান গার্ডের খানসামার চাকুরি হতে শেষমেষ দশম শ্রেণির পাঠ অসমাপ্ত রেখে বাঙালি পল্টনে যোগদান। অন্যজন পিতার মৃত্যুতে প্রথমে সুপারি স্টকের ব্যবসা দিয়ে জীবনে টিকে থাকার চেষ্টা করেন। তারপর জোটে স্টিমার কোম্পানীর কুড়ি টাকা মাসিক বেতনে সহকারীর কাজ। অতঃপর বীমা কোম্পানীর উঁচু আয়ের কর্মে মনোনিবেশ। দুজনেরই প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ অসমাপ্ত দশম শ্রেণি। আদর্শের দিক থেকেও দু'জন দু'জনের বিপরীত। একজনের রাজনৈতিক মতাদর্শ কমিউনিজম আর অন্যজন ছিলো মধ্যপন্থী। না গোঁড়া না চরম। লাল ঝা-ার নিশান উড়িয়ে একজন বন্ধু মোজাফ্ফর আহমদের পাল্লায় পড়ে আপন করে নিতে চেয়েছিলেন লেনিনকে। আর একজন লাল ঝা-ার ভয়েই নজরুল হতে নিজেকে দূরে রেখেছিলেন শুরুর দিকে। একজন 'রক্তাম্বরধারিণী মা' লিখে হৈ চৈ ফেলে দিয়েছিলেন। কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন অত্যাচারী বৃটিশ শাসকের ভিত। অন্যজন পত্রিকা বন্ধ হওয়ার ভয়ে 'রক্তাম্বরধারিনী মা' কে জায়গাই দেননি 'সওগাতে'। তবুও 'সওগাত'ই কাছে টেনে এনেছে দুই বিপরীত চরিত্রের মানুষকে। কংগ্রেসে যোগ দিয়ে কৃষ্ণনগরের জন্যে নজরুল ছেড়েছিলেন কোলকাতা। কিন্তু বাড়ি ভাড়ার টাকা দেয়ার কথা থাকলে হেমন্তকুমার সেই কথা রাখেননি। ফলে নজরুল হয়ে পড়েন কপর্দকহীন। এ সময় 'সওগাত' এগিয়ে এলো নাসিরউদ্দিনের কণ্ঠস্বর হয়ে। চাঁদপুরের পাইকারদী গ্রামের নাসিরউদ্দিনের সহযোগিতায় 'সওগাত' অফিসের পাশেই দুই কামরার একটি ফ্ল্যাটে জায়গা হলো নজরুলের। মাসিক দেড়শো টাকা বেতনে ইলিশের বাড়ি চাঁদপুরের নাসিরউদ্দিনই আজকের জননী সাহসিকা বেগম সুফিয়া কামাল তথা তখনকার সুফিয়া এন হোসেনের আবেগঘন চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ভবিষ্যতের বাংলাদেশের জাতীয় কবিকে রক্ষা করেন তাঁর চরম অর্থ সঙ্কটের দিনে। কংগ্রেসের হেমন্ত কুমারের প্রতারণা হতে বেঁচে এসে বড় রুগ্ন আর কৃশকায় হয়ে উঠেছিলেন নজরুল। খান মুহম্মদ মঈনুদ্দিনকে দিয়ে গাড়ি পাঠিয়ে তিনি নজরুলকে নিয়ে আসেন নিজের কাছে। নজরুল 'সওগাত'-এ যোগ দিয়েই সারাদিন তার ঘরখানি মাতিয়ে রাখতো আড্ডায়। নাসিরউদ্দিন চেয়েছিলেন, 'সওগাত' কোন ইসলামিক পত্রিকা হবে না, বরং 'সওগাত' হবে আধুনিক মুসলিম সাহিত্যিকদের একটা মিলনমঞ্চ। এজন্যে কেউ হযরত উমরের জীবনী কিংবা রাবেয়া বসরীর জীবনী দিতে চাইলে তিনি তাতে আগ্রহ না দেখিয়ে বরং এড়িয়ে যেতেন। তিনি আগ্রহ দেখিয়েছিলেন মুসলিম সাহিত্যিকদের আধুনিক রচনায়। ফলে নজরুলের ভেতরকার কথাসাহিত্যিককে টেনে বের করে আনার প্রয়াস ছিল তার লক্ষ্যণীয়।



গীতিকার নজরুল কিংবা কবি নজরুলের জন্ম যেভাবেই হোক না কেন, ঔপন্যাসিক নজরুলের জনক নাসিরউদ্দিন আর জননী 'সওগাত'। নাসিরউদ্দিনের তাগাদায় নজরুলের প্রথম উপন্যাস 'মৃত্যুক্ষুধা'র জন্ম হয়। সে সময়ের স্বকালের আবেদন ছিলো 'মৃত্যুক্ষুধা'র প্রধান উপজীব্য। ধারাবাহিকভাবে উপন্যাসটি প্রকাশকালে নজরুলের খেয়ালই থাকতো না, পূর্বের কিস্তিতে ঘটনা কতটুকু গড়িয়েছিল। ফলে পরবর্তী কিস্তি রচনার আগে ডাক পড়তো নাসিরউদ্দিনের কোমলমতি মেয়েটার। সে-ই পুরানো পত্রিকার স্তূপ দেখে বলে দিতে পারতো আগের কিস্তিতে কাহিনী কতটুকু পর্যন্ত গড়িয়েছিল। নাসিরউদ্দিন নিজেই বলেছেন, তাগাদা দিয়ে উপন্যাস লেখানোর কারণে এগুলো মানের দিক থেকে হয়তো বা ঐ মাত্রায় পেঁৗছাতে পারেনি। তবে নজরুল যদি নিজের অভিরুচিতে লিখতেন তাহলে নিশ্চয়ই তা আরো মান সম্পন্ন হতো। নজরুলের তিনটা উপন্যাসের মধ্যে 'মৃত্যুক্ষুধা' ও 'কুহেলিকা' এ দুটি 'সওগাত'-এর প্রয়োজনে লিখিত। অন্য একটি পত্রোপন্যাস আরেকটি পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছিল। নজরুল 'সওগাত'-এর জন্যে কখনো কখনো সম্পদ ও বিপদ উভয়রূপেই পরিগণিত হতেন। তাই রাজনীতি সম্পৃক্ততার কারণে নজরুল পরবর্তীতে আর নাসিরউদ্দিন কর্তৃক মূল্যায়িত হননি তেমনভাবে। নজরুল পরবর্তীতে বাকহারা হয়ে যাওয়ার পর নাসিরউদ্দিন অনেকদিন তাকে দেখতে যাননি। কিন্তু পরে নজরুল তনয় কাজী সব্যসাচীর অনেক অনুরোধে দেখতে আসেন তাঁর কন্যা নূরজাহানসহ। এ দুজনকে দেখে নজরুল চেয়েছিলেন ফ্যাল ফ্যাল করে।



নজরুলকে পেয়ে যেমন সমৃদ্ধ হয়েছে 'সওগাত' তেমনি নাসিরউদ্দিনের মতো একজন পরোপকারী আধুনিকমনস্ক সম্পাদক পেয়ে পূর্ণ বিকশিত হয়ে উঠেছেন নজরুল। নজরুলের যেটা ঘাটতি ছিল তা হলো লেখক হিসেবে তাঁর আশ্রয়। 'সওগাত'কে পেয়ে নজরুল সেই আশ্রয়ই যেন পেয়ে উঠলেন বহুলাংশে। নিজের পত্রিকাকে একদিকে বিতর্কিত না করার যেমন দৃঢ় প্রত্যয় ছিল নাসিরউদ্দিনের তেমনি অন্যদিকে তিনি নজরুলকে সুরক্ষা দেয়ার ব্যাপারেও অকুণ্ঠ ছিলেন। 'সওগাত সাহিত্য মজলিশ'-এর আড্ডায় নজরুল ছিলেন মধ্যমণি। মাঝে মাঝে নাসিরউদ্দিনও থাকতেন সেখানে। আড্ডার হৈ হুল্লোড় আর নজরুলের গান-বাজনার শব্দে বিরক্ত হয়ে পাশের মসজিদের বিহারী ইমাম সাহেব উষ্মা প্রকাশ করলে নজরুলের সমর্থনে নাসিরউদ্দিন বলেছিলেন, পাশের রাস্তায় ট্রাম চলাকালীন শব্দে আদৌ ইমাম সাহেবের কোনো অসুবিধা হয় কি না। যদি সে শব্দ তিনি বন্ধ করতে পারেন তাহলে নজরুলের গান-বাজনার শব্দও তিনি বন্ধ করে দিবেন। তিনি এও বলেছিলেন, গানের সুর ও বাণী শ্রুতিমধুর, পক্ষান্তরে ট্রামের শব্দ বিকট ও বেসুরো। কাজেই বিঘ্ন যদি কারও মারফত ঘটেও তবে তা ট্রামের শব্দেই অধিক। তাই আগে ট্রামের শব্দ বন্ধ করাটাই সমীচীন। নজরুলের পক্ষে নাসিরউদ্দিনের কাছ থেকে এ রকম যুক্তিপূর্ণ উত্তর পেয়ে ইমাম সাহেব নজরুলের গান-বাজনা চর্চার আর কোনো বিরোধিতা করেননি। নাসিরউদ্দিন 'সওগাত' ও 'সওগাত সাহিত্য মজলিশ'-এর মাধ্যমে নজরুলকে মুসলিম তরুণদের কাছে আসার দারুণ সুযোগ করে দেন। নজরুল অল্পদিনেই তাঁর স্বভাবসুলভ আচরণে তাদের নেতা বনে যান। তিনি তাদের 'চল্ চল্ চল্, ঊর্ধ গগনে বাজে মাদল' রণসঙ্গীতটি গেয়ে শুনিয়ে অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করেন। 'অগ্রপথিক' শিরোনামে একটি কবিতাও তিনি তরুণদের উদ্দেশ্যে 'সওগাত'-এ লিখে সাহিত্য বিষয়ে তাদের উদ্বুদ্ধ করেন।



নজরুলের অনেক গানের বাণী ও সুর 'সওগাত' সম্পাদক নাসিরউদ্দিনকে মোহিত করে। বিশেষতঃ একটি গান যার বাণী ছিল নিম্নরূপ :



এত জল ও কাজল চোখে পাষাণী



আনলে বল কে,



টলমল জলমোতির মালা



দুলিছে হিয়ার ফলকে।



এই গানটি মাঝে মাঝেই নাসিরউদ্দিন গুনগুন করে গাইতেন নিজে।



'সওগাত' পত্রিকা, সম্পাদক নাসিরউদ্দিন ও মিশরীয় আরব্য গায়িকা-নর্তকী ফৌজিয়ার দেখা না পেলে নজরুল আদৌ গজল লিখতেন কি না তা সন্দেহ। চাঁদপুরের নাসিরউদ্দিনই কোলকাতায় বসে নজরুলকে গজল রচনায় উদ্বুদ্ধ করেন। অবশ্য মৌলিক প্রণোদনা আসে মিশরীয় নর্তকী-গায়িকা ফৌজিয়ার উর্দু গজল শুনে। সেই উর্দু গজলই নজরুলের ভিতরে জাগিয়ে দেয় ঘুমিয়ে থাকা গানের পাপিয়াকে। ফলে সৃষ্টি হয় 'আজি বসন্ত ফুলবনে / সাজে বনভূমি সুন্দরী...' গজলটি। নজরুলের এই গজলের প্রতি ঝোঁক তার কবিতার প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দেয় এবং গানের প্রতি মগ্নতা বাড়িয়ে দেয়। এ সময় হিজ মাস্টারস্ ভয়েসে তাঁর গান দেওয়ার চুক্তির বাইরেও হিন্দুস্থান গ্রামোফোন কোম্পানী, বিভিন্ন চলচ্চিত্র পরিচালকরা তাঁর কাছে গান চাইতে থাকলেন। 'সিরাজউদ্দৌলা' নাটকে আলেয়ার গান ও লুৎফার মুখে গানের দৃশ্যে নজরুলের লেখা গানের ডাক পড়ে। নাসিরউদ্দিনের ভাষ্যে নজরুল চলচ্চিত্রে অভিনয় করলেও অভিনেতা হিসেবে ভালো ছিলেন না।



নজরুলের প্রতি নাসিরউদ্দিনের পরোক্ষ আরেক মহানুভবতা তৎকালীন মুসলিম মহিলা গণিত শিক্ষার্থী মিস্ ফজিলতুন্নেসাকে আর্থিক সহযোগিতা প্রদানের মাধ্যমে উচ্চতর শিক্ষার্থে বিলেত পাঠানো। মিস্ ফজিলতুন্নেসা ছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম সেরা গণিতবিদ ড. কাজী মোতাহার হোসেনের অতি নিকটাত্মীয়া বোন। কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন নজরুলের অকৃত্রিম বন্ধু যাঁকে কবি ডাকতেন 'মোতিহার' নামে। মিস্ ফজিলতুন্নেসার প্রতি নজরুলের অন্তঃসলিলা প্রেম নাসিরউদ্দিনের অজানা ছিল না। নাসিরউদ্দিনের আর্থিক প্রণোদনায় নজরুলের পরিণতিহীন প্রেমের নায়িকা লন্ডনে গিয়ে গণিত শিক্ষায় সুযোগ পাওয়া মানেই পরোক্ষভাবে নজরুলই তাতে প্রীত হওয়া। গানের প্রতি অতিরিক্ত ঝোঁকের কারণে নজরুল যখন কবিতা লেখা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন তখন ফজিলতুন্নেসার জন্যে লিখিত 'রহস্যময়ী' কবিতা দিয়েই তিনি আবার কবিতার প্রতি ঝুঁকে আসেন। ঊনিশশো আটাশ সালের সেপ্টেম্বরে তুখোড় মেধাবী গণিত শাস্ত্রী মিস্ ফজিলতুন্নেসা উচ্চশিক্ষায় বৃত্তি পেয়ে লন্ডন যাত্রার আগে চাঁদপুরের নাসিরউদ্দিন 'সওগাত-এর পক্ষ থেকে এক সংবর্ধনার আয়োজন করেন। সেই সংবর্ধনা সভায় নজরুল নিজেই গান করেন। সেই গানের শিরোনাম ছিল ' জাগিলে পারুল কিগো?'।



'সওগাত' একদিকে যেমন কবি নজরুলের পৃষ্ঠপোষক, তেমনি অন্যদিকে কথাসাহিত্যিক ও ঔপন্যাসিক নজরুলের জন্মদাতা। 'সওগাত' সম্পাদক নাসিরউদ্দিন যেমন একদিকে ঘুচিয়েছেন নজরুলের আর্থিক দীনতা তেমনি অন্যদিকে তাঁর বিকাশে বড় এক নিরাপত্তা-ঢাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সাহিত্যিক হিসেবে কুশলতা অর্জনে নাসিরউদ্দিনই সম্পাদনার পরশ পাথর নিয়ে নজরুলকে তৈরি করেছেন। প্রথম দিককার কাঁচা লেখাগুলো উপেক্ষা করে তিনি ভালো লেখাগুলোই কেবল ছেপেছেন। যে কারণে নজরুল একসময় বাধ্য হয়ে 'কবিতা-সমাধি' শিরোনামে তাঁর একমাত্র গদ্য ও ব্যঙ্গ কবিতাটি লিখতে বাধ্য হয়েছিলেন। এটাই 'সওগাত'-এ প্রকাশিত নজরুলের প্রথম কবিতা। নজরুলের সত্যিকারের প্রথম কবিতা 'ক্ষমা' 'সওগাত' হতে নাসিরউদ্দিন কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়ে 'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা'তে তা সম্পাদকের কাঁচিতে 'মুক্তি' নাম ধারণ করে প্রকাশিত হয়। এতে নজরুল 'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা'-এর সম্পাদকের প্রতি ক্ষিপ্ত হন।



প্রথম দিকে ঊনপঞ্চাশ নম্বর বাঙালি পল্টন হতে নজরুল তাঁর লেখা 'সওগাত' পত্রিকায় পাঠানোর সময় লিখতেন, 'হাবিলদার নজরুল ইসলাম'। পরে অবশ্য যুদ্ধের পরে তিনি হাবিলদার শব্দটি বাদ দেন নিজেই। নাসিরউদ্দিনের সাথে প্রথম যেদিন নজরুলের দেখা হয় সেদিন নজরুলের পরণে ছিল সৈনিকের উর্দি। ঊনিশশো কুড়ি সালের মার্চ মাসে নজরুল ঊনপঞ্চাশ নং বাঙালি পল্টন হতে ফিরেই নাসিরউদ্দিনের সাথে দেখা করতে আসেন। নাসিরউদ্দিন তার অফিসে সৈনিকের আনাগোনা দেখে কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। পরে নজরুল পরিচয় দেন নিজের 'হাবিলদার মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম' বলে। এতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে। নজরুলের সাথে নাসিরউদ্দিনের প্রথম সাক্ষাৎ তাই কিছুটা ভিন্ন মাত্রিক এবং ঘটনাবহুলও বটে।



 



চুরুলিয়ার নজরুলকে চাঁদপুরের নাসিরউদ্দিনই সবচেয়ে ভালো বুঝেছিলেন বলে অনুমিত। তাঁর ভাষ্যে আমরা পাই, নজরুল সভা-সমিতিতে বক্তৃতা দিতে পছন্দ করতেন না মোটেই। অর্থাৎ তিনি সভা-সমিতিতে তখনো বক্তৃতা দিতে শিখেন নাই। তাই কেউ ডাকতে এলেই তিনি পালিয়ে গিয়ে ফুটবল মাঠে বা দাবা খেলার বোর্ডে নিজেকে মগ্ন রাখতেন। কিন্তু পরবর্তীতে নজরুল বিভিন্ন সভা-সমিতিতে যেসব অভিভাষণ প্রদান করেন তার অধিকাংশই নাসিরউদ্দিনের অত্যন্ত পছন্দের ছিল। 'সওগাত'-এ নজরুলের মোট আশিটি রচনা প্রকাশিত হয়। নজরুলকে সকলের কাছে তুলে ধরার জন্যে, নজরুলের সাহায্যার্থে নাসিরউদ্দিন কোলকাতার অ্যালবার্ট হলে নজরুল রজনীর আয়োজন করেন, যাতে তার লেখা স্বাগত বক্তব্য পাঠ করেন ওয়াজেদ আলী। নাসিরউদ্দিন কখনো সভা-সমিতিতে নিজে বক্তৃতা দিতেন না। এরপর থেকেই কোলকাতার ঘরে ঘরে নজরুলের জয়জয়কার শুরু হয়ে যায়।



নজরুল মানেই হৈ হুল্লোড়। নজরুল মানেই প্রাণশক্তি। যুদ্ধের পল্টনে তাই তাঁর নাম হয়েছিলো 'হৈ হৈ নজরুল'। বুদ্ধদেব বসুর দৃষ্টিতে নজরুল ছিলেন কথার মানুষ। তুমুল আড্ডাবাজ। তবে কথার চেয়ে বেশি ছিল তার হাসি আর হাসির চেয়ে বেশি ছিল গান। সারাদিন অফুরান পান আর চা পেলে হার্মোনিয়মের ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে যেত। তখন টানা কয়েক ঘন্টা ভাঙ্গা গলায় দরদমাখা গান কোনো ব্যাপারই ছিল না। এরকম এক মহাপ্রতিভাকে নিজের কাছে রেখে 'সওগাত'-এর মাধ্যমে তাকে বিকশিত করা, পৃষ্ঠপোষকতা করা চাট্টিখানি কথা নয়। একদিন চাঁদপুরের গান্ধী হরদয়াল নাগের কাছ থেকে মাত্র বারো টাকা পেয়ে যাঁর জুটেছিল পথ খরচ কালক্রমে সেই মহাজ্যোতির্ময় প্রতিভাই আরো অধিক জ্বলজ্বলে হয়ে উঠলেন চাঁদপুরের মেঘনা-নিবিড় মহাপ্রাণ নাসিরউদ্দিনের পরিচর্যায়। তাই এ কথা বলতেই হয়, নজরুলের জীবনে ইলিশের বাড়ি চাঁদপুরের অবদান গৌরবময় এবং চিরভাস্বর। অজয় নদের পাড়ের নজর আলি মেঘনা পাড়ের নাসিরউদ্দিনের 'সওগাত' পেয়ে হয়ে উঠেছেন কালজয়ী, কালের কারিগর।



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৯৭১৮৪২
পুরোন সংখ্যা