চাঁদপুর, মঙ্গলবার ১৪ জানুয়ারি ২০২০, ৩০ পৌষ ১৪২৬, ১৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৬১-সূরা সাফ্‌ফ


১৪ আয়াত, ২ রুকু, মাদানী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


৭। যে ব্যক্তি ইসলামের দিকে আহূত হইয়াও আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রচনা করে তাহার অপেক্ষা অধিক যালিম আর কে? আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।


 


ব্যবসায়ীদের নিজস্ব কোনো দেশ নেই। - জেফারসন।


 


 


যদি মানুষের ধৈর্য থাকে তবে সে অবশ্য সৌভাগ্যশালী হয়।


ফটো গ্যালারি
ভ্যান গগ : একজন বেদনাদীর্ণ শিল্পীর মুখ
মুহাম্মদ ফরিদ হাসান
১৪ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


চিত্রশিল্পীদের অাঁকা ছবিগুলো কখনো তুলে ধরে সময়, আবার কখনো অতিক্রম করে যায় সময়কে। সবাই অাঁকতে পারেন না, রঙের কারুকাজ সবার বোধগম্যও নয়। হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করে, চেতনাকে সর্বোচ্চ কাজে লাগিয়ে শিল্পীমাত্রই তাঁর শিল্পকর্ম রচনা করে থাকেন। এক্ষেত্রে শব্দশিল্পী ও চিত্রশিল্পীর মধ্যে মাধ্যম ভিন্ন অন্য কোনো তফাৎ নেই। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন শহরে অজস্র চিত্রশিল্পী প্রতিনিয়ত টেনে যাচ্ছেন তাদের তুলি। কিন্তু সেরাদের সেরা শিল্পীরা রঙ-তুলিতে কেবল তাঁর বাসভূম ও দেশকেই মাত করেন না, তাঁরা তাক লাগিয়ে দেন বিশ্ববাসীকেও। তাঁদের রঙতুলি জানান দেয়_আমি এসেছি, জয় করতে এসেছি! এমনি একজন শক্তিমান তুলির জাদুকর ভিনসেন্ট ভ্যান গগ। তাঁর চিত্রকর্মগুলো তাঁকে শিল্পের দরবারে যুবরাজের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। যদিও ভ্যান গগ লৌকিকভাবে দীর্ঘজীবন পান নি, কিন্তু শিল্পীর ভুবন তাঁকে প্রসারিত জীবন দান করেছে।



ভিনসেন্ট উইলিয়াম ভ্যান গগ জন্মেছিলেন নেদারল্যান্ডের জুনডারটে, ১৮৫৩ সালের ৩০ মার্চ। তাঁর বাবা থিওডর ভ্যান গগ ও মা কর্নেলিয়া। গগ ছিলেন তাঁর বাবা-মায়ের দ্বিতীয় সন্তান। যদিও তাদের প্রথম সন্তান মৃত হয়েছিলো। তার নামও রাখা হয়েছিলো ভিনসেন্ট উইলিয়াম ভ্যান গগ। মৃত সন্তানের স্মৃতি ধরে রাখতেই বাবা মা তাদের দ্বিতীয় সন্তানের নাম রাখলেন প্রথম সন্তানের নামে। ভ্যান গগের ছিলো মৃত ভাইয়ের প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধা। অবশ্য একটি বিষয় তাঁকে প্রায়ই বিমর্ষ করতো। কেননা, তাঁর ভাইয়ের কবর তাদের বাড়ির সামনেই ছিলো। কবরের নাম ফলকে লেখা ছিলো_'ভিনসেন্ট উইলিয়াম ভ্যান গগ'। অর্থাৎ নিজের নামকে প্রতিনিয়ত মৃতদের কাতারে দেখতে দেখতে বড় হয়েছিলেন গগ। হয়তো এই কারণেই শৈশব থেকে একাকিত্ব পছন্দ করতেন তিনি। পাড়ার ছেলেদের সাথে মিশতেন না। কোনো খেলাধুলাতেও তাঁকে পাওয়া যেতো না। তিনি একা একা সারাক্ষণ ঘুরে বেড়াতেন। নদী ছিলো তাঁর ভীষণ পছন্দের। শৈশবে নদীর তীরে বসে সময় কাটানো ছিলো ভ্যান গগের একমাত্র কাজ। গগের একাকিত্বের সাথে শৈশবে যে বিষণ্নতা যুক্ত হয়েছিলো, পরবর্তীতে যৌবনে এসেও সেই বিষণ্নতা তিনি কাটাতে পারেন নি। কারো সাথে বন্ধুত্ব হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সে সম্পর্ক বেশিদিন টিকে থাকে নি। গগের স্বভাবের কারণে যতো দেরিতে কারো সাথে তাঁর বন্ধুত্ব হয়েছে, ততো দ্রুত আবার সেই বন্ধুত্ব ভেঙেও গেছে।



 



মানুষ হিসেবে গগ ছিলেন অস্থিতিশীল ও স্পর্শকাতর মানুষ, বিশেষত সবক্ষেত্রেই_যার কারণে কোনো চাকুরিতেই তিনি দীর্ঘদিন বহাল থাকতে পারেন নি। জীবনের পথে দৌড় দিতে দিতে তিনি বারবার কর্মস্থল পাল্টিয়েছেন, হয়েছেন চাকুরিচ্যুত। প্রথমে আর্ট ডিলার, পরে ১৮৭৬ সালে একটি স্কুলে কাজ নেন তিনি। কিন্তু নানা কারণে প্রশাসনের কাজ করতে তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন। সুতরাং চাকুরি হারালেন গগ। ভ্যান গগ এমন একজন মানুষ, যাঁকে কেউ কেউ দুঃখীতম শিল্পী বলে আখ্যায়িত করে থাকেন। গগ গবেষকরা বলেন, ভ্যান গগ ঘরবাড়ি ছেড়েছেন, শহর ও দেশ ছেড়েছেন, কিন্তু দুঃখ কখনো তাঁকে ছাড়ে নি। গগের জীবনে আনন্দঘন মুহূর্তের সংখ্যা বেশি হবে না। স্কুলে চাকুরি হারানোর পর ২৫ বছর বয়সে ভ্যান গগ পাদ্রী হিসেবে যোগ দেন বোর্নিয়াজের একটি কয়লা খনিতে। মূলত এই কয়লা খনিতে থাকা অবস্থায় উন্মেষ ঘটে গগের শিল্পী সত্তার। যে জীবন তিনি ইংল্যান্ডের দরিদ্র পরিবারে দেখেছেন, কয়লা খনির শ্রমিকদের জীবন তারচেয়েও অনেক বেশি ভয়াবহ। এমন বাস্তবতার মুখোমুখি তিনি কখনো পড়বেন বা পড়তে পারেন তা গগ কখনো ভাবতে পারেন নি। এখানেও কয়েকদিন না যেতেই পাদ্রীর চাকুরি হারালেন গগ। দু বছরের মতো চাকুরিবিহীন অবস্থায় তিনি শ্রমিকদের সাথেই ছিলেন। তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন শিল্পী হবেন। তিনি অাঁকা শুরু করলেন কয়লা শ্রমিকদের ছবি। কয়লা খনির জীবনচিত্র। অাঁকলেন মানুষের মুখ, যেসব মানুষ পীড়িত ও অবহেলিত। পরবর্তীতে যতদিন তিনি বেঁচে ছিলেন, ততদিনই দুঃখ ও দারিদ্র্যের সাথে তাঁর সঙ্গী ছিলো রঙ তুলি আর ক্যানভাস। গগ কয়লা খনিতে থাকা অবস্থায় প্রচুর ছবি এঁকেছেন। তিনি ছিলেন 'চড়ংঃ ওসঢ়ৎবংংরড়হরংঃ' ধারার শিল্পী। হলুদ রঙ তাঁর প্রিয় ছিলো। তাঁর অাঁকা 'দি পটেটো ইটার্স' বা 'সানফ্লাওয়ার্স'ই কেবল বিখ্যাত হয় নি, পাশাপাশি 'স্টারি নাইট', 'প্রোট্রেট অব ডাঃ গেচেট', 'সরো', 'বেডরুম ইন আর্লেস'ও কালকে জয় করে কালজয়ী হয়েছে। গগের আত্মপ্রতিকৃতিগুলোও কম গুরুত্ববহ নয়। তিনি ৩০টির মতো আত্মপ্রতিকৃতি এঁকেছিলেন। 'সানফ্লাওয়ার্স' পৃথিবীর সবচেয়ে দামী চিত্রকর্মগুলোর মধ্যে একটি। বর্তমানে এই ছবিটির বাজার মূল্য ৭৪ মিলিয়ন ডলার। ১৮৮৮ সালে এই ছবিটি এঁকেছিলেন গগ। 'স্টারি নাইট' অাঁকা হয় ১৮৮৯ সালে। বর্তমানে এই ছবিটি নিউইয়র্কের আধুনিক আর্ট মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। ছবিতে দেখা যায় নক্ষত্রখচিত আকাশকে। এখানে শিল্পী তারা অাঁকতে হলুদ রঙের ব্যবহার করেছেন। 'স্টারি নাইট'-এ আমরা রহস্যময় আকাশকে রহস্যময়ভাবেই ক্যানভাসে দেখি। 'দি পটেটো ইটার্স' ছবিতে ফুটে উঠেছে শ্রমজীবী মানুষের কথা। ছবিতে দেখা যায় চারজন মানুষ রাতে মৃদু আলোতে আলু খাচ্ছে। অর্থাৎ আলু খেয়ে তারা তাদের রাতের আহার সারছে। ছবির মানুষগুলোর বিষণ্নতা এবং একই সাথে আত্মতৃপ্তি আমাদের দৃষ্টি এড়ায় না।



চাকুরি হারানো, দরিদ্রতার মধ্য দিয়েও ভ্যান গগের জীবনে প্রেম এসে হানা দিয়েছিলো বারকয়েক। যতবার প্রেমিকা জুটেছিলো তাঁর, ততোবারই তিনি তাদেরকে হারিয়েছেন। কখনো অর্থ দীনতার কারণে, কখনো তাঁর খামখেয়ালী মনোভাবের কারণে। তবে তাঁর প্রেম ছিলো বহু বিচিত্র। প্রথম যৌবনে উরসুলা নামের এক ব্রিটিশ মেয়ের প্রেমে পড়েন। মজার বিষয় হলো উরসুলা ছিলেন অন্য একজনের বাগদত্তা। প্রথম প্রেমের জন্যে গগকে বহুবার অপমানিত হতে হয়েছে, এমনকি চাকুরিও হারাতে হয়েছে। গগের দ্বিতীয়বার একজন বিধবার প্রেমে পড়েন। তার নাম ছিলো 'কি'। কি সম্পর্কে গগের খালাতো বোন ছিলো। তাঁর প্রতি গগের প্রেম এতটাই তীব্র ছিলো যে, তিনি কি-এর জন্যে ডান হাতটি পুড়িয়ে ফেলেছিলেন। গগের তৃতীয় প্রেমিকা ক্রিস্টিন। তিনি ছিলেন পাঁচ সন্তানের জননী এবং একজন পতিতা। গগ তখন হেগে থাকতেন। ক্রিস্টিনের সাথে গগের সম্পর্ক একবছর ছিলো। উরসুলা, কি অথবা ক্রিস্টেনের প্রেমে গগ পড়লেও গগের প্রেমে পড়েছিলো মাত্র একজনই। তাঁর নাম মার্গো। গগ ছিলেন তাঁর দশবছরের ছোট। গগ স্বভাবসুলভভাবেই মার্গোকে ভালোবেসেছিলেন। কিন্তু তাদের প্রেমে বাধা হয়ে দাঁড়ায় মার্গোর বিত্তশালী পরিবার। মার্গো একসময় ব্যথা বিদীর্ণতা নিয়ে আত্মহত্যা করে। প্রকৃত অর্থে একমাত্র মার্গোই গগকে নিজের মতো করে ভালোবেসে ছিলেন। ভ্যান গগের সর্বশেষ প্রেম রেসেল নামের একজন পতিতা। রেসেলের বয়স ছিলো ষোল-সতের। একবার গগের কান দেখে রেসেল কটাক্ষ করে বলেছিলো, 'সুন্দর কান!'। এই কটাক্ষের জবাব অদ্ভুতভাবে শোধ দিয়েছিলেন গগ। রেসেলকে ক্রিসমাসের দিন গগ্যাঁর উপর ক্ষুব্ধ হয়ে কাটা নিজের কানের লতি উপহার দিয়েছিলেন ভ্যান গগ!



ভ্যান গগ চিঠি লিখতে পছন্দ করতেন। তাঁর চিঠিগুলোতে তাঁকে আমরা যথেষ্ট সংযত অবস্থায় পাই। তিনি সবচেয়ে বেশি চিঠি লিখেছেন তাঁর ভাই থিওকে। থিও-ই একমাত্র ব্যক্তি যাঁর কাছে ভ্যান গগ তাঁর বেদনা প্রকাশ করতেন। আর বলতেন আর্থিক সহযোগিতার কথা। গগ তাঁর ৩৭ বছরের জীবনে প্রায় এক হাজার চিঠি লিখেছেন। অনির্বাণ রায়ের মতে, ভ্যান গগ সবচেয়ে বেশি চিঠি লিখেছিলেন ভাই থিওকে : ছয়শো একান্নটা, ভাইয়ের বউকে একটা, ভাই আর তার বউকে সাতটা। ডাচ শিল্পী আন্তন ভ্যান র্যাপার্ডকে লিখেছিলেন আটান্নটা। ফরাসি শিল্পী এমিল বার্নার্ডকে লিখেছিলেন বাইশটা। বোন ভিলেমিয়েন আর মাকে লিখেছিলেন যথাক্রমে একুশ আর বারোটা চিঠি। বাবা-মাকে একসঙ্গে লিখেছিলেন মাত্র পাঁচটি চিঠি। ভ্যান গগের সঙ্গে সঙ্গে যে ফরাসি শিল্পীর নাম উঠে আসে সেই পল গগ্যাঁকে লিখেছিলেন মাত্র চারখানা চিঠি। এছাড়া বিভিন্ন পরিচিতজন, শখের শিল্পী এবং তাঁর স্বল্পকালের ছাত্র আন্তন কোর্সমেকার্সকে, সমালোচক আলবার্ত অরিয়েরদের সব মিলিয়ে লিখেছিলেন একশ' ষাটটা চিঠি। অন্যদিকে ভিনসেন্ট পেয়েছিলেন মাত্র তিরাশিটি চিঠি। সবচেয়ে বেশি থিও আর তাঁর বউয়ের কাছ থেকে : ছেচলি্লশটা। পল গগ্যাঁ তাঁকে লিখেছিলেন ষোলোটা চিঠি। অন্যরা দুটো-একটা করে। ডাকঘরকর্মী যোসেফ রুলাঁর কাছ থেকে পেয়েছিলেন চারটা চিঠি। গগের লেখা এসব চিঠিতে স্পষ্ট হয়ে আছে তাঁর মন ও মানসিকতা। স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তাঁর আবেগ ও দরিদ্রতা। পাশাপাশি তাঁর স্বপ্নগুলোও উচ্চকিত হয়েছে পরিমার্জিত ভাষায়। পূর্বেই উল্লেখ করেছি, গগ ছিলেন কোমল মনের অধিকারী। কিন্তু সেই সময়ের অনেক মানুষই তাঁকে ভেবেছে নির্দয়, নির্মম। অনেক সময় এমনও হয়েছে তাঁকে আখ্যায়িত করা হয়েছে 'কুৎসিত ও পাগল' শব্দবন্ধে। গগের চিঠিগুলো আমাদেরকে স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দেয় তিনি কতটা নরম ও সবুজ ছিলেন।



ভ্যান গগ যে কেবল প্রচুর চিঠি লিখতেন তা-ই নয়, তিনি প্রচুর বইও পড়তেন। কোথাও গেলে রঙতুলি, ক্যানভাসের পাশাপাশি তাঁর সাথে থাকতো বই। অবসরের মুহূর্তে তিনি বই পড়ে সময় ব্যয় করতেন। তাঁর চিঠিগুলো পাঠে আমরা প্রচুর লেখক ও বিখ্যাত বইয়ের কথার উল্লেখ পাই। ভ্যান গগের প্রিয় কবি ছিলেন জন কিটস। এছাড়া শেঙ্পিয়রও ছিলেন তাঁর পাঠের তালিকায়। ম্যাকবেথ, হ্যামলেট, দ্যা মার্চেন্ট অব ভেনিস, ওথেলো_এর মতো নাটকগুলো পড়েছিলেন গগ। তাঁর এসব বই পাঠের কথাগুলো তিনি তাঁর ভাই থিওকে চিঠিতে জানিয়েছিলেনও। শুধু তাই নয়, ফ্লবেয়ার, চার্লস ডিকেন্স, গঁকুর, মোপাসাঁ, হুইটম্যান, জোলা, বালজাক ও কার্লাইলের কথাও উল্লেখ আছে তাঁর চিঠিগুলোতে। ভ্যান গগ যে সাহিত্যপ্রেমী ছিলেন তার প্রমাণ আমরা তাঁর কথাতেই পাই। একবার তিনি বলেছিলেন, 'আমাদের চারপাশে সর্বত্র কবিতা ঘিরে রয়েছে। দেখে যেমন মনে হয়, তাকে কাগজে কলমে ধরা কিন্তু তত সহজ নয়।' ভ্যান গগ বলতেন, 'পৃথিবীর প্রতি একটা ঋণ, একটা কর্তব্য আমি বোধ করি, ত্রিশ বছর চলে ফিরে বেড়াচ্ছি পৃথিবীতে এবং কৃতজ্ঞতাস্বরূপ শিল্পকর্ম আকারে কিছু স্মৃতিচিহ্ন রেখে যেতে চাই। আমার এ কাজে শিল্পকলার কোনো বিশ্বাসকে সন্তুষ্ট করা হবে না, কেবলমাত্র বিশ্বস্ত মানবিক অনুভূতির একটা প্রকাশ হবে।' তবে সমকালে তিনি অবহেলিত হলেও তাঁর বিশ্বাস ছিলো 'এমন সময় আসবে, যখন আমিও বিক্রি হবো।' কেবলমাত্র গুটিকয়েক শিল্পী ও তাঁর ভাই থিও'র উৎসাহ পেয়েছিলেন গগ। যদিও তাঁর ছবির সমালোচকদের সমালোচনাই গগকে বিক্ষিপ্ত করে ভাবতে বাধ্য করেছিলো। তিনি একদশক ধরে ৯শ' ছবি অাঁকলেও জীবত অবস্থায় তাঁর ছবিগুলোর কদর হয় নি। এমনকি উল্লেখ্যযোগ্য সংখ্যক কোনো ছবিও বিক্রি হয় নি। যেখানে জীবতাবস্থায় পাবলো পিকাসো অথবা সালভাদর দালি ব্যাপক খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা পেয়েছেন, সেখানে ভ্যান গগ একেবারেই নিঃস্ব ও রিক্ত ছিলেন। সারা জীবনে গগ মাত্র একটি ছবি বিক্রি করতে পেরেছিলেন। তাও সেই বিক্রিতে তাঁর ভাই থিও সহযোগিতা করেছিলো। ছবিটি ছিলো 'আর্লেসের আঙুরক্ষেত'। এই ছবিটির বিক্রির অর্থ হিসেবে গগ পেয়েছিলেন মাত্র চার শ' ফ্রাঁ। এখন এই সময়ে যখন ভ্যান গগের একটি ছবির অর্থমূল্য কয়েক শ' কোটি টাকা, সেখানে ভ্যান গগ সে-সময়ে তাঁর ছবি বিক্রি করে পেয়েছিলেন মাত্র চারশ' ফ্রাঁ! যাঁর ছবিগুলো এখন কয়েক বিলিয়ন ডলারে বিক্রি হচ্ছে, অথচ সেই শিল্পীকেই কত অসহায়, অসচ্ছলভাবে জীবনপাত করতে হয়েছে। অর্ধাহারে, অনাহারে থেকে তিনি ছবি এঁকে গেছেন। দুঃখের বিষয় হলো, গগকে জীবত অবস্থায় যথাযথ মূল্যায়ন করেন নি সমালোচকরা। যাঁর ফলে এই গুণী শিল্পী অন্তরালেই থেকেছেন।



 



গগ মাত্র ৩৭ বছর বেঁচেছিলেন। শেষ দিকে তিনি প্রায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর ধৈর্য ভেঙে খানখান হয়েছে। মৃত্যুর কিছুদিন আগে গগ এক চিঠিতে থিওকে লিখেছিলেন, 'নিজেকে সাবধানে বাঁচিয়ে চলার কোনো ইচ্ছে আমার নেই, কোনো অসুবিধে বা আবেগ আমি এড়িয়ে যেতে চাই না। কম বাঁচি বেশি বাঁচি, তাতে কোনো পরোয়া করি না; তাছাড়া একজন ডাক্তার যেভাবে শরীরের যত্ন নিতে পারে, সেভাবে করার ক্ষমতাও আমার নেই।' এ কথা থেকে স্পষ্ট যে, জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা এসে গিয়েছিলো গগের। সাথে সাথে এই বিতৃষ্ণার কারণ যে অর্থদৈন্য তাও স্পষ্ট। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে তিনি লিখেছেন, 'আমি এখনো দারুণ দুঃখভারাক্রান্ত। তোমার ওপর দিয়ে যে ঝড় বয়ে যাচ্ছে, সে ঝড়ের ঝাপটা প্রতিনিয়ত টের পাচ্ছি আমি নিজেও। এমনিতে আমি খুব হাসিখুশি আর মিশুক একজন মানুষ হয়ে থাকতে চাই। কিন্তু আমার জীবনও এখন আপাদমস্তক আক্রান্ত। আমার পদক্ষেপ ভারী হয়ে আসছে।' সত্যি সত্যিই পদক্ষেপ ভারি হয়ে আসছিলো তাঁর। তখন গগ ছিলেন অভঁরোতে। ১৮৯০ সালের ২৭ জুলাই। গগ একা একা হাঁটলেন দীর্ঘক্ষণ। রাতে বিছানায় শুয়ে নিজের বুকে নিজেই গুলি করলেন তিনি। পরদিন রাত একটার দিকে লৌকিক মায়া ত্যাগ করেন বিশ্বখ্যাত এই শিল্পী। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ভ্যান গগ ঠিক মরে গেলেন না, আবার নতুন করে বেঁচে উঠলেন যেন। মৃত্যুর পর তাঁর সৃষ্টিকর্মই তাঁকে বিশ্বের মহান শিল্পী করেছে, করেছে বিশ্বজয়ী। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ভ্যান গগ পেয়েছিলেন অমরত্ব সুধা, মানুষের নিরন্তর ভালোবাসা।



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৪৮৬৯৪৭
পুরোন সংখ্যা