চাঁদপুর, সোমবার ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১১ ফাল্গুন ১৪২৬, ২৯ জমাদিউস সানি ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • চাঁদপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ছেলেটির করোনা ভাইরাস নেগেটিভ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ সে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী নয়। তথ্য সূত্র: আরএমও ডাঃ সুজাউদ্দৌলা রুবেল। || বৈদ্যনাথ সাহা ওরফে সনু সাহা করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যায় নি : সিভিল সার্জন
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৬৪-সূরা তাগাবুন


১৮ আয়াত, ২ রুকু, মাদানী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


১২। তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর; যদি তোমরা মুখ ফিরাইয়া লও, তবে আমার রাসূলের দায়িত্ব কেবল স্পষ্টভাবে প্রচার করা।


 


যে তার দেশকে ভালোবাসতে পারে না, কিছুই সে ভালোবাসতে পারে না। -বায়রন।


 


নিশ্চয় আল্লাহ অত্যাচারীকে শাস্তি প্রদান করেন।...কোন দেশ যখন অত্যাচারী হয়, তোমার প্রভু তাকে শাস্তি প্রদান করেন, তার শাস্তি অতীব ভীষণ।


 


 


 


 


ফটো গ্যালারি
ছয় দফার অর্ধশতক : আমাদের বাঁচার দাবি
পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


মুক্তির পথ বড়ই কঠিন। প্রকৃত মুক্তি কখনো সুলভে আসে না। মুক্তি আসে ত্যাগে, মুক্তি আসে তিতিক্ষার বিনিময়ে। পরাধীনতার দীর্ঘ শেকল ভাঙতে বাঙালির লেগেছে হাজার বছরের তপস্যা বা সাধনা। কত ঈশা খাঁ, কত তিতুমীর, কত নূরুলদীন, কত সূর্যসেন দিয়েছেন আত্মবলিদান এই হাজার বছরের নিরবচ্ছিন্ন সাধনায় তা ইতিহাসের পাতা জানে। হাজার বছরের পরাধীনতা হতে মুক্তিতে বাঙালির প্রয়োজন ছিল একজন যাদুকরী নেতা আর একটি মুক্তিসনদ। শত তপস্যার ফলে বাঙালি সেই যাদুকরী নেতাকে পেয়ে যায় মর্ত্যে বাংলার মাটিতে ঊনিশশো কুড়ি সালের সতের মার্চ। মধুমতী-বাইগারে সিক্ত জনপদ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জনক লুৎফর রহমান আর জননী সায়েরার কোল আলো করে জন্ম নেওয়া সেই খোকাই কারো মিয়াভাই, বাঙালির বঙ্গবন্ধুরূপে হয়ে ওঠেন জাতির জনক। ছেচলি্লশে পা দেওয়া পোড় খাওয়া জনতার নেতা মুজিবের হাতেই জন্ম নিয়েছে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত মুক্তির সনদ। ঊনিশশো ছেষট্টির পাঁচ ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের সম্মিলিত বিরোধী দলের কনফারেন্সে সর্বপ্রথম মুজিবের বজ্রনিনাদী কণ্ঠে উত্থাপিত হয় বাঙালির ম্যাগনাকার্টা নামে খ্যাত ঐতিহাসিক ছয়দফা। সেই ছয়দফাই তখন নাম পেয়েছিল 'আমাদের বাঁচার দাবি' হিসেবে। দুহাজার ষোলতে ছয়দফা পার করেছে সুবর্ণ জয়ন্তী। এই মাইলফলক অতিক্রমণের পুণ্য ঘটনাকে কালের গর্ভে ধরে রাখার এক মহান প্রয়াস অধ্যাপক হারুণ-অর-রশীদ প্রণীত 'আমাদের বাঁচার দাবি, ছয়দফার ৫০ বছর' শীর্ষক পাঠকনন্দিত এই গ্রন্থটি।



সত্য কখনো ধরা দেয় না, সত্যকে ছিনিয়ে আনতে হয়। সত্যের জন্যে জগতে সেই আদিকাল থেকে হয়েছে যুদ্ধ, হয়েছে বিপ্লব। বাঙালি জাতির জীবনেও সত্যের প্রতিষ্ঠায় বিপ্লবের সংঘটন ছিল অবশ্যম্ভাবী। আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বাঙালির রক্তদান ও আত্মবলিদানের ঘটনা পৃথিবীতে বিরল। বাঙালি যেমন ভাষার জন্যে প্রাণ দিয়েছে তেমনি বাঙালি প্রাণ দিয়েছে দেশের ভৌগোলিক ও সার্বিক মুক্তির জন্যে। বাঙালির এই ত্যাগ বৃথা যায়নি। বাঙালি এই ত্যাগের ফলে যেমন দেশ পেয়েছে, তমনি পেয়েছে মুক্তির সনদ তথা 'বাঁচার দাবি'। গ্রন্থকার এই অবধারিত ও অবিসংবাদিত মুক্তির সনদের জন্মকাল এবং ঘটনাপ্রবাহে তাঁর পরিণত হয়ে সুবর্ণজন্মজয়ন্তী অতিক্রমণের ঘটনাকেই বিধৃত করেছেন আলোচ্য গ্রন্থের পরতে পরতে। এই গ্রন্থে ছয়টি অধ্যায় আছে। বোঝাই যায়, ছয়টি অধ্যায় মানেই ছয়দফার প্রতীকায়ন। পাশাপাশি আছে বারটা পরিশিষ্ট যা ছয়দফা বিষয়ক আলোচনাকে পূর্ণতা দান করে। বইটির উৎসর্গে লেখক বলেছেন, 'বাঙালির স্বতন্ত্র জাতিসত্তার হাজার বছরের গঠনপর্বকে ধারণ করে আমাদের স্বপ্ন পূরণের মহানায়ক, জাতির পিতা ও স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালবাসায়। ' বইটির প্রচ্ছদ নেওয়া হয়েছে খ্যাতিমান শিল্পী হাশেম খান অঙ্কিত ড্রইং-এর আদলে এবং বইটি প্রকাশ করেছে বাংলা একাডেমি। বইয়ের অধ্যায়গুলো যথাক্রমে-'অসামপ্রদায়িক ভাবাদর্শ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আওয়ামী লীগ', 'আইয়ুব শাসনামল



(১৯৫৮-১৯৬৯) : বাঙালির স্বাধীনতা ভাবনা',



'৬-দফার ৫০ বছর : পরিপ্রেক্ষিত ও তাৎপর্য',



'৬৬ থেকে '৭১', 'বাঙালির রাষ্ট্রচিন্তা ও স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়' এবং 'ঐ মহামানব আসে' উপশিরোনামে পৃথকীকৃত। বারটি পরিশিষ্টের পরে সংযুক্ত হয়েছে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিকভাবেই আলোকচিত্র ও নির্ঘন্ট।



ঊনিশশো পঁয়ষট্টিতে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সতর দিন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ঊনিশশো ছেষট্টির দশ জানুয়ারি উজবেকিস্তানের তাসখন্দে ভারত-পাকিস্তান-এর মধ্যে চুক্তি সম্পাদিত হয়। এই চুক্তির পরিণাম নিয়ে পাকিস্তানের সকল বিরোধী দল দ্বিমত পোষণ করায় ঊনিশশো ছেষট্টি সালের পাঁচ ও ছয় ফেব্রুয়ারি লাহোরে সকল বিরোধী দল এক সভা আহ্বান করে। এই সভায় তৎকালীন পূর্ববঙ্গের অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা শেখ মুজিবুর রহমান সাত সদস্য বিশিষ্ট প্রতিনিধি দল নিয়ে যোগ দেন। এই সভাতেই বিকেলে তিনি তাঁর ঐতিহাসিক ছয়দফা দাবি পেশ করেন। উপস্থিত সকলে তাঁর এ দাবির পক্ষে সহমত পোষণ করেন।



ঊনিশশো ছেষট্টি সালের আঠার, ঊনিশ এবং বিশ মার্চ তারিখে ঢাকার মতিঝিলস্থ ইডেন হোটেলে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এই কাউন্সিলে সারাদেশ হতে চৌদ্দশ তেতালি্লশ জন কাউন্সিলর ঢাকায় আসে। মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ অসুস্থ থাকায় সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম এতে সভাপতিত্ব করেন। আঠার মার্চ বিকেল সাড়ে তিনটায় বিশ্বকবি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিরচিত 'আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি' শীর্ষক উদ্বোধনী সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সভার শুভ সূচনা হয়। উদ্বোধনী সঙ্গীত পরিবেশন করেন জাহেদুর রহিম। এতে কুড়ি তারিখে প্রধান বক্তা ছিলেন আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান। উদ্বোধনী দিনে মুজিবের কণ্ঠে 'ছয়দফা' সকলের সামনে তুলে ধরা হয় এবং সকলকেই ছয়দফার বিষয়ে মনোযোগ প্রদানের জন্যে সাংগঠনিকভাবে প্রচারণা চালানো হয়। ছয়দফাকে তৃণমূলে পৌঁছে দেওয়ার এবং ছয় দফা আন্দোলনের মুখপত্র 'দৈনিক ইত্তেফাক' এর প্রচ্ছদ ছিল সবুজ জমিনের পাশে লালবৃত্ত,



নিচে আমাদের বাঁচার দাবি : ৬ দফা, এর নিচে ১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের অংশবিশেষ, যেখানে 'স্বাধীন ও স্বতন্ত্র রাষ্ট্রসমূহ' প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে।



মুজিবের ছয়দফা ঘোষণার পাশাপাশি অনতিবিলম্বে ছয়দফার শক্তি সম্পর্কে অবহিত হয়ে আইয়ুব নিজেই স্বকণ্ঠে তার সরাসরি বিরোধিতা করতে শুরু করেন। ৬ দফা সম্পর্কে রাজশাহীতে ছেষট্টি সালের ষোল মার্চ তারিখে



আইয়ুব বলেন, 'ইহা বৃহত্তর বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়নেরই একটি পরিকল্পনা। ' তিনি আরও জনগণকে উস্কিয়ে বিশ মার্চ ময়মনসিংহের জনসভায় বলেন, প্রয়োজন হইলে অস্ত্রের মুখে ছয়দফার জবাব দেওয়া হইবে।



 



গ্রন্থকার খুব চমৎকারভাবে মুজিবের ছয়দফার পরিপ্রেক্ষিত তুলে ধরেছেন এবং ছয়দফাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠী ও তার দলের মধ্যে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়াকে ফুটিয়ে তুলেছেন। মুজিবের বয়ানে ছয়দফা কেবল পূর্ব বাংলারই যে মুক্তির সনদ তা-ই নয়, বরং এটি পশ্চিম পাকিস্তানের জন্যেও ভালো পরিণামের নীলনকশা। ছয়দফার বিরুদ্ধে পশ্চিমা সরকার অসহিষ্ণু হয়ে মুজিবকে আবারও কারাবন্দী করে এবং পরবর্তী ধারাবাহিকতায় উত্তাল গণ আন্দোলন চলাকালে ঊনিশশো আটষট্টি সালের জানুয়ারি মাসে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে আরো চৌত্রিশ জনকে ফাটকে ঢোকায়। এতে প্রধান আসামী করা হয় মুজিবকে। এই মামলার খরচ চালানোর জন্যে কুপন ছাপানো হয় এবং অবশেষে জেলে অন্তরীণ সার্জেন্ট জহুরুল হকের মৃত্যু হয়। বহির্বিশ্ব ও দেশীয় রাজনীতির চাপে মুজিব মুক্তি লাভ করেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা শেখ মুজিবকে রাজনীতি বিষয়ে আরো শিক্ষিত এবং আরো পরিপক্ক করে তোলে। তিনি তাঁর আন্দোলনকে এমনভাবে পরিচালিত করতে শুরু করেন যাতে এই আন্দোলন বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে পরিণত না হয়। তাঁর সাত মার্চের ভাষণে এই অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটে এবং শেখ মুজিব তাঁর এই রণকৌশলে অবিসংবাদিতভাবে বিজয়ী হন।



মুজিব যখন তাঁর ছয়দফাকে সামনে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সংগ্রামে লিপ্ত তখন তাঁর কারাবন্দী অবস্থায় তাঁর দলের নেতারা ও ছাত্রলীগের কর্মীরা আট দফা নামে নিজেদের গড়া প্রস্তাব সামনে নিয়ে আসে। তারা বেগম মুজিব ও মুজিবের জেষ্ঠ্যকন্যা শেখ হাসিনাকে চাপ প্রয়োগ করতে থাকে এই প্রস্তাব মেনে নিতে। কিন্তু মুজিব-পত্নীর দৃঢ়তায় সে চক্রান্ত সফল হয়নি। মুজিব-পত্নী এই কথাগুলো সব মুজিবকে জানান এবং মুজিবও সেই মোতাবেক তাঁর ছয়দফাকে আরও বেগবান করে তোলেন।



ছয়দফা ছিল মুজিবের মেধাজাত সন্তান। নিজস্ব মুদ্রাব্যবস্থা, নিজস্ব মিলিশিয়া বাহিনী চেয়ে তিনি বস্তুত স্বাধিকার নয়, ধীরে ধীরে স্বাধীনতার দিকে ধাবিত হচ্ছিলেন। যদিও কৌশলগত কারণে ফেডারেল রাষ্ট্রব্যবস্থাকে এক নম্বর দফা হিসেবে রেখেছিলেন, কিন্তু তাঁর মনের ভিতরে ছিলো সর্বশেষ দফা নিজস্ব মিলিশিয়া বাহিনী গঠনের প্রতি নিবিষ্ট, যাতে ভবিষ্যতে স্বাধীনতার দিকে নিজেদের সহজে ধাবিত করা যায়। ছয়দফা যে সত্যিকার অর্থেই আমাদের বাঁচার দাবি ছিল তা আজ সুবর্ণ জয়ন্তী পেরিয়ে প্রমাণিত হয়ে গেছে দিবালোকের মতো। ছয়দফা যদি না হতো বাঙালি তার সামনে পেতো না কোন হাতিয়ার ও লক্ষ্য। পরন্তু ছয়দফার কারণেই পশ্চিম পাকিস্তানীরা অতিরিক্ত হিংস্র হতে শুরু করেছিল। এরই ফলস্বরূপ বাঙালি বলবান হয়ে উঠে নিরস্ত্র হওয়া সত্ত্বেও।



লেখক হারুণ-অর-রশীদ তাঁর 'আমাদের বাঁচার দাবি, ৬ দফা'র ৫০ বছর' শীর্ষক গ্রন্থের পরিশিষ্টে খুব তাৎপর্যপূর্ণভাবেই লাহোর প্রস্তাবের দলিল উপস্থাপন করেছেন। এই লাহোর প্রস্তাবের উন্মেষের মধ্যেই ছয়দফার বীজ নিহিত আছে। বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবন হতে অর্জিত প্রজ্ঞা আর অভিজ্ঞতায় ছয়দফাকে প্রণয়ন করেছেন, যাতে কারো কাছে তা মনে না হয় কোন বিচ্ছিন্নতাবাদী দলিল। আলোচ্য গ্রন্থের শেষ পরিচ্ছদ হচ্ছে 'ঐ মহামানব আসে। ' সত্যিকার অর্থেই পৃথিবীর ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একজন মহামানব। তিনি না এলে যেমন বাঙালি জাতির পরাধীনতার শৃঙ্খল মুক্তি হতো না তেমনি বাঙালি জাতির স্বপ্ন দেখাও সম্ভব হতো না। আর তাই যথার্থ অর্থেই তিনি ফিদেল ক্যাস্ট্রোর কাছে হয়ে উঠেছেন হিমালয়। ছয়দফা ও তার প্রণেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অমর হয়ে থাকুন হাজার বছর। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু। আমাদের বাঁচার দাবি পার হোক শতবছরের জন্মশতক অচিরেই।



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
১২৫০৩১
পুরোন সংখ্যা