চাঁদপুর, সোমবার ২৩ মার্চ ২০২০, ৯ চৈত্র ১৪২৬, ২৭ রজব ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • চাঁদপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ছেলেটির করোনা ভাইরাস নেগেটিভ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ সে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী নয়। তথ্য সূত্র: আরএমও ডাঃ সুজাউদ্দৌলা রুবেল। || বৈদ্যনাথ সাহা ওরফে সনু সাহা করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যায় নি : সিভিল সার্জন
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৬৭-সূরা মুল্ক


৩০ আয়াত, ২ রুকু, মাদানী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


৩। যিনি সৃষ্টি করিয়াছেন স্তরে স্তরে সপ্তাকাশ। দয়াময় আল্লাহর সৃষ্টিতে তুমি কোন খুঁত দেখিতে পাইবে না; তুমি আবার তাকাইয়া দেখ, কোন ত্রুটি দেখিতে পাও কি?


 


 


 


শিক্ষা মানুষকে সব অবস্থাই সহনশীল হতে শেখায়।


-উইলিয়াম বিললিং।


 


 


 


যে শিক্ষিত ব্যক্তিকে সম্মান করে, সে আমাকে সম্মান করে।


 


 


ফটো গ্যালারি
মোটা চালে চিকন ভাত
কাদের পলাশ
২৩ মার্চ, ২০২০ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


প্রায়শই বিচিত্র আচরণ করেন মালেকা খাতুন। নিজে নিজের সাথে কথা বলেন। কথা বলতে বলতে হাসেন। আরে দূর, যাহ্, ফালতু কথা, এসব বলেন। ক্ষণিক পর আবার স্বাভাবিক হয়ে যান। বিষয়টি যে স্বামী সাইফুদ্দিনের দৃষ্টিগোচর হয় না তা কিন্তু নয়। এমনটি যে কারো বেলায় হতে পারে ভেবে ভুলে যায় সাইফ।



সেদিন প্রাক-প্রাথমিকে পড়া মেয়েটার চোখ যেন আসমানে ওঠার জোগাড়। শঙ্খচিল চোখের মতো বড় বড়। স্কুল মাস্টারির সামান্য বেতনে কখনো চিকন চালের ভাত রান্না হয়নি এ ঘরে। এবারই প্রথম চিকন চালের ভাত দেখলো লাবণ্য।



কাশ ফুলের মতো সাদা ভাত দেখে মেয়েটা জানতে চায়, আব্বু আমাদের ভাতগুলো এতো চিকন হলো ক্যামনে?



সাইফ ভাত খেতে বসে এমন বিভ্রান্তিকর প্রশ্নের কী জবাব দেবে ভেবে পায় না। অবশ্য সে নিজেও জানে না কীভাবে ভাতগুলো এতো চিকন হলো। এ ঘরেতো কখনো মিনিকেট আনা হয় না। মেয়ের মতো বাবার মনেও একই প্রশ্ন। কিন্তু জবাব মিলবে কিভাবে? অবশ্য সাইফ ভেবাচেকা খেয়ে মেয়েকে গোঁজামিল জবাব দেয়।



মারে... আমাদের ঘরের মোটা চালগুলো পাতিলে সেদ্ধ হতে হতে চিকন হয়ে গেছে।



-তয় এতোদিন চিকন হলো না ক্যান?



সাইফ মেয়ের কথার জবাব না দিয়ে দ্রুত খাবার শেষ করে। তখনো পিতা-কন্যা মোটা চালে চিকন ভাত হয়ে ওঠার রহস্য উন্মোচন করতে পারে না।



বাপ-মেয়ের গুনগুন কথাগুলো মালেকা খাতুনের কান পর্যন্ত পৌঁছায় না। নয়তো তিনি যথাযথ একটা জবাব দিতে পারতেন। কিন্তু সকাল থেকে রাত অবধি ঘরের কাজ করতে করতে সর্বংসহা হয়ে উঠেছেন তিনি। এখন মেয়ের আবদার ছেলের কান্নাগুলো কমন মনে হয় মালেকা খাতুনের কাছে। পাশের ঘরের ভাবী সবসময় মিনিকেট চাল খায়। রান্না করা ভাত কতো চিকন মিহি হয়। কতো আহ্লাদী চেহারা ভাতগুলোর। মাঝে মাঝে কুকুরকে দেয়া উচ্ছিষ্ট খাবার দেখেই জেনেছে মালেকা খাতুন। যদিও এ নিয়ে কোনো আফসোস নেই তার। তবে চিকন চালের ভাত রান্না করে স্বামী সন্তানকে খাওয়াতে খুব ইচ্ছে পোষণ করেন মনে। টানাপোড়েনের সংসারে স্বামীকে এমন ইচ্ছের কথা বললে ক্ষেপেও যেতে পারেন, তাই বলা হয়নি। সেদিন সবার অগোচরে ভাবীদের ঘরে গিয়েছিলেন মালেকা। ভাবী ঘরে ছিলেন না, কারণ মেয়েকে নিয়ে স্কুলে গেছেন। মালেকা ফেরেন বেশ কিছু সময় পর। বিষয়টি শুধু মালেকা আর পাশের ঘরের ভাবীর স্বামী জানেন। তিনি বেশ মস্ত বড় মানুষ। চাকুরি ব্যবসা দুইটা একসাথে করেন। তাইতো বার মাস চিকন চালের ভাত রান্না হয় ওই ঘরে।



ছেলেটা একটা সাইকেল বায়না করেছিলো বহুদিন। সাইফ নিচু গলায় ছেলেকে বোঝায়। নিজের অসহায়ত্বকে পর্দার ওপাশে রেখে জবাব দেয়, তুমি বড় হয়ে হেলিকপ্টার চালাবে বাবা।



-তখন হেলিকপ্টার চালাবো। এখন সাইকেল কিনে দাও।



-সাইকেল চালালে হেলিকপ্টার চালানো শিখতে পারবে না। তাই সাইকেল চালানোর দরকার নাই।



-তাহলে সবুজ রঙের একটা বেলুন দাও।



-আচ্ছা বাবা। স্কুলে যাবার সময় দেবো।



গতবছর মেয়ের জন্মদিন পালন করতে হয়েছিলো সাইফুদ্দিনের। মেয়ের খুব বেশি আকুতি আর ভনিতার কারণে না করে উপায় ছিলো না। সেবারের কিছু বেলুন উপড়ি ছিলো। একশ বেলুন সত্তর টাকায় কেনা। মাঝেমাঝেই ছেলে-মেয়ের আবদার মেটায় ওই বেলুনগুলো।



অংকের শিক্ষক বলে সাইফুদ্দিন কিছু টাকায় বাড়তি আয় করতে পারে। সে আয় থেকে কিছু সঞ্চয় করে। ছেলে-মেয়ে বড় হচ্ছে। দায়িত্বও বাড়ছে। খরচ বাড়ছে। মেয়ে স্কুলে ভর্তি হয়েছে। স্কুলের পোশাক, বই খাতা কলম, নিয়মিত যাতায়াত খরচ। আরো কতো কী। অথচ সাইফুদ্দিনরা দুই যুগ আগে অন্তত তিনক্রোড় হেঁটে স্কুলে যেতো। দুপুরের লাঞ্চের ব্রেক হলেও লাঞ্চ করা হতো না। বিকেল চারটায় স্কুল ছুটি শেষে বাড়ি আসতে আসতে পেট ছোঁ ছোঁ করতো। মুখ শুকিয়ে বইচা বইচা হয়ে যেতো। এখন সময় পাল্টেছে। বাচ্চাদের স্কুলে যাবার সময় টিফিন দিয়ে দিতে হয়। না হয় টাকা দিতে হয়। সাইফুদ্দিন মেয়েকে নিজে স্কুলে দিয়ে আসে। প্রতিদিন দশ টাকার বেশি দিতে পারে না। অবশ্য সকালে মালেকা খাতুন আটার রুটি আর আলু ভাজি একটি প্লাস্টিকের কৌটায় দিয়ে দেয়। তা দিয়েই দুপুরের খাবার চলে। বাচ্চা মানুষ কতক্ষণ বাদে বাদেই ক্ষুধা লাগে। যদিও প্রাক-প্রাথমিকের ক্লাস দুপুরের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়।



রান্না করা মোটা চালের ভাত চিকন হয়েছে কীভাবে মেয়ে আর জানতে চায় না। তবে সাইফুদ্দিনের মনে তো প্রশ্ন রয়েই যায়। স্কুলে গিয়ে ক্লাসে মনে পড়ে। কিন্তু বাড়ি এলে সব ভুলে যায়। যে কারণে অনেকদিন হয় এর রহস্য আর জানা হয়ে উঠে না। ওই একদিনই চিকন চালের ভাত রান্না হয়েছিলো ঘরে।



চিকন ভাতের স্বাদে ভিন্নতা পেয়ে পরের বার চাল কেনার সময় দোকানীর কাছে জানতে চেয়েছিলেন মিনিকেট চালের দাম কতো। দোকানী জবাবে বলে, পঞ্চাশ থেকে সত্তর টাকার মধ্যে। কোন্টা নেবেন স্যার। এমন প্রশ্নে বিব্রত হয় সাইফ।



-আরে না । এমনিতেই জানতে চেয়েছি। আমাদের জন্যে মোটা চালই ভালো। সকালে রান্না করলে রাতেও খাওয়া যায়। তাছাড়া চিকন চাল প্রতিবেলায় রান্না করে খেতে হয়। না হয় পাতিলের নিচ দিয়ে ভিজে উঠে। দাও দাও দশ কেজি চাল দাও। মোটা চাল-ই দাও।



দোকানী দশ কেজি চাল দেয়। তিনশ চলি্লশ টাকা। সাইফুদ্দিন ভাবে চালের দাম যদি আরো কমতো কতো উপকার হতো। মাস শেষে আরো কিছু টাকা সঞ্চয় করা যেতো। মেয়েটা লকলেকিয়ে বড় হচ্ছে। ছেলেও স্কুলের যাবার পথ ধরছে। খরচ বাড়ছে। নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্যের যে হারে দাম বাড়ছে, স্কুলের বেতনে মাস কাভার করাই দায় হয়ে পড়ছে। সঞ্চয়তো দূরের কথা। এখন টিউশনিও করতে হয় চুরি করে। সরকারের কতো বাধা নিষেধ। আরে এটা কোন্ আজব দুনিয়া? মেধা খরচ করে দুই চার টাকা কামাই তাও সরকারের ভালো লাগে না। অবশ্য সরকারেরও বা কী করার আছে? যে হারে প্রশ্ন ফাঁস হয়। সরকার কঠিন না হয়ে উপায় কী? কোচিং বন্ধ করেছে খুব ভালোই করেছে। মানুষ এখন হঠাৎ বড় লোক হতে চায়। এ মনোভাব টিচারদের মাঝে তৈরি হয়েছে। এভাবে চললেতো সরকার কঠোর হবেই।



মেয়েটা এবার ক্লাস থ্রিতে উঠেছে। ছেলে প্রাক প্রাথমিক ভর্তি হয়েছে। খরচ বাড়ছে। ওদিকে টিউশনিও করতে এখন ইতস্তত হয়। নিজেকে চোর চোর লাগে। খুব ছোট মনে হয়। কিন্তু উপায়তো দেখছে না সাইফ। সে দিনদিন যেন নিজের কাছেই হেরে যায়। পায়ে জুতা জোড়া অনেক পুরানো হয়েছে। স্কুলে এ জুতা পরে গেলে শিক্ষার্থীরা পায়ের দিকে বারবার তাকায়। এতে লজ্জা লাগে। কিন্তু করার কীইবা আছে? বরং শিক্ষার্থীরা জুতা নিয়ে যেন কোনো প্রশ্ন না করে বারবার লেকচারের ধরণ পাল্টায়। গল্প বলে। ক্লাসে গল্প বললে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ কাড়া যায়। এতে পড়াতেও সুবিধা হয়। যদিও সাইফ এভাবে নিজের প্রতি দৃষ্টি সরায়। তাই কখনো শিক্ষার্থীরা জুতা নিয়ে প্রশ্ন করার আর সুযোগ পায় না।



স্কুলের শিক্ষার্থীরা ভয়ে বা সুযোগ না পেয়ে জুতা বিষয়ক প্রশ্ন না তুললেও স্ত্রী মালেকা খাতুন কিন্তু ঠিকই নজর রাখছে। সেদিন স্কুল যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে সাইফুদ্দিন। স্ত্রী মালেকা খাতুন বলেন, কইগো শুনছে?



-কী? বল।



-তোমার জুতোগুলো অনেক পুরানো আর ছিঁড়ে গেছে। একজোড়া জুতো কিনে নিও।



-আরে না। অনেকদিন হয় পালিশ করি নাতো । তাই তোমার কাছে এমন মনে হচ্ছে। আজই কালি করো আনবো। তখন দেখবা পুরো নতুনের মতো হয়ে গেছে।



-আরো না এ জুতো পালিশ করলে নতুনের মতো হবে না বরং পুরানোই থাকবে। আজই একজোড়া জুতা কিনে নিও।



হঠাৎ সাইফুদ্দিনের সেই চিকন ভাতের কথা মনে হয়। মনে মনে ভাবে বিষয়টি নিয়ে আজই কথা বলি। অনেক দিনইতো হয়ে গেলো। রহস্যতো আর জানা গেলো না। আচ্ছা সেদিন চিকন চালের ভাত আসলো কোথা থেকে প্রশ্ন করে সাইফুদ্দিন।



মালেকা এতোদিনে ভুলে গেছে কোন্ ভাতের কথা বলছে। মালেকাকে মনে করিয়ে দেয় সাইফ। মালেকা মনে করতে পারে না। সবশেষ সাইফুদ্দিন বলে, প্রায় তিন বছর আগের কথা। একদিন ঘরে চিকন চালের ভাত খেয়েছিলাম। লাবণ্য জানতে চেয়েছিলো ভাতগুলো চিকন হলো কী করে। আমি কিছু বলতে পারিনি। তাছাড়া আমিও তো জানি না। তোমাকে বলি বলি করে বলা হয় না।



-অনেক পুরানো কথা মনে না থাকারই কথা। সাইফুদ্দিন মনে করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। মালেকা খাতুন প্রথম বারেই বুঝতে পেরেছে কোন্ চাল আর ভাতের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু মালেকা এ বিষয়ে কোনো জবাব দিতে চাচ্ছে না। শুধু কথা ঘুরায় । জবাব যেন না দেয়া লাগে। কিন্তু সাইফুদ্দিন যেন নাছোড়বান্দা। ততোক্ষণে স্কুলের সময় হয়। সাইফুদ্দিন ব্যর্থ হয়ে এ বিষয়ে আর জানতে না চেয়ে ঘর থেকে বের হয়। স্কুলের দিকে পা বাড়ায়। মালেকা খাতুন যেন দম ছেড়ে বাঁচে। হঠাৎ করে কোত্থেকে যে এ কথা মনে হলো। এ ঘরের সব কিছুই মালেকা খাতুনের জানাশোনা। কোথায় একটা সুঁই, কোথায় একটি সুতার বান্ডিল কিংবা কোথায় সাইফুদ্দিন অল্পকিছু টাকা সঞ্চয় করেছে। সেদিনের মোটা চাল চিকন হওয়ার রহস্যও তার জানা। কিন্তু মালেকা খাতুন ওই চালের কথা মনে করিয়ে আফসোস বাড়াতে চান না। যে কারণে সাইফুদ্দিনকে মোটা চালে চিকন ভাতের গল্প খোলসা করে না।



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
১২৪৪৫৯
পুরোন সংখ্যা