চাঁদপুর, সোমবার ১১ মে ২০২০, ২৮ বৈশাখ ১৪২৭, ১৭ রমজান ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৬৮-সূরা কালাম


৫২ আয়াত, ২ রুকু, মক্কী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


৪৪। ছাড়িয়া দাও আমাকে এবং যাহারা এই বাণীকে প্রত্যাখ্যান করে তাহাদিগকে, আমি উহাদিগকে ক্রমে ক্রমে ধরিব এমনভাবে যে, উহারা জানিতে পারিবে না।


 


 


 


 


 


 


হাজারো সমালোচকের মধ্যে যে সুষ্ঠুভাবে কাজ করে যায়, সেই যথার্থ কর্মী।


-এ. ডাবিস্নউ হ্যারি।


 


 


বিদ্যালাভ করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য অবশ্য কর্তব্য।


 


 


 


 


উত্তম-সুচিত্রা : তারকা প্রথার পাঁচ ফোড়ন
বিধান রিবেরু
১১ মে, ২০২০ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


তারকা বলি কিম্বা তারকা জুটি, তাঁরা যে কারণে রূপালি পর্দার তারা হয়ে ওঠেন, তার পেছনে রয়েছে গণিত, এই গণিতের একদিকে যদি থাকে দর্শকের বাসনা পূরণ, তো অপরদিকে পুঁজি-পণ্য-বিনিময়। মাঝখানে শিল্পী স্বয়ং। বাজারের এই অংক মেনেই সাধারণ অভিনয় শিল্পী জনপ্রিয় হন, উত্থান ঘটার পর তারকা হন, এরপর তারা ধীরে ধীরে মহাতারকা হয়ে ওঠেন। যেমন সুচিত্রা সেন ও উত্তমকুমার। তাঁদেরও বন্ধুর পথ পারি দিতে হয়েছে। উত্তমকুমারের তো ডাকনাম হয়ে গিয়েছিল 'ফ্লপমাস্টার জেনারেল', কারণ প্রথম সাত ছবিতে ভাগ্যের শিকে ছেঁড়েনি তাঁর! আর সুচিত্রা সেনের তো উচ্চারণের জন্য পরিচালকের মার পর্যন্ত খেতে হয়েছিলো। 'ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য' (১৯৫৩) তৈরির সময় শুধু মার নয়, বকাঝকাও খেয়েছেন পরিচালক দেবকী বসুর কাছ থেকে। বোঝাই যাচ্ছে তারকা হওয়া সহজ কাজ নয়। সময় লাগে। ধৈর্য লাগে। সঙ্গে সাধনাও।



চলচ্চিত্র প-িত মারিয়া প্রামাগিয়র ও টম ওয়ালিস চিত্রজগতের তারকা প্রথাকে পাঁচভাগে ভাগ করেছেন। তাঁরা পাঁচটি ভাগে নানা উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন কী করে একজন তারকা তাঁর খ্যাতি, প্রভাব, দাপট, জনপ্রিয়তা ইত্যাদিকে সামাল দেন। আর সমাজ ও সংস্কৃতিই বা কিভাবে একজন তারকাকে ধারণ করে। আমরা সেই পাঁচটি ভাগকে যদি কিঞ্চিত স্থানীয়করণ করি, তাহলে পাবো : চিত্রকারখানা ও তারকার দাপট, শিল্পীর দক্ষতা, তারকার ভাবমূর্তি, খ্যাতি ও আদর্শ এবং তারকা ও ভক্তকূল। আমরা এগুলোর আলোকেই পুনর্বার দেখে নেবো সুচিত্রা সেন ও উত্তমকুমারের জুটিকে।



চিত্রকারখানা ও তারকার দাপট



একটি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি বা চিত্রকারখানায় তারকারা আদতে অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করেন। আগে স্টুডিওভিত্তিক চুক্তির মাধ্যমে অভিনয় করার চল থাকলেও পঞ্চাশের দশকে, উত্তম-সুচিত্রার আমলে সেই চল উঠে যায়। তারা স্বাধীনভাবেই বিভিন্ন প্রযোজক ও পরিচালকের সাথে কাজ করেন। এই 'প্যাকেজ ইউনিট অ্যাপ্রোচে' কাজ করার সুবাদে উত্তম ও সুচিত্রাকে নিয়ে কারখানার অনেকেই ব্যবসা করতে পেরেছেন, তাতে একক কোনো স্টুডিওর বিধিনিষেধ থাকেনি। একই সময়ে তাই তারকারা একাধিক ছবিতেও কাজ করতে পেরেছেন। আর এ কারণেই বিনোদন দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তারকার প্রভাব, কোনো একক স্টুডিওর নয়।



তারকার দাপটের নমুনা হিসেবে বলি, একবার টালিগঞ্জের শুটিং ফ্লোরে অভিনেত্রী সন্ধ্যারাণীর সাথে সকলের সামনে চরম দুর্ব্যবহার করেন একজন পরিচালক। মৃদুভাষী ও নরম মনের মানুষ সন্ধ্যারাণী এতে অপমানিত হয়ে ফ্লোর থেকে বেরিয়ে গিয়ে এক কোণে বসে কাঁদতে থাকেন। পাশের ফ্লোরেই অন্য ছবির শুটিং করছিলেন উত্তমকুমার। কথাটি তাঁর কানে যায় এবং তখনই তিনি শুটিং বন্ধ করে চলে আসেন সন্ধ্যারাণীর কাছে। সকলের মতো উত্তমও তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন। অভিনেত্রীর সামনে দাঁড়িয়ে উত্তম বলেন, এই ঘটনার বিহিত না হলে, তিনি তো কাজ করবেনই না, অন্য কেউই কাজ করবেন না। সকলেই একমত হলেন এতে। শেষে ঐ পরিচালককে হাতজোড় করে ক্ষমা চাইতে হয়েছিল।



শিল্পী ও কলাকুশলীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য উত্তম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শিল্পী সংঘ। আমৃত্যু তিনি এই সংঘের সভাপতি ছিলেন এবং নিষ্ঠার সঙ্গে দরিদ্র শিল্পী ও কলাকুশলীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। স্টুডিও পাড়ার ছত্রিশজন গরীব প্রযোজনা সহকারীকে উত্তম নিজে দুই কাঠা করে জমি কিনে দিয়েছিলেন টালিগঞ্জের কাছে নেপালগঞ্জে। কাজেই এমন তারকার প্রভাব কারখানাতে থাকবে সে আর আশ্চর্যের কী!



সুচিত্রার দাপটও কম ছিলো না। সত্যজিৎ রায়ের মতো পরিচালকের কাজ তিনি ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন, চুক্তিনামায় শুধু 'এঙ্ক্লুসিভ' শব্দটি থাকায়। সত্যজিৎ চেয়েছিলেন সুচিত্রা যখন তাঁর ছবিতে কাজ করবেন, তখন যেন তিনি আর কোনো ছবিতে যুক্ত না থাকেন। সত্যজিৎ ও প্রযোজক আরডি বনশাল এ নিয়ে কথা বলে গেলে, সুচিত্রা বলেছিলেন, তিনি মনপ্রাণ দিয়ে কাজ করবেন তাঁদের ছবিতে। কিন্তু পরে একদিন আরডি বনশাল যখন চুক্তিপত্র নিয়ে যান এবং সেখানে ঐ শব্দটি দেখেন সুচিত্রা সেন, তখন তিনি সরাসরি 'না' করে দেন। সুচিত্রার জবানিতে, 'আমি ফর্মটা নিয়ে এঙ্ক্লুসিভ দেখা মাত্র ফর্মটা ছুড়ে ফেলে দিলাম বনশালের দিকে। বললাম থ্যাংক ইউ মিস্টার বনশাল, আপনি এখন যেতে পারেন। আমি আপনার ছবিতে কাজ করব না। ব্যস ওই হয়ে গেল সত্যজিৎবাবুর সঙ্গে কাজ করা। আমি কিছুতেই রাজি হলাম না ওঁর শর্তে।"



সত্যজিতের মতো পরিচালককে ওভাবে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য বুকের পাটা লাগে। তাছাড়া সুচিত্রার যুক্তি ছিল, এতদিন ধরে যারা তাঁকে তিলে তিলে সুচিত্রা সেন করে তুলেছেন, তাঁদের কাজ বন্ধ রেখে তিনি সত্যজিৎ রায়ের কাজ করতে পারবেন না। সত্যজিৎ যখন 'দেবী চৌধুরানী' করার প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলেন, তখন সুচিত্রা দুটি ছবির কাজ করছিলেন। কাজেই সেগুলো বাদ দিয়ে তিনি শুধুমাত্র রায়ের ছবিতে সময় দিতে চাননি।



সুচিত্রার এমন দাপটের আরেকটি নমুনা দেয়া যায়। এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে সুচিত্রা বলেছিলেন. "উত্তমের সঙ্গে আমার এত ছবি, কিন্তু আমি প্রোডিউসারকে বলেছিলাম, আমার নাম বিজ্ঞাপনে আগে দিতে হবে। তারপর সব ছবিতে দেখবে সুচিত্রা-উত্তম, উত্তম-সুচিত্রা নয়।"



দাপট ছাড়া কি কারখানায় তারকা হয়ে ওঠা যায়? ধীরে ধীরে নিজের প্রভাব ও দাপট প্রতিষ্ঠা করার মধ্য দিয়েই একজন তারকা হয়ে উঠে এবং তারকা হিসেবে নিজেকে বহাল রাখে। দাপট বা প্রভাবহীন তারকারা যে কোন তারকা নয়, সেটা উত্তম-সুচিত্রা বুঝতেন। সে কারণেই কারখানায় তাঁরা নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন এবং নিজের দাপট বজায় যেন থাকে, সেই প্রচেষ্টাও করেছেন, জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে।



শিল্পীর দক্ষতা



কেউ যদি এক কথায় উত্তর চান, উত্তম-সুচিত্রা কেন বিখ্যাত? উত্তর হবে অনস্ক্রিন রোমান্স, কিন্তু পর্দার প্রেমকে কেন এত লাখ লাখ ভক্ত হৃদয়ে স্থান দিয়েছেন? কারণ উত্তম ও সুচিত্রা নিজেদের বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পেরেছিলেন পর্দায়। তারা বিশ্বাস করাতে পেরেছেন তারা সত্যি সত্যি একে অপরের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছেন। যদিও আমরা জানি, বাস্তবে নানা মাত্রিক সম্পর্কে জড়িয়ে ছিলেন তাঁরা : বন্ধু, সহশিল্পী ও প্রতিদ্বন্দ্বী। অস্বীকাররের জো নেই তাদের ভেতর 'প্রেম' ছিল না। তবে প্রেমটা অন্য সবকিছুকে ছাপিয়ে উঠেনি বাস্তবে। যা বাস্তবে অবদমিত, সেটাই যেন পর্দায় গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। পর্দা যেন পরিণত হয়েছিলো উত্তম-সুচিত্রার অচেতনে। মানুষ তাই সচেতন চিত্তেই তাঁদের রসায়নকে স্বাগত জানিয়েছে।



তাই বলে এটা ভাবার কোনো কারণ নেই, বাস্তবের অভাব পর্দায় পূরণ হলো বলেই তা সার্থক হলো, না, তা নয়। অভিনয়ে তারা দক্ষ ও মেধাবী। তাছাড়া পর্দায় একটি নির্দিষ্ট ভাবমূর্তি তারা ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। উত্তম ও সুচিত্রাকে কেউ কোনোদিন প্রেমিক-প্রেমিকার চরিত্র ছাড়া অন্য কোনো চরিত্রে একই ছবিতে অভিনয় করতে দেখেননি। তাছাড়া প্রযোজকরাও চেয়েছেন তাঁদের রসায়নকে কাজে লাগিয়ে একইরকম ছবি বানাতে, যার মাধ্যমে মুনাফা নিশ্চিত হয়। সংস্কৃতি কারখানার ধর্মই তাই।



উত্তম-সুচিত্রা সেই জুটি, যাদের ছবি দেখার জন্যে কলকাতার মানুষ অগ্রিম টিকিট কেটেছে। বসুশ্রী সিনেমা হলের মালিক মন্টু বসুর কথায়, "সাদা-কালো বিজ্ঞাপনে খবরের কাগজে ছাপা উত্তম-সুচিত্রার নতুন ছবির ঘোষণা আর সেখান থেকেই শুরু ইতিহাসের। ছুটির দিনের অ্যাডভান্স তো আগেই কাটা হয়ে যেত। ফ্রন্ট রো, মিডল স্টল, ব্যালকনি আর সার্কল। সর্বোচ্চ তিন টাকা। একজন দিনে দু-তিনবার করে একই সিনেমা দেখেছেন, এই দৃশ্য বছর ৫০ আগে আমি দেখেছি। আরে বাবা, অগ্রিম টিকিট কাটার চল শুরু হলো তো এই জুটির হাত ধরেই। আমরা তিনদিনের অগ্রিম টিকিট দিতাম। তাতেও দর্শকদের চাপ সামলাতে হিমশিম খেতাম।"



উত্তম-সুচিত্রা একত্রে ২৯টি ছবিতে জুটি হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁরা অন্য নায়ক-নায়িকার সাথেও জুটি বেঁধেছেন। তবে বলা বাহুল্য নয়, সেগুলো চিরসবুজ জুটির তকমা পায়নি। দুজনেই গুণী অভিনয়শিল্পী, কিন্তু দুজন একসাথে যখন হয়েছেন পর্দায়, তখন সেখানে আগুন ধরে গিয়েছে, আর মানুষের মনে নেমে এসেছে ফাগুন।



আগুন-ফাগুনের পেছনে শিল্পীর দক্ষতা ও মেধা ছাড়াও আরো দুটি বিষয়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য, সেগুলো হলো : মিজোঁসেন ও সিনেমাটোগ্রাফি। মিজোঁসেন বলতে বোঝাচ্ছি, ছবিতে যে নির্মিত বাস্তবের বিপরীতে তাঁরা অভিনয় করেছেন সেটা, মিজোঁসেন তাঁদের দক্ষতার পরিপূরক হয়েছে, সহায়ক হয়েছে। ধরুন 'চাওয়া পাওয়া' (১৯৫৯) ছবিতে উত্তম ও সুচিত্রার ছাদের দৃশ্যটি। চারপাশ খোলা, গাছ-গাছালি, বিস্তৃত দিগন্ত। রোমান্টিক আবহাওয়া। উত্তম উদাস ভঙ্গিতে গান ধরেছেন। সুচিত্রার গলায় মালা। পরিবেশ, প্রতিবেশ ও প্রপস সব মিলিয়ে একটি আবহ তৈরি হয়েছে। যেখানে প্রেম জমে ওঠে। আবার যদি বলি, 'আলো আমার আলো' (১৯৭২) ছবির কথা। সাগরকে পাশে রেখে বালুকাবেলায় দুজন নরনারী হাত ধরে হাঁটছেন। প্রাণোচ্ছল। অথবা 'সপ্তপদী' (১৯৬১) ছবির সেই বিখ্যাত গান 'এই পথ যদি না শেষ হয়', দুজনে মিলে দ্বিচক্রযানে যাচ্ছেন আর দুপাশে পথ সরে সরে যাচ্ছে। যেন অনন্তকাল ধরে এই নরনারী ছুটেই চলেছেন একসঙ্গে। প্রেমী যুগলের এক শাশ্বত সফর যেন।



সিনেমাটোগ্রাফির ক্ষেত্রে যুগলকে জনপ্রিয় করার পেছনে মূল কাজটি করে ক্লোজআপ। 'ইন্দ্রানী' (১৯৫৮) ছবিতে বরবধূ বেশে উত্তম-সুচিত্রার যে রূপ ধরা পড়ে অথবা 'শাপমোচন' (১৯৫৫) ছবিতে উত্তমের বুকে সুচিত্রার আশ্রয় খোঁজার যে দৃশ্য পর্দায় বড় করে তুলে ধরা হয়, সেগুলোর মধ্য দিয়ে ক্যামেরার সামনের রসায়ন আসলে সংবাহিত করা হয় দর্শকের মনেও।



ক্লোজআপ আসলে কী? ক্যামেরার এই বিশেষ শটের মাধ্যমে মিজোঁসেন থেকে অনেক কিছুই বাদ দেয়া হয়, সাবজেক্ট যদি নায়ক-নায়িকা হয়, তাহলে তারাই হয়ে উঠেন মুখ্য, তাদের মুখের অভিব্যক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠে দর্শকের কাছে। কপালের ভাঁজ, চোখের চঞ্চলতা, ওষ্ঠাধরের কম্পন সবই নজরবন্দী হয় দর্শকের। ক্লোজআপের মাধ্যমেই দর্শকের মনে স্থায়ী স্থান করে নেন শিল্পীরা। একটি ছবিতে নায়ক-নায়িকার কতগুলো ক্লোজআপ আছে, সেটা দেখেই বোঝা যায় পরিচালক জুটি তৈরির চেষ্টা করছেন কি না। উত্তম-সুচিত্রার যত চলচ্চিত্র আছে, সেগুলোর প্রত্যেকটিতেই ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ানো দুই তারকার ক্লোজআপ দেখা যাবে। এই বিশেষ কৌশল ছবির পর ছবি প্রয়োগ করা হয়েছে বলেই জুটি হিসেবে উত্তম-সুচিত্রা আজ অবিসংবাদিত জুটি হয়ে ফ্রেমবন্দী হয়ে আছে মানুষের মনোজগতে।



আরেকটি ব্যাপার ভুলে গেলে চলবে না, সেটি হলো মিজোঁসেন বলি অথবা সিনেমাটোগ্রাফি, সিনেমার ভাষাকে ভালো করে না বুঝলে একজন শিল্পী নিজের সেরা কাজটি উপহার দিতে পারবেন না। যেমন যখন দেখানো হচ্ছে উত্তম-সুচিত্রা মোটর সাইকেলে করে গান গাইতে গাইতে পথ চলছেন, তখন সেরকম অভিব্যক্তিই ফুটিয়ে তুলতে হয়েছে তাঁদের। আবার ক্যামেরার চোখ যখন কাছে আসছে, ক্লোজআপ শট নিচ্ছে, তখন তাঁরা সেই মোতাবেকই অভিব্যক্তি দিচ্ছেন, তাঁরা জানেন বড় পর্দায় এই কাছ থেকে ধারণ করা দৃশ্যটিই দেখানো হবে। কাজেই মুখের কোন্ পাশ ক্যামেরার দিকে রাখলে তাঁকে ভালো লাগবে, বা আলোকসম্পাতের পুরোটা মুখের উপর আনা যাচ্ছে কি না, সেসবও তাঁদের খেয়াল রাখতে হয়েছে। অতয়েব, শুধু অভিনয় দক্ষতা নয়, মাধ্যমটি ব্যবহারের দক্ষতাও থাকতে হয় একজন শিল্পীর। এই দুটোই উত্তম-সুচিত্রার ভেতর উত্তম রূপেই ছিলো।



তারকার ভাবমূর্তি



তারকারা বায়বীয় কিছু নন, তারাও রক্তমাংসের মানুষ। অনস্ক্রিন ও অফস্ক্রিন দুই জগত নিয়েই জীবন কাটাতে হয় তারকাদের। তারা ব্যক্তিজীবনকে প্রকাশ্যে অতোটা আনতে না চাইলেও, চলচ্চিত্রের জীবন কিন্তু ঠিকই প্রভাব ফেলে তাতে। দুয়ের দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের ভেতর দিয়ে তারকার এক ধরনের ভাবমূর্তি ও ব্যক্তিত্ব তৈরি হয়। এটাই আসলে প্রভাব ফেলে দর্শকের মনে। উত্তম-সুচিত্রার বেলাতেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।



শিল্পী সত্তা ও সাধারণ মানুষ, দুয়ে মিলে যতটুকু ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছিল উত্তম ও সুচিত্রার, জুটি হিসেবে, তার পেছনে চলচ্চিত্রের অবদানটাই মুখ্য। ছবি মুক্তির আগে ও পরে প্রচারিত পোস্টার, খবরের কাগজের বিজ্ঞাপন ও গানের বই ইত্যাদির কারণেও একধরনের ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছিলো উত্তম ও সুচিত্রার এবং মজার বিষয় যেহেতু তাঁদের সব ছবিই প্রেমকেন্দ্রিক, তাই জনগণের সাংস্কৃতিক মনোজগতে তাঁরা হয়ে উঠেছিলেন পৌরাণিক প্রেমের মানব-মানবী। এই যুগলের ভাবমূর্তিকে আরো পোক্ত করেছে গণমাধ্যম। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সাক্ষাৎকার, খবর, সমালোচকদের মন্তব্য, এমনকি গুজবও সমান পাল্লা দিয়ে এই জুটিকে চিরহরিৎ করে রেখেছে আজো।



সাক্ষাৎকারে যখন সুচিত্রা বা উত্তম একে অপরকে উল্লেখ করে কিছু বলেন, তখন সেটি কিন্তু সাধারণ দর্শকের মনে দাগ কেটে যায় এবং সেই অনুভূতি নিয়েই দর্শক তাদের অভিনীত ছবি দেখতে বসে। তাঁদের চর্চা করে।



উত্তমের সঙ্গে সুচিত্রার ব্যক্তিগত সম্পর্ক বিষয়ে একবার প্রশ্ন করা হলে, উত্তম উত্তর দিয়েছিলেন, "রমার সঙ্গে একটা ইমোশনাল অ্যাটাচমেন্ট তো আমার চিরকালই আছে।" অপরদিকে একই রকম প্রশ্নের জবাবে সুচিত্রা বলেছিলেন, "উত্তমের উপর নানা ব্যাপারে ভীষণ নির্ভর করি।"



উত্তমকুমার যখন রোমান্টিক নায়ক হিসেবে নিজের সেরাটা দিতে পারছিলেন না, সঠিক নায়িকার অভাবে, তখন সুচিত্রা সেনের আগমন তাঁকে সেই সুযোগ করে দিয়েছিলো, তাই কৃতজ্ঞতা জানাতে ভোলেন নি উত্তম। ক্যারিয়ারের যখন বারোটা বেজে যাচ্ছিলো, তখন 'রমা এসে আমাকে বাঁচিয়ে দিল,' বলতেও দ্বিধা করেননি উত্তম। সুচিত্রাও দ্বিধা করেননি, এটা বলতে যে, উত্তমের সঙ্গে তাঁর ছিলো 'গভীর বন্ধুত্ব'।



সুচিত্রা যে উত্তমকে 'উতু' বলে ডাকতেন, সেটাও তো আর অজানা থাকেনি মিডিয়ার কল্যাণে। স্বামী দিবানাথ সেনকে সুচিত্রা ডাকতেন 'তুতু' বলে। বোঝাই যাচ্ছে 'তুতু' আর 'উতু' কতটা কাছাকাছি। শুধু তাই নয়, সাংবাদিকদের আশীর্বাদে এটাও প্রকাশ পায়, গভীর রাত পর্যন্ত ফোনালাপ চলতো উত্তম ও সুচিত্রার। এমনকি ফোনে উত্তমকে চুমুও খেতেন সুচিত্রা। এসব খবর আমাদের জানিয়েছেন সুচিত্রার অন্তরঙ্গ বন্ধু ও সাংবাদিক গোপালকৃষ্ণ রায়।



উত্তমের দ্বিতীয় সঙ্গিনী ও অভিনেত্রী সুপ্রিয়া দেবীর জবানিতেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। একদিন নাকি ফোন করে উত্তমকে না পেয়ে সুপ্রিয়াকে আফসোস করে সুচিত্রা বলেছিলেন, "ইস, শুটিংয়ে গেছে? ভীষণ চুমু খেতে ইচ্ছে করছিল।" জবাবে সুপ্রিয়া বলেছিলেন, তিনি উত্তমকে ফোন করে বলে দেবেন, উত্তম যেন শুটিং প্যাকআপ করে সুচিত্রার বাসায় চলে যান। সুচিত্রা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এতোটা নির্বিকার! হিংসে হচ্ছে না? সুপ্রিয়া বলেছিলেন, "রমাদি, তোমাকে আমি চিনি।"



এত বড় তারকা তাঁরা। আর তাঁদের নিয়ে কোনো গুজব থাকবে না, তা কি হয়? গুজব তো হাওয়ার আগে ছোটে। একবার তো চাউড় হয়েছিল, সুচিত্রা নাকি গোপনে প্রেমপত্র লিখেছেন উত্তমকে। সেটা নাকি আবার ফাঁসও হয়ে গেছে। জীবিত অবস্থাতে তো হয়েছেই, মৃত্যুর পরও তাঁদের 'প্রেম' নিয়ে চর্চা থেমে থাকেনি। উত্তমকুমারের মৃত্যুর পর এক সাংবাদিক তো সরাসরিই প্রশ্ন করে বসেছিলেন সুচিত্রাকে, "আচ্ছা বলো তো, উত্তমকুমারের সঙ্গে তোমার ভাব ছিল, এই প্রেম-টেম?" এড়িয়ে গিয়েছিলেন সুচিত্রা।



শুধু উত্তম কেন,পরিচালক অসিত সেন, প্রযোজক অসিত চৌধুরী ও ব্যরিস্টার সুব্রত রায়চৌধুরীর সঙ্গেও সুচিত্রাকে নিয়ে গুজব শোনা গেছে। তবে এগুলো থোরাই কেয়ার করেছেন সুচিত্রা। বলেছেন, "জীবনে অনেক গুজব শুনেছি। প্রথম-প্রথম খারাপ লাগত। প্রতিবাদ করতে ইচ্ছে করত। কিন্তু পরে দেখলাম, গুজবেও একটা আনন্দ আছে, গুজবের মধ্যে একটা প্রাণও আছে।" এটাই আসল কথা, গুজবে আনন্দ যেমন আছে, তেমনি প্রাণও আছে। তারকারা এ বিষয়টিকে উপভোগ করেন। কারণ তারা জানেন তারকাজীবনে জ্বালানি জোগানদাতা হিসেবে গুজবের অবদান কম নয়।



এসবের সাথে সমালোচক-সাংবাদিকদের প্রশংসা বাক্য তো আছেই। কৌশিক পাল 'আনন্দলোক' পত্রিকায় লিখছেন, "বিগত পাঁচ-ছয় দশক ধরে বাঙালি মধ্যবিত্তের রোমান্সের মায়াবী হৃদয়স্পন্দনে লাব-ডাব বলতে তো শুধুই উত্তম-সুচিত্রা! জনপ্রিয়তার নিরিখে যে জুটিকে আজও 'টাচ' করতে পারেনি অন্য কোনও নায়ক-নায়িকার জুটি। তা সে যতই ১৯৮০ সালে ইহলোক ত্যাগ করুন উত্তমকুমার, অন্তরালে চলে যান সুচিত্রা সেন। বিশেষণপ্রিয় বাঙালির কাছে উত্তমকুমার বরাবর 'মহানায়ক', আর সুচিত্রা সেন 'মহানায়িকা'। তাদের চোখে উত্তম-সুচিত্রা জুটি? চিরন্তন প্রেমের প্রতীক! রোমান্টিসিজমের শেষ কথা।"



দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ক প-িত শর্মিষ্ঠা গুপ্তু তো বলছেন, "উত্তম-সুচিত্রার আমলকে, ১৯৫০ দশকের মাঝামাঝি থেকে ষাটের দশক পর্যন্ত, সাধারণত বলা হয় বাংলা সিনেমার 'স্বর্ণযুগ', এভাবেই লেখা হচ্ছে ও স্মৃতিচারণ হয়ে আসছে। আদর্শায়িত নারী অর্থাৎ সুচিত্রা সেন এবং আদর্শবাদী-নৈতিক পুরুষ অর্থাৎ উত্তমকুমারের শরীরে (বাঙালির) পরিচয় প্রোথিত হয়ে গিয়েছিলো। আর স্বাধীনতা উত্তর প্রজন্মের কাছে তাঁদের রোমান্টিক ভালোবাসা হয়ে উঠেছিলো গভীর আবেগজাত পরিচয়ের বিষয়।"



সেই পঞ্চাশের দশক থেকে এমন জুটি বন্দনার পুনঃপুনঃ উৎপাদনে উত্তম-সুচিত্রা আজ রূপকথায় পরিণত হয়েছেন। শর্মিষ্ঠা গুপ্তু যেমনটা বলছিলেন, বাঙালি নিজেদেরকে গেঁথে ফেলেছিলেন ঐ দুই নর-নারীর ভেতর। এর অন্যতম কারণ উত্তম ও সুচিত্রা সব ছবিতেই বাঙালি থাকার চেষ্টা করেছেন: চলনে-বলনে, পোশাক-আশাকে। যদিও উত্তমকুমার অনুপ্রাণিত ছিলেন হলিউড স্টার রোনাল্ড কোলম্যানের দ্বারা। আর সুচিত্রাকে তো তুলনাই করা হতো আরেক পশ্চিমা তারকা গ্রেটা গার্বোর সাথে। তাঁরা বিদেশী তারকাদের কাছ থেকে নির্যাসটুকুই নিয়েছিলেন। তারপর সেটিকে জারিত করেছিলেন বাঙালিয়ানায়। তাই বাঙালি তাদের গ্রহণ করেছে খুব কাছের মানুষ হিসেবেই। পাশের বাড়ির ছেলে ও মেয়ে হিসেবেই তাঁদের আপন করে নিয়েছিলো মানুষ। কাছের, তারপরও দূরের, আপন কিন্তু ভীষণ পর। কাছের ও আপনভাবটা উত্তম-সুচিত্রাকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলো, আর দূরের ও পরভাবটা উত্তম-সুচিত্রাকে করে তুলেছিলো 'মহান' অর্থাৎ লার্জার দেন দ্য লাইফ। একই সাথে এই দ্বৈত বৈশিষ্ট্য যোগ করতে পেরেছেন বলেই তাঁরা হয়েছেন মহানায়ক আর মহানায়িকা।



একদিকে, উত্তম-সুচিত্রা নিজেদের অভিনয় প্রতিভা ও কারিশমা দিয়ে মানুষের মন জয় করেছেন, অন্যদিকে সাংবাদিক, সমালোচক, প-িত, চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট বিপননের লোকজন সবাই মিলে এমন ধ্বনি ও প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করেছেন, তাতে প্রতিষ্ঠা হয়ে গেছে উত্তম-সুচিত্রা ছাড়া রূপালি জগতে তুলনাযোগ্য কোনো জুটি নেই। একটু খতিয়ে দেখলে অবশ্য দেখা যাবে মৃত্যুর আগে ও পরে, দুই জায়গাতেই উত্তম-সুচিত্রা জুটি বিকিয়েছে ভালো। তাই যতদিন মিথ বাঁচিয়ে রাখা যাবে, ততোদিন সুযোগের সদ্ব্যবহার করা যাবে, ইংরেজিতে যাকে বলে এঙ্প্লয়েট। অথবা উল্টো করে বললে, মিথ তৈরি হয়েছে বলেই সুযোগ নেয়া থেমে নেই।



খ্যাতি ও আদর্শ



সমাজে যে আদর্শ কর্তা রূপে বিরাজ করে এবং সেটার ফলস্বরূপ যে ভাবাবেগ জনপ্রিয় হয়, সেটিকেই ফুটিয়ে তোলা হয় মূলধারার কাহিনীচিত্রে। সেই আদর্শ ও ভাবাবেগের ছাচে ফেলেই তারকাদের উপস্থাপন করা হয় পর্দায়। এতে দর্শকও খুশি, প্রযোজকেরও লাভ। খ্যাতি অর্জন ও তার যথাযথ ব্যবহার একেই বলে।



ভারতে দুই নম্বর বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বাম রাজনীতির একটি হাওয়া বয়ে গেলেও, সার্বিক বিচারে দেশটিতে কখনো সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায়নি। দিনেদিনে বরং বুর্জোয়া আদর্শ আরো শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। এই বুর্জোয়া আদর্শজাত সাংস্কৃতিক পণ্যে নারী-পুরুষের প্রেম সংক্রান্ত ভাবাবেগ ছাড়া আর কিছু নেই। সেখানে দলবদ্ধ মানুষ নেই, যূথবদ্ধ মানুষের লড়াই নেই। শাসক নেই, শোষিত নেই। আছে শুধু প্রেমিক আর প্রেমিকা, আর আছে বাস্তবতা ভোলানো প্রেমের মিষ্টি গল্প। ভারতের মূলধারার চলচ্চিত্রে যে এই প্রেমের গল্পটাই ঘুরেফিরে এসেছে, আসছে, তার কারণ বিদ্যমান আদর্শের বাইরে গিয়ে মূলধারার বাণিজ্যিক ছবি তৈরি হওয়া অসম্ভব প্রায়।



সমাজে যে আদর্শ বিরাজ করে তারই উপজাত হিসেবে মূলধারার চলচ্চিত্র নির্মিত হয়, আর এতে অভিনয় করে তারকাখ্যাতি পাওয়া মানুষগুলোকে সেই আদর্শে আদর্শায়িত মানুষ বললে ভুল বলা হয় না। এভাবেই তারা সংখ্যাগরিষ্ঠের আদর্শের প্রতিভূ হয়ে জনগণের মনের মুকুরে টিকে থাকেন। জনপ্রিয় থেকে তারকা, তারকা থেকে মহাতারকা বনে যান। এরপর একসময় জন্ম নেয় মিথ।



পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে যখন ভারতবর্ষ, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, দেশভাগ ও স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিকভাবে বিপর্যস্ত, ক্ষুধা-দারিদ্র্য-অভাব-বেকারত্ব-সামপ্রদায়িকতা সামাল দেয়ার চেষ্টা করছে অবিরত, সেসময় এক স্বপি্নল দরোজা খুলে দেয় উত্তম-সুচিত্রা জুটি। যে দরোজা দিয়ে এমন এক জগতে প্রবেশ করা যায়, যেখানে বাস্তবের রূঢ়তা অনুপস্থিত থাকে। জনগণের মনে যে বুর্জোয়া সংস্কৃতির বসবাস, সেটিরই সার্থক রূপায়নে এই জুটিকে ইস্তেমাল করা হয় সেসময় জুটি-নির্ভর চলচ্চিত্রগুলোতে। তাই এই জুটি হয়ে উঠেছিলো পোড়খাওয়া মধ্যবিত্তের আশ্রয়স্থল, দু'দ-ের শান্তির জায়গা।



ভিন্নভাবে বললে, রাজনীতি বিমুখ সংস্কৃতির সহায়ক হয়ে ওঠে উত্তম-সুচিত্রার ছবিগুলো। উত্তমকুমার নিজেও রাজনীতি তেমন পছন্দ করতেন না। সাংবাদিক অশোক বসুকে একবার উত্তম বলেছিলেন, তিনি কোনো রাজনৈতিক মতবাদে বিশ্বাস করেন না, আবার অবিশ্বাসও করেন না। যদিও অশোক বসু বলছেন, "উত্তমকুমার রাজনৈতিক দিক থেকে দক্ষিণপন্থী ছিলেন।"



রাজনীতি নিয়ে অনেকের মতোই উত্তমকুমারের মনোভাব ছিলো উদাসীন, তাচ্ছিল্য মেশানো। তিনি বলতেন, "রাজনীতি কত বড়ো জিনিস। মহৎ জিনিস। রাজনীতি আমাদের খাওয়াচ্ছে, পরাচ্ছে। ট্রামে বাসে বাদুড়ঝোলা ঝোলাচ্ছে। মাঝেমাঝে লাঠি, গুলি, টিয়ারগ্যাস উপহার দিচ্ছে। এ হেন মহান জিনিসে বিশ্বাস করব না তেমন বুকের পাটা আমার নেই। আমি ছোটোখাটো মানুষ। অভিনয় টভিনয় করে পেটের ভাত জোগাড় করি। আমার কি ওসব বড়ো বড়ো ব্যাপারে মাথা ঘামানো সাজে?"



তাই বলে জনহিতকর কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখেননি উত্তম। সরকারে যে-ই থাকুন কংগ্রেসি, যুক্তফ্রন্টি বা বামপন্থী, প্রয়োজনে তাদের সাথে হাত মিলিয়ে উত্তম টালিগঞ্জের সহকর্মীদের নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন অসহায় মানুষের জন্য। শিল্পী সংঘের সভাপতি হওয়ায় মানুষের প্রতি দায়িত্ব বেড়ে গিয়েছিলো তাঁর। খ্যাতির কারণেও উত্তমকে নানা সরকারী ও সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে অংশ নিতে হয়েছে।



একই ঘটনা ঘটেছে সুচিত্রা সেনের বেলাতেও। খ্যাতির শীর্ষে থাকা অবস্থায় একবার মঞ্চে উঠতেও দ্বিধা করেননি সুচিত্রা। শর্ত ছিলো একটাই, বিধান রায়ের টিবি ক্লিনিকের জন্য ১০০১ টাকা চাঁদা দিতে হবে। যুদ্ধাহত সেনা ও সরকারি ত্রাণতহবিলের জন্যও সুচিত্রা যতটুকু পেরেছেন করেছেন। অর্থাৎ নিজের খ্যাতিকে কাজে লাগিয়ে সুচিত্রা জনকল্যাণমূলক কাজ করেছেন। আর এভাবেই সুচিত্রা ও উত্তমের তারকা খ্যাতির মুকুটে সমাজসেবকের পালকও যুক্ত হয়েছে। এতে কোটি হৃদয়ের মণিকোঠায় তাঁদের আসন আরো স্থায়ী হয়েছে।



রাজনীতি নিয়ে আগ্রহ ছিলো সুচিত্রা সেনের। বন্ধু ও সাংবাদিকদের কাছ থেকে তিনি প্রায়ই রাজনীতির খবরাখবর নিতেন। বন্ধু গোপালকৃষ্ণ রায়কে একবার সুচিত্রা জানিয়েছিলেন, রাজনৈতিক দল থেকে নির্বাচনে দাঁড়ানোর প্রস্তাব পেয়েছেন তিনি। গোপালকৃষ্ণ অবাক হয়েছিলেন। জবাবে সুচিত্রা বলেছিলেন, "অবাক হচ্ছ কেন? আমি যদি ইলেকশনে দাঁড়াই ক্ষতি কী?"



রাজনীতিতে জড়ানো তো দূরের ব্যাপার, চলচ্চিত্র থেকেই অনেক দূরে সরে যান মিসেস সেন। নিজেই হন গৃহবন্দী। অন্তরালে যাওয়ার পর নিজেকে আধ্যাত্মিকতার দর্শনে সঁপে দিয়েছিলেন সুচিত্রা সেন। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ও শ্রীশ্রীসারদা মায়ের দরবারেই তিনি মানসিক প্রশান্তির জায়গা খুঁজে পেয়েছিলেন। একবার নাকি বেলুড় মঠের ভরত মহারাজ সুচিত্রার মাথায় হাত রেখে ইঙ্গিতে বলেছিলেন, 'মা, লোভ করো না।' তারপরই নাকি সুচিত্রার মোহমুক্তি ঘটে। চলচ্চিত্রের দুনিয়াকে বিদায় জানান তিনি।



এখন রামকৃষ্ণ-সারোদা-মহারাজের অনুসারীর সংখ্যা পশ্চিমবঙ্গে কম নয়। ভক্তরা সুচিত্রার মতো মহানায়িকাকে যখন তাদের পাশে পান, তখন সুচিত্রা আর নায়িকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেন না, তিনি পেয়ে যান মাতৃরূপ। এ আরেক রূপান্তর। অথচ চলচ্চিত্রকে বিদায় জানানোর আগে সুচিত্রা সেন ছিলেন বাঙালি পুরুষের কাঙ্ক্ষিত নারী। তখন যে আদর্শের আদলে মানুষ তাঁকে পেয়েছিলো, আধ্যাত্মিকতায় প্রবেশের পর সে আদর্শ বদলে যায়, ভক্তেরও রূপান্তর ঘটে।



তারকা ও ভক্তকূল



অগি্নপরীক্ষা (১৯৫৪), শাপমোচন (১৯৫৫), সাগরিকা (১৯৫৬), হারানো সুর (১৯৫৭), পথে হলো দেরী (১৯৫৭), ইন্দ্রানী (১৯৫৮), চাওয়া পাওয়া (১৯৫৯) ও সপ্তপদী (১৯৬১) : সাত বছরে আটটি ছবি দিয়েই মূলত নিজেদের চিরঅমস্নান জুটি হিসেবে প্রমাণ করে ফেলেন উত্তম-সুচিত্রা। এই সাত বছরেই তাঁদের যে ভক্ত তৈরি হয়, তারা বংশপরম্পরায় এই জুটির বন্দনা করে চলেছেন আজো।



মধ্যবিত্ত বাঙালি ভদ্রলোকেদের কাছে এই জুটির জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পেছনের মূল কারণ একই আদর্শ ও সংস্কৃতির প্রতিফলন তারা দেখতে পেয়েছিলেন তাঁদের মাঝে। যুগের পর যুগ তাই উত্তম-সুচিত্রাও হয়েছেন চর্চিত। চর্চার নানা মাত্রায় যোগ হয়েছে মঙ্গলকাব্যও! জনৈক মহাকবি তাঁদের নিয়ে রচনা করেছিলেন 'সুচিত্রা-উত্তম-মঙ্গল'। উইপোকার ক্ষুধার কারণে কবির নাম উদ্ধার করা যায়নি বটে, তবে কাব্য উদ্ধার হয়েছিল। কয়েক লাইন পেশ করা যেতে পারে:



"অতঃপর দেবদেবী বন্দনার শেষে। দু'জনে বন্দনা করি পরম আশ্বাসে।। আহা আহা কী মধু সুচিত্রা-উত্তম। সবিস্তারে কী কহিব সাধ্য অতি কম।। স্টুডিও পাড়ায় গিয়া দেখো ভগি্ন-ভাই। এই দুই বিনে হোতা আর কেহ নাই।। ইন্দ্রপুরী ইন্দ্রলোক যেখানেই যাও। দাঁড়াইয়া গেটে থাক দেখা যদি পাও।। পলক দেখিতে পার বুঝিবা তখন। হুস করি গাড়ি চড়ি যাইবে যখন।। কী দেখিলে অহো অহো ইন্দ্র ও ইন্দ্রানী। নাড়ি ছিঁড়া চলি গেলা জানি বন্ধু জানি।। পাইও না দুখ-ব্যথা যাওরে পরদায়। কায়ায় ধরিতে নারি দেখ রে ছায়ায়।। পুং হলে ভাবে সবে উত্তম নিজেরে। স্ত্রীলিঙ্গ প্রকৃতি করে কপি সুচিত্রারে। মেয়েরা সাজিলা যত সুচিত্রার মতো। উত্তমের বেশে সাজে ছেলে শত শত।।"



এই মঙ্গলকাব্যটি পাওয়া গিয়েছিল সোনাগাছির এক নারী নীরার কাছ থেকে। উত্তম-সুচিত্রাকে নিয়ে আনন্দলোক পত্রিকায় প্রকাশিত এক ধারাবাহিক রচনায় এ প্রসঙ্গেই বলা হয়, "সুচিত্রা-উত্তমের সঙ্গে সোনাগাছির নারীর সম্পর্ক ছিল, ভগবান ও ভক্তের। ভজন-পূজনের।"



'সুচিত্রা-উত্তম-মঙ্গল' কাব্যের কথা উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেন জেনেছিলেন। কাব্যটি নিয়ে সুচিত্রার কোনো মন্তব্য পাওয়া না গেলেও উত্তম বলেছিলেন, "এমনও হয়? কখনও হয়? হতে পারে?" ভক্তদের ভালোবাসায় এভাবেই সিক্ত হয়েছেন তাঁরা। সুচিত্রাও কম বিস্মিত হননি, যখন বছরের পর বছর ধরে তাঁর কাছে হাজার হাজার ভক্তের চিঠি এসেছে। শুধু কি চিঠি? কত ভক্তই তো আজো তাঁদের ছবি টাঙিয়ে রেখেছে নিজেদের শয়নকক্ষে। তাঁদের স্মরণে তৈরি হয়েছে সংঘ, ক্লাব। যেমন বর্ধমানের উত্তম-সুচিত্রা ফ্যান ক্লাব। কয়েক দশক ধরে তাঁরা উত্তম-সুচিত্রা বন্দনায় রত আছেন। উত্তম-সুচিত্রার মূর্তিও তৈরি করেছেন তারা। ভক্তদের এই যে আবেগের বিনিয়োগ, যুগ যুগ ধরে, তার বিনিময়েই একজন অরুণকুমার হয়ে উঠেন উত্তমকুমার, আর একজন রমা সেন হয়ে ওঠেন সুচিত্রা সেন।



ভক্তরা যখন তারকাদের দিকে তাকায়, তখন শুধু তারকার অভিনয় প্রতিভা দেখে না, তারা দেখে অভিনয় শৈলী, অনস্ক্রিন ও অফস্ক্রিনে কেমন হচ্ছে চরিত্রের চরিত্রায়ন ও ব্যক্তির জীবন যাপন, আর দেখে বাজারে তাঁদের দাপট, অর্থাৎ গোটাটা মিলিয়ে যে ভাবমূর্তি তৈরি হয় তারকার, সেটার দিকেই নজর থাকে ভক্তদের। কাজেই একই সঙ্গে তারকা সাংস্কৃতিক প্রতিমা বা কালচারাল আইকনে পরিণত হন, আবার বিনোদনের অর্থনীতিতে তিনিই হয়ে উঠেন সূচক। এটাই, তারকা বলি বা মহাতারকা, তাদের ক্ষমতার জায়গা। মৃত্যুর পরও যে ক্ষমতার প্রমাণ দিয়ে চলেছেন উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেন।



শেষ কথা



চলচ্চিত্র একটি সাংস্কৃতিক পণ্য। এই পণ্যকে বিক্রয়যোগ্য করে তুলতে তারকা প্রথা অন্যতম হাতিয়ার। উত্তম-সুচিত্রা ছিলেন তেমনই এক হাতিয়ার, বলতে গেলে অব্যর্থ। এমন নিশ্চিত মুনাফার সম্ভাবনা জাগিয়ে রাখা জুটির অভাব বোধ করি এখন দুই বাংলাতেই আছে। অভাব অবশ্য পূরণ হওয়ারও নয়। কে কার শূন্য স্থান পূরণ করে? পাশাপাশি বসে সংস্কৃতিকে সর্পিলাকারে এগিয়ে নেয় শুধু।



দোহাই



১. মারিয়া প্রামাগিয়র ও টম ওয়ালিস, ফিল্ম : আ ক্রিটিকাল ইনট্রোডাকশন, লন্ডন: লরেন্স কিং পাবলিশিং লিমিটেড, ২০১১।



২. গোপালকৃষ্ণ রায়, সুচিত্রার কথা, কলকাতা : আনন্দ পাবলিশার্স, ২০১০



৩.আশিসতরু মুখোপাধ্যায়, মহানায়িকা সুচিত্রা, কলকাতা : দে'জ পাবলিশিং, ১৪১৯ (বঙ্গাব্দ)



৪. বীজেশ সাহা ও চ-ী মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত, বেডসাইড সুচিত্রা, কলকাতা : প্রতিভাস, ২০১৪



৫. পৌলমী সেনগুপ্ত সম্পাদিত, আনন্দলোক, সুচিত্রা সেন বিশেষ সংখ্যা : ২৭ জানুয়ারি ২০১৪, কলকাতা



৬. পৌলমী সেনগুপ্ত সম্পাদিত, সম্পূর্ণ সুচিত্রা : আনন্দলোক সংকলন, কলকাতা : আনন্দ পাবলিশার্স, ২০১৭



৭. উত্তমকুমার চট্টোপাধ্যায়, হারিয়ে যাওয়া দিনগুলি মোর, অভীক চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত, কলকাতা : সপ্তর্ষি প্রকাশন, ২০১৩



৮. অশোক বসু, পর্দার বাইরেও মহানায়ক, কলকাতা : কৃতি, ২০১৬



৯. শর্মিষ্ঠা গুপ্ত, বেঙ্গলি সিনেমা : অ্যান আদার নেশন, নয়াদিলি্ল : রোলি বুকস, ২০১০



 



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
১৯৭৯৫৪৯
পুরোন সংখ্যা