চাঁদপুর। বৃহস্পতিবার ৫ জুলাই ২০১৮। ২১ আষাঢ় ১৪২৫। ২০ শাওয়াল ১৪৩৯
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • চাঁদপুরের নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগ দেবেন মোঃ কামরুজ্জামান। তিনি বর্তমানে এলজিইডি মন্ত্রণালয়ে উপ-সচিব হিসেবে কর্মরত আছেন।
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৩৯-সূরা আয্-যুমার

৭৫ আয়াত, ৮ রুকু, মক্কী

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

২৪। যে ব্যক্তি কেয়ামতের দিন তার মুখ দ্বারা অশুভ আযাব ঠেকাবে এবং এরূপ জালেমদেরকে বলা হবে, তোমরা যা করতে তার স্বাদ আস্বাদন কর, সে কি তার সমান, যে এরূপ নয়?

২৫। তাদের পূর্ববর্তীরাও মিথ্যারোপ করেছিল, ফলে তাদের কাছে আযাব এমনভাবে আসল, যা তারা কল্পনাও করত না।

দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


মন যদি পরিষ্কার হয় তবে চোখের দৃষ্টি স্বচ্ছ হবে।                       


-টমাস পেইনি।


যে শিক্ষিত ব্যক্তিকে সম্মান করে, সে আমাকে সম্মান করে।   



 


ফটো গ্যালারি
আমার বাবা আবদুর রসিদ খান
নজরুল খান দুলাল
০৫ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


চাঁদপুরের সাগরিকা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা, বিশিষ্ট সমাজকর্মী ও শিক্ষানুরাগী হাজী আবদুর রসিদ খান প্রায় দু যুগ আগে ইহলোক ত্যাগ করলেও আজও এলাকাবাসী এবং আত্মীয়-স্বজনের নিকট চিরভাস্বর হয়ে আছেন। শিক্ষার প্রতি তিনি এতোটাই অনুরাগী ছিলেন যে, চাঁদপুরের কালীবাড়ির মোড়ে প্রসিদ্ধ বেঙ্গল লাইব্রেরী ও আমজাদিয়া লাইব্রেরী স্থাপন করে পুস্তক ব্যবসাকেই ব্রত হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। বিনামূল্যে পুস্তক সরবরাহ করে শত শত অভাবী ও মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীকে শিক্ষার আলো দান করেছেন এ মহান ব্যক্তিটি। আজও অনেকেই সে কৃতজ্ঞতা অকপটে আমাদের কাছে ব্যক্ত করে থাকেন। তাঁর সুযোগ্য সন্তান আনিছুর রহমান খান, মিজানুর রহমান খান, মোরশেদ আলম খান, নাসিমা বেগম এবং আমি নিজে পিতার আদর্শকে আঁকড়িয়ে ধরে থাকতে আপ্রান চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আল্লার রহমতে আজ আমরা স্ব-স্ব ক্ষেত্রে প্রায় প্রতিষ্ঠিত যা আমার পিতা-মাতার অশেষ দোয়ার কারণেই সম্ভব হয়েছে।



জুন মাসের তৃতীয় রোববার বিশ্বব্যাপী বাবা দিবস পালন করা হয়। আমার বাবাও মৃত্যুবরণ করেছিলেন এই জুন মাসেরই তৃতীয় সপ্তাহেই। মা-বাবার প্রতি সন্তানের অকৃত্রিম ভালবাসার প্রতিদানস্বরূপ তাঁদের প্রতি একটি বিশেষ দিনে বিশেষভাবে স্মরণ করার একটা তাৎপর্য আছে বৈকি। যদিও এ ভালোবাসা সার্বক্ষণিক এবং সার্বজনীন! বাবা দিবসের পটভূমি হলো, ১৯০৯ সালে মা দিবস পালন করার পর সোনোরা স্মার্ট ডড্ নামে আমেরিকার একটি মেয়ে শৈশবে মা মারা যাওয়ার পর বাবা তার লালন-পালনের ভার অত্যন্ত নিষ্ঠা আর ত্যাগের সাথে পরিচালনা করেন। মাতার অভাব সে অনুভবই করতে পারেনি। তখন থেকেই পিতার অকৃত্রিম আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার নিদর্শন স্বরূপ বাবা দিবস প্রবর্তন করেন। ধন্যবাদ সোনোরা ডড্, লক্ষ কোটি সন্তানের মনের কথা মূল্যায়ন করেছো তুমি। আমরা এ প্রজন্মের সন্তান-সন্ততিরা তোমাকে শ্রদ্ধা জানাই। তুমি আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছো আমাদের কর্তব্যকর্ম। আমাদের সমাজে এর প্রচলন নূতন হলেও আজকাল অন্তত শহরে এর চর্চা শুরু হয়েছে অল্প-বিস্তর। নিঃসন্দেহে অত্যন্ত ভালো উদ্যোগ। পৃথিবীব্যাপী হিংসা-বিদ্বেষ আর নিষ্ঠুরতার পাশে এ উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে। পিতামাতার প্রতি শ্রদ্ধা ভালোবাসা পৃথিবীব্যপী সার্বজনীন। তারপরেও বছরের বিশেষ দিনে আনুষ্ঠানিকভাবে স্মরণ করা তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা-ভালোবাসা আরো বেশি অর্থবহ করে তোলে। এর প্রতিক্রিয়ায় পিতা-মাতার আনন্দের যে অনুভূতি ভাষায় তা প্রকাশ করা যাবে না। আমার ছেলে-মেয়েরাও প্রতি বছর বাবা দিবসে আমাকে অমূল্য উপহার সামগ্রী দিয়ে উচ্ছাসে জড়িয়ে ধরে মায়াডোরে বেঁধে ফেলে। পুত্র-কন্যার এমন শ্রদ্ধা ভালোবাসায় আমি দারুণভাবে আপ্লুত হয়ে পড়ি। ইহলোক ত্যাগী পিতা-মাতার প্রতিও ধর্মীয়ভাবে দোয়া, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা প্রদর্শন করে এদিনটি পালন করা হয়।



আমার পিতা হাজী আবদুর রসিদ খান ১৯৭৯ সালের ২৩ জুন সকাল ৬টায় ইন্তেকাল করেন নিজ জন্মস্থান চাঁদপুরস্থ বাগাদী ইউনিয়নের নানুপুর গ্রামে। আমার জ্ঞান হওয়ার পর থেকে বাবার সাথে তাঁর সমগ্র জীবনব্যাপী তাঁর সাহচর্যে যে টুকরো টুকরো অভিজ্ঞতাগুলো সঞ্চয় করেছি তারই আংশিক এখানে তুলে ধরছি। ছোটবেলায় গ্রীষ্মকালে বাবার কাঁধে চড়ে নদীতে স্নান করতে যাওয়া-আসা ছিল প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। বাবার গলায় ধরে বুকপানিতে সাঁতারের অনাবিল আনন্দ কিভাবে ভুলি! খাবারের সময় বাবার দু পাশে আমরা ভাই-বোনেরা বৃত্তাকারে বসে পড়তাম আর বাবা আমাদের মুখে ভাত তুলে দিতেন। দু বেলা খাবারের সময় এ ছিল আমাদের নিয়মিত অভ্যেস। এতে বাবার চোখে-মুখে যেন পরম তৃপ্তির ছবি ফুটে উঠতো। অমৃত স্বাদ ছিল বাবার মাখা ভাতে। কোনোদিন সামান্যতম বিরুক্তির ভাব দেখিনি। মা মাঝে-মধ্যে দু-একবার মৃদু বারণ করলেও কাজ হতো না।



আমার বাবা একজন সহজ সরল আচরণের মানুষ ছিলেন। অপূর্ব ছিলো তাঁর ব্যক্তিত্ব আর এলাকায় ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। সৎ এবং নিষ্ঠাবান সমাজকর্মী হিসেবে ব্রিটিশ আমল থেকেই প্রায় ৪০ বছর একটানা ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও মেম্বার পদে আসীন ছিলেন। সর্বশেষ '৭১ সালে দেশ স্বাধীনের পর পর দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে ইউনিয়ন সংগ্রাম কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। এ সময়ের একটি ঘটনা আমাকে আজও দারুণভাবে বিমোহিত করে। দেশ স্বাধীনের পর পর সরকার কর্তৃক প্রচুর সাহায্যসামগ্রী যুদ্ধবিধ্বস্ত গ্রাম-বাংলার ক্ষতিগ্রস্ত জনসাধারণের মাঝে বিনামূল্যে সংগ্রাম কমিটির চেয়ারম্যানগণের মাধ্যমে সরবরাহ করা হতো। তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে কাপড়-চোপড় হতে শুরু করে গৃহস্থালীসামগ্রী পর্যন্ত অনেক কিছুই সংগ্রাম পরিষদের চেয়ারম্যানের দ্বারা বিলি-বণ্টন হতো। এসব সামগ্রীর মধ্যে শার্ট তৈরির জন্যে থান কাপড়ও ছিল। আমি একদিন চুপিচুপি বাবাকে একপিচ শার্টের কাপড় আমার জন্যে চাইলাম। বাবা আমাকে তাঁর চিরাচরিত নম্র-ভদ্র স্বভাবসুলভ আচরণে বললেন, 'এসব দ্রব্য তোমার জন্যে আসেনি' এবং সঙ্গে সঙ্গে শহর থেকে আমার পছন্দ মতো জামাকাপড় কেনার জন্যে আমার হাতে নিজের পকেট থেকে টাকা গুঁজে দিলেন। তাৎক্ষণিক আমার মাঝে দারুণ একটি বিরূপ প্রতিক্রিয়া খেলে গেলো যে, আমি চেয়ারম্যান সাহেবের সন্তান হয়েও আমার সামান্য একটি আবদার বাবা রক্ষা করলেন না। রাগে ক্ষোভে এ জ্বালা বহুদিন পুষেছি। কিন্তু সাহস ছিল না বাবার চোখের সামনে কথা বলার। এখন অতিক্রান্ত জীবনে মূল্যবোধের জগতে যখন সবকিছুর মূল্যায়নে বসি তখন নিজের কাছেই নিজে গর্ব অনুভব করি এই ভেবে যে, কত আদর্শবান এক পিতার সন্তান আমি। বাবা আজীবন সততা এবং আদর্শকে সযত্নে লালন করে গেছেন। তা না হলে সমাজে এভাবে লাগাতার এতকালব্যাপী জনপ্রিয়তা নিয়ে টিকে থাকা সম্ভব ছিলো না।



বয়স ভেদাভেদ নির্বিশেষে মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা-সম্মানের এক মূর্ত প্রতীক ছিলেন আমার পিতা। অনেক সময়ে দেখেছি সমাজের কিছু কিছু অজনপ্রিয় মানুষকেও বাবা দারুণ সম্মান দিতেন। এমনকি নিজের চেয়ার ছেড়ে তাদেরকে বসতে দিতেন। আমার ছোটবেলায় এ ব্যাপারটিতে আমি কিঞ্চিত বিব্রত বোধ করতাম। আমার ভাবনা ছিল, বাবা সমাজের সবচেয়ে গণ্যমান্য ব্যক্তি তাঁকেই সবাই সম্মান করবে! এখন বুঝতে পারছি বাবাকে মানুষ এতো সম্মান কেন করতো। আসলে তিনি মানুষকে অকাতরে সম্মান করতেন বলেই গোটা সমাজ তাঁকে এভাবে সম্মানের মর্যাদায় ভূষিত করেছে। এখন বুঝতে পারলাম, অন্যকে সম্মান দেখালেই কেবল নিজে সত্যিকার সম্মানের যোগ্য হয়। বাবা যেমন তাঁর মুরুব্বীদের সাথে পিতাসম শ্রদ্ধা করতেন তেমনি তরুণ-কিশোরদেরকে আদর স্নেহে আপ্লুত করে রাখতেন। মাঝে মাঝে বাবার সাথে পথ চলতে দু পাশ থেকে সালাম আর কদমবুচি দেখে টের পেতাম সমাজে বাবার গ্রহণযোগ্যতা ছিল কতটা গভীরে।



প্রতিদিন ভোরে গ্রামের অসংখ্য মানুষ বাবার জন্যে অপেক্ষা করতো আমাদের ঘরের সিঁড়িতে ও আঙ্গিনায় তাদের সমস্যাদি নিয়ে। সারি সারি ভাবে তারা মাটিতে বা টুল-টেবিলে বসে এ ভাবেই অপেক্ষা করতো বাবার জন্যে। তাদের জন্যে মাঝে মধ্যে হালকা চা-নাস্তার ব্যবস্থা থাকতো। তবে পান-সুপারি দিয়ে আপ্যায়নের ব্যত্যয় কোনোদিন দেখিনি। এ এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা ছিলো প্রত্যহ প্রত্যুষে আমার শৈশবে! আমাদের জমি-সম্পত্তি ছিল প্রচুর। বাবার আজীবন একটি নিয়মিত অভ্যেস ছিল, প্রতিদিন ফজরের নামাজ পড়ে মসজিদ থেকে সোজা চলে যেতেন ক্ষেত-খামার পরিদর্শনে। ফিরে এসেই অপেক্ষমান দর্শনার্থীদের নিয়ে বসে পড়তেন তাদের সমস্যাদি শোনার জন্যে। তিনি সর্বদাই কম কথা বলতেন কিন্তু শুনতেন বেশি। বাবার একটি বিশেষ গুণ ছিল, অতি দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারতেন।



সে সময়কালে গ্রামের এমনকি শহরের লোকেরাও ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনার সাথে আদৌ সম্পৃক্ত ছিলো না। টাকা-পয়সা, সোনা-গয়না ইত্যাদি মূল্যবান সম্পদ কোনো বিশ্বাসী এবং নির্ভরশীল কারো কাছে আমানত রাখতো। বাবা আমাদের এলাকায় ছিলেন এমনি একজন সৎ ও বিশ্বাসী ব্যক্তি যার কাছে মানুষ তাদের ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সা বিনাশর্তে গচ্ছিত রাখতো এবং চাওয়ামাত্র বাবা আমানতকারীকে তা পরিশোধ করতেন। একটি ছোট্ট নোটবুকে আমানতকারীর বৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ করে রাখতেন (নোটবুকটি আমি সযত্নে সংরক্ষণ করে রেখেছি)। জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত এ কাজটি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করে গেছেন। এভাবেই তিনি অগণিত মানুষের কাছে আজীবন অশেষ শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। এভাবে আরো অনেক সততার দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন আমার আদর্শবান বাবা মরহুম হাজী আবদুর রসিদ খান। পর কল্যাণে সারাজীবন নিজেকে উৎসর্গ করে গেছেন ক্ষণজন্মা এ মহাপুরুষটি। আজ অতিশয় শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি আমার প্রিয় পিতাকে এবং মহন আল্লাহ যেন তাঁকে বেহেশত নসীব করেন। তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৬৩৪৬৬৫
পুরোন সংখ্যা