চাঁদপুর। বৃহস্পতিবার ০১ নভেম্বর ২০১৮। ১৭ কার্তিক ১৪২৫। ২১ সফর ১৪৪০
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • --
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৪৩-সূরা যূখরুফ

৮৯ আয়াত, ৭ রুকু, মক্কী

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

৩৫। এবং স্বর্ণের নির্মিতও। আর এই সবই তো শুধু পার্থিব জীবনের ভোগ সম্ভার। মুত্তাকীদের জন্যে তোমার প্রতিপালকের নিকট রয়েছে আখেরাত (-(-এর কল্যাণ)।

৩৬। যে ব্যক্তি দয়াময় আল্লাহর স্মরণে বিমুখ হয় আমি তার জন্যে নিয়োজিত করি এক শয়তান, অতঃপর সেই হয় তার সহচর।

৩৭। তারাই (শয়তানরা) মানুষকে সৎপথ হতে বিরত রাখে, অথচ মানুষ মনে করে যে তারা হেদায়েতের উপর পরিচালিত হচ্ছে।    

দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন



 


নিচে নামাটা যত সহজ, উপরে ওঠা তত সহজ নয়।                          


-টমাস ফুলার।


ক্ষমতায় মদমত্ত জালেমের জুলুমবাজির প্রতিবাদে সত্য কথা বলা ও মতের প্রচারই সর্বোৎকৃষ্ট জেহাদ।



 


ফটো গ্যালারি
শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা
সুধীর বরণ মাঝি
০১ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


শিক্ষা ও শিক্ষকের মর্যাদা একে অপরের পরিপূরক এবং বর্তমান সময়ে অতিগুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একজন শিক্ষক তিনি যিনি সমাজের বিবেক জাগিয়ে তুলেন, একজন ছাত্রের সুপ্ত প্রতিভাকে জাগ্রত করেন, তিনি সমাজ বিনির্মাণের কারিগর, তিনি সমাজ এবং জাতির প্রয়োজনে আলোর দিশারী হিসেবে পথ দেখান এবং সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে সর্বদা প্রস্তুত। পিতা-মাতার পরই শিক্ষকের স্থান। পিতা-মাতা সন্তানকে জন্ম দেন। কিন্তু তাকে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলেন শিক্ষক। আমাদের ধর্মগুলোতে শিক্ষকদের সর্বোচ্চ মর্যাদা দেয়া হয়েছে। তাই বলা বলা হয়, গুরুদক্ষিণা ছাড়া শিক্ষা সম্পন্ন হয় না। বিদ্যানের কালি শহীদরের রক্তের চেয়েও পবিত্র। পৃথিবীর যে দেশ শিক্ষকদের যতো বেশি মর্যাদা দিয়েছেন সেই দেশ সভ্যতা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে ততো বেশি উন্নত। ইতিহাস বলে, যুগে যুগে অতি অত্যাচারী শাসকও নত শিরে গুরুর সামনে দাঁড়িয়েছেন। গুরুকে অসম্মানের দৃষ্টতা কেউ দেখাননি। চাণক্য শ্লোকে আছে, 'এক অক্ষরদাতা গুরুকেও গুরু বলিয়া মান্য করিবে। এক অক্ষরদাতা গুরুকে যে গুরু বলিয়া মান্য করে না, সে শতবার কুকুরের যোনীতে জন্মগ্রহণ করে চ-ালত্ব লাভ করিবে।'



 



ইসলামও দিয়েছে শিক্ষকেদের অসামান্য সম্মান ও মর্যাদা। শিক্ষকদের সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে ছিলো ব্যাপক সমাদৃত। হযরত আবু হুরায়ারা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেন, 'তোমরা জ্ঞান অর্জন করো এবং জ্ঞান অর্জনের জন্যে আদব শিষ্টাচার শিখো। তাকে সম্মান করো যার থেকে তোমরা জ্ঞান অর্জন করো।' সুতরাং যারা জ্ঞান অর্জন করা হয় তিনিই আমাদের শিক্ষক। শিক্ষকের মর্যাদায় ইসলামের বক্তব্য ও সংক্ষিপ্ত একটি নমুনা তুলে ধরা হলো। 'একবার হযরত জায়েদ ইবনে সাবিত বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) চাচাতো ভাই! আপনি (রেকাব থেকে) হাত সরান। উত্তরে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন, 'না', আলেম ও বড়দের সাথে সম্মানসূচক আচরণই করতে হয়। জ্ঞানই মানুষের যথার্থ শক্তি ও মুক্তির পথনির্দেশ দিতে পারে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'আমাকে শিক্ষক হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে বা আমি শিক্ষকরূপে প্রেরিত হয়েছি।' প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিক্ষা, শিক্ষার উপকরণ, শিক্ষক ও শিক্ষার ব্যাপকীকরণে সদা সচেষ্ট ছিলেন। তাই তো প্রিয় নবী বদরের যুদ্ধে বন্দিদেরকে মুক্তির জন্যে মদিনার শিশুদের শিক্ষা দেয়ার চুক্তি করেছিলেন। যার মাধ্যমে তিনি বন্দিদের মুক্তির ব্যবস্থা করেছিলেন, যা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। জাতি গঠন এবং উন্নয়নের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হলো শিক্ষা আর শিক্ষা সম্পর্কিত বিষয়গুলো হলো শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিক্ষাঙ্গন, শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, শিক্ষার পরিবেশ ইত্যাদি। তবে এ প্রসঙ্গে শিক্ষকের ভূমিকাই মূখ্য। কেননা শিক্ষকই হচ্ছেন শিক্ষা ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি। শিক্ষকতা কেবল চাকুরি নয় বরং একটি মহান পেশা। একজন আদর্শ শিক্ষক জানেন তার চলার পথ কতটা কণ্টকাকীর্ণ এবং ভবিষ্যৎ বিড়ম্বনাময়, তবুও তিনি হৃদয়ের টানে এই সুকঠিন জীবিকার পথ বেছে নেন। এজন্যে তাকে জীবনব্যাপী সংগ্রাম করতে হলেও তিনি আদর্শচ্যুত হন না। সর্বদা ন্যায়নীতির প্রশ্নে তিনি আপোষহীন। শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগর_এ নামেই আখ্যায়িত। শিক্ষা নিকেতন তার কর্মশালা। তিনি শিক্ষার্থীর মনন, মেধা ও আত্মশক্তির বিকাশ পরিশীলন ও উন্নয়ন প্রসার সাধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সমাজ গঠনে, দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতির উন্নয়নে দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে বিশ্ব দরবারে নিজ দেশের গৌরবময় অবস্থান তুলে ধরতে একজন আদর্শ শিক্ষকের অবদান একজন রাষ্ট্রনায়ক, রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ বা সমাজনেতার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। একজন শিক্ষক তিনি একজন রাষ্ট্রনায়ক, রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিল্পী, আইনজীবীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের শিক্ষক। অর্থাৎ তিনি কারিগর। তিনি সকলেরই শ্রদ্ধা ও সম্মানের পাত্র। তাই বলা যায়, একজন আদর্শ শিক্ষক দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান ও শ্রেষ্ঠ মানুষদের মধ্যে অন্যতম।



 



আগের যুগে শিক্ষকের মর্যাদা যে কত উচুঁমানের এবং সম্মানের ছিলো তা শিক্ষকের মর্যাদা কবিতাটি থেকেই সহজেই অনুমেয়। কবিতাটির বিষয়বস্তু এ রকম, দিলি্লর এক মৌলভী (শিক্ষক) বাদশাহ আলমগীরের পুত্রকে পড়াতেন। একদিন প্রভাতে বাদশাহ লক্ষ্য করলেন, তাঁর পুত্র শিক্ষকের পায়ে পানি ঢালছেন আর শিক্ষক নিজেই তাঁর পা পরিষ্কার করছেন। এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করার পর বাদশাহ দূত মারফত ওই শিক্ষককে কেল্লাতে ডেকে নিয়ে যান (যদিও ওই শিক্ষক খুব ভয়ে ছিলেন)। তারপর বাদশাহ ওই শিক্ষককে বললেন, আমার পুত্র আপনার নিকট থেকে তো সৌজন্য না শিখে বেয়াদবি আর গুরুজনের প্রতি অবহেলা করা শিখেছে। কারণ সেদিন প্রভাতে দেখলাম আমার পুত্র আপনার পায়ে পানি ঢেলে দিচ্ছে আর আপনি নিজেই আপনার পা পরিষ্কার করছিলেন। আমার পুত্র কেনো পানি ঢালার পাশাপাশি আপনার পা ধুয়ে দিলো না_এ কথা স্মরণ করলে মনে ব্যথা পাই। বাদশাহর মুখ থেকে এ কথা শোনার পর ওই শিক্ষক অত্যন্ত উচ্ছ্বাসের সাথে বলেন, 'আজ হতে চির উন্নত হলো শিক্ষাগুরুর শির, সত্যিই বাদশাহ তুমি মহান, উদার বাদশাহ আলমগীর।' 'ওস্তাদে প্রণাম করো পিতা হস্তে বাড়ে দোসর জনম দিলা হিত সে আম্বার।' এভাবেই মধ্যযুগের অন্যতম কবি শাহ মুহম্মদ সগীরের কবিতায় উঠে এসেছে শিক্ষকের মর্যাদা। তাদের দেয়া শিক্ষায় একজন মানুষ প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠে। শিক্ষকের দেখানো পথই আমাদের পাথেয়। তার জ্ঞানেই আমরা ভালো-মন্দের পার্থক্য নির্ণয় করি।



 



শিক্ষকের চোখেই আমরা জগৎ দেখি। মানব সভ্যতা বিনির্মাণে শিক্ষক সমাজের রয়েছে বড় অবদান। আর এজন্যেই যুগে যুগে শিক্ষকদের সম্মান ও মর্যাদা সবার উপরে। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (দঃ) ইশরাত করেন, 'তোমরা জ্ঞান অর্জন করো এবং জ্ঞান অর্জনের জন্যে তোমরা আদব-শিষ্টাচার শিখো। তাঁকে সম্মান করো যার থেকে তোমরা জ্ঞান অর্জন করো।' (আল মুজালুম আউসাত : ৬১৮৪)। মহান সৃষ্টিকর্তাই তাঁদের মর্যদার মুকুট পড়িয়েছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গেলে তাঁরই বাংলা বিভাগের শিক্ষক ড. নীলিমা ইব্রাহীমকে দূর থেকে দেখতে পেয়ে সকল প্রটোকল ভেঙ্গে ছুটে গেলেন তাঁর কাছে এবং পা ছুঁয়ে সালাম করলেন এবং আশীর্বাদ নিলেন। সম্মানিত শিক্ষকদের মর্যাদা দিতে বঙ্গবন্ধু এভাবে শিখিয়েছেন তাঁর সন্তানদের।



 



আর এখনকার দিনে শিক্ষকের ওপর হামলা চালানো, তাদেরকে হুমকি প্রদান ও হত্যা করা এবং লাঞ্ছনা করার ঘটনা যেনো নিত্য-নৈমত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষকদের ওপর হামলা চালানো, তাদেরকে হত্যা করা, হুমকি দেয়া এবং লাঞ্ছনা করা যে নিঃসন্দেহে লজ্জাজনক এবং এ লজ্জা যে গোটা জাতির লজ্জা তা বলা বাহুল্য। এদেশে অনেক শিক্ষক হত্যাসহ অনেকবার শিক্ষকদেও উপর হামলা চালানো এবং তাদেরকে বার বার লঞ্ছনার শিকার হতে হলেও এখন পর্যন্ত বেশিরভাগ ঘটনারই বিচার হয়নি। ফলে অপরাধীরা এ ধরনের জঘন্য কর্মকা- ঘটাতে উৎসাহী হয়ে উঠছে_যা জাতির জন্যে চমর আশনি সংকেত। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে পরবর্তীতে এরশাদবিরোধী আন্দোলনসহ দেশের সম্পদ রক্ষা আন্দোলনসহ প্রতিটি গণআন্দোলনে শিক্ষকদের ভূমিকা ছিলো অগ্রগণ্য। দেশ ও জাতির স্বার্থেই শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত থাকলেও বাংলাদেশে এর লেসমাত্র নেই। শিক্ষকদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার পেছনে মূলত তিনটি কারণ দায়ী। প্রথমত সন্তানদের সামনে অভিভাবকদের নীতিবাচক সমালোচনা। দ্বিতীয়ত শিক্ষকদের ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা। যার ফলে শিক্ষকরা এখন আর আগের মতো মনপ্রাণ উজার করে দিয়ে পাঠদান করেন না। আর তৃতীয়ত শিক্ষকদের পেশার সামাজিক স্বীকৃতি ও সামাজিক মর্যাদা নেই। এই বিষয়গুলো থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে শিক্ষকদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব নয়। তাই কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন শিক্ষকদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৪৯৫৯০৭
পুরোন সংখ্যা