চাঁদপুর। বৃহস্পতিবার ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮। ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫। ৫ রবিউস সানি ১৪৪০
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫৭-সূরা হাদীদ


২৯ আয়াত, ৪ রুকু, মাদানী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


২৭। অতঃপর আমি তাহাদের পশ্চাতে অনুগামী করিয়াছিলাম আমার রাসূলগণকে এবং অনুগামী করিয়াছিলাম মারইয়াম তনয় ঈসাকে, আর তাহাকে দিয়াছিলাম ইঞ্জীল এবং তাহার অনুসারীদের অন্তরে দিয়াছিলাম করুণা ও দয়া। আর সন্নাসবাদ-ইহা তো উহারা নিজেরাই আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য প্রত্যাবর্তন করিয়াছিল। আমি উহাদের ইহার বিধান দেই নাই; অথচ ইহাও উহারা যথাযথভাবে পালন করে নাই। উহাদের মধ্যে যাহারা ঈমান আনিয়াছিল, উহাদিগকে আমি দিয়াছিলাম পুরস্কার এবং উহাদের অধিকাংশই সত্যত্যাগী।


 


 


assets/data_files/web

অপ্রয়োজনে প্রকৃতি কিছুই সৃষ্টি করে না। -শংকর।


 


 


কবর এবং গোসলখানা ব্যতীত সমগ্র দুনিয়াই নামাজের স্থান।


 


 


 


ফটো গ্যালারি
মুক্তিযুদ্ধে চাঁদপুরের দুঃসাহসিক নৌ-কমান্ডোদের ভূমিকা
১৩ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+

চাঁদপুরে '৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে দুঃসাহসিক নৌ-কমান্ডো বাহিনীর ভূমিকা একটি গৌরবময় অধ্যায় হয়ে আছে। নদীমাতৃক দেশ হিসেবে নৌ-কমান্ডো যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেই নৌ-কমান্ডো যুদ্ধের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। দেশের অভ্যন্তরে পাকবাহিনীর অগ্রযাত্রাকে প্রতিরোধ করার জন্যে প্রত্যেকটি নৌপথে নৌ-কমান্ডো বাহিনীর অকুতোভয় সদস্যরা অতর্কিত আক্রমণ চালাবার পরিকল্পনা করে।

১৯৭১ সালে নিজস্ব প্রচেষ্টায় উদ্ভাবিত রণসম্ভার নিয়ে জীবন হাতের মুঠোয় করে অবর্তিত হয়েছে তার নৌ-যুদ্ধে। নৌ-কমান্ডোরা পাকিস্তানী অবস্থানের ওপর তা-বলীলা চালিয়ে তাদের ভেতর প্রচ- ভীতি ও হুমকির সৃষ্টি করেছিলো। উদ্দেশ্য ছিলো নদীমাতৃক বাংলাদেশের সাথে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিকভাবে পাকহানাদার বাহিনীর যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা। এজন্যে নদী এলাকা হিসেবে চাঁদপুর সদরের সফরমালী এলাকার ৮ জন নৌ-কমান্ডো বাহিনীতে যোগ দেয়ার অনুমতি পেলো।

যতোদূর জানা গেছে, ১৭ মার্চ ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার সংগ্রামে সাড়া দিয়ে ফ্রান্সের সুদূর তুলন শহর থেকে ৮ জন বাঙালি নৌ-সেনা পালিয়ে এসে নৌ-কমান্ডো বাহিনী গঠন করার পরিকল্পনা হাতে নেয়।

এদিকে চাঁদপুর সদরের উত্তর সফরমালী এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, সফরমালী হাইস্কুলের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক ও সংগ্রাম কমিটির অন্যতম সংগঠক ইব্রাহিম বিএবিটি ও অন্যান্য সদস্যদের সার্বিক সহযোগিতায় সম্ভবত এপ্রিল মাসে এ এলাকায় ১১ জন যুবক একত্রে একই রাতে মুক্তিযুদ্ধের উদ্দেশ্যে ও দেশকে স্বাধীন করতে ভারতে রওনা দেন।

এদের মধ্যে ছিলেন নৌ-কমান্ডো এমএ রাজ্জাক, নৌ-কমান্ডো আবুল হোসেন, শাহজান কবীর (বীর প্রতীক), নৌ-কমান্ডো সামসুল কবীর, বীর প্রতীক মমিন উল্যাহ পাটোয়ারী, নৌ-কমান্ডো মোঃ জহিরুল আলম, নৌ-কমান্ডো মোঃ সালাউদ্দিন বীর উত্তম, বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাসেম বেপারী। এঁরা সবাই চাঁদপুর সদরের সফরমালী এলাকার।

এমএ রাজ্জাকের বর্ণনা মতে, সর্বপ্রথম এ দলটি ভারতের বঙ্নগরে এসে পেঁৗছে। সেখান থেকে হাতিমারা যাওয়া হয়। হাতিমারায় প্রায় একমাস প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার পর একটি রিক্রোটিং দল এ ক্যাম্পে চলে আসেন এবং গোপনে জানানো হলো নদীমাতৃক দেশ হিসেবে শিক্ষিত, সাহসী, উদ্যমীদের নিয়ে একটি নৌ-কমান্ডো দল গঠন করা হবে।

পরবর্তীতে ১৫০ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ি এলাকায় আকাবাঁকা, উঁচু নিচু, ঢালু রাস্তা অতিক্রম করে সকল বাছাইকৃত নৌ-কমান্ডো বাহিনী সদস্যদের ধর্মনগরে আনা হয়। ধর্মনগর থেকে পুনরায় ট্রাকে করে ভাগিরথী নামক স্থানে নিয়ে যাওয়া হয় প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য।

পলাশীর ভাগিরথীতেই সকল নৌ-কমান্ডেদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাগ্রহণ করা হয়। এদের সংখ্যা ছিলো ৩৫০ জনের মতো। সম্ভবত যুদ্ধে ও প্রশিক্ষণের সফলতা আনয়নের সুঠামদেহী বাঙালি যুবকদের বাংলার শেষ নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজিত স্থানে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার ঐতিহাসিক সেই প্রান্তরে সমবেত করা হয়।

কেননা এখানে রয়েছে বাংলার শেষ নবাব আলীবর্দি খাঁর দৌহিত্র নবাব সিরাজের স্মৃতি বিজড়িত একটি মুহূর্ত। সেই মনুম্যান্ট স্পর্শ করেই প্রতিটি যুবকের শপথ নিতে হয়েছিলো।

শপথবাক্যগুলো এমন ছিলো : '১৯৫৭ সালের ২৩ জুন সেখানে বাংলার সূর্য অস্তমিত হয়েছিলো, ঠিকই সেই স্থানে দাঁড়িয়েই শপথ নিচ্ছি যে, বাংলার সূর্য আমরাই আবার উদিত করবো। এছাড়াও আমি দেশের স্বাধীনতার জন্যে বিসর্জন দিতে সম্মত হয়েই এ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছি। যুদ্ধে আমার মৃত্যু হলে কেউ দায়ী থাকবে না।'

প্রথম উদ্বোধনী পর্বে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছিলো, 'নৌ-কমান্ডো বাহিনী মূলত সুইসাইডাল স্কোয়াড।' তাই তাদেরকে বলা হতো 'আত্মঘাতী নৌ-কমান্ডো বাহিনী।' প্রশিক্ষণগ্রহণের ক'দিন পর (২২জুন, ১৯৭১) সাহস যোগানোর জন্যে নৌ-কমান্ডোদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক কর্নেল এমএ জি ওসমানী পলাশীর ভাগিরথীতে কমান্ডোদের সাথে দেখা করতে আসেন। সম্ভবত ১১ কি ১৩ আগস্ট রাতে সাবমেরিনার বদিউল আলমের নেতৃত্বে ২০ জনের একটি চৌকস নৌ-কমান্ডো দল সারাদেশের মতো চাঁদপুর নৌ-বন্দর দখলমুক্ত করার লক্ষ্যে সফরমালী এলাকায় এসে পেঁৗছে। শিক্ষাবিদ বিএবিটির বাড়িতে রাত্রিযাপন করে তাকে তাদের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। ভাগ্যক্রমে সে দলের সদস্য ছিলেন বিটির দু ছেলে শাহজাহান কবির সাজু ও সামছুল কবির দুলু।

এছাড়া তারই দৌহিত্র বীর প্রতীক মমিন উল্যাহ পাটোয়ারী বাড়ি পাশে তাঁর ছাত্র নৌ-কমান্ডো মোঃ জহিরুল ইসলাম, মোঃ সালাউদ্দিন বীর উত্তম, বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাসেম ও গফুর মাস্টার নামের একজন নৌ-কমান্ড এ দলের সদস্য ছিলেন।

চাঁদপুর নৌ-বন্দর হামলা করার বিষয়টির দিন, তারিখ, ধরন, কীভাবে, কোথায়, কখন কী করতে হবে_এ সময় ছিলো সম্পূর্ণ পরিকল্পনা মোতাবেক এবং সাবমেরিনার বদিউল আলমের ওপর ন্যস্ত ছিলো।

সম্ভবত ১৪ আগস্ট রাতে নৌকার মাঝি বা চালক স্থানীয় ক'জন যুবকের সাথে নিয়ে ৮-৯টি ছইওয়ালা নৌকাসহ জেলের বেশে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চাঁদপুর নৌ-বন্দর মোহনা দিয়ে পুরাণবাজার রঘুনাথপুর হাজী এ করিম খানের বাড়িতে আশ্রয় নেয়। এছাড়া ৪-৫ জন ওই আত্মঘাতী নৌ-কমান্ডো বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন বেশে চাঁদপুরের নৌ-বন্দরে নোঙ্গরকৃত পাকিস্তানী জাহাজগুলোর অবস্থান জেনে নেয়।

পূর্বপরিকল্পনা মতে রাতে প্রশিক্ষণের সকল কলা-কৌশল অবলম্বন করে জাতিসংঘের খাদ্যবাহী জাহাজ, তৈলবাহী ট্যাঙ্ক, লন্ডনঘাটে পাকহানাদার বাহিনীর জাহাজগুলোতে মাইন স্থাপন করে স্রোতের টানে কচুরীপানার আড়ালে ক্যামো-প্লাইজ করে মেঘনা মোহনা দিয়ে পুরাণবাজারের দক্ষিণে দিকে বের হয়ে আসে। পুর্বের নির্ধারিত লাল সংকেত হিসেবে ঠিক ১২টা ১ মিনিটের সময় ভারতের 'শিলিগুড়ি বেতার' থেকে বাজানো হলো সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে একটি গান_'আজকে যাবে আমার পুতুল নতুন শ্বশুর বাড়ি।'

গানটি বাজার সাথে সাথেই আত্মঘাতী নৌ-কমান্ডোদের লাগানো মাইনগুলোর পরপর বিকট শব্দে পুরো চাঁদপুর শহর ও এর আশপাশের এলাকা প্রকম্পিত হয়ে উঠে। পরদিন আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে ফলাওভাবে প্রচার হয়। এজন্যে ১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় দিন।

কেননা স্বাধীনতার পথকে সুগম করেছিলো 'অপারেশন জ্যাকপট'-এর আত্মঘাতী নৌ-কমান্ডোদের এ হামলাটি।' স্বাধীনতাযুদ্ধে অবিস্মরণীয় ভূমিকার জন্যে চাঁদপুরের নৌ-কমান্ডোরা বাঙালি জাতির হৃদয়ে চির অমস্নান হয়ে থাকবে।

অপারেশনের পর তাঁরা পুনরায় ভারত চলে যান। পরবর্তীতে নভেম্বরের মাঝামাঝিতে চাঁদপুর শহরের উত্তরে এখলাছপুরের নিকট বীর উত্তম সালাউদ্দিন ও বীর প্রতীক শাহজাহানসহ কয়েকজন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধার সহায়তায় নৌ-কমান্ডো মোঃ সেলিমের নেতৃত্বে 'এমভি সেমী' নামক নোঙ্গর করা একটি অস্ত্র ও রসদ বোঝাই জাহাজ ডুবিয়ে দেন। তারা হাইমচরের নিক পাকসেনাদের আরো দুটো রসদ বোঝাই জাহাজ ডুবিয়ে দেন।

৮ ডিসেম্বর হানাদারমুক্ত হয় চাঁদপুর। পরবর্তীতে পাকহানারা জানতে পারে নৌ-কমান্ডোদের বাড়ি সফরমালী এবং শহীদ বিএবিটির বাড়িতে তারা আত্মগোপন করে আছেন তাই ওই রেশ ধরেই হঠাৎ কয়েকজন পাকহানা ও দেশীয় তাদের দোসরদের সহায়তায় ১৯৭১ সালের ১৭ আগস্ট ভোরে শহীদ বিএবিটির বাড়িতে নৌকাযোগে আসে এবং হাতেনাতে বিএবিটিকে ধরে ফেলে। পুরো বাড়ি তল্লাশী চালানোর পর শহীদ বিটি ও বিন্দাবনকে আটক করেন। পরে হিন্দু লোধবাড়ির পেছনে তাদেরকে গুলি করে তড়িঘড়ি করে তারা নৌকযোগেই চলে আসে।

৭ ডিসেম্বর ২০১৮, শুক্রবার।

আজকের পাঠকসংখ্যা
১৩১৪৩৬
পুরোন সংখ্যা