চাঁদপুর, বুধবার ২৬ জুন ২০১৯, ১২ আষাঢ় ১৪২৬, ২২ শাওয়াল ১৪৪০
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • মতলবের জিয়াউর রহমান সাউথ আফ্রিকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত।
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫১-সূরা সূরা তূর

৪৯ আয়াত, ২ রুকু, মক্কী

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

১৯। ‘তোমরা যাহা করিতে তাহার প্রতিফল স্বরূপ তোমরা তৃপ্তির সহিত পানাহার করিতে থাক।’

২০। তাহারা বসিবে শ্রেণীবদ্ধভাবে সজ্জিত আসনে হেলান দিয়া; আমি তাহাদের মিলন ঘটাইব আয়তলোচনা হূূরের সংগে;


জাতীয় সংসদ আদর্শ লোকজনের এক বিরাট সমাবেশ ব্যতীত আর কিছু নয়।

 -ওয়াল্টার বেজইট।


দুষ্কর্মের প্রকৃত অনুতাপকারী এবং যে কখনো দুষ্কর্ম করেনি-এদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।


ফটো গ্যালারি
প্রসঙ্গ : ভারতের লোকসভা নির্বাচন
নজরুল ইসলাম
২৬ জুন, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


ধারণাটা আগেই করা গিয়েছিলো, দিলি্লর মসনদে আবারো বসছেন নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদী; যিনি নিজেকে জনগণের শাসক নয় চৌকিদার হিসেবে পরিচয় দেন। গত ২৪ মে নিশ্চিত হওয়া গেলো ৩৫১টি আসনে জয়লাভ করে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) জোট দ্বিতীয়বারের মতো সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। ভারতীয় পার্লামেন্টের নিম্ন্নকক্ষ লোকসভার ৫৪৩টি আসনের মধ্যে ভোটগ্রহণ হয় ৫৪২টি আসনে। সেই হিসেবে কোনো দলকে সরকার গঠন করতে হলে পেতে হবে ২৭২টি আসন। নির্বাচনে বিজেপি একাই পেয়েছে ৩০৩টি আসন! গত ৩০ মে নয়াদিলি্লর রাইসিনা হিলে দেশের ১৫তম প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন এক সময়ের চা-বিক্রেতা নরেন্দ্র মোদী।



 



নির্বাচনে ভরাডুবি হয়েছে ভারতের সবচেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের; তাঁরা পেয়েছে মাত্র ৫২টি আসন। ২০১৪ সালে এই দল পেয়েছিলো ৪৪টি আসন। ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত কংগ্রেস হচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম ও অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক দল, যার বর্তমান সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক হচ্ছেন দুই সহোদর-রাহুল গান্ধী এবং প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। সকলেই জানেন তাঁরা হচ্ছেন ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজিব গান্ধী এবং কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি সোনিয়া গান্ধীর সন্তান। স্বভাবতই প্রশ্ন আসে, নরেন্দ্র মোদীর এ বিজয় ভারতে পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির জন্যে কোনো বার্তা কি না?



 



পরিবারতন্ত্র দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে খুব পরিচিত দৃশ্য। রাজনীতিতে দলের নেতা নির্বাচনে দক্ষতা, যোগ্যতা, সততা, ত্যাগ ইত্যাদি বিবেচিত হওয়া উচিৎ। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এ অঞ্চলে ভবিষ্যৎ নেতা নির্বাচনে শুধুমাত্র দলীয় প্রধানের সন্তান, স্ত্রী বা সহোদরকে বিবেচনা করা হয়। অনেক সময় দলীয় প্রধানও তাঁর পরিবারের সদস্যকে দলীয় কর্মকা-ে বাড়তি সুযোগ প্রদান করে কর্মী ও জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দেন। অতীতের দিকে তাকালে আমার দেখবে াআমাদের এ অঞ্চলে বিশেষ করে ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় রাজনৈতিক দল ও সরকারপ্রধান একটা বিশেষ পরিবার থেকেই নির্বাচিত হওয়ার রেওয়াজ আছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আমরা কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করছি।



 



বিশ্বের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হবার বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয় দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কায় এবং সেটা হয় পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির বলয়েই। কলম্বোয় জন্মগ্রহণকারী বিখ্যাত বক্তা ও রাজনীতিবিদ সলোমন বন্দরনায়েকে ছিলেন ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৯ পর্যন্ত তৎকালীন সিলনের প্রধানমন্ত্রী। ১৯৫৯ সালে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী কর্তৃক নিহত হবার পর তাঁর বিধবা পত্নী সিরিমাভো বন্দরনায়েকে বিশ্বের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি তিনবার সিলন ও শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং তাঁর সময়েই সিলনের নাম বদলে শ্রীলঙ্কা হয়। তাঁর কন্যা চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা ১৯৯৪ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হবার আগে প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন। আশ্চর্যের বিষয়, চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা রাষ্ট্রপতি হবার পর তাঁর মাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করেছিলেন।



 



কিন্তু বর্তমানে শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি মৈত্রীপালা সিরিসেনার উত্থান হয় পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির বাইরে থেকে। তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যোগদানের পর ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত অনেকগুলো মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৫ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নিউ ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে তাঁর প্রতিপক্ষ ও সাবেক রাষ্ট্রপতি মহিন্দ রাজাপক্ষকে পরাজিত করে শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি হিসেবে ক্ষমতাসীন হন। তিনি নতুন ধারার রাজনীতির ঘোষণা দেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে কোনো রাষ্ট্রপতি একবারের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না।



 



বর্তমানে পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। ১৯৯৬ সালে পাকিস্তান ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ইমরান খান দলটি প্রতিষ্ঠা করেন। দলটি প্রথম ২০০২ সালে সাধারণ নির্বাচনে একটি আসনে জয় পায়; ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে দলটিকে বয়কট করা হয়। কিন্তু ২০১৩ সালের নির্বাচনে দলটি ৭.৫ মিলিয়ন ভোট পায় এবং ৩৪টি আসনে জয়ী হয়। সর্বশেষ ২০১৮ সালের নির্বাচনে দলটি ১৬.৯ মিলিয়ন ভোট পায় এবং ১১৬টি আসনে জয়ী হয়। পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির বাইরে থেকে পাকিস্তানের ২২তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন ইমরান খান। সেই নির্বাচনে পাকিস্তান পিপলস্ পার্টি (পিপিপি) পায় মাত্র ৪৩টি আসন।



 



অথচ একসময় পাকিস্তানের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল ছিল পিপিপি। পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো দলটির প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৭৭ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট কর্তৃক তাঁকে একটি রাজনৈতিক হত্যাকা-ে দোষী সাব্যস্ত করে হত্যার পর কন্যা বেনজির ভুট্টো দলের সভাপতি হন এবং দুইবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ২০০৭ সালে এক আত্মঘাতী হামলায় তিনি নিহত হলে তাঁর ১৯ বয়সী পুত্র বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারিকে দলের সভাপতি মনোনীত করা হয়। যদিও বেনজির ভূট্টো তাঁর উইলে সভাপতি পদের জন্যে তাঁর স্বামী আসিফ আলি জারদারিকে মনোনীত করেছিলেন কিন্তু জারদারি নিজেই ছেলের নাম প্রস্তাব করেন। পরবর্তীতে পিপিপি ক্ষমতায় আসলে জারদারি দেশের রাষ্ট্রপতি ও দলের সহ-সভাপতি হন।



 



আমাদের বাংলাদেশেও পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির প্রভাব অনেক। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হবার পর থেকে যারা রাজনৈতিক দল ও সরকারপ্রধান ছিলেন, তাঁরা প্রায় প্রত্যেকেই পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির প্রভাবেই সেই পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। এমনকি স্বাধীনতার পর থেকে যারা বিরোধী দলের প্রধান ছিলেন, তাঁরাও পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির বলয়ের বাইরে যেতে পারেননি। সম্প্রতি একজন প্রাক্তন স্বৈ্বরশাসক, যিনি নয় বছর রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিলেন, তিনিও তাঁর দলের উত্তরসূরি হিসেবে ছোট ভাইকে মনোনীত করেছেন। যদি তাঁর কোনো সন্তান রাজনীতিতে সক্রিয় থাকত তাহলে তিনি যে নিশ্চিতভাবে তাঁর ভাইকে মনোনীত করতেন না, তা বলাই বাহুল্য!



 



পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির অসুবিধা হলো, রাষ্ট্রের একজন নাগরিক মেধা-বলে অন্য যে কোনো পদে অধিষ্ঠিত হতে পারলেও কেবল দলীয়প্রধান বা সরকারপ্রধান পদটিতে অধিষ্ঠিত হতে পারবেন না! রাজনীতি করতে হয় বিচক্ষণটা ও দূরদর্শিতা নিয়ে; নেতা নির্বাচন করতে হয় সাহস, প্রজ্ঞা, আনুগত্যতা এবং সবচে জরুরি-ডিসিশান মেকিং ও ক্রাইসিস ম্যানেজিং সক্ষমতা দেখে। রক্ত বা বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে এই গুণাবলিগুলো মানুষের মধ্যে প্রবাহিত হয়, এ কথা কেউ হলফ করে বলতে পারবে না। দলীয় প্রধানের সন্তান, স্ত্রী বা সহোদরকে লাইমলাইটে আনতে যে পরিমাণ সুযোগ দেয়া হয়, তা যদি দলের তৃণমূল থেকে উঠে আসা কোনো প্রতিভাবান নেতাকে দেয়া হয় তাহলে পরিবারতন্ত্রের বাইরে ক্যারিসমাটিক নেতা অবশ্যই তৈরি হবে।



 



দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি ভারত। ৯০ কোটি ভোটারের এই দেশ পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। সেই ভারতের রাজনীতিতে একসময় কংগ্রেসের ছিলো একচ্ছত্র আধিপত্য। প-িত জওহরলাল নেহরু ছিলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। মহাত্মা গান্ধীর তত্ত্বাবধানে নেহরু ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। পরবর্তীকালে তাঁর মেয়ে ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। মূলত ইন্দিরা গান্ধীর হাত ধরেই কংগ্রেসে পরিবারতন্ত্রের শুরু। গান্ধী উপাধি ব্যবহার করলেও এই পরিবার মূলত নেহরু পরিবার। যারা ইতিহাস পড়েন তারা জানেন, ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী নেহরু কীভাবে ফিরোজ খাঁকে বিয়ে করলেন এবং ফিরোজ খাঁ কীভাবে ফিরোজ গান্ধী হলেন।



 



পরিবারতন্ত্রের উৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে কংগ্রেস। ইন্দিরা গান্ধীর ছেলে রাজীব গান্ধীও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। রাজীব গান্ধীর স্ত্রী সোনিয়া গান্ধী ক্ষমতার কিনারে গিয়ে ফিরে এলেও দল ক্ষমতায় গেলে পুত্র রাহুল গান্ধী যে প্রধানমন্ত্রী হবেন, তা একপ্রকার নিশ্চিত। সোনিয়া গান্ধী যখন কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন তখন সাধারণ সম্পাদক ছিলেন পুত্র রাহুল গান্ধী। সেই কংগ্রেস ২০০৯ সালের পর থেকে আর কোনো নির্বচনে জয়লাভ করতে পারেনি। সর্বশেষ, ১৭তম লোকসভা নির্বাচনেও ভারতের জনগণ রায় দিলেন পরিবারতন্ত্রের বাইরে; গুজরাটের একজন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে। নরেন্দ্র মোদীর এ বিজয় সাধারণভাবে বিজেপির বিজয় বা কংগ্রেসের হার বলে মনে হলেও এই জনরায় ভারতে পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির জন্যে বিশেষ বার্তা বহন করে।



 



নজরুল ইসলাম : লেখক ও এমফিল গবেষক।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
১০৯৭৫৮৩
পুরোন সংখ্যা